ঢাকা ০৮:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই সনদ: ঐকমত্যের পথে ভিন্নমতের দোলাচল

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:১১:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
  • ৯৫ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির:

আটাশের আহ্বান পেরিয়ে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রার প্রারম্ভে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’—একটি বহুল আলোচিত দলিল, যার নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে জেগে ওঠে আশা ও সংশয়ের মিশ্র অনুভূতি। এখন পর্যন্ত ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে দলের ভেতর মতবিরোধ স্পষ্ট। কেউ দেখছে পরিবর্তনের নতুন ভোর, কেউ আশঙ্কা করছে আরেকটি ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির কাগুজে দলিল হয়ে পড়বে এটি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন সনদের খসড়া তৈরি করেছিল, তখন প্রশ্ন উঠেছিল—এর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া কী হবে? কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবের মাটিতে নামবে কীভাবে? তখনো উত্তর ছিল অনিশ্চিত। তাই আশঙ্কা জেগেছিল—সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া এই সনদ কেবল রাজনৈতিক শোভনতার প্রদর্শনী হয়ে থাকবে।

৩১ জুলাইয়ের পর থেকে ঐকমত্য কমিশন দলগুলো ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক আনুষ্ঠানিক–অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ৯ অক্টোবর প্রস্তাব ওঠে গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের। এ নিয়ে একধরনের ঐকমত্য হলেও, গণভোটের সময়, আইনি ভিত্তি ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে দলের ভেতর দ্বন্দ্ব থেকেই গেছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সনদ বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হবে, দ্বিতীয় ধাপে সেই আদেশের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভবিষ্যতের সংসদ—যেটি গঠিত হবে গণভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো থেকে—তার থাকবে দ্বৈত ভূমিকা: একদিকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা, অন্যদিকে নিয়মিত সংসদ হিসেবে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা।

এ আদেশের প্রস্তাবিত নাম ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান) আদেশ’। এটি সংবিধানের পরিপূরক আইন হিসেবে গণ্য হবে, যার ভিত্তি হবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। অর্থাৎ, জনগণের অভ্যুত্থানের ক্ষমতাবলে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে এই আদেশ জারি হবে। পরিশিষ্টে থাকবে পুরো জুলাই সনদ—দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকারনামা হিসেবে। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে মতবিরোধের নতুন অধ্যায়। বিএনপি—একটি প্রধান রাজনৈতিক দল—এই বিশেষ আদেশ জারির বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সহ কয়েকটি দল দীর্ঘদিন ধরেই এর দাবি জানিয়ে আসছে। সনদটি সংবিধানের অংশ হলেও এর টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বাহাত্তরের সংবিধানও তো স্থায়ী হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রণীত সেই মহান দলিল মাত্র দুই বছরের মাথায় কত পরিবর্তনের মুখ দেখেছিল! সুতরাং জুলাই সনদও যদি সময়ের রাজনীতির স্রোতে ভেসে যায়, তাতে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আড়ালে সংঘাতের ছায়া : জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিনটি ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারত, যদি না সেখানে দ্বন্দ্বের কালো ছায়া পড়ত। এনসিপি সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি অস্পষ্ট বলে অনুষ্ঠান বর্জন করে। শুধু তাই নয়, তারা আয়োজনকে ঘিরে সমাবেশ ঘটিয়ে বাধা সৃষ্টি করে, যার জেরে সংঘর্ষ হয় ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে।
যদিও দলটির শীর্ষ নেতারা সরাসরি সেখানে ছিলেন না, জনমনে ধারণা গড়ে ওঠে—এনসিপি-ই বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত করেছে। এই সংঘাত শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, জাতীয় ঐকমত্যের সৌন্দর্যকেই ক্ষুণ্ন করেছে। ঐকমত্য কমিশন শেষ মুহূর্তে এসে সনদের কিছু অঙ্গীকার সংশোধন করে। প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিবর্তন আগে কেন করা হলো না? কমিশনের মধ্যে কি এমন দূরদৃষ্টি ছিল না যে তারা আগে থেকেই বুঝতে পারবে কোন বিষয়গুলো বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে? নাকি চাপের মুখে পড়ে কিছু দলকে সন্তুষ্ট করতে হঠাৎ করে সংযোজন করা হয়েছে নতুন বাক্য? এই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন।

সংস্কারের টানাপোড়েন: ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ঐকমত্য কোথায়? সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য হয়েছে খুব কম জায়গায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক বা একাধিক দল আপত্তি জানিয়েছে। যেমন—বিচার বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “জেলা পর্যায়ে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন এবং আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হবে।” চারটি দল শেষ বাক্যটির বিরোধিতা করেছে। তারা চায় আদালতেও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় থাকুক! এটি কেবল একটি প্রস্তাবের উদাহরণ নয়—বরং পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।

আরেকটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে নতুন প্রশাসনিক বিভাগ করা হবে। প্রস্তাবটি তুচ্ছ মনে হলেও, এর মধ্য দিয়ে আমরা প্রশাসনিক বিভাজনের অকারণ মোহের চিত্র দেখি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাই এখন বিভাগ হতে চায়—এ এক নতুন জাতীয়তাবাদ, যার কোনো বাস্তব প্রশাসনিক প্রয়োজন নেই। বিভাগ বাড়ালে রাষ্ট্রের খরচ বাড়ে, কিন্তু জনগণের সেবা কি বাড়ে? দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়—যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলোর বাস্তবায়ন ভবিষ্যতের নির্বাচিত সংসদের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ, কোনো দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তবেই সেসব সংস্কার কার্যকর হবে। এতে বোঝা যায়, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সংসদের সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়াই এর মূল দর্শন। কিন্তু এখানেই আবার প্রশ্ন—তাহলে এত আয়োজন, এত হইচই, এত সনদ—সবই কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি হয়ে থাকবে?

গণভোটের জটিল প্রশ্ন : গণভোট—একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক শব্দ, কিন্তু বাস্তবে এটি সবচেয়ে জটিল পদ্ধতিগুলোর একটি। বাংলাদেশে আগেও গণভোট হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন ছিল একটাই—‘আপনি কি সম্মত?’ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। জুলাই সনদের ক্ষেত্রে আছে ৮৪টি মূল প্রস্তাব, যার প্রতিটিতে একাধিক উপপ্রস্তাবও রয়েছে। একজন নাগরিক যদি কিছু প্রস্তাবে একমত হন আর কিছুতে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে তিনি ভোট দেবেন কীভাবে? গণভোট কি প্রতিটি প্রস্তাবের ওপর আলাদাভাবে হবে, নাকি একটি সামগ্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

টেকসই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা : অনেকে বলছেন, জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে এটি চিরস্থায়ী হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে—সংবিধান কখনো চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তি যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় রাষ্ট্রের মানচিত্র, সমাজের চাহিদা, মানুষের চিন্তা। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে যেমন ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৭ এপ্রিলের মুজিবনগর ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, তেমনি ভবিষ্যতের কোনো সরকারও তাদের ইচ্ছামতো সনদ থেকে অংশ বাদ বা সংযোজন করতে পারে।
তাই বলা যায়—জুলাই সনদও এক পরিবর্তনশীল দলিল, যার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর, কোনো আইন বা ঘোষণার ওপর নয়।

দলীয় রাজনীতির স্ববিরোধিতা ও জনগণের প্রত্যাশা : বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যেন এক গোলকধাঁধা—দলগুলো একদিকে সংস্কারের দাবি তোলে, অন্যদিকে সেই সংস্কারের আইনি ভিত্তি নিয়েই বিভক্ত। কেউ চায় নির্বাচনের আগেই অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তন করুক, আবার সেই দলই বলে নির্বাচিত সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এই দ্বৈত অবস্থান আসলে জনগণের আস্থাকে ক্ষয় করে দেয়। সাধারণ মানুষ জানতে চায়—এই সনদ তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে? তাদের ভোট, তাদের আশা, তাদের ভবিষ্যৎ কি কেবল রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরীক্ষিত হবে?

শেষকথা: সময়ের ঘড়িতে নতুন অধ্যায় : ঘড়ির কাঁটা কখনো থেমে থাকে না। সময় এগিয়ে যায়, সঙ্গে বদলায় মানুষের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের রূপ, রাজনীতির ভাষা। জুলাই সনদও সেই চলমান সময়ের এক প্রতিবিম্ব—যেখানে আশা, বিভ্রান্তি, আর্তি ও আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে এক জটিল বাস্তবতা গড়ে তুলেছে। এটি কেবল একটি দলিল নয়, এটি এক জাতির আত্মসমালোচনার প্রকাশ। তবে যদি আমরা শিখি অতীত থেকে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সত্যিকারের ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে—তবেই জুলাই সনদ হতে পারে নতুন সূর্যের প্রতিশ্রুতি। অন্যথায়, এটি থাকবে ইতিহাসের পাতায় আরেকটি অর্ধসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে—যেখানে স্বাক্ষর আছে অনেকের, কিন্তু দায়ভার কারও নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

