ঢাকা ০৬:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাঁচ বছর ভাঙা সেতু, এখন ভাসমান পথেই চার গ্রামের স্বস্তি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৪:৩০:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: খালের ওপর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। নিচে গভীর পানি, আর বর্ষায় স্রোতে আরও তীব্র। প্রতিদিন এই সাঁকো পেরিয়েই স্কুলে যেতে হতো শিশুদের। একটু অসাবধান হলেই পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। নারী, বয়স্ক ও শিশুদের জন্য খাল পার হওয়া ছিল নিত্যদিনের ঝুঁকি।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে এভাবেই চলছিল পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের মম্বিপাড়া এলাকার বড়হরপাড়া খালের দুই পাড়ের মানুষের জীবন।
এখন সেই চিত্র কিছুটা বদলেছে। খালের ওপর তৈরি হয়েছে ১৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু। কাঠ ও ৪০টি প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করে তৈরি সেতুটির প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মাত্র ১৫ দিনে নির্মাণ করা হয়েছে এটি।
সেতুটি চালু হওয়ার পর চার গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিতে এসেছে স্বস্তি। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য এটি হয়ে উঠেছে নিরাপদ চলাচলের নতুন পথ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর আগে বড়হরপাড়া খালের ওপর থাকা লোহার সেতুটি ভেঙে যায়। এরপর সেখানে নতুন করে স্থায়ী কোনো সেতু নির্মাণ করা হয়নি।

সেতু না থাকায় খাল পারাপারে মানুষের ভরসা হয়ে ওঠে ভেলা, নৌকা ও বাঁশের সাঁকো।
শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলেই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ত। খালের পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গেলে বাঁশের সাঁকো হয়ে উঠত আরও বিপজ্জনক। স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে তখন অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকত না।
অনেক সময় শিশুদের সঙ্গে নিয়ে সাঁকো পার হতে হতো অভিভাবকদের। নারী ও বয়স্কদেরও একই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হতো।
স্থানীয়দের ভাষায়, খালের ওপর একটি সেতু না থাকায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবনই যেন আটকে ছিল। সেতুটি নির্মাণের আগে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার সময় পা পিছলে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। বর্ষায় স্রোত বেড়ে গেলে সেই ভয় আরও বাড়ত।
নতুন ভাসমান সেতু নির্মাণের পর শিক্ষার্থীদের সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। এখন তারা সেতু দিয়ে খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু শিক্ষার্থী নয়, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সেতুটি ব্যবহার করছেন। ফলে একদিকে যেমন সময় কমছে, অন্যদিকে খাল পারাপারে ঝুঁকিও কমেছে।
ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের চলাচলের কথা বিবেচনা করে ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করা হয়।
ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের বরিশাল বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতেই তাঁরা সেতুটি নির্মাণ করেছেন।
তিনি বলেন, উপকূলীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁদের মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
লতাচাপলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ভাঙা থাকায় এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে ছিলেন। ভাসমান সেতু নির্মাণের ফলে তাঁদের কষ্ট অনেকটাই কমেছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, সেতুটি নির্মাণের ফলে এখন খাল পারাপারে আগের মতো ভেলা বা নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের জন্য এটি বড় সুবিধা হয়েছে।
তবে ভাসমান সেতু নিয়ে তাঁদের আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের দাবি।
তাঁদের প্রত্যাশা, এই ভাসমান সেতুকে স্থায়ী সমাধানের বিকল্প হিসেবে না দেখে দ্রুত খালের ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণ করা হবে।
এতে শুধু চার গ্রামের মানুষের চলাচলই সহজ হবে না, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডও আরও গতিশীল হবে।
ভাসমান সেতুটি পরিদর্শন করেছেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান। তিনি বলেন, মানুষের চলাচলের কষ্ট লাঘবে এমন ভাসমান সেতু নির্মাণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সেতুটি সুন্দর ও কার্যকর হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ডু সামথিং ফাউন্ডেশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।
পাঁচ বছর আগে ভেঙে যাওয়া লোহার সেতুর জায়গায় এখন ভাসমান কাঠের পথ। আপাতত সেটিই চার গ্রামের মানুষের ভরসা।
তবে তাঁদের স্বপ্ন আরও বড়-একদিন এই খালের ওপর তৈরি হবে একটি স্থায়ী সেতু। তখন হয়তো বাঁশের সাঁকো, ভেলা কিংবা ভাসমান ড্রামের ওপর ভর করে আর কাউকে খাল পার হতে হবে না।

