জুবাইয়া বিন্তে কবির
বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসে খালেদা জিয়া এমন এক রাজনৈতিক নাম—যাকে ঘিরে আবেগ, মূল্যবোধ, ত্যাগ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব, মাতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক লড়াই এক অনন্য মিশ্রণে প্রতিনিয়ত নতুন মূল্যায়নের জন্ম দেয়। তিনি শুধু তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রী নন; তিনি এমন এক শক্তিমান চরিত্র, যিনি বহু সংকট, ষড়যন্ত্র, শারীরিক দুর্বলতা, কারাবাস, রাজনৈতিক ঝড়—সবকিছুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজস্ব অবস্থানে অটল ছিলেন। এই অটলতার কারণেই তিনি পরিচিত ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। আজ তিনি গুরুতর অসুস্থ—কিন্তু তাঁর নাম, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর জীবনগাথা আবারও দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। মানুষ দোয়া করছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকিয়ে আছে, আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এই সময়ে তাঁর জীবনী ও সংগ্রাম নতুন করে সামনে আসে—একটি ইতিহাসের মতো, একটি প্রেরণার মতো।
একজন মানুষ, একজন মা, একজন নেত্রী—সব মিলেই খালেদা জিয়া : রাজনীতির কঠোর বাস্তবতা তাঁকে যেমন দৃঢ় করেছে, তেমনি মাতৃত্ব তাঁকে দিয়েছে মানবিক গভীরতা। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর তিনি রাজনীতিতে আসেন। শুরুতে তিনি ছিলেন নিঃশব্দ, শান্ত, গৃহবধূসুলভ সাধারণ নারী। কিন্তু সময় তাঁকে রূপ দেয় সংগ্রামী নেত্রীতে;
রাজপথ তাঁকে বানায় প্রতীক; দেশ তাঁকে ডাকে নেতৃত্বের আসনে। তারেক রহমান তাঁর মাকে শুধু দেশের নেত্রী হিসেবে দেখেননি—তিনি দেখেছেন এক মমতাময়ী মা হিসেবে। আজ তাঁর মাকে হারানোর শঙ্কায় তিনি উদ্বেগে-উৎকণ্ঠায় প্রহর গুনছেন। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করছেন। আবার দেশে ফেরা তাঁর একার সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়।

আধ্যাত্মিক মানুষ খালেদা জিয়া : তিনি অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। নিয়মিত নামাজ, নফল ইবাদত এবং প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবার রোজা পালন করতেন। রাজনৈতিক ব্যস্ততা কখনোই তাঁর ধর্মীয় অনুশাসনে ছেদ ঘটাতে পারেনি। এই কারণেই আজ লাখো মানুষের মতো লেখকও দোয়া করেন—আল্লাহ যেন তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে আবার জাতির মাঝে ফিরিয়ে দেন।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা: দেশের চোখ এখন এভারকেয়ার হাসপাতালের দিকে গত রোববার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাঁকে দ্রুত রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি সিসিইউতে ভর্তি আছেন। হৃদ্রোগ, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস—মোটামুটি সব মিলিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। ডায়ালাইসিস চলছে টানা কয়েকদিন ধরে। গত তিন দিন তিনি প্রায় সাড়াহীন ছিলেন। গতকাল সামান্য কথা বলেছেন—যা চিকিৎসকদের মতে, “positive but not enough”। মেডিকেল বোর্ডে আছেন বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা, লন্ডন ক্লিনিক এবং জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও।
বিদেশে নেওয়ার ধারণা আলোচনায় রয়েছে, তবে ফ্লাইট নেওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা এখনো নেই বলেই জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
দল, পরিবার ও দেশের মানুষের উদ্বেগ : হাসপাতালের সামনে দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের ঢল নামছে। মানুষ মনোজগতে অসহায়, কিন্তু দোয়ার মাধ্যমে শক্তি খুঁজছে। বিএনপি নেতারা মানুষকে অনুরোধ করছেন—হাসপাতাল এলাকায় যেন ভিড় সৃষ্টি না হয়। বিএনপির অনেক কর্মসূচি ইতিমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে, বিশেষ করে বিজয়ের মাসের ‘মশাল রোড শো’ কর্মসূচি।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চিঠি। ২৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ খালেদা জিয়ার উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠান। তিনি লিখেছেন, তাঁর অসুস্থতায় পাকিস্তান সরকার ও জনগণ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের উন্নয়নে খালেদা জিয়ার অবদান “সর্বত্র স্বীকৃত”।পাকিস্তান–বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে তাঁর পূর্ণ আরোগ্য কামনা। এই চিঠি শুধু রাজনৈতিক নয়—বন্ধুত্বপূর্ণ মানবিক সম্পর্কেরও বহিঃপ্রকাশ।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার দোয়া প্রার্থনা : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনও দেশবাসীর কাছে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য দোয়া চেয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টাও একই আহ্বান জানিয়েছেন এবং চিকিৎসা সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে—খালেদা জিয়া রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় চরিত্র, একজন মানবিক ব্যক্তিত্ব।
