জুবাইয়া বিন্তে কবির : ইতিহাস কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্তের জন্ম দেয়, যেগুলো কেবল দিনের খবর হয়ে মিলিয়ে যায় না—বরং জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী চিহ্ন এঁকে দেয়, ভবিষ্যতের পথচলার দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও তেমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী হলো জাতি, যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তারেক রহমান। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, কিংবা ক্ষমতার স্বাভাবিক পালাবদলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মাত্রও নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, নির্বাসন ও অবিচল রাজনৈতিক প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই অধ্যায় শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ রদবদলের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কারণ বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়—এটি এ দেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দলটির উত্থান, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা, বিরোধী দলে সংগ্রাম এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই—সবকিছুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সেই ঐতিহ্যবাহী দলের নেতৃত্বে আজ যে পরিবর্তন ঘটলো, তা স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় রাজনীতিতে নতুন প্রত্যাশা, নতুন প্রশ্ন এবং নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ তাই একক কোনো ব্যক্তির উত্থান নয়; এটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এক প্রত্যাবর্তনের নাম—যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিন্তা এক সুতোয় গাঁথা হয়ে নতুন এক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান : ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরা ছিল আবেগঘন, বেদনাবিধুর এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার ঘরে ফেরা নয়—এটি ছিল এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান। এরপর ৯ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ সেই প্রত্যাবর্তনকে পূর্ণতা দেয়। দীর্ঘ আট বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব গ্রহণ দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে ছিল প্রত্যাশিত, কাঙ্ক্ষিত এবং ন্যায়সঙ্গত। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই দায়িত্ব গ্রহণ একটি স্বাভাবিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফল—কোনো রাজনৈতিক কৌশল বা অস্বচ্ছতার বিষয় নয়।জিয়া পরিবার : ক্ষমতার উত্তরাধিকার নয়, সংগ্রামের ধারাবাহিকতা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারকে নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কেউ কেউ একে ক্ষমতার উত্তরাধিকার বলে আখ্যায়িত করতে চান। কিন্তু ইতিহাস জানে—এই পরিবার ক্ষমতায় এসেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে, কখনোই নিরাপদ পথ বেছে নিয়ে নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে নিয়ে আসা ছিল তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অবদান। তার শাহাদতের পর বিএনপি নেতৃত্বশূন্যতায় পড়েছিল। সেই শূন্যতা পূরণ করতে রাজনীতিতে আসেন বেগম খালেদা জিয়া—একজন সাধারণ গৃহবধূ, যিনি রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন অসাধারণ নেতৃত্বে।
তারেক রহমান এই উত্তরাধিকারের তৃতীয় প্রজন্ম। কিন্তু তার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। বরং তার রাজনৈতিক জীবন শুরু থেকেই কণ্টকাকীর্ণ। ওয়ান–ইলেভেনের অগণতান্ত্রিক অধ্যায়, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, মামলা এবং দীর্ঘ নির্বাসন—সবকিছু তাকে ভেঙে ফেলেনি, বরং পরিণত করেছে।

নির্বাসনে থেকেও নেতৃত্ব : ইতিহাসে বিরল উদাহরণ : বিশ্ব রাজনীতিতে খুব কম নেতা আছেন, যারা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকেও একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছেন। তারেক রহমান সেই বিরল দৃষ্টান্তের অন্যতম। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি বিএনপিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
এই সময় বিএনপি দমন–পীড়ন, মামলা, গ্রেপ্তার, নেতৃত্বশূন্যতার মতো ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। তবু দলটি টিকে ছিল, সংগঠিত ছিল—কারণ নেতাকর্মীরা জানতেন, একজন ‘অভিভাবক’ আছেন, যিনি দূর থেকে হলেও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
