ঢাকা ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

ঈদের পথে আর ফেরা হলো না রবিউলের নতুন জামাকাপড় নিয়েই মৃত্যুর পথে যাত্রা, দরিদ্র পরিবারে এখন শুধু আহাজারি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৬:৫৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
  • ১৩ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের ছেলে রবিউল ইসলাম (২২)। এক বছর আগে সংসারের হাল ধরতে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। উত্তরার একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় চাকরি নিয়ে প্রতি মাসে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলত অসুস্থ বাবার চিকিৎসা আর পরিবারের খরচ।
কিন্তু ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার সেই স্বপ্নময় যাত্রাই শেষ হলো লাশ হয়ে। নতুন জামাকাপড় কিনে বাবা-মার সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি ফিরছিলেন রবিউল। বুধবার সকালে রাজধানীর নর্দার নতুন বাজার এলাকায় ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। মুহূর্তেই নিভে যায় দরিদ্র পরিবারটির একমাত্র ভরসার প্রদীপ।


রবিউলের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ মির্জাগঞ্জ গ্রামে। বাবা মো. মজিবর সিকদার রিকশা চালানোসহ দিনমজুরের কাজ করতেন। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে পড়ায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। মা শাহিনুর বেগম গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রবিউল ছিল সবার ছোট। বড় ভাই রেজাউল সিকদার গভীর নলকূপ বসানোর কাজ করেন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে আগেই।
অভাব-অনটনের সংসারেও হার মানেননি রবিউল। ২০২৪ সালে মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন দরগাহ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর বাবার অসুস্থতা ও সংসারের কষ্ট দেখে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় গিয়ে উত্তরার একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় চাকরি নেন। মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন পেতেন। সেই টাকাতেই চলত পুরো পরিবার।
ঈদুল আজহা সামনে রেখে কয়েকদিন ধরেই বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাকুল ছিলেন রবিউল। পরিবারের জন্য নতুন কাপড় কিনেছিলেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার স্বপ্ন ছিল তার চোখে। মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বাবাকে ফোন করে জানান, অবশেষে ছুটি পেয়েছেন। রাতে রওনা দিতে চাইলে বাবা তাকে সকালে আসতে বলেন।
কিন্তু সেই সকালই হয়ে উঠল পরিবারের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সকাল।
রবিউলের বাবা মজিবর সিকদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“পোলাডা কইছিল, আব্বা আমি আইতাছি, একসাথে ঈদ করুম। রাতে রওনা দিতে চাইছিল, আমি সকালে আসতে কইছি। সকালে খবর আইলো, আমার রবিউল আর নাই…”কথা বলতে বলতেই বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। মা শাহিনুর বেগমের কান্না যেন থামছেই না। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হচ্ছিল তার।
তিনি বলেন, “রবিউল কামাই কইরা টাকা পাঠাইতো। ওই টাকায় ওর বাবার চিকিৎসা করতেছি। কত আশা কইরা বাড়ি আইতেছিল। এখন কেউ বাড়িতে আইলেই আমি জিগাই—আমার রবিউল আইছে?”
স্বজনদের আহাজারিতে এখন ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ। যে ছেলেটি ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, সে ফিরছে নিথর দেহ হয়ে।
উল্লেখ্য, বুধবার (২৭ মে) সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর নর্দার নতুন বাজার এলাকায় ইসলাম পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রোড ডিভাইডার ভেঙে বিপরীত লেনের আকাশ পরিবহনের বাসকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং আরও অন্তত ১০ জন আহত হন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাটের লাইজু বেগম (৩৮), তার স্বামী কবির জমাদ্দার (৪৭), খুশি বেগম (৩৫) এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের রবিউল ইসলাম (২২)।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদের পথে আর ফেরা হলো না রবিউলের নতুন জামাকাপড় নিয়েই মৃত্যুর পথে যাত্রা, দরিদ্র পরিবারে এখন শুধু আহাজারি

প্রকাশিত : ০৬:৫৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের ছেলে রবিউল ইসলাম (২২)। এক বছর আগে সংসারের হাল ধরতে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। উত্তরার একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় চাকরি নিয়ে প্রতি মাসে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলত অসুস্থ বাবার চিকিৎসা আর পরিবারের খরচ।
কিন্তু ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার সেই স্বপ্নময় যাত্রাই শেষ হলো লাশ হয়ে। নতুন জামাকাপড় কিনে বাবা-মার সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি ফিরছিলেন রবিউল। বুধবার সকালে রাজধানীর নর্দার নতুন বাজার এলাকায় ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। মুহূর্তেই নিভে যায় দরিদ্র পরিবারটির একমাত্র ভরসার প্রদীপ।


রবিউলের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