উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে একাধিক স্থানে পর্যায়ক্রমে ‘কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এ উদ্যোগের সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা উঠে এসেছে। এর মধ্যে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বড়তারা ইউনিয়নের তারাপানি মৌজায় এবং বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া পৌরসভায় কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পকারখানা স্থাপন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সম্প্রতি সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সচিব মো. সেলিম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনামূলক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষসহ (বেপজা) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায়, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ‘কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গঠন করাকে অধিক কার্যকর বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যপত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে জয়পুরহাট ও বগুড়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপণ্য উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা এবং যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এ দুটি জেলাকে কেন্দ্র করে কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
জয়পুরহাট দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিপ্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত। এ জেলার অর্থনীতির বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, আলু, ভুট্টা, সরিষা, শাকসবজি এবং বিভিন্ন মৌসুমি কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে জেলার কৃষকরা জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। কৃষিপণ্যের উৎপাদনের পাশাপাশি এসব পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে আরও গতিশীলতা আসতে পারে। বিশেষ করে আলু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে আধুনিক সংরক্ষণাগার, বাছাই ও মান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, প্যাকেজিং কারখানা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে উৎপাদনস্থলের কাছাকাছি এসব সুবিধা তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাত করা, অপচয় কমানো এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মান নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বড়তারা ইউনিয়নের তারাপানি মৌজাকে প্রাথমিকভাবে সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুযায়ী প্রস্তাবিত জমির তথ্য পাঠিয়েছে। এ কারণে ওই স্থানে কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বগুড়া উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। জেলাটির কৃষি উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং যোগাযোগসুবিধা কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিপণনের ক্ষেত্রেও বগুড়ার ভূমিকা রয়েছে।
বগুড়ার কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষির সঙ্গে ব্যবসা ও শিল্পের সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা গেলে কাঁচামালের স্থানীয় চাহিদা তৈরি হবে। একই সঙ্গে কৃষক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক ও শিল্পকারখানার কর্মীদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া পৌরসভাকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ স্থান সম্পর্কে ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য জেলা প্রশাসনকে পাঠাতে বলা হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 