পাঁচ বছর ভাঙা সেতু, এখন ভাসমান পথেই চার গ্রামের স্বস্তি

পাঁচ বছর ভাঙা সেতু, এখন ভাসমান পথেই চার গ্রামের স্বস্তি

প্রকাশিত : ০৪:৩০:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: খালের ওপর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। নিচে গভীর পানি, আর বর্ষায় স্রোতে আরও তীব্র। প্রতিদিন এই সাঁকো পেরিয়েই স্কুলে যেতে হতো শিশুদের। একটু অসাবধান হলেই পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। নারী, বয়স্ক ও শিশুদের জন্য খাল পার হওয়া ছিল নিত্যদিনের ঝুঁকি।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে এভাবেই চলছিল পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের মম্বিপাড়া এলাকার বড়হরপাড়া খালের দুই পাড়ের মানুষের জীবন।
এখন সেই চিত্র কিছুটা বদলেছে। খালের ওপর তৈরি হয়েছে ১৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু। কাঠ ও ৪০টি প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করে তৈরি সেতুটির প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মাত্র ১৫ দিনে নির্মাণ করা হয়েছে এটি।
সেতুটি চালু হওয়ার পর চার গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিতে এসেছে স্বস্তি। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য এটি হয়ে উঠেছে নিরাপদ চলাচলের নতুন পথ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর আগে বড়হরপাড়া খালের ওপর থাকা লোহার সেতুটি ভেঙে যায়। এরপর সেখানে নতুন করে স্থায়ী কোনো সেতু নির্মাণ করা হয়নি।

সেতু না থাকায় খাল পারাপারে মানুষের ভরসা হয়ে ওঠে ভেলা, নৌকা ও বাঁশের সাঁকো।
শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলেই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ত। খালের পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গেলে বাঁশের সাঁকো হয়ে উঠত আরও বিপজ্জনক। স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে তখন অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকত না।
অনেক সময় শিশুদের সঙ্গে নিয়ে সাঁকো পার হতে হতো অভিভাবকদের। নারী ও বয়স্কদেরও একই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হতো।
স্থানীয়দের ভাষায়, খালের ওপর একটি সেতু না থাকায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবনই যেন আটকে ছিল। সেতুটি নির্মাণের আগে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার সময় পা পিছলে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। বর্ষায় স্রোত বেড়ে গেলে সেই ভয় আরও বাড়ত।
নতুন ভাসমান সেতু নির্মাণের পর শিক্ষার্থীদের সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। এখন তারা সেতু দিয়ে খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু শিক্ষার্থী নয়, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সেতুটি ব্যবহার করছেন। ফলে একদিকে যেমন সময় কমছে, অন্যদিকে খাল পারাপারে ঝুঁকিও কমেছে।
ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের চলাচলের কথা বিবেচনা করে ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করা হয়।
ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের বরিশাল বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতেই তাঁরা সেতুটি নির্মাণ করেছেন।
তিনি বলেন, উপকূলীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁদের মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
লতাচাপলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ভাঙা থাকায় এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে ছিলেন। ভাসমান সেতু নির্মাণের ফলে তাঁদের কষ্ট অনেকটাই কমেছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, সেতুটি নির্মাণের ফলে এখন খাল পারাপারে আগের মতো ভেলা বা নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের জন্য এটি বড় সুবিধা হয়েছে।
তবে ভাসমান সেতু নিয়ে তাঁদের আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের দাবি।
তাঁদের প্রত্যাশা, এই ভাসমান সেতুকে স্থায়ী সমাধানের বিকল্প হিসেবে না দেখে দ্রুত খালের ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণ করা হবে।
এতে শুধু চার গ্রামের মানুষের চলাচলই সহজ হবে না, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডও আরও গতিশীল হবে।
ভাসমান সেতুটি পরিদর্শন করেছেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান। তিনি বলেন, মানুষের চলাচলের কষ্ট লাঘবে এমন ভাসমান সেতু নির্মাণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সেতুটি সুন্দর ও কার্যকর হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ডু সামথিং ফাউন্ডেশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।
পাঁচ বছর আগে ভেঙে যাওয়া লোহার সেতুর জায়গায় এখন ভাসমান কাঠের পথ। আপাতত সেটিই চার গ্রামের মানুষের ভরসা।
তবে তাঁদের স্বপ্ন আরও বড়-একদিন এই খালের ওপর তৈরি হবে একটি স্থায়ী সেতু। তখন হয়তো বাঁশের সাঁকো, ভেলা কিংবা ভাসমান ড্রামের ওপর ভর করে আর কাউকে খাল পার হতে হবে না।