ঢাকা ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬

বিসিসির প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীনের স্পর্শে জেগে উঠছে বাংলার ভেনিস

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০১:৩৪:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: বরিশাল এই নাম উচ্চারণ করলেই মনে ভেসে ওঠে কীর্তনখোলার কলতান, সোনালি ধানের মাঠ, নৌকার ছন্দ আর অসংখ্য খালের জলজ বিছানা। এটি শুধু একটি নগরী নয়, এটি বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণ, ইতিহাসের সাক্ষী, সংস্কৃতির ধারক। একসময় এই শহরকে বলা হতো ‘খালের শহর’। এখানকার মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর সাধারণ মানুষের অদম্য স্বপ্ন। ব্রজমোহন কলেজের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি গলি, প্রতিটি খালপাড় আজও সেই গর্ব বহন করে। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, দখল, জলাবদ্ধতা আর অব্যবস্থাপনার চাপে সেই গর্বিত নগরী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আকাশ ধূসর হয়ে গিয়েছিল, রাস্তাঘাট জলে ডুবেছিল, নাগরিক সেবা হয়ে উঠেছিল দূরের স্বপ্ন। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক নারীর পদধ্বনি শোনা গেল। অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন যিনি শুধু প্রশাসক নন, যিনি এই নগরীর মায়ের মতো, যাকে আমি অন্তরের গভীর থেকে ভালোবাসি। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে তিনি যেন বরিশালের বুকে ফিরিয়ে এনেছেন নতুন প্রাণের স্পন্দন। তাঁর হাতেই আজ এই ঐতিহ্যমণ্ডিত নগরী নতুন করে জেগে উঠছে। তাঁর কারিশমায় বরিশাল আজ স্বপ্ন দেখছে দেশের শীর্ষ মডেল সিটি হওয়ার। এই প্রতিবেদন সেই নবজাগরণের গল্প, সেই নারীর অক্লান্ত যাত্রার আখ্যান, আর এক নগরীর নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা।

এক নারীর অগ্রযাত্রা : বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী প্রশাসক হিসেবে অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আপা দায়িত্ব নেন ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ। দায়িত্ব গ্রহণের দিনই তিনি নাগরিক সেবা, জলাবদ্ধতা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা ও নগর ব্যবস্থাপনার উন্নতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তার সেই অঙ্গীকার এখন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে।

নাগরিক ভাবনার প্রশাসন : এবারের বিসিসি বাজেট প্রণয়নের আগে প্রথমবারের মতো নগরবাসীর মতামত নেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনের অংশগ্রহণমূলক মানসিকতার বড় পরিচয়। সভায় নাগরিক, পেশাজীবী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের পরামর্শ শোনা হয় এবং প্রশাসক তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দেন। এই পদ্ধতি নগর রাজনীতির প্রচলিত একমুখী ধারা ভেঙে নাগরিককে সিদ্ধান্তের অংশীদার করেছে।

শিক্ষাজীবনের মেধা : বরিশালের শিক্ষাঙ্গনে তার পথচলা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই, এবং পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিষয়ে তার পড়াশোনা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। শিক্ষকতা ও আইনপেশার অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক চিন্তায় শৃঙ্খলা ও যুক্তির ভিত তৈরি করে। ফলে তিনি কেবল রাজনৈতিক মুখ নন, একজন শিক্ষিত ও প্রাজ্ঞ প্রশাসক হিসেবেও সামনে এসেছেন ।

রাজনীতির আগুন থেকে সেবার আলো : শিরীনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে, পরে তিনি ছাত্র সংসদ, মহিলা দল, জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাই তাকে প্রশাসনিক দায়িত্বে শক্ত ভিত দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাওয়া এই দায়িত্ব তার জন্য শুধু পদ নয়, বরং দায়বদ্ধতার এক বড় পরীক্ষা। ছাত্রজীবনের সেই উত্তাল দিনগুলো থেকে শুরু। ১৯৮৫ সালে ব্রজমোহন কলেজের প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পতাকা হাতে তুলেছিলেন যে তরুণী, তিনি আজ নগরীর প্রশাসক। ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক, এজিএস, জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ধাপে ধাপে তিনি পেরিয়েছেন রাজনীতির কঠিন পথ। মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সব পদেই তিনি ছিলেন মানুষের পাশে। আজ সেই অভিজ্ঞতার আগুন জ্বলে উঠেছে সেবার আলোয়। শাসক নয়, সেবক হতে চাই এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর আত্মার পরিচয়।