২৭ প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার ঢাকা জেলায়

জুলাই সনদ: ঐকমত্যের পথে ভিন্নমতের দোলাচল

প্রকাশিত : ০৯:১১:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫

জুবাইয়া বিন্তে কবির:

আটাশের আহ্বান পেরিয়ে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রার প্রারম্ভে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’—একটি বহুল আলোচিত দলিল, যার নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে জেগে ওঠে আশা ও সংশয়ের মিশ্র অনুভূতি। এখন পর্যন্ত ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে দলের ভেতর মতবিরোধ স্পষ্ট। কেউ দেখছে পরিবর্তনের নতুন ভোর, কেউ আশঙ্কা করছে আরেকটি ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির কাগুজে দলিল হয়ে পড়বে এটি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন সনদের খসড়া তৈরি করেছিল, তখন প্রশ্ন উঠেছিল—এর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া কী হবে? কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবের মাটিতে নামবে কীভাবে? তখনো উত্তর ছিল অনিশ্চিত। তাই আশঙ্কা জেগেছিল—সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া এই সনদ কেবল রাজনৈতিক শোভনতার প্রদর্শনী হয়ে থাকবে।

৩১ জুলাইয়ের পর থেকে ঐকমত্য কমিশন দলগুলো ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক আনুষ্ঠানিক–অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ৯ অক্টোবর প্রস্তাব ওঠে গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের। এ নিয়ে একধরনের ঐকমত্য হলেও, গণভোটের সময়, আইনি ভিত্তি ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে দলের ভেতর দ্বন্দ্ব থেকেই গেছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সনদ বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হবে, দ্বিতীয় ধাপে সেই আদেশের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভবিষ্যতের সংসদ—যেটি গঠিত হবে গণভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো থেকে—তার থাকবে দ্বৈত ভূমিকা: একদিকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা, অন্যদিকে নিয়মিত সংসদ হিসেবে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা।

এ আদেশের প্রস্তাবিত নাম ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান) আদেশ’। এটি সংবিধানের পরিপূরক আইন হিসেবে গণ্য হবে, যার ভিত্তি হবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। অর্থাৎ, জনগণের অভ্যুত্থানের ক্ষমতাবলে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে এই আদেশ জারি হবে। পরিশিষ্টে থাকবে পুরো জুলাই সনদ—দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকারনামা হিসেবে। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে মতবিরোধের নতুন অধ্যায়। বিএনপি—একটি প্রধান রাজনৈতিক দল—এই বিশেষ আদেশ জারির বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সহ কয়েকটি দল দীর্ঘদিন ধরেই এর দাবি জানিয়ে আসছে। সনদটি সংবিধানের অংশ হলেও এর টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বাহাত্তরের সংবিধানও তো স্থায়ী হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রণীত সেই মহান দলিল মাত্র দুই বছরের মাথায় কত পরিবর্তনের মুখ দেখেছিল! সুতরাং জুলাই সনদও যদি সময়ের রাজনীতির স্রোতে ভেসে যায়, তাতে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আড়ালে সংঘাতের ছায়া : জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিনটি ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারত, যদি না সেখানে দ্বন্দ্বের কালো ছায়া পড়ত। এনসিপি সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি অস্পষ্ট বলে অনুষ্ঠান বর্জন করে। শুধু তাই নয়, তারা আয়োজনকে ঘিরে সমাবেশ ঘটিয়ে বাধা সৃষ্টি করে, যার জেরে সংঘর্ষ হয় ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে।
যদিও দলটির শীর্ষ নেতারা সরাসরি সেখানে ছিলেন না, জনমনে ধারণা গড়ে ওঠে—এনসিপি-ই বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত করেছে। এই সংঘাত শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, জাতীয় ঐকমত্যের সৌন্দর্যকেই ক্ষুণ্ন করেছে। ঐকমত্য কমিশন শেষ মুহূর্তে এসে সনদের কিছু অঙ্গীকার সংশোধন করে। প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিবর্তন আগে কেন করা হলো না? কমিশনের মধ্যে কি এমন দূরদৃষ্টি ছিল না যে তারা আগে থেকেই বুঝতে পারবে কোন বিষয়গুলো বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে? নাকি চাপের মুখে পড়ে কিছু দলকে সন্তুষ্ট করতে হঠাৎ করে সংযোজন করা হয়েছে নতুন বাক্য? এই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন।

