বরিশালের চরমোনাই ইউনিয়নের চরহোগলা গ্রামে নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে এক ব্যতিক্রমী স্থাপনা—গাজী কালু দরগাবাড়ির পাঞ্জেগানা মসজিদ। বাহারি কারুকাজ বা দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের জন্য নয়, বরং ক্ষুদ্র আকার ও রহস্যময় ইতিহাসের কারণেই এটি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এটিই বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মসজিদ।
মাত্র ৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের এ মসজিদে একসঙ্গে তিন থেকে চারজনের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন না। তিন ফুট উচ্চতার একটি দরজা, উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটি ছোট জানালা এবং একটি গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির অভ্যন্তরীণ উচ্চতা প্রায় সাড়ে ১২ ফুট। মিম্বর না থাকলেও দেয়ালের ভেতরে খাঁজ কেটে তার আকৃতি তৈরি করা হয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের বিশ্বাস, এটি পর্তুগিজ আমলে নির্মিত হয়েছিল। পুরোনো খতিয়ান ও রেকর্ডপত্রে আব্দুল মজিদ সিকদার ও বন্দে আলী সিকদারের নাম পাওয়া যায়। সেখানে ২১ শতাংশ জমি মসজিদের নামে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নিবন্ধিত রয়েছে বলে জানা যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি বিরল প্রজাতির বিশাল ‘লাহর’ গাছ মসজিদটিকে চারদিক থেকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছে যে দূর থেকে এটি সহজে চোখেই পড়ে না। গাছের শিকড়, ডালপালা ও বাকলের আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে শত বছরের পুরোনো ইতিহাস। সম্পূর্ণ পোড়ামাটি ও চুন-সুড়কি দিয়ে নির্মিত মসজিদটি স্থানীয়ভাবে ‘গায়েবি মসজিদ’ ও ‘কানা মসজিদ’ নামেও পরিচিত।

মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ বাদল সিকদার জানান, একসময় পতাং ও নাপিতেরহাট এলাকায় একই ধরনের আরও দুটি ছোট মসজিদ ছিল। তবে সেগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এই মসজিদটিই সেই ঐতিহ্যের একমাত্র সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা কিংবদন্তি ও অলৌকিক বিশ্বাস। প্রবীণদের অনেকে দাবি করেন, মসজিদ বা এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লাহর গাছের অসম্মান করলে অমঙ্গল নেমে আসে। এ কারণে গাছের ঝরে পড়া পাতাও কেউ স্পর্শ করেন না। এমনকি জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনে আসছি, গাছটির পাতা ছেঁড়া বা ডাল কাটলে ক্ষতি হয়। তাই গ্রামের কেউ এ গাছের কোনো অংশ স্পর্শ করার সাহস করেন না।”
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে মানত করতে আসেন। মানতের অর্থ দিয়ে মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল, মাহফিল ও গণখাদ্যের আয়োজন করা হয়। যদিও এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত জামাত অনুষ্ঠিত হয় না, তবুও অনেকেই বিশেষ উদ্দেশ্যে এসে নামাজ আদায় করেন।
সঠিক ইতিহাস ও নির্মাণকাল অজানা থাকলেও স্থানীয়দের বিশ্বাস, রহস্যময় এই মসজিদটি অলৌকিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাদের দাবি, বিশ্বের ক্ষুদ্রতম এই মসজিদটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা ।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