চার মাসে যে পরিবর্তনের ঝড় : দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পেরোয়নি। অথচ নগরীর বুক থেকে উধাও হয়েছে “হরিলুটের” পুরনো রীতি। বন্ধ হয়েছে কমিশন বাণিজ্যের কালো অধ্যায়। নাগরিকদের নগরভবন আজ “অনিয়ম” এর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন সেবা উন্মুক্ত হচ্ছে। সড়ক নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার, মশক নিধন, খাল উদ্ধার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন প্রতিটি কাজেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। রিকশায় চড়ে অফিসে আসা সেই প্রথম কর্মদিবসের ছবি আজও নগরবাসীর চোখে ভাসে। তিনি শুধু নির্দেশ দেন না, নিজে মাঠে নেমে তদারকি করেন। এই তৎপরতাই বদলে দিচ্ছে বরিশালের মুখচ্ছবি।

জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ : বরিশাল একসময় ছিল খাল-নদীর শহর। কিন্তু দখল ও অব্যবস্থাপনায় সেই খালগুলো হারিয়েছে প্রাণ। শিরীন আপার হাতে এখন সেই খালগুলো ফিরে পাচ্ছে নতুন জীবন। জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী, লাকুটিয়া এসব খাল পুনঃখনন ও পাড় সংরক্ষণের জন্য ৭৬৯ কোটি টাকার প্রকল্প ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম পাড়ে বন্যা প্রতিরোধে ৫৩৩ কোটি টাকার আরেক প্রকল্পও প্রস্তুত। সামান্য বৃষ্টিতে যে নগরী জলে ভেসে যেত, সেই নগরী আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে।

বর্জ্যের পাহাড় থেকে পরিচ্ছন্ন নগরী : প্রতিদিন প্রায় তিনশ টন বর্জ্য অপসারণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে শিরীন আপা এগিয়েছেন। কাউনিয়ার ময়লাখোলা এখন আর তুতুরে পরিবেশ নয় রাতে ঝলমলে আলোয় ভরে ওঠে। ডাম্প ট্রাক, ভ্যাকুয়াম ট্রাক, কম্প্যাক্ট গার্বেজ ট্রাক নতুন যানবাহন যোগ হয়েছে। কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঈদের সময় সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের অর্ধেকের মধ্যেই বর্জ্য অপসারণ এটাই প্রমাণ করে তাঁর নেতৃত্বের দক্ষতা। পরিচ্ছন্নকর্মীদের ঈদ উপহার, হরিজন-ডোম সম্প্রদায়ের জন্য আধুনিক ভবন নির্মাণ সবই তাঁর মানবিকতার প্রতিফলন।

ডিজিটাল সেবায় নাগরিকের দোরগোড়ায় সরকার :
অনলাইন অভিযোগ কেন্দ্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, সনদপত্র সবকিছুই এখন সহজ। ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে। নগরবাসী আর লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হয় না। এই সহজতাই আধুনিক নগরীর প্রথম শর্ত। শিরীন আপা বুঝেছেন সেবা যদি মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে প্রশাসন অর্থহীন।

ভাসমান ব্যবসায়ীদের স্থায়ী ঠিকানা : ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য স্থায়ী দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কেডিসি এলাকায় পঞ্চাশটি দোকান ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত বাজার গড়ে তুলে যানজট কমানো এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা এটাই টেকসই উন্নয়নের পথ। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরনো বাঁশখোলা সরিয়ে ফেলা যা আগে কোনো মেয়র সাহস করেননি সেই সাহস দেখিয়েছেন শিরীন আপা।

নারী ও শিশুবান্ধব নগরীর স্বপ্ন : নারীদের জন্য পাবলিক টয়লেট, শিশুদের জন্য গ্রিন সিটি পার্কের উন্নয়ন, ৫০ হাজার বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা সবই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিককে চাকরি দিয়ে তিনি যে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বার্তা দিয়েছেন, তা যুগান্তকারী। “তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী আমাদের সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ” এই কথা বলে তিনি শুধু নিয়োগপত্র দেননি, দিয়েছেন মর্যাদা। এমন উদ্যোগ নগরের সামাজিক ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করে। নারী প্রশাসক হিসেবে তার উপস্থিতি অনেক মেয়ের চোখে নতুন সম্ভাবনার ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