রাজনীতিতে উত্থান: সাধারণ গৃহবধূ থেকে জাতীয় নেত্রী :
১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যু তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। তখন তিনি ছিলেন ঘরের মানুষ। কিন্তু দল, রাষ্ট্র এবং ইতিহাস তাঁকে ডাক দেয় নেতৃত্বের আসনে। রাজনীতিতে আগমন। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান। ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন। এরপর টানা চার দশক ধরে তিনি বিএনপির নেতৃত্বে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব। ৭-দলীয় জোট গঠন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিরোধ।
নির্বাচনে অভাবনীয় রেকর্ড : ১৯৯১–২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জেলার ১৮টি সংসদীয় আসন থেকে তিনি নির্বাচন করে সবকটিতে বিজয়ী হন। বাংলাদেশে এমন রেকর্ড আর কারও নেই।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিন মেয়াদ (১৯৯১–১৯৯৬) সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা উন্নয়ন ও বেসরকারিকরণ কার্যক্রম শিক্ষা খাতে সংস্কার (২০০১–২০০৬) তখন এশিয়ার দ্রুততম অর্থবর্ধক দেশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। বহু অবকাঠামো প্রকল্প, কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
অন্যান্য ভূমিকা : ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা : ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জন—যা বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের বড় বিতর্ক। জেল, মামলা, চিকিৎসা—রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাবন্দী হন। এতে তাঁর শারীরিক সমস্যা দ্রুত বেড়ে যায়। নাজিমউদ্দীন রোড কারাগার থেকে পরে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। আজ তাঁর সমস্ত শারীরিক সংকট সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ, কারাবাস এবং বয়সজনিত জটিলতার সম্মিলিত রূপ।
তারেক রহমান: উদ্বিগ্ন পুত্র, রাজনৈতিক উত্তরসূরি। তিনি সার্বক্ষণিক চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলছেন। বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তাঁর মন সম্পূর্ণভাবে এখন মায়ের শয্যা পাশে। তবু দেশে ফেরা তাঁর একক সিদ্ধান্ত নয়—রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। মানুষের ভালোবাসা, দোয়া, সম্মান—যা তাঁকে বিশেষ করে তোলে : দেশজুড়ে মানুষ দোয়া করছে। বিভিন্ন দলে-দলে সাধারণ মানুষ ব্যানার নিয়ে হাসপাতালের সামনে। ধর্মীয় সংগঠনগুলোর বিশেষ দোয়া। রাষ্ট্রপ্রধান, বিদেশি রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক, বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এটি প্রমাণ করে—খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী নন, তিনি একটি জাতীয় আবেগের নাম।

পরিশেষে একটি প্রার্থনা : আজ যিনি জীবন–মরণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তিনি শুধু একজন মানুষ নন; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়, গণতন্ত্রের সংগ্রামের আলোকবর্তিকা, সংসদীয় রাজনীতির দৃঢ় স্তম্ভ, আর লক্ষ মানুষের মমতার অন্য নাম—একজন মা। আজ তাঁকে ঘিরে দেশের আকাশে যেন এক নীরব আকুতি ভেসে বেড়ায়। যেন প্রতিটি বাতাসে উচ্চারিত হয় এক আর্তিমাখা প্রার্থনা। আমি, আমরা—এই দেশের কোটি মানুষ—হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকে হাত তুলে বলি—হে আরশের মালিক মহান আল্লাহ, যিনি দয়ার সাগর, যিনি আরোগ্যের অধিপতি, আপনি আমাদের এই প্রিয় নেত্রীকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন। যে নারী আজীবন মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়েছেন—তাঁর শরীরের ব্যথা, অসুখ, তীব্র যন্ত্রণা আপনি দূর করে দিন।
হে আল্লাহ, তিনি এই দেশের মানুষের মায়ের মতো, কোটি মানুষের ভালোবাসার কেন্দ্র, এক জাতির আশা ও ইতিহাসের প্রতীক। আজ সেই মায়ের জন্য আমাদের বুক ভরে ওঠে দোয়ার স্রোতে—আমরা আপনার করুণার দ্বারস্থ হই। হে সুস্থতার দাতা রাব্বুল আলামিন, তাঁর দুর্বলতা কাটিয়ে দিন, তাঁর শ্বাসে শক্তি ফিরিয়ে দিন, তাঁর হৃদয়ে প্রশান্তি বর্ষণ করুন, তাঁর পথের সব আঁধার সরিয়ে দিন।
হে আল্লাহ, আমরা চাই—তিনি আবার যেন উঠে দাঁড়ান, আমাদের দিকে মমতার দৃষ্টি ফেরান, নিজের প্রিয় দেশ, প্রিয় মানুষের মাঝে ফিরে আসেন সেই আগের শক্ত, দৃঢ়, সাহসী রূপে। আমাদের প্রিয় বেগম জিয়া, আপনার প্রতি মানুষের ভালোবাসা আজ প্রার্থনায় রূপ নিয়েছে। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা আজ অশ্রুপ্লাবিত আবেগে ভিজে যাচ্ছে। দেশজুড়ে শব্দহীন এক কান্না—আল্লাহর কাছে মিনতি হয়ে উঠছে। হে আল্লাহ, আপনার রহমতের ছায়ায় তাঁকে ঢেকে দিন, তাঁর জীবনের এই কঠিন মুহূর্তকে সহজ করে দিন, তার দেহ-মনে পূর্ণ আরোগ্য দান করুন। আপনি চাইলে অসীম, আপনার সিদ্ধান্তই সর্বশেষ—তবুও আপনার সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের মতো আমরা আপনার কাছে হাত পেতে দাঁড়ালাম, আমাদের এই মাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিন আমাদের মাঝে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