ঐক্যের রাজনীতি : দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তারেক রহমান যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সুর যোগ করেছে। “উই হ্যাভ আ প্ল্যান”—এই উচ্চারণ কোনো তাৎক্ষণিক স্লোগান নয়; এটি জনগণ ও রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত। তার ঐক্যের আহ্বান কেবল বিএনপির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পুরো জাতির উদ্দেশে উচ্চারিত। ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবী সমাজ ও কূটনৈতিক মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ও সংলাপ রাজনৈতিক পরিপক্বতারই প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বিভাজন ও বৈরিতার রাজনীতির বিপরীতে এই সংলাপমুখী অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমে ‘মাননীয়’ সম্বোধন প্রত্যাখ্যান করা তার ক্ষমতা–বিমুখ ও দায়বদ্ধ নেতৃত্বের মানসিকতাকে স্পষ্ট করে। তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; তবে তা যেন জাতিকে বিভক্ত না করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সচল রাখা এবং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করার যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা বিভাজনের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে। এই ঐক্যের রাজনীতি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু বিএনপির নয়, সমগ্র জাতির জন্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।সামনে চ্যালেঞ্জ : নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা : চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জন্য এটি সহজ কাজ নয়। দলকে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও তরুণবান্ধব করতে হবে। তৃণমূলকে সক্রিয় করা, স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা—এগুলো তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জনের মূল চাবিকাঠি।
‘রাষ্ট্র মেরামত’ কেবল স্লোগান নয়; এটি অর্থনীতি, নির্বাচন, বিচার, মানবাধিকার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তবমুখী কর্মসূচি নিশ্চিত করার আহ্বান। বিভাজন ও বৈরিতার রাজনীতি ছাড়িয়ে সংলাপমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হল গণতন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধির একমাত্র পথ। আমি বিশ্বাস করি তারেক রহমান শুধু নেতা নয়, তিনি সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বে অভ্যস্ত। তার জীবনসংগ্রাম তাকে অহংকারী নয়, বরং জনগণকে কাছে নিয়ে চলার ক্ষমতা দিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কেবল শক্তিশালী দল হবে না, বরং গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার পথপ্রদর্শক হিসেবেও প্রতিস্থাপিত হবে।
ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পারিবারিক আদর্শ : আমি এবং আমার পরিবারের সবাই রাজনীতিকে দেখি কেবল ক্ষমতার হিসাব–নিকাশ হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শিক সংগ্রাম হিসেবে। আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান। এই তিনটি নাম আমাদের কাছে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়—এরা আমাদের কাছে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। শহীদ জিয়া আমাদের শিখিয়েছেন আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন রাষ্ট্রচিন্তা। বেগম খালেদা জিয়া শিখিয়েছেন আপসহীন সংগ্রাম ও সাংবিধানিক গণতন্ত্র। আর তারেক রহমান আমাদের সামনে তুলে ধরছেন ধৈর্য, সংগঠন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এই ধারাবাহিকতা আমাদের পরিবারের বিশ্বাসের ভিত্তি, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের নৈতিক শক্তি।

আমাদের প্রত্যাশা ও অভিনন্দন : আমরা যারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী নেতৃত্ব এবং সেই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রত্যয়ের ওপর আস্থা রাখি, আমরা বিশ্বাস করি—এই সময়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিক দৃঢ়তা ও সক্ষমতা তারেক রহমানের রয়েছে। তার জীবন কখনোই সহজ ছিল না। সংগ্রাম, কারাবরণ, নির্যাতন ও দীর্ঘ নির্বাসনের প্রতিটি অধ্যায় তাকে অহংকারী করে তোলেনি; বরং করেছে আরও সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। নির্বাসনের দীর্ঘ সময় তাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং মানুষের দুঃখ–দুর্দশা, রাষ্ট্রের সংকট ও গণতন্ত্রের অর্থ আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই আজ তার নেতৃত্বকে দিয়েছে পরিণত ও ভারসাম্যপূর্ণ এক রূপ—যেখানে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে দায়িত্ববোধই মুখ্য। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চতুর্থ চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ একটি নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। এই প্রত্যাশা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়; এটি গণতন্ত্রকামী, ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী এবং মর্যাদাশীল রাষ্ট্রচিন্তায় বিশ্বাসী সমগ্র বাংলাদেশের। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণে আমরা তারেক রহমানকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। মহান আল্লাহ যেন তাকে সত্য, ন্যায় ও মানুষের অধিকারের পথে অবিচল রাখেন। তার নেতৃত্ব হোক গণতন্ত্রের পক্ষে, মানুষের সম্মান ও অধিকার রক্ষার পক্ষে এবং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায়।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