কর না বাড়িয়েও বাজেটের নতুন দিগন্ত : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন তিনি কোনো নতুন কর বৃদ্ধি ছাড়াই। সীমিত রাজস্বের মধ্যেও নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর এই প্রতিশ্রুতি অসাধারণ। সড়ক-ড্রেনেজ উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, ডিজিটাল সেবা প্রতিটি খাতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপচয় রোধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এই তিন নীতিতেই তিনি এগিয়ে চলেছেন।

মাঠের মানুষ, মাঠের নেতৃত্ব : রাতের বেলা পরিচ্ছন্নতা তদারকি, জলাবদ্ধ ড্রেন পরিদর্শন, উন্নয়নকাজের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ তিনি কখনো অফিসের চার দেয়ালে আটকে থাকেন না। ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থা, গভীর রাতে পার্কে উপস্থিতি এসবই তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, অসুস্থতায় দেখা করা এই মানবিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বরিশালের স্বপ্ন তুলে ধরা : সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশ নায়ক তারেক রহমানের কাছে তিনি তুলে ধরেছেন বরিশালের পুঞ্জীভূত সমস্যা। ১৪টি খাল পুনরুদ্ধার, ফুটওভার ব্রিজ, ৩০টি ওয়ার্ডের সমন্বিত উন্নয়ন সব দাবি তিনি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসও পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় বরিশাল এখন আর অবহেলিত নয় এটাই শিরীন আপার কূটনৈতিক সাফল্য।

স্থবির প্রকল্পে নতুন গতি : ৭৯৭ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প যে স্থবির হয়ে পড়েছিল, সেখানে তিনি নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন। ১৪২টি সড়ক, ১৩৫ কিলোমিটার রাস্তা, ১০০ কিলোমিটার ড্রেন এসব কাজ এখন এগিয়ে চলছে। ২০০টি ভবনের নকশা একসঙ্গে অনুমোদন দিয়ে তিনি নাগরিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ঘুচিয়েছেন। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার এই দৃষ্টান্তই মডেল সিটির ভিত্তি।

সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বরিশালের অঙ্গীকার :
গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি এই স্লোগান শুধু কথার কথা নয়। ৫০ হাজার বৃক্ষ রোপণ, ইকোপার্কের পরিকল্পনা, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালু, পানির এটিএম বুথ সবই তাঁর দূরদৃষ্টির ফসল। নগরবাসী আজ বিশ্বাস করে শিরীন আপার হাতে বরিশাল সত্যিই ফুলের মতো সুন্দর হয়ে উঠবে।

একজন প্রিয় মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি : ব্যক্তিগতভাবে আপনি যাকে পছন্দ করেন, তার কাজের মধ্যে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার ছাপ দেখতে চাওয়াটা স্বাভাবিক। শিরীন আপার প্রশাসনে সেই ছাপ অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন বিশেষ করে নাগরিক সেবা, পানি, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে। আমার কাছে তিনি শুধু প্রশাসক নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি রাজনীতির কঠিন পথে হাঁটতে হাঁটতেও মানুষের সেবাকেই জীবনের মূলমন্ত্র করেছেন। যাঁর চোখে আমি দেখি বরিশালের ভবিষ্যৎ, যাঁর হাতে আমি দেখি নগরীর নতুন সূর্য। তাঁর নেতৃত্বে বরিশাল শুধু মডেল সিটি হবে না হবে দেশের গর্বের প্রতীক।

বাজেটের ভেতর ভবিষ্যৎ : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিসিসি ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। বাজেটে সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, মশক নিধন, পানির সংকট ও নাগরিক সেবার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এ বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং নগর উন্নয়নের এক নীলনকশা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিরীনের কারিশমা : অল্প কয়েক মাসেই শিরীনের প্রশাসনিক উপস্থিতি নগরবাসীর নজর কেড়েছে। একদিকে তিনি মাঠে নেমে সমস্যার বাস্তব চিত্র দেখছেন, অন্যদিকে দাপ্তরিক জট খুলে সেবা প্রাপ্তিকে সহজ করার চেষ্টা করছেন। এই সক্রিয়তা বরিশালের অনেক মানুষের কাছে নতুন আশার নাম হয়ে উঠেছে।