সংস্কারের টানাপোড়েন: ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ঐকমত্য কোথায়? সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য হয়েছে খুব কম জায়গায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক বা একাধিক দল আপত্তি জানিয়েছে। যেমন—বিচার বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “জেলা পর্যায়ে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন এবং আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হবে।” চারটি দল শেষ বাক্যটির বিরোধিতা করেছে। তারা চায় আদালতেও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় থাকুক! এটি কেবল একটি প্রস্তাবের উদাহরণ নয়—বরং পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।

আরেকটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে নতুন প্রশাসনিক বিভাগ করা হবে। প্রস্তাবটি তুচ্ছ মনে হলেও, এর মধ্য দিয়ে আমরা প্রশাসনিক বিভাজনের অকারণ মোহের চিত্র দেখি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাই এখন বিভাগ হতে চায়—এ এক নতুন জাতীয়তাবাদ, যার কোনো বাস্তব প্রশাসনিক প্রয়োজন নেই। বিভাগ বাড়ালে রাষ্ট্রের খরচ বাড়ে, কিন্তু জনগণের সেবা কি বাড়ে? দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়—যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলোর বাস্তবায়ন ভবিষ্যতের নির্বাচিত সংসদের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ, কোনো দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তবেই সেসব সংস্কার কার্যকর হবে। এতে বোঝা যায়, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সংসদের সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়াই এর মূল দর্শন। কিন্তু এখানেই আবার প্রশ্ন—তাহলে এত আয়োজন, এত হইচই, এত সনদ—সবই কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি হয়ে থাকবে?

গণভোটের জটিল প্রশ্ন : গণভোট—একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক শব্দ, কিন্তু বাস্তবে এটি সবচেয়ে জটিল পদ্ধতিগুলোর একটি। বাংলাদেশে আগেও গণভোট হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন ছিল একটাই—‘আপনি কি সম্মত?’ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। জুলাই সনদের ক্ষেত্রে আছে ৮৪টি মূল প্রস্তাব, যার প্রতিটিতে একাধিক উপপ্রস্তাবও রয়েছে। একজন নাগরিক যদি কিছু প্রস্তাবে একমত হন আর কিছুতে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে তিনি ভোট দেবেন কীভাবে? গণভোট কি প্রতিটি প্রস্তাবের ওপর আলাদাভাবে হবে, নাকি একটি সামগ্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

টেকসই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা : অনেকে বলছেন, জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে এটি চিরস্থায়ী হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে—সংবিধান কখনো চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তি যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় রাষ্ট্রের মানচিত্র, সমাজের চাহিদা, মানুষের চিন্তা। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে যেমন ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৭ এপ্রিলের মুজিবনগর ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, তেমনি ভবিষ্যতের কোনো সরকারও তাদের ইচ্ছামতো সনদ থেকে অংশ বাদ বা সংযোজন করতে পারে।
তাই বলা যায়—জুলাই সনদও এক পরিবর্তনশীল দলিল, যার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর, কোনো আইন বা ঘোষণার ওপর নয়।

দলীয় রাজনীতির স্ববিরোধিতা ও জনগণের প্রত্যাশা : বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যেন এক গোলকধাঁধা—দলগুলো একদিকে সংস্কারের দাবি তোলে, অন্যদিকে সেই সংস্কারের আইনি ভিত্তি নিয়েই বিভক্ত। কেউ চায় নির্বাচনের আগেই অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তন করুক, আবার সেই দলই বলে নির্বাচিত সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এই দ্বৈত অবস্থান আসলে জনগণের আস্থাকে ক্ষয় করে দেয়। সাধারণ মানুষ জানতে চায়—এই সনদ তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে? তাদের ভোট, তাদের আশা, তাদের ভবিষ্যৎ কি কেবল রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরীক্ষিত হবে?

শেষকথা: সময়ের ঘড়িতে নতুন অধ্যায় : ঘড়ির কাঁটা কখনো থেমে থাকে না। সময় এগিয়ে যায়, সঙ্গে বদলায় মানুষের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের রূপ, রাজনীতির ভাষা। জুলাই সনদও সেই চলমান সময়ের এক প্রতিবিম্ব—যেখানে আশা, বিভ্রান্তি, আর্তি ও আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে এক জটিল বাস্তবতা গড়ে তুলেছে। এটি কেবল একটি দলিল নয়, এটি এক জাতির আত্মসমালোচনার প্রকাশ। তবে যদি আমরা শিখি অতীত থেকে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সত্যিকারের ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে—তবেই জুলাই সনদ হতে পারে নতুন সূর্যের প্রতিশ্রুতি। অন্যথায়, এটি থাকবে ইতিহাসের পাতায় আরেকটি অর্ধসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে—যেখানে স্বাক্ষর আছে অনেকের, কিন্তু দায়ভার কারও নয়।