আফজাল হোসেন : প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)—দুটোরই তীব্র সংকটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিত্যদিনের রান্না কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও পাইপলাইনের গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও আবার দিনে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা অতি কম চাপে গ্যাস মিলছে। অপরদিকে এলপিজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাজারে সিলিন্ডার মিলছে না। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকার কিংবা বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষজন বিকল্প হিসেবে ফিরছেন মাটির চুলায়।

রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলী, খিলগাঁও, কাঁঠালবাগান ও মগবাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক দিন ধরে পাইপলাইনের গ্যাস সংকট চলছে। বেশির ভাগ গ্রাহক জানান, গভীর রাত বা ভোরে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না। গ্যাস না পেলেও নিয়মিত মাসিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মীর হুযাইফা আল মামদূহ বলেন, “মঙ্গলবার থেকে আমাদের বাসায় একেবারেই গ্যাস নেই। কয়েক দিন ধরে চুলা জ্বলেনি। রাইস কুকার দিয়ে কোনোরকমে এক বেলা রান্না হচ্ছে।”
পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দা এফ এম আনোয়ার হোসেন জানান, “বুধবার রাত থেকে গ্যাস নেই। বাইরে থেকে খাবার আনতে হচ্ছে। বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে হবে ভাবছি, কিন্তু তাতে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যাবে।”
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সাদিকুন নাহার বলেন, “আমরা পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ১২ কেজির সিলিন্ডার এখন ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। এত দামেও পাব কি না, জানি না।” তিনি আরও জানান, তাঁর শাশুড়ির বাসায় মধ্যরাতের পর অল্প সময় গ্যাস আসে, সকাল সাতটার আগেই চলে যায়। ফলে এখন বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
রাজধানীর নিউমার্কেট ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যাস–সংকটের কারণে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকার কিনতে দোকানগুলোতে মানুষের ভিড় বেড়েছে। অন্যদিকে কামরাঙ্গীরচরে মাটির চুলার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি চুলা তৈরি হচ্ছে।
ঢাকার বাইরে রাজশাহীতেও এলপিজি সিলিন্ডার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। নগরীর সাহেববাজার এলাকায় হোটেল মালিকরা জানান, চড়া দামে সিলিন্ডার কিনে কোনোভাবে রান্না চালাতে হচ্ছে। রহমানিয়া হোটেলের মালিক শওকত খান বলেন, “আগে ১২০০ টাকার সিলিন্ডার এখন ১৪২০ টাকা নিচ্ছে। জানুয়ারি জুড়েই সংকট থাকবে বলা হচ্ছে।”
মেমোরি হোটেলের মালিক সেলিম ইলাহী জানান, ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় উঠেছে। তিনি বলেন, “এভাবে সংকট তৈরি হওয়া কোনো সিস্টেম হতে পারে না।”
রাজশাহীর খুচরা ব্যবসায়ী মতিনুর রহমান বলেন, “কোম্পানি থেকে গ্যাস সিলিন্ডার দিচ্ছে না। আমাদের কাছে যে দু-চারটা ছিল, সেটাও শেষ।” নগরীর বাসিন্দা প্রণব দাস পিন্টু বলেন, “তিনবেলা খাবার রান্না করার মতো গ্যাস না থাকা মানা যায় না। দ্রুত সমাধান দরকার।”

এলপিজি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিএম ও যমুনা গ্যাসের ডিলার মোহাম্মদ আলী বলেন, “বসুন্ধরা এক মাস আগে সরবরাহ বন্ধ করেছে। আজ থেকে যমুনা ও বিএম গ্যাসেও সিলিন্ডার নেই।” তবে এ বিষয়ে বিএম গ্যাসের রাজশাহীর ম্যানেজার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ এলপিজি পাওয়ায় অটোগ্যাসনির্ভর পরিবহন খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি জানিয়েছে, তুরাগ নদের নিচে একটি বড় পাইপলাইনের ক্ষতি এবং শেরেবাংলা নগর এলাকায় একটি ভালভ বিস্ফোরণের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এতে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে রাজধানীর বড় অংশে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
হঠাৎ করে এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। নির্ধারিত দামে গ্যাস না পেয়ে তাঁদের অনেকেই আবার মাটির চুলার দিকে ফিরে যাচ্ছেন। খুচরা বিক্রেতারা অভিযোগ করছেন, পরিবেশকরা সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত দামে এলপিজি সরবরাহ করছেন না। ভোগান্তিতে থাকা গ্রাহকদের দাবি, দ্রুত পাইপলাইন মেরামত ও এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রাজধানীসহ দেশের নগরজীবনে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