রাস্তা ও ড্রেনের জাগরণ : নকশা অনুমোদন দীর্ঘসূত্রতা কমানো ও নির্মাণখাতে গতি ফেরানোর দিকেও বিসিসি নজর দিয়েছে। আটকে থাকা ভবনের নকশা অনুমোদন ও ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ নাগরিক ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনে। একই সঙ্গে খাল, ড্রেন ও সড়ক উন্নয়নকে নতুন প্রশাসনের মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

পানি সংকটের অবসান : বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে রুপাতলী ১৬ এমএলডি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি পরিশোধনের সক্ষমতা থাকা এ প্ল্যান্ট নগরবাসীর জন্য বড় স্বস্তির খবর। নিরাপদ পানির দিকে এটি বিসিসির সবচেয়ে মানবিক ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপগুলোর একটি।

পরিচ্ছন্নতার নতুন অধ্যায় : নগরের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিসিসি নতুন গতি এনেছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক ডাম্পিং ব্যবস্থার পরিকল্পনা, এবং সেবাকে ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করছে। শহর পরিষ্কার মানে শুধু রাস্তা ঝকঝকে করা নয়, বরং মানুষের বসবাসযোগ্যতার ভিত্তি শক্ত করা ।

সামাজিক অন্তর্ভুক্তির উষ্ণতা : তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক অভিকে চাকরি দিয়ে বিসিসি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা প্রশাসনিক কর্মসূচির বাইরে এক মানবিক ঘোষণা। এই উদ্যোগ সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় সংবেদনশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। নগর প্রশাসনের কাজ যে কেবল ইট-পাথরের নয়, মানুষের মর্যাদারও সেটি এই পদক্ষেপে স্পষ্ট।

নাগরিক সেবার সহজ পথ : জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ও সনদপত্র সেবাকে সহজ করার দিকেও বিসিসি নজর দিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়। সেবা পৌঁছে দিতে অনলাইনভিত্তিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নাগরিকবান্ধব প্রশাসনের পরিচয় বহন করে। প্রশাসকের লক্ষ্য যদি থাকে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া, তবে সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য।

জনতার সঙ্গে জননেত্রী : বিলকিস জাহান শিরীন আপা বারবার বলেছেন, তিনি প্রশাসক নন, জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চান। এই ভাষা শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং নাগরিকের সঙ্গে এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ার প্রয়াস। প্রশাসন যখন মানুষকে ‘দূর’ মনে না করে, তখন শহরও আপন হয়ে ওঠে।

পরিশেষে, বরিশালের ইতিহাস শুধু অতীতের পাতায় লেখা নয় এটি প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে। কীর্তনখোলার তীর থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ড আজ নতুন আশার আলোয় উদ্ভাসিত। অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আপার নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের ঝড় উঠেছে, তা শুধু সড়ক-ড্রেন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক গভীর মানবিক জাগরণ। তিনি দেখিয়েছেন, প্রশাসন মানে শুধু ক্ষমতার চেয়ার নয় এটি মানুষের সেবা, মর্যাদা আর স্বপ্নের রক্ষা। চার মাস আগে যে নগরীতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অন্ধকার ছিল, আজ সেখানে আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, মানবিকতা ও দূরদৃষ্টিই সেই আলোর উৎস। নগরবাসীর সহযোগিতায়, প্রধানমন্ত্রী দেশ নায়ক তারেক রহমানের ঐকান্তিক সমর্থনে এবং তাঁর নিজের অটল অঙ্গীকারে বরিশাল অবশ্যই দেশের শীর্ষ মডেল সিটিতে পরিণত হবে। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি অপেক্ষা করি সেই দিনের, যখন বরিশালের নাম উচ্চারিত হবে গর্বের সঙ্গে সারা দেশে। শিরীন আপা, আপনার পথ চলুক নিরবচ্ছিন্ন। এই ঐতিহ্যমণ্ডিত নগরী আপনার সঙ্গেই আছে আজও, আগামীকালও, চিরকাল।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিসিসির প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীনের স্পর্শে জেগে উঠছে বাংলার ভেনিস

