ঢাকা ০১:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রূপালি চিংড়ির পর এবার সাতক্ষীরার ‘সফটশেল’ কাঁকড়ায় বিশ্বজয়

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:৫৫:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে এখন ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনির বিস্তীর্ণ জলাশয়ে এখন প্লাস্টিকের খাঁচার সারি। সেখানে বড় হচ্ছে ‘সফটশেল’ বা নরম খোসার কাঁকড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় এই কাঁকড়া এখন উপকূলীয় মানুষের ভাগ্য বদলের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চিংড়ির পর কাঁকড়া এখন এ অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য। লাভ বেশি হওয়ায় অনেক চাষি এখন চিংড়ি ছেড়ে ঝুঁকছেন কাঁকড়া চাষে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, সাতক্ষীরার প্রায় ৪২০ হেক্টর জমিতে এখন কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু শ্যামনগরেই রয়েছে ১ হাজার ১৯৫টি ঘের, যার ৮৭০টিই উৎসর্গ করা হয়েছে নরম খোসার কাঁকড়ার জন্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাতক্ষীরা থেকে ৬৭ লাখ ডলার সমমূল্যের কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল, যা এখন আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি এখন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেও পৌঁছে যাচ্ছে সাতক্ষীরার এই সফটশেল কাঁকড়া।
সুন্দরবনসংলগ্ন দাতিনাখালী গ্রামের ‘ভাই ভাই অ্যাগ্রো ক্র্যাব ফিশারিজ’-এর মালিক বিশ্বনাথ মন্ডল জানান তাঁর সফলতার কথা। ২০১৭ সালে শুরু করা তাঁর খামারে এখন খাঁচার সংখ্যা ৫৫ হাজার। তিনি বলেন, “১০০ গ্রাম ওজনের শক্ত কাঁকড়াকে ২০ দিন তেলাপিয়া মাছ খাইয়ে মোটাতাজা করি। খোলস বদলানোর পর ওজন ১৫০ গ্রাম হলে তা রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করা হয়।”
আরেক চাষি মাধব সরকার জানান, ৭০০ খাঁচায় তাঁর খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকা। বাজার ঠিক থাকলে মৌসুম শেষে তাঁর ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভের আশা রয়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি নরম কাঁকড়া ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষিরা এখন শুধু কাঁকড়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। কাঁকড়া চাষ হয় খাঁচায়, যা পানির উপরিস্তরে ভাসমান থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পানির নিচের স্তরে রুই, কাতলা ও তেলাপিয়ার মতো সাদা মাছ চাষ করে বাড়তি আয় করছেন অনেক চাষি। একে বলা হচ্ছে পুকুরের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার।
কাঁকড়া শিল্প এই অঞ্চলে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি আয়ের বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঁকড়ার খাবার তৈরি করা, খাঁচা পরিষ্কার রাখা এবং খোলস পাল্টানোর সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণের কাজে নারীরা বড় ভূমিকা রাখছেন।
শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদ হাসান বলেন, সম্ভাবনার পাহাড় থাকলেও এই শিল্পের বড় বাধা এখন পোনা বা ক্র্যাব সিড সংকট। চাষি আবদুল্লাহ আল কাইয়ুম আবু বলেন, “আগে ১০০ টাকায় পোনা পাওয়া যেত, এখন তা ৩০০-৪০০ টাকা হয়েছে।” সুন্দরবনে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের অর্ধেক সময় পোনা সংগ্রহ বন্ধ থাকে। এ ছাড়া পোনা মৃত্যুর উচ্চহার ও হ্যাচারির অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
“দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁকড়া আসে শ্যামনগর থেকে। চাষিদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি।”
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম জানান, পোনা সংকট মেটাতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি টেকসই চাষাবাদের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে হ্যাচারি স্থাপন করা গেলে এই শিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রেকর্ড গড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে দুই পরিবহনের সংঘর্ষে চালক নিহত, আহত ১০

