পটুয়াখালী প্রতিনিধি: তিন বছরের শিশু রাফি জ্বর, সর্দি-কাশির সঙ্গে পাতলা পায়খানায় ভুগছিল। বরগুনার আমতলীর মহিষডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা বাবা মো. রুহুল আমিন স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার আশায় সোমবার সকালে ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে।
কিন্তু হাসপাতালে এসে জানতে পারেন, শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে কাঙ্খিত চিকিৎসা দিতে রাফিকে নিয়ে বরিশালের পথে রওনা হন তিনি।
রুহুল আমিনের মতো প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা পটুয়াখালীর এই হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু হাসপাতালের অবকাঠামো ও শয্যা বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি চিকিৎসকের সংখ্যা। বরং দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের বড় একটি অংশের পদ শূন্য থাকায় চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসকেরা।
হাসপাতালটিতে তত্ত্বাবধায়কসহ চিকিৎসকের ৭৭টি পদের মধ্যে ৫১টিই শূন্য। মাত্র ২৬ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতাল। সোমবার (৩১ আগষ্ট ) সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।
হাসপাতালের শয্যা ২৫০ হলেও ওই দিন হাসপাতালে মোট রোগী ছিলেন ৮২৪ জন। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, আগের ভর্তি রোগী ছিলেন ৭৮১ জন। ওই দিন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২২৯ জন। ছাড়পত্র পেয়েছেন ১০২ জন এবং স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছেড়েছেন ৭৭ জন। ছয়জন রোগীকে অন্যত্র রেফার করা হয়েছে। মারা গেছেন একজন।
অর্থাৎ, হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা ছিল তিন গুণেরও বেশি।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, শুধু চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই আন্তবিভাগে ৩৯ হাজার ১৫০ জন, জরুরি বিভাগে ৪১ হাজার ৭২ জন এবং বহির্বিভাগে ৭৮ হাজার ৯০৩ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসকের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত চাপ।
২৫০ শয্যার হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়কসহ ৭৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৬ জন। এর মধ্যে ১০টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে কর্মরত আছেন শুধু গাইনি বিভাগের একজন। সার্জারি, শিশু, মেডিসিন, নাক-কান-গলা (ইএনটি), অ্যানেসথেশিয়া, চক্ষু, চর্ম ও যৌন, কার্ডিওলজি এবং অর্থোপেডিক-এই নয়টি পদই শূন্য।
জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন চারজন। অর্থোপেডিক, অ্যানেসথেশিয়া, শিশু ও মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসক থাকলেও গাইনি, চক্ষু, কার্ডিওলজি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, প্যাথলজি, চর্ম ও যৌন, সার্জারি এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন বিভাগের আটটি পদ শূন্য।
এ ছাড়া আবাসিক ফিজিশিয়ান, আবাসিক সার্জন ও আবাসিক মেডিকেল অফিসারের তিনটি পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
সহকারী সার্জনের ১৬টি পদের মধ্যে ১৫টিই শূন্য। তিনটি অ্যানেসথেটিক পদের একটিতেও চিকিৎসক নেই। রেডিওলজিস্ট থাকলেও প্যাথলজিস্টের পদ শূন্য।
১০টি আবাসিক মেডিকেল অফিসারের মধ্যে পাঁচটি, ১১টি সহকারী রেজিস্ট্রারের মধ্যে তিনটি এবং আটটি ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের মধ্যে চারটি পদও শূন্য। এ ছাড়া ডেন্টাল সার্জনের পদটিও শূন্য রয়েছে।
হাসপাতালের গাইনি বিভাগে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট থাকায় গর্ভবতী নারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকলেও গত আট মাসে এখানে ৬৭৫টি সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এস এম কবির হাসান জানান, মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে গর্ভবতী মায়েদের সিজার করা হচ্ছে।
শিশু বিভাগেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। হাসপাতালের একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তায় শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক জনবল সংকটও রয়েছে। সহকারী পরিচালক পদটি শূন্য থাকায় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে।
ফলে যে ২৬ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের মধ্য থেকে তত্ত্বাবধায়ককে বাদ দিলে চিকিৎসাসেবা পরিচালনার জন্য কার্যত আরও কমসংখ্যক চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মশিউর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল দিয়েই তাঁরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাঁর ভাষায়, জরুরি ভিত্তিতে শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে চিকিৎসক সংকট অনেকটাই কমবে এবং রোগীরা কাঙ্খিত সেবা পাবেন। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পটুয়াখালী শহরের কালিকাপুর এলাকায় হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। পরে ১৯৯৬ সালে এটি ১৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০০৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শয্যা বাড়ানোর সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চিকিৎসকের পদও সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রোগীর চাপ যত বেড়েছে, চিকিৎসকের সংকট ততই প্রকট হয়েছে।
এরই মধ্যে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পটুয়াখালীর ২৫০ শয্যার হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরে আলাদা ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পও একনেকে অনুমোদন পায়। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ ৫০০ শয্যার সেবা চালু হয়নি।
অন্যদিকে ২০১৪ সালে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলেজটির সঙ্গেই রয়েছে ২৫০ শয্যার পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও চিকিৎসকদের সহায়তায় অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের সেবা চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা ডা. এস এম কবির হাসান চিকিৎসক সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট প্রকট। শিশু বিভাগে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তায় চিকিৎসাসেবা চালানো হচ্ছে। গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকলেও অ্যানেসথেটিক চিকিৎসক নেই। এ অবস্থায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের সহায়তায় সিজার করা হচ্ছে।
তাঁর আশা, হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাওয়া যাবে এবং মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন।
তবে আপাতত বাস্তবতা হলো-শয্যা বেড়েছে, রোগী বেড়েছে কয়েক গুণ; কিন্তু সেই অনুপাতে চিকিৎসক বাড়েনি।
ফলে পটুয়াখালীসহ আশপাশের জেলার হাজারো মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই হাসপাতালটি নিজেই এখন জনবল সংকটে কার্যত অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 