বিসিসির প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীনের স্পর্শে জেগে উঠছে বাংলার ভেনিস

প্রকাশিত : ০১:৩৪:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: বরিশাল এই নাম উচ্চারণ করলেই মনে ভেসে ওঠে কীর্তনখোলার কলতান, সোনালি ধানের মাঠ, নৌকার ছন্দ আর অসংখ্য খালের জলজ বিছানা। এটি শুধু একটি নগরী নয়, এটি বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণ, ইতিহাসের সাক্ষী, সংস্কৃতির ধারক। একসময় এই শহরকে বলা হতো ‘খালের শহর’। এখানকার মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর সাধারণ মানুষের অদম্য স্বপ্ন। ব্রজমোহন কলেজের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি গলি, প্রতিটি খালপাড় আজও সেই গর্ব বহন করে। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, দখল, জলাবদ্ধতা আর অব্যবস্থাপনার চাপে সেই গর্বিত নগরী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আকাশ ধূসর হয়ে গিয়েছিল, রাস্তাঘাট জলে ডুবেছিল, নাগরিক সেবা হয়ে উঠেছিল দূরের স্বপ্ন। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক নারীর পদধ্বনি শোনা গেল। অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন যিনি শুধু প্রশাসক নন, যিনি এই নগরীর মায়ের মতো, যাকে আমি অন্তরের গভীর থেকে ভালোবাসি। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে তিনি যেন বরিশালের বুকে ফিরিয়ে এনেছেন নতুন প্রাণের স্পন্দন। তাঁর হাতেই আজ এই ঐতিহ্যমণ্ডিত নগরী নতুন করে জেগে উঠছে। তাঁর কারিশমায় বরিশাল আজ স্বপ্ন দেখছে দেশের শীর্ষ মডেল সিটি হওয়ার। এই প্রতিবেদন সেই নবজাগরণের গল্প, সেই নারীর অক্লান্ত যাত্রার আখ্যান, আর এক নগরীর নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা।

এক নারীর অগ্রযাত্রা : বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী প্রশাসক হিসেবে অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আপা দায়িত্ব নেন ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ। দায়িত্ব গ্রহণের দিনই তিনি নাগরিক সেবা, জলাবদ্ধতা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা ও নগর ব্যবস্থাপনার উন্নতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তার সেই অঙ্গীকার এখন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে।

নাগরিক ভাবনার প্রশাসন : এবারের বিসিসি বাজেট প্রণয়নের আগে প্রথমবারের মতো নগরবাসীর মতামত নেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনের অংশগ্রহণমূলক মানসিকতার বড় পরিচয়। সভায় নাগরিক, পেশাজীবী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের পরামর্শ শোনা হয় এবং প্রশাসক তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দেন। এই পদ্ধতি নগর রাজনীতির প্রচলিত একমুখী ধারা ভেঙে নাগরিককে সিদ্ধান্তের অংশীদার করেছে।

শিক্ষাজীবনের মেধা : বরিশালের শিক্ষাঙ্গনে তার পথচলা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই, এবং পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিষয়ে তার পড়াশোনা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। শিক্ষকতা ও আইনপেশার অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক চিন্তায় শৃঙ্খলা ও যুক্তির ভিত তৈরি করে। ফলে তিনি কেবল রাজনৈতিক মুখ নন, একজন শিক্ষিত ও প্রাজ্ঞ প্রশাসক হিসেবেও সামনে এসেছেন ।

রাজনীতির আগুন থেকে সেবার আলো : শিরীনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে, পরে তিনি ছাত্র সংসদ, মহিলা দল, জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাই তাকে প্রশাসনিক দায়িত্বে শক্ত ভিত দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাওয়া এই দায়িত্ব তার জন্য শুধু পদ নয়, বরং দায়বদ্ধতার এক বড় পরীক্ষা। ছাত্রজীবনের সেই উত্তাল দিনগুলো থেকে শুরু। ১৯৮৫ সালে ব্রজমোহন কলেজের প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পতাকা হাতে তুলেছিলেন যে তরুণী, তিনি আজ নগরীর প্রশাসক। ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক, এজিএস, জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ধাপে ধাপে তিনি পেরিয়েছেন রাজনীতির কঠিন পথ। মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সব পদেই তিনি ছিলেন মানুষের পাশে। আজ সেই অভিজ্ঞতার আগুন জ্বলে উঠেছে সেবার আলোয়। শাসক নয়, সেবক হতে চাই এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর আত্মার পরিচয়।

