দুমকি(পটুয়াখালী) প্রতিনিধিঃ
পটুয়াখালীর দুমকিতে সুপারি খোল সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে পরিবশবান্ধব প্লেট, বাটি, লবনদানি, চামচ, কাটা চামুচ, ছুরি, ট্রেসহ নানা ধরণর তৈজসপত্র। যা হোটেল-রেঁস্তোরা ও বিভিন সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশনে ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক অনটাইমের বিকল্প হিসেবে মাটিতে পচনশীল এসব তৈজসপত্রের কারখানা গড়ে তুলছেন পটুয়াখালীর দুমকি উপজলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের রাজাখালী গ্রামে তরুণ উদ্যোক্তা তৌকির আহমেদ সাবাব। এই তরুণ উদ্যোক্তা প্লাস্টিকের ধংসাযজ্ঞ থেকে পরিবেশ রক্ষার জন্য ‘প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের ও কার্যক্রম শুরু করেছেন। তাঁর এ উদ্যোগ ও সম্ভাবনা একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, অন্যদিক এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।

সুপারি গাছের খোল গ্রামীণ জনপদের একটি পরিচিত নাম। যা গাছ থেকে ঝরে পড়ে গাছের নিচেই গলে-পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সুপারির খোল আবার গ্রামবাংলার মহিলারা গাছের নিচ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে গৃহস্থালি, বেড়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করে। একসময়ের অবহেলিত সুপারির খোল এখন শহরের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পরিবশবান্ধব তৈজসপত্র তৈরি করে আলোড়ন সষ্টি করেছে পটুয়াখালীর তরুণ উদ্যোক্তা তৌকির আহমেদ এর ‘আলপথ গ্রুপ’।
পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে ১৮ কিলামিটার পূর্ব-উত্তর দিক এবং দুমকি উপজলা সদর থেকে ২ কিলামিটার পূর্বে লেবুখালী -বাউফল মহাসড়কের উত্তর পাশে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের রাজাখালী গ্রামে স্থাপিত ‘আলপথ গ্রুপ’ এর তৈজসপত্র তৈরির কারখানাটি। পৈত্রিক ৩৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এ কারখানাটি চলতি বছরের ২৪ অক্টাবর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে উৎপাদন শুরু হয়। ‘আলপথ গ্রুপ’ এর তৈজসপত্রের এই কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন ওই এলাকার খাতিব-নাসরিন দম্পতির জেষ্ঠ সন্তান তরুণ উদ্যোক্তা তৌকির আহমেদ সাবাব। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান হচ্ছেন তৌকির আহমেদ সাবাব নিজে এবং কো-ফাউন্ডার হিসেবে রয়েছেন আমান সুজয় ও ফাহাদ মেহেদী। ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. জলিলুর রহমান। এ কারখানায় রয়েছে ২০জন কর্মচারি, যাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এ প্রতিষ্ঠানটি।

ওই এলাকার প্রয়াত আইনজীবী ও বিশিষ্ট সমাজসেবক খাতিব আহমেদ কামবার ও নাসরিন আহমেদের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তৌকির জেষ্ঠ। নিজে চাকরির পিছনে ছুটব না, মানুষকে চাকরি দিব এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব, এমন স্বপ্ন নিয়ে ছোটবেলা থেকেই গড়ে উঠতে থাকেন তিনি। মরহুম দাদা আজিজ উদ্দিন আহমদের আদর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে তাঁর স্বপ পূরণে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে থাকেন তৌকির আহমেদ। ২০২৫ সালের অক্টাবরে এসে তৌকির তাঁর স্বপ ও লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে এক কাজিন ফাহাদ মেহেদী ও বন্ধু আমান সুজয়কে সঙ্গে নিয়ে এলাকার হত-দরিদ্র মানুষের জন্য গড়ে তুলছেন পরিবেশবান্ধব এই কারখানাটি। এছাড়াও আলপথ গ্রুপের আওতায় ঢাকায় অবস্থিত গার্মেন্টস ইউনিটে ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে। যেখানে চামড়া ও পরিবেশ বান্ধব পাট দিয়ে তৈরি হয় দেশি-বিদেশি ব্যাগ। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব পন্য সরবরাহ করা হয়।
তরুণ উদ্যাক্তা তৌকির আহমেদ সাবাব বলন, ‘আমার দাদা আলহাজ্জ্ব আজিজ উদ্দিন আহমেদ (প্রাক্তন জলা প্রশাসক) সারাজীবন জনকল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন। তাঁর (আজিজ উদ্দিন) মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে কিভাবে কাজর মধ্যে সম্পৃক্ত করা যায়, মানুষের দ্বারে দ্বারে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়া। এরই ধারাবাহিকতায় আমার দাদা আজিজ উদ্দিন আহমেদ এলাকায় কলজ, মাদ্রাসাসহ আটটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন’।
তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দাদাকে অনুসরণ এবং অনুকরণ করতে থাকি। যেমন কিভাব মানুষকে কাজের মধ্যে সম্পৃক্ত করা যায়, মানুষকে নিয়ে চলা এবং মানুষর জন্য কল্যাণকর কিছু করা। দ্বিতীয়ত: ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল আমি চাকরি করবা না, আমি মানুষের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। দাদা এলাকায় নিখুঁত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করে দিয়ে গেছেন। আর আমি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। এতে দুমকি উপজলার মানুষ আমাদের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ শেষে এখানেই আবার কর্মজীবী-কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করতে পারবে। পরিবারের কাছে থাকবেন এবং তাঁদর জন্য রুটি রুজি ব্যবস্থা করবেন’।
তৌকির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র প্লাস্টিকের কারণে।

