দীর্ঘ কয়েক যুগের অবহেলা আর অযত্ন কাটিয়ে অবশেষে নান্দনিক রূপে সাজছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত ঐতিহাসিক ‘ডিসি হিল’। নবাগত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে শুরু হওয়া এই সংস্কার কাজে উচ্ছ্বসিত নগরবাসী। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এই পাহাড়ে প্রাতঃভ্রমণ করা লেখক স্বপন কুমার দাশসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সোমবার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী যখন ডিসি হিল চট্টগ্রামের খুলশি এলাকার বাসিন্দা লেখক স্বপন কুমার দাশ। এক সময় সফল পরিবহন ব্যবসায়ী ছিলেন। ২০১৮ সালে স্ট্রোক করার পর সন্তানদের পরামর্শে ব্যবসা ছেড়ে অবসর জীবন শুরু করেন। স্ত্রী বিয়োগের পর দুই সন্তান উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে থাকায় বিশাল ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকেন। এই নিঃসঙ্গ জীবনে গত ৩৪ বছর ধরে তার প্রতিদিনের শুরু হয় ডিসি হিলে প্রাতঃভ্রমণের মাধ্যমে।

তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই পাহাড়ের শ্রীহীন পরিবেশ নিয়ে প্রশাসনের ওপর বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি। সম্প্রতি সংস্কার কাজ শুরু হওয়ায় সোমবার সকালে সরাসরি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ধন্যবাদ জানান এই প্রবীণ নাগরিক। আবেগে আপ্লুত স্বপন দাশ বলেন, অবসর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ডিসি হিল। জেলা প্রশাসক যে রুচিশীলভাবে সংস্কার করছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ পুরোপুরি বদলে যাবে।
কী কী সংস্কার হচ্ছে? জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ডিসি হিলকে নাগরিক বান্ধব করতে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। পাহাড়ের শীর্ষে জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবন হওয়ার সুবাদে অব্যবস্থাপনাগুলো বর্তমান ডিসির নজরে আসে।
অবকাঠামো : হাঁটার রাস্তা সংস্কার এবং বিভিন্ন দেয়ালে লাল-সাদা নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
আলোকসজ্জা : অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ দূর করতে পুরো এলাকায় আধুনিক ‘থার্ড লাইট’ বা ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে।
সৌন্দর্যবর্ধন : সেখানে থাকা ঝরনা বা ফোয়ারা এবং দুটি উন্মুক্ত মঞ্চ সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি : বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাস্কর্য এলাকাটিকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও মানসম্মত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নাগরিক সুবিধা : নতুন ওয়াশ ব্লক নির্মাণ এবং ডাস্টবিনের সুব্যবস্থা করা হচ্ছে।
উচ্ছ্বসিত প্রাতঃভ্রমণকারী সংগঠনগুলো ডিসি হিলের এই পরিবর্তনে ‘শতায়ু অঙ্গন’, ‘ইয়োগা প্রভাতি’, ‘প্রভাতী আড্ডা’ ও ‘উজ্জীবন’-এর মতো প্রাতভিত্তিক সংগঠনগুলো অভিনন্দন জানিয়ে ব্যানার টাঙিয়েছে।

‘ভোরের ডাক’-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান ভুঁইয়া বলেন, আগে এখানে কুকুর ও পাগলের উপদ্রব ছিল, নিয়মিত পরিষ্কার করা হতো না। এখন লাইটিং করায় আমাদের মনও আলোকিত হয়েছে। ‘উজ্জীবন’-এর সভাপতি মিল্টন ঘোষ বলেন, ২০০৪ সাল থেকে এখানে আসছি। আগে অনেক ডিসি এসেছেন, কিন্তু কেউ এমন উদ্যোগ নেননি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আমি যোগদানের পর দেখলাম হাঁটার জায়গাগুলো স্বাস্থ্যকর নয়। এই শহরের মানুষের জন্য খোলা জায়গা খুবই সীমিত। মানুষ যাতে একটু স্বস্তিতে শ্বাস নিতে পারে এবং আনন্দ পায়, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।
প্রসঙ্গত, ইংরেজ শাসনামলে এখানে চাকমা রাজার বাড়ি থাকলেও পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের বাসভবন হওয়ার কারণে এটি ‘ডিসি হিল’ নামে পরিচিতি পায়। সংস্কারের ফলে নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির সড়ক সংলগ্ন এই ঐতিহাসিক স্থানটি এখন নগরবাসীর জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