চার মাসে যে পরিবর্তনের ঝড় : দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পেরোয়নি। অথচ নগরীর বুক থেকে উধাও হয়েছে “হরিলুটের” পুরনো রীতি। বন্ধ হয়েছে কমিশন বাণিজ্যের কালো অধ্যায়। নাগরিকদের নগরভবন আজ “অনিয়ম” এর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন সেবা উন্মুক্ত হচ্ছে। সড়ক নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার, মশক নিধন, খাল উদ্ধার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন প্রতিটি কাজেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। রিকশায় চড়ে অফিসে আসা সেই প্রথম কর্মদিবসের ছবি আজও নগরবাসীর চোখে ভাসে। তিনি শুধু নির্দেশ দেন না, নিজে মাঠে নেমে তদারকি করেন। এই তৎপরতাই বদলে দিচ্ছে বরিশালের মুখচ্ছবি।

জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ : বরিশাল একসময় ছিল খাল-নদীর শহর। কিন্তু দখল ও অব্যবস্থাপনায় সেই খালগুলো হারিয়েছে প্রাণ। শিরীন আপার হাতে এখন সেই খালগুলো ফিরে পাচ্ছে নতুন জীবন। জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী, লাকুটিয়া এসব খাল পুনঃখনন ও পাড় সংরক্ষণের জন্য ৭৬৯ কোটি টাকার প্রকল্প ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম পাড়ে বন্যা প্রতিরোধে ৫৩৩ কোটি টাকার আরেক প্রকল্পও প্রস্তুত। সামান্য বৃষ্টিতে যে নগরী জলে ভেসে যেত, সেই নগরী আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে।

বর্জ্যের পাহাড় থেকে পরিচ্ছন্ন নগরী : প্রতিদিন প্রায় তিনশ টন বর্জ্য অপসারণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে শিরীন আপা এগিয়েছেন। কাউনিয়ার ময়লাখোলা এখন আর তুতুরে পরিবেশ নয় রাতে ঝলমলে আলোয় ভরে ওঠে। ডাম্প ট্রাক, ভ্যাকুয়াম ট্রাক, কম্প্যাক্ট গার্বেজ ট্রাক নতুন যানবাহন যোগ হয়েছে। কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঈদের সময় সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের অর্ধেকের মধ্যেই বর্জ্য অপসারণ এটাই প্রমাণ করে তাঁর নেতৃত্বের দক্ষতা। পরিচ্ছন্নকর্মীদের ঈদ উপহার, হরিজন-ডোম সম্প্রদায়ের জন্য আধুনিক ভবন নির্মাণ সবই তাঁর মানবিকতার প্রতিফলন।

ডিজিটাল সেবায় নাগরিকের দোরগোড়ায় সরকার :
অনলাইন অভিযোগ কেন্দ্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, সনদপত্র সবকিছুই এখন সহজ। ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে। নগরবাসী আর লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হয় না। এই সহজতাই আধুনিক নগরীর প্রথম শর্ত। শিরীন আপা বুঝেছেন সেবা যদি মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে প্রশাসন অর্থহীন।

ভাসমান ব্যবসায়ীদের স্থায়ী ঠিকানা : ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য স্থায়ী দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কেডিসি এলাকায় পঞ্চাশটি দোকান ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত বাজার গড়ে তুলে যানজট কমানো এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা এটাই টেকসই উন্নয়নের পথ। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরনো বাঁশখোলা সরিয়ে ফেলা যা আগে কোনো মেয়র সাহস করেননি সেই সাহস দেখিয়েছেন শিরীন আপা।

নারী ও শিশুবান্ধব নগরীর স্বপ্ন : নারীদের জন্য পাবলিক টয়লেট, শিশুদের জন্য গ্রিন সিটি পার্কের উন্নয়ন, ৫০ হাজার বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা সবই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিককে চাকরি দিয়ে তিনি যে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বার্তা দিয়েছেন, তা যুগান্তকারী। “তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী আমাদের সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ” এই কথা বলে তিনি শুধু নিয়োগপত্র দেননি, দিয়েছেন মর্যাদা। এমন উদ্যোগ নগরের সামাজিক ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করে। নারী প্রশাসক হিসেবে তার উপস্থিতি অনেক মেয়ের চোখে নতুন সম্ভাবনার ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