বাংলাদশে অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে বটে, কিন্তু পরিবশবান্ধব কোনো শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি। এখন থেকেই আমার পরিকল্পনা শুরু এবং ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ভেবে দেখলাম প্রতিটি কলকারখানা কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। কোনটিতেই পরিবশবান্ধব হচ্ছে না। এ কারণে আমি পরিত্যক্ত সুপারি গাছের খোল ব্যবহারের চেষ্টা করি। কারণ, সুপারির খোল মাটিত পচনশীল এবং মাটিতই এটা মিশে যায়’।
তিনি বলন, ‘অবশ্যই পরিবশবান্ধব এই তৈজসপত্র বাজারজাত হবে এবং ক্রেতাদের হৃদয়ে স্হান করে নিবে। আড়ং এবং সুপার শপসহ বিভিন প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেঁস্তোরার সঙ্গে আমাদর যোগাযোগ চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আমাদের তৈরি পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র ক্রয় ও ব্যবহার করতে আগ্রহী। এটা সম্ভাবনাময় পণ্য, পরিবশবান্ধব এ পণ্য নিয়ে আমি আশাবাদী’।
তিনি বলন, ‘এই তৈজসপত্র অনটাইম ব্যবহারের জন্য উপযোগী’। এমনকি এটি একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে। পণ্যটি অনেক শক্ত ও মজবুত। প্লাস্টিকর অনটাইম পণ্য প্রথমবার ব্যবহারকরলেই বাঁকা হয় যায়। কিন্তু সুপারির খোল দিয়ে তৈরি এ পণ্যটি বাঁকা হবে না এবং এটি অনেকবার ব্যবহার করা যাবে। আমার বিশ্বাস আমাদের তরুণ সমাজ এগিয়ে আসলে এর আরো উন্নতি হবে।

পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্রের কারিগর মাসা. সুখি আক্তার বলন, ‘আমরা কখনও দেখিনি সুপারির খোল দিয়ে এত সুন্দর তৈজসপত্র তৈরি করা যায় এবং কিভাবে তৈজসপত্র তৈরি করে তাও জানতাম না। চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রথম আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারপর আমরা তৈজসপত্র তৈরি শুরু করি। প্রথমে খোল ভালো করে শুকানোর পর মেশিনে দিতে হয় এবং দুই থেকে ক তিন মিনিটের মধ্য একটি পণ্য বের হয়’। তিনি আরও বলন, ‘আমি যখন বেকার ছিলাম তখন পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাইছি। কিন্তু এখান কাজ নেওয়ার পর পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাচ্ছি’।
আরেক কারিগর মোসা. বিথী আক্তার বলেন, ‘অচেনা-অজানা বিদ্যুতের মেশিনে কাজ করতে প্রথম প্রথম ভয় লাগতো। কিন্তু এখন আর ভয় লাগে না। কাজ শিখতে শিখতে এখন ভালো লাগে। এখন নিজেই সবকিছু ঠিকঠাক মতো কাজ করতে পারি।
প্লাস্টিক রিসাইক্লিংম্যান ফরিদা বেগম বলেন, ‘এখান প্লাস্টিকের পুরানো ও ভাংগাচুরা মালপত্র যা আসে তা বাছাই করি এবং মেশিনে ভেঙে প্যাকেট করার পর ঢাকায় পাঠানো হয়। এরপর সেখানে উন্নত মেশিনের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরি হয়’। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক অভাবে ছিলাম। এখান কাজ নেওয়ার পর সংসারে অভাব নাই । এখন আমরা সংসারের সবাইকে নিয়ে ভালো আছি, ভালো খাই’।
কারখানার ব্যবস্থাপক মো. জলিলুর রহমান বলেন, ‘মূলত: এখানে পরিবেশবান্ধব কাজ হচ্ছে। প্রথমত: আমরা প্লাস্টিকর বিকল্প হিসেবে সুপারির খোল দিয়ে অনটাইম পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র তৈরি করি এবং তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। আমাদর মূল লক্ষ্য হচ্ছে এ পণ্যকে মানুষের কাছে কিভাবে সহজলভ্যভাবে উপস্থাপন করা যায়। অন্যদিকে ‘প্লাস্টিক রিসাইক্লিং’এর মাধ্যম নতুন প্লাস্টিক তৈরি করতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে এলাকার বেশকিছু পরিবার উপকৃত হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২০ জন শ্রমিক নিয়াগপ্রাপ্ত হয়ে কাজ করছে। এর মধ্য ১৩ জন নারী এবং ৭ জন পুরুষ রয়েছে’।

এ ব্যাপার দুমকি উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, সুপারির খোল থেকে তৈজসপত্র তৈরির উদ্যোগ দেশের সবুজ শিল্পায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। সত্যিকার অর্থে এটি পরিবেশবান্ধব এবং পরিবেশের জন্য অনকটা উপকারী। এ ধরণের উদ্যোগে যদি আরো কেউ গ্রহণ করে তাহলে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















