সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: নদী আছে। নদীর নামও আছে-কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ, খোলপেটুয়া, ইছামতি, কালিন্ধী। কিন্তু নদীর বুকে যে জীবন একদিন স্পন্দিত ছিল, সেই নৌকা আর নৌকার মানুষ-মাঝিরা-আজ প্রায় অদৃশ্য। উন্নয়নের গতিপথে পড়ে আশাশুনিতে নৌকা হারাচ্ছে তার প্রয়োজন, আর নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শত শত মাঝি পরিবার ঠেলে পড়ছে মানবেতর জীবনে। এক সময় আশাশুনি উপজেলা ছিল পুরোপুরি নদীকেন্দ্রিক জনপদ।
সড়ক ছিল না বললেই চলে। মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, হাটবাজার, চিকিৎসা-সবকিছুর একমাত্র ভরসা ছিল নৌকা। নদী পাড়ের গ্রামগুলোতে বিয়ের মৌসুম এলেই সাজানো হতো নৌকা। বরযাত্রী আসত নদীপথে, নৌকায় করেই আনা-নেওয়া হতো জামাই-মেয়ে।

গদাইপুর, কেয়ারগাতি, রামনগর, বুধহাটা, ঘোলা-হিজলা-কল্যাণপুর, মহিষকুড়, কালিকাপুর, নাছিমাবাদ, শোভনালী, ঝাপালি, মাদারবাড়িয়া, চেইটিয়া, হাজরাখালি, কাকবাসিয়া, দয়ারমা, মানিকখালি, কুল্যা, বড়দল, চাপড়া-এই সব এলাকার খেয়াঘাটে একসময় সারি সারি নৌকা ভিড়ত। নদীর পাড়ে দাঁড়ালে শোনা যেত বৈঠার ছলাৎছল শব্দ, মাঝিদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের কোলাহল। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন স্মৃতিতে বন্দী।
সড়ক যোগাযোগের বিস্তার, একের পর এক ব্রিজ নির্মাণ, ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের দাপট এবং নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস-সব মিলিয়ে নৌকার প্রয়োজন ফুরিয়ে আসছে। নদী ছোট হয়ে গেছে, অনেক স্থানে খাল ও নালায় রূপ নিয়েছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার প্রাচীন এই বাহন, আর তার সঙ্গে সঙ্গে নিভে যাচ্ছে মাঝিদের জীবনের আলো।
বাহাদুরপুর গ্রামের খেয়াঘাটের মাঝি সৈয়দ আলী প্রায় ৫০ বছর ধরে নৌকা চালান। কণ্ঠে ক্লান্তি আর হতাশা-‘একসময় নদীর যৌবন ছিল। তখন নৌকায় মালামাল নিয়ে ঢাকাও গেছি। এখন আর যাত্রী নেই। কেউ নৌকায় উঠলে ইচ্ছা হলে টাকা দেয়, না হলে দেয় না। তবুও বসে থাকি-এই তো আমার কাজ।’ বুধহাটা খেয়াঘাটে এখন দিনে যাত্রী মেলে হাতে গোনা।
অনেক মাঝি নৌকা বেঁধে রেখেই দিন পার করছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পেশা বদলাচ্ছেন। মাছ ধরা, ধান কাটা, গাছ কাটা কিংবা দিনমজুরি-এই সব অনিশ্চিত কাজেই এখন তাদের জীবিকা। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। বেশির ভাগ মাঝির নিজস্ব নৌকা নেই। মহাজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে নৌকা চালাতে হয়। প্রতিদিন দিতে হয় নৌকার ভাড়া, ঘাটের টোল। অথচ আয় নেই বললেই চলে। ফলে সংসার চালানো হয়ে উঠছে অসম্ভব।
সৈয়দ আলী বলেন, ‘রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে সারাদিন নৌকা চালিয়েও তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পারি না। পরনের কাপড় জোটে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা তো দূরের কথা।’ বুধহাটা বাজারের ব্যবসায়ী প্রদীপ সাধু বলেন, ‘অনেক মাঝি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশায় আছেন। তারা চাইলেও সহজে পেশা বদলাতে পারেন না। অধিকাংশ পরিবার ভূমিহীন। ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহায়তার কোনো ব্যবস্থাও নেই।’ চা ব্যবসায়ী মাধব বিশ্বাস বলেন, ‘নৌকা ছিল এই অঞ্চলের আদি বাহন। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস না করে।

মাঝিদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও নৌকাভিত্তিক জীবিকা টিকিয়ে রাখতে পরিকল্পনা জরুরি।’ এক সময় আশাশুনির নদীগুলো ঘিরেই গড়ে উঠেছিল মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার লড়াই। আজ সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মাঝিরা শুধু সময় গোনেন-কবে ডাক পড়বে, কবে কেউ নৌকায় উঠবে। নদী এখনো আছে।কিন্তু নদীর মানুষ-মাঝিরা-হারিয়ে যেতে বসেছে নীরবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