রূপালি চিংড়ির পর এবার সাতক্ষীরার ‘সফটশেল’ কাঁকড়ায় বিশ্বজয়

প্রকাশিত : ০৯:৫৫:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে এখন ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনির বিস্তীর্ণ জলাশয়ে এখন প্লাস্টিকের খাঁচার সারি। সেখানে বড় হচ্ছে ‘সফটশেল’ বা নরম খোসার কাঁকড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় এই কাঁকড়া এখন উপকূলীয় মানুষের ভাগ্য বদলের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চিংড়ির পর কাঁকড়া এখন এ অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য। লাভ বেশি হওয়ায় অনেক চাষি এখন চিংড়ি ছেড়ে ঝুঁকছেন কাঁকড়া চাষে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, সাতক্ষীরার প্রায় ৪২০ হেক্টর জমিতে এখন কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু শ্যামনগরেই রয়েছে ১ হাজার ১৯৫টি ঘের, যার ৮৭০টিই উৎসর্গ করা হয়েছে নরম খোসার কাঁকড়ার জন্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাতক্ষীরা থেকে ৬৭ লাখ ডলার সমমূল্যের কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল, যা এখন আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি এখন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেও পৌঁছে যাচ্ছে সাতক্ষীরার এই সফটশেল কাঁকড়া।
সুন্দরবনসংলগ্ন দাতিনাখালী গ্রামের ‘ভাই ভাই অ্যাগ্রো ক্র্যাব ফিশারিজ’-এর মালিক বিশ্বনাথ মন্ডল জানান তাঁর সফলতার কথা। ২০১৭ সালে শুরু করা তাঁর খামারে এখন খাঁচার সংখ্যা ৫৫ হাজার। তিনি বলেন, “১০০ গ্রাম ওজনের শক্ত কাঁকড়াকে ২০ দিন তেলাপিয়া মাছ খাইয়ে মোটাতাজা করি। খোলস বদলানোর পর ওজন ১৫০ গ্রাম হলে তা রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করা হয়।”
আরেক চাষি মাধব সরকার জানান, ৭০০ খাঁচায় তাঁর খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকা। বাজার ঠিক থাকলে মৌসুম শেষে তাঁর ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভের আশা রয়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি নরম কাঁকড়া ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষিরা এখন শুধু কাঁকড়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। কাঁকড়া চাষ হয় খাঁচায়, যা পানির উপরিস্তরে ভাসমান থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পানির নিচের স্তরে রুই, কাতলা ও তেলাপিয়ার মতো সাদা মাছ চাষ করে বাড়তি আয় করছেন অনেক চাষি। একে বলা হচ্ছে পুকুরের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার।
কাঁকড়া শিল্প এই অঞ্চলে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি আয়ের বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঁকড়ার খাবার তৈরি করা, খাঁচা পরিষ্কার রাখা এবং খোলস পাল্টানোর সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণের কাজে নারীরা বড় ভূমিকা রাখছেন।
শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদ হাসান বলেন, সম্ভাবনার পাহাড় থাকলেও এই শিল্পের বড় বাধা এখন পোনা বা ক্র্যাব সিড সংকট। চাষি আবদুল্লাহ আল কাইয়ুম আবু বলেন, “আগে ১০০ টাকায় পোনা পাওয়া যেত, এখন তা ৩০০-৪০০ টাকা হয়েছে।” সুন্দরবনে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের অর্ধেক সময় পোনা সংগ্রহ বন্ধ থাকে। এ ছাড়া পোনা মৃত্যুর উচ্চহার ও হ্যাচারির অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
“দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁকড়া আসে শ্যামনগর থেকে। চাষিদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি।”
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম জানান, পোনা সংকট মেটাতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি টেকসই চাষাবাদের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে হ্যাচারি স্থাপন করা গেলে এই শিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রেকর্ড গড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।