কর না বাড়িয়েও বাজেটের নতুন দিগন্ত : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন তিনি কোনো নতুন কর বৃদ্ধি ছাড়াই। সীমিত রাজস্বের মধ্যেও নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর এই প্রতিশ্রুতি অসাধারণ। সড়ক-ড্রেনেজ উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, ডিজিটাল সেবা প্রতিটি খাতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপচয় রোধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এই তিন নীতিতেই তিনি এগিয়ে চলেছেন।

মাঠের মানুষ, মাঠের নেতৃত্ব : রাতের বেলা পরিচ্ছন্নতা তদারকি, জলাবদ্ধ ড্রেন পরিদর্শন, উন্নয়নকাজের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ তিনি কখনো অফিসের চার দেয়ালে আটকে থাকেন না। ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থা, গভীর রাতে পার্কে উপস্থিতি এসবই তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, অসুস্থতায় দেখা করা এই মানবিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বরিশালের স্বপ্ন তুলে ধরা : সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশ নায়ক তারেক রহমানের কাছে তিনি তুলে ধরেছেন বরিশালের পুঞ্জীভূত সমস্যা। ১৪টি খাল পুনরুদ্ধার, ফুটওভার ব্রিজ, ৩০টি ওয়ার্ডের সমন্বিত উন্নয়ন সব দাবি তিনি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসও পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় বরিশাল এখন আর অবহেলিত নয় এটাই শিরীন আপার কূটনৈতিক সাফল্য।

স্থবির প্রকল্পে নতুন গতি : ৭৯৭ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প যে স্থবির হয়ে পড়েছিল, সেখানে তিনি নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন। ১৪২টি সড়ক, ১৩৫ কিলোমিটার রাস্তা, ১০০ কিলোমিটার ড্রেন এসব কাজ এখন এগিয়ে চলছে। ২০০টি ভবনের নকশা একসঙ্গে অনুমোদন দিয়ে তিনি নাগরিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ঘুচিয়েছেন। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার এই দৃষ্টান্তই মডেল সিটির ভিত্তি।

সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বরিশালের অঙ্গীকার :
গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি এই স্লোগান শুধু কথার কথা নয়। ৫০ হাজার বৃক্ষ রোপণ, ইকোপার্কের পরিকল্পনা, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালু, পানির এটিএম বুথ সবই তাঁর দূরদৃষ্টির ফসল। নগরবাসী আজ বিশ্বাস করে শিরীন আপার হাতে বরিশাল সত্যিই ফুলের মতো সুন্দর হয়ে উঠবে।

একজন প্রিয় মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি : ব্যক্তিগতভাবে আপনি যাকে পছন্দ করেন, তার কাজের মধ্যে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার ছাপ দেখতে চাওয়াটা স্বাভাবিক। শিরীন আপার প্রশাসনে সেই ছাপ অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন বিশেষ করে নাগরিক সেবা, পানি, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে। আমার কাছে তিনি শুধু প্রশাসক নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি রাজনীতির কঠিন পথে হাঁটতে হাঁটতেও মানুষের সেবাকেই জীবনের মূলমন্ত্র করেছেন। যাঁর চোখে আমি দেখি বরিশালের ভবিষ্যৎ, যাঁর হাতে আমি দেখি নগরীর নতুন সূর্য। তাঁর নেতৃত্বে বরিশাল শুধু মডেল সিটি হবে না হবে দেশের গর্বের প্রতীক।

বাজেটের ভেতর ভবিষ্যৎ : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিসিসি ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। বাজেটে সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, মশক নিধন, পানির সংকট ও নাগরিক সেবার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এ বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং নগর উন্নয়নের এক নীলনকশা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিরীনের কারিশমা : অল্প কয়েক মাসেই শিরীনের প্রশাসনিক উপস্থিতি নগরবাসীর নজর কেড়েছে। একদিকে তিনি মাঠে নেমে সমস্যার বাস্তব চিত্র দেখছেন, অন্যদিকে দাপ্তরিক জট খুলে সেবা প্রাপ্তিকে সহজ করার চেষ্টা করছেন। এই সক্রিয়তা বরিশালের অনেক মানুষের কাছে নতুন আশার নাম হয়ে উঠেছে।

রাস্তা ও ড্রেনের জাগরণ : নকশা অনুমোদন দীর্ঘসূত্রতা কমানো ও নির্মাণখাতে গতি ফেরানোর দিকেও বিসিসি নজর দিয়েছে। আটকে থাকা ভবনের নকশা অনুমোদন ও ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ নাগরিক ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনে। একই সঙ্গে খাল, ড্রেন ও সড়ক উন্নয়নকে নতুন প্রশাসনের মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

পানি সংকটের অবসান : বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে রুপাতলী ১৬ এমএলডি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি পরিশোধনের সক্ষমতা থাকা এ প্ল্যান্ট নগরবাসীর জন্য বড় স্বস্তির খবর। নিরাপদ পানির দিকে এটি বিসিসির সবচেয়ে মানবিক ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপগুলোর একটি।

পরিচ্ছন্নতার নতুন অধ্যায় : নগরের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিসিসি নতুন গতি এনেছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক ডাম্পিং ব্যবস্থার পরিকল্পনা, এবং সেবাকে ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করছে। শহর পরিষ্কার মানে শুধু রাস্তা ঝকঝকে করা নয়, বরং মানুষের বসবাসযোগ্যতার ভিত্তি শক্ত করা ।

সামাজিক অন্তর্ভুক্তির উষ্ণতা : তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক অভিকে চাকরি দিয়ে বিসিসি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা প্রশাসনিক কর্মসূচির বাইরে এক মানবিক ঘোষণা। এই উদ্যোগ সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় সংবেদনশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। নগর প্রশাসনের কাজ যে কেবল ইট-পাথরের নয়, মানুষের মর্যাদারও সেটি এই পদক্ষেপে স্পষ্ট।

নাগরিক সেবার সহজ পথ : জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ও সনদপত্র সেবাকে সহজ করার দিকেও বিসিসি নজর দিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়। সেবা পৌঁছে দিতে অনলাইনভিত্তিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নাগরিকবান্ধব প্রশাসনের পরিচয় বহন করে। প্রশাসকের লক্ষ্য যদি থাকে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া, তবে সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য।

জনতার সঙ্গে জননেত্রী : বিলকিস জাহান শিরীন আপা বারবার বলেছেন, তিনি প্রশাসক নন, জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চান। এই ভাষা শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং নাগরিকের সঙ্গে এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ার প্রয়াস। প্রশাসন যখন মানুষকে ‘দূর’ মনে না করে, তখন শহরও আপন হয়ে ওঠে।

পরিশেষে, বরিশালের ইতিহাস শুধু অতীতের পাতায় লেখা নয় এটি প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে। কীর্তনখোলার তীর থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ড আজ নতুন আশার আলোয় উদ্ভাসিত। অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আপার নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের ঝড় উঠেছে, তা শুধু সড়ক-ড্রেন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক গভীর মানবিক জাগরণ। তিনি দেখিয়েছেন, প্রশাসন মানে শুধু ক্ষমতার চেয়ার নয় এটি মানুষের সেবা, মর্যাদা আর স্বপ্নের রক্ষা। চার মাস আগে যে নগরীতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অন্ধকার ছিল, আজ সেখানে আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, মানবিকতা ও দূরদৃষ্টিই সেই আলোর উৎস। নগরবাসীর সহযোগিতায়, প্রধানমন্ত্রী দেশ নায়ক তারেক রহমানের ঐকান্তিক সমর্থনে এবং তাঁর নিজের অটল অঙ্গীকারে বরিশাল অবশ্যই দেশের শীর্ষ মডেল সিটিতে পরিণত হবে। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি অপেক্ষা করি সেই দিনের, যখন বরিশালের নাম উচ্চারিত হবে গর্বের সঙ্গে সারা দেশে। শিরীন আপা, আপনার পথ চলুক নিরবচ্ছিন্ন। এই ঐতিহ্যমণ্ডিত নগরী আপনার সঙ্গেই আছে আজও, আগামীকালও, চিরকাল।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট