পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর দক্ষিণে রাঙ্গাবালী উপজেলার শেষ প্রান্তে পৌঁছালে মনে হয়, দেশ যেন ধীরে ধীরে জল আর কাদার ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে নদী, চর আর কাদামাটি। এখানে লঞ্চ ঘাট আছে, যাত্রীও আছে-কিন্তু নেই লঞ্চ ভেড়ার মতো কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা।
উপজেলার বড় বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাইয়াপাড়া লঞ্চঘাট, ছোট বাইশদিয়া ইউনিয়নের চর নজির ঘাট এবং চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা লঞ্চঘাট, সব জায়গার চিত্র প্রায় একই।
এই ঘাটগুলো যেন স্থির কোনো অবকাঠামো নয়, বরং অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক চলমান ব্যবস্থা। জোয়ারে ঘাটের চিহ্ন দেখা গেলেও ভাটার টানে তা মিলিয়ে যায় কাদামাটির ভেতর।
চর নজির লঞ্চঘাটে দাঁড়ালে সেই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় আরও স্পষ্টভাবে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরে নদীর বুক চিরে ভেসে ওঠে লঞ্চ। যাত্রীরা তখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কারণ লঞ্চ ঘাটে ভেড়ে না। অনেকটা দূরের চরে গিয়ে থামে। তারপর শুরু হয় যাত্রীদের আসল সংগ্রাম।

সম্প্রতি এই রুটে চলাচলকারী রুপসী তুষার লঞ্চে উঠতে গিয়ে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন যাত্রীরা।
লঞ্চে উঠতে হলে যাত্রীদের নামতে হয় কাদামাটির ভেতর। কেউ জুতা হাতে তুলে নেন, কেউ শাড়ির খুঁট গুটিয়ে নেন হাঁটুর ওপর। শিশুকে কোলে নিয়ে, ব্যাগ মাথায় তুলে ধীরে ধীরে এগোতে হয় কাদা ও পানির মধ্য দিয়ে।
এই নৌরুটে যাতায়াতকারী এক যাত্রী সম্প্রতি লঞ্চ থেকে তোলা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরে তাদের এই দুর্ভোগের কথা জানান দেন। ওই ভিডিও চিত্রতে দেখা গেছে, পা যত এগোয় কাদা তত গাঢ় হয়। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, আবার কোথাও এমনভাবে পা আটকে যায় যেন মাটি নিজেই ধরে রাখতে চাইছে।এই কাদা পেরিয়ে কখনো কোমরসমান পানির ভেতর দিয়ে যাত্রীদের পৌঁছাতে হয় লঞ্চে।
দূর থেকে দৃশ্যটি অনেকটা অদ্ভুত এক মিছিলের মতো মনে হয়, মানুষের সারি কাদা ও পানির ভেতর দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কোনো ব্যতিক্রমী দৃশ্য নয়; এটি এখানকার মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
উপজেলার চরমোন্তাজ-গলাচিপা-রাঙ্গাবালী-কলাপাড়া নৌরুটে বর্তমানে দুটি লঞ্চ ও অন্তত আটটি বড় ট্রলার নিয়মিত যাত্রী আনা-নেওয়া করে।
কিন্তু ঘাটে নেই লঞ্চ ভেড়ানোর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। নদী ও কাদামাটির সঙ্গে লড়েই যাত্রীদের ওঠানামা করতে হয় প্রতিদিন।
স্থানীয়দের মতে, নদীতে চর জেগে ওঠার কারণে লঞ্চগুলো আর ঘাটে ভিড়তে পারে না। বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র চলছে। বর্ষায় পানি বাড়লে দুর্ভোগ কিছুটা কমে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে তা চরমে পৌঁছায়।
রুপসী তুষার লঞ্চের কয়েকজন নারী যাত্রী জানান, “আমাদের জন্য ঘাট মানেই কাদা। এই কাদা পেরিয়েই প্রতিদিন চলাচল করতে হয়। নারী ও শিশুদের জন্য এই পথ আরও কঠিন।”
তাদের ভাষ্য, অনেক সময় কাদায় পিছলে পড়ে কাপড় নষ্ট হয়ে যায়, পিছলে পড়ে আঘাত পায়। কিন্তু তাদের এভাইে একমাত্র যোগাযোগের ভরসা।
চরমোন্তাজ শিশু বাগান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব খান বলেন,“লঞ্চ আসে, কিন্তু ঘাটে ভেড়ার জায়গা নেই। ফলে প্রতিদিনই যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।”
তিনি বলেন, “যাত্রীদের কেউ জুতা হাতে নিয়ে নামেন, কেউ কাপড় গুটিয়ে হাঁটেন পানির ভেতর দিয়ে। বৃদ্ধ, নারী, শিশু-কারও জন্যই নেই আলাদা নিরাপত্তা।”
তার মতে, নদীভাঙন, অবকাঠামোর অভাব এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় এসব ঘাট এখন কেবল নামেই ‘লঞ্চঘাট’। বাস্তবে এগুলো ভরসাহীন এক যাত্রার শুরু। স্থানীয়দের দাবি, এখানে একটি স্থায়ী জেটি বা পাকা ঘাট নির্মাণ করা হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।
এ প্রসঙ্গনে জানতে চাইলে পটুয়াখালী নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক জাকী সরোয়ার জানান, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে ওই ঘাটগুলো পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে পল্টুর স্থপনের স্থানীয়ভাবে কোন আবেদন পাননি তারা। আবেদন পেলে যাচাই করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















