ঢাকা ১১:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

আধুনিকতার ছোঁয়ায় নেত্রকোনা থেকে হারিয়ে গেছে চিরচেনা হারিকেন ও আবহমান বাংলার হুক্কা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:১৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে
নেত্রকোনা প্রতিনিধি: আধুনিকতার ছোঁয়ায় নেত্রকোনা থেকে হারিয়ে গেছে চিরচেনা  হারিকেন। কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত প্রায় আলোর দিশারী হারিকেন এখন শুধু স্মৃতি হয়ে আছে গ্রাম বাংলার মানুষের মনে। একটা সময় হারিকেনকে রাতের সঙ্গী হিসেবে মনে করত গ্রাম বাংলার মানুষ। হারিকেন হাতে নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলতেন শহর থেকে গ্রামে- গ্রামে। পূজা, পার্বন, ঈদ সহ নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে এক সময় যে হারিকেন শোভা পেতো আলোকসজ্জার কাজে। আজ সে হারিকেন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে পরে থাকে পরিত্যাক্ত বস্তু হয়ে। এক সময় এ হারিকেন রাতের সঙ্গী হিসেবে পরিচিত ও আদৃত ছিলো সকলের কাছে। হারিকেনের আলো গৃহস্থলিয় কাজের পাশাপাশি ব্যবহার হতো বিভিন্ন যানবাহনেও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দেশের বিভিন্ন গ্রাম বৈদ্যুতিক বাতিতে আলোকসজ্জিত থাকে। যার ফলে রাতের আলোর দিশারী হারিকেন এখন শুধুই প্রবীণদের কাছে স্মৃতির বস্তু।
সরেজমিনে নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, হারিকেন মেরামতের জন্য জেলার বিভিন্ন হাট- বাজারে এক সময় কারিগরের দেখা পাওয়া যেতো। কালেন বিবর্তসে এখন তারা হারিকেন মেরামতের পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশা গ্রহণ করেছেন। জেলার বিভিন্ন বাজারে হারিকেন মেরামতের ছিলো ভাসমান দোকান। কারিগরেরা বিভিন্ন হাট বাজারে ঘুরে- ফিরে হারিকেন মেরামতের কাজ করতেন। জেলা শহরের মাছুয়া বাজারের এক হারিকেন মিস্ত্রি মোর্শেদ জানান, আজ থেকে ১০ বছর আগেও হারিকেন মেরামত করে সংসার চালিয়েছি। এখন মানুষ হারিকেন ব্যবহার করে না। তাই ব্যবসা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি। মোহনগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী মাঈন উদ্দিন বলেন, এখন গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির এলইডি লাইট বের হওয়ায় আর হারিকেনের প্রয়োজন হয় না। হারিকেন এখন শুধু স্মৃতি। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক অজানা পরিচিত বস্তুর নাম এই হারিকেন।
এদিকে আবহমান বাংলার জনপ্রিয় গান ‘আমার মান কুল মান সব হারাইলাম, এই হুক্কার সঙ্গ ধরে রে, ও সাধের হুক্কারে, তোরে ছাড়া প্রাণ বাঁচে না, রই কেমনে ঘরে…; পরানের হুক্কারে তোর নাম কে রাখিল ডাব্বা?…’ অথবা রম্য ছড়া ‘হায়রে সে-ই হুক্কা, উপরে তার তামাক-কলকি, নিচের দিকে চুক্কা, হায়রে সে-ই হুক্কা/নানা বলে নানি বলে, হুক্কা ছাড়া জীবন চলে?, হুক্কার পেট ভরা জলে, টানছে দেখ দুজন মিলে, হায়রে সে-ই হুক্কা।’একসময়ের ধূমপানের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘হুঁকা’ বা হুক্কা নিয়ে রচিত এসব গান, ছড়া এখনও দেশের সংস্কৃতিতে পরিচিত হলেও হারিয়ে গেছে বস্তুটি। এখন নেত্রকোনা শহর তো দূরের কথা, গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও পাওয়া যায় না হুঁকার দেখা। কালের বিবর্তনে অনেকটা হারিয়ে গেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হুঁকা। তিন-চার দশক আগেও বাংলার গ্রামগঞ্জে ধূমপায়ীরা হুঁকার মাধ্যমে তামাকপানের নেশায় ছিল অভ্যস্ত। সে সময় দেশের প্রায় সব বাড়িতেই ছিল এর প্রচলন। তখনকার দিনে গ্রাম্য সালিশ, সামাজিক অনুষ্ঠান বা জমায়েতে ছোটবড় সবাইকে হুঁকায় আপ্যায়নের রীতি ছিল। প্রতিটি গ্রামের প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী বাড়িতে লম্বা পাইপযুক্ত স্ট্যান্ড হুঁকা ওই বাড়ির শোভাবর্ধন ও প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করত। বর্তমান প্রজন্মের কাছে হুঁকা একটি অপরিচিত বস্তু। এটি খাওয়া দূরের কথা, চোখেই দেখেনি তারা।
বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এ হুঁকার জায়গায় বাজার দখল করেছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিকোটিনযুক্ত সিগারেট-বিড়ি। প্রজন্মের একটা বড় অংশ নিষিদ্ধ মাদকের নেশায় মাতোয়ারা। অথচ কম নিকোটিনযুক্ত হুঁকার প্রচলন থাকলে যুবসমাজকে মাদক গ্রহণের অধঃপতন থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করা যেত। সম্প্রতি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নে সংবাদ সংগ্রহে গেলে এক বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বসে বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ আড্ডায় হুঁকা পানরত অবস্থায় দেখা গেছে।আলাপকালে তারা বলেন, ‘তিন-চার দশক পূর্বেও আমাদের বাপদাদারা তিন বেলা খাবার খেতে ততটা আগ্রহী হতেন না যতটা আগ্রহী ছিলেন হুক্কা টানায়। এ ছাড়া তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কল্পনাও করা যেত না। ঘরে চালডাল না থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণে জমা থাকত হুক্কার তামুক। তামাকপাতা টুকরা টুকরা করে কেটে এনে এতে চিটাগুড় মিশিয়ে তৈরি করা হতো বিশেষ এ তামুক। এতে নিকোটিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে। যতটুকু নিকোটিন থাকে তা নারকেলের টোলে থাকা পানিতে মিশে যায়।’ তারা আরও বলেন, ‘বাপদাদার ঐতিহ্য ধরে রেখে আমরা হুক্কা টানায় রয়েছি প্রায় ৬৫ বছর ধরে। এ ছাড়া জীবনে সিগারেট-বিড়ি বা পানও খাইনি। আমাদের গ্রামের আর কেউ না খেলেও আমরা হুক্কার প্রেমে কাটিয়ে দিয়েছি ৬৫ বছর। আমাদের বাড়িতে এসে অনেকেই শখ করে হুক্কায় টান দিয়ে যান। এতেই আমাদের প্রশান্তি।

ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি ঐক্যই

আধুনিকতার ছোঁয়ায় নেত্রকোনা থেকে হারিয়ে গেছে চিরচেনা হারিকেন ও আবহমান বাংলার হুক্কা

প্রকাশিত : ০৮:১৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
নেত্রকোনা প্রতিনিধি: আধুনিকতার ছোঁয়ায় নেত্রকোনা থেকে হারিয়ে গেছে চিরচেনা  হারিকেন। কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত প্রায় আলোর দিশারী হারিকেন এখন শুধু স্মৃতি হয়ে আছে গ্রাম বাংলার মানুষের মনে। একটা সময় হারিকেনকে রাতের সঙ্গী হিসেবে মনে করত গ্রাম বাংলার মানুষ। হারিকেন হাতে নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলতেন শহর থেকে গ্রামে- গ্রামে। পূজা, পার্বন, ঈদ সহ নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে এক সময় যে হারিকেন শোভা পেতো আলোকসজ্জার কাজে। আজ সে হারিকেন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে পরে থাকে পরিত্যাক্ত বস্তু হয়ে। এক সময় এ হারিকেন রাতের সঙ্গী হিসেবে পরিচিত ও আদৃত ছিলো সকলের কাছে। হারিকেনের আলো গৃহস্থলিয় কাজের পাশাপাশি ব্যবহার হতো বিভিন্ন যানবাহনেও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দেশের বিভিন্ন গ্রাম বৈদ্যুতিক বাতিতে আলোকসজ্জিত থাকে। যার ফলে রাতের আলোর দিশারী হারিকেন এখন শুধুই প্রবীণদের কাছে স্মৃতির বস্তু।
সরেজমিনে নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, হারিকেন মেরামতের জন্য জেলার বিভিন্ন হাট- বাজারে এক সময় কারিগরের দেখা পাওয়া যেতো। কালেন বিবর্তসে এখন তারা হারিকেন মেরামতের পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশা গ্রহণ করেছেন। জেলার বিভিন্ন বাজারে হারিকেন মেরামতের ছিলো ভাসমান দোকান। কারিগরেরা বিভিন্ন হাট বাজারে ঘুরে- ফিরে হারিকেন মেরামতের কাজ করতেন। জেলা শহরের মাছুয়া বাজারের এক হারিকেন মিস্ত্রি মোর্শেদ জানান, আজ থেকে ১০ বছর আগেও হারিকেন মেরামত করে সংসার চালিয়েছি। এখন মানুষ হারিকেন ব্যবহার করে না। তাই ব্যবসা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি। মোহনগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী মাঈন উদ্দিন বলেন, এখন গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির এলইডি লাইট বের হওয়ায় আর হারিকেনের প্রয়োজন হয় না। হারিকেন এখন শুধু স্মৃতি। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক অজানা পরিচিত বস্তুর নাম এই হারিকেন।
এদিকে আবহমান বাংলার জনপ্রিয় গান ‘আমার মান কুল মান সব হারাইলাম, এই হুক্কার সঙ্গ ধরে রে, ও সাধের হুক্কারে, তোরে ছাড়া প্রাণ বাঁচে না, রই কেমনে ঘরে…; পরানের হুক্কারে তোর নাম কে রাখিল ডাব্বা?…’ অথবা রম্য ছড়া ‘হায়রে সে-ই হুক্কা, উপরে তার তামাক-কলকি, নিচের দিকে চুক্কা, হায়রে সে-ই হুক্কা/নানা বলে নানি বলে, হুক্কা ছাড়া জীবন চলে?, হুক্কার পেট ভরা জলে, টানছে দেখ দুজন মিলে, হায়রে সে-ই হুক্কা।’একসময়ের ধূমপানের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘হুঁকা’ বা হুক্কা নিয়ে রচিত এসব গান, ছড়া এখনও দেশের সংস্কৃতিতে পরিচিত হলেও হারিয়ে গেছে বস্তুটি। এখন নেত্রকোনা শহর তো দূরের কথা, গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও পাওয়া যায় না হুঁকার দেখা। কালের বিবর্তনে অনেকটা হারিয়ে গেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হুঁকা। তিন-চার দশক আগেও বাংলার গ্রামগঞ্জে ধূমপায়ীরা হুঁকার মাধ্যমে তামাকপানের নেশায় ছিল অভ্যস্ত। সে সময় দেশের প্রায় সব বাড়িতেই ছিল এর প্রচলন। তখনকার দিনে গ্রাম্য সালিশ, সামাজিক অনুষ্ঠান বা জমায়েতে ছোটবড় সবাইকে হুঁকায় আপ্যায়নের রীতি ছিল। প্রতিটি গ্রামের প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী বাড়িতে লম্বা পাইপযুক্ত স্ট্যান্ড হুঁকা ওই বাড়ির শোভাবর্ধন ও প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করত। বর্তমান প্রজন্মের কাছে হুঁকা একটি অপরিচিত বস্তু। এটি খাওয়া দূরের কথা, চোখেই দেখেনি তারা।
বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এ হুঁকার জায়গায় বাজার দখল করেছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিকোটিনযুক্ত সিগারেট-বিড়ি। প্রজন্মের একটা বড় অংশ নিষিদ্ধ মাদকের নেশায় মাতোয়ারা। অথচ কম নিকোটিনযুক্ত হুঁকার প্রচলন থাকলে যুবসমাজকে মাদক গ্রহণের অধঃপতন থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করা যেত। সম্প্রতি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নে সংবাদ সংগ্রহে গেলে এক বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বসে বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ আড্ডায় হুঁকা পানরত অবস্থায় দেখা গেছে।আলাপকালে তারা বলেন, ‘তিন-চার দশক পূর্বেও আমাদের বাপদাদারা তিন বেলা খাবার খেতে ততটা আগ্রহী হতেন না যতটা আগ্রহী ছিলেন হুক্কা টানায়। এ ছাড়া তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কল্পনাও করা যেত না। ঘরে চালডাল না থাকলেও যথেষ্ট পরিমাণে জমা থাকত হুক্কার তামুক। তামাকপাতা টুকরা টুকরা করে কেটে এনে এতে চিটাগুড় মিশিয়ে তৈরি করা হতো বিশেষ এ তামুক। এতে নিকোটিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে। যতটুকু নিকোটিন থাকে তা নারকেলের টোলে থাকা পানিতে মিশে যায়।’ তারা আরও বলেন, ‘বাপদাদার ঐতিহ্য ধরে রেখে আমরা হুক্কা টানায় রয়েছি প্রায় ৬৫ বছর ধরে। এ ছাড়া জীবনে সিগারেট-বিড়ি বা পানও খাইনি। আমাদের গ্রামের আর কেউ না খেলেও আমরা হুক্কার প্রেমে কাটিয়ে দিয়েছি ৬৫ বছর। আমাদের বাড়িতে এসে অনেকেই শখ করে হুক্কায় টান দিয়ে যান। এতেই আমাদের প্রশান্তি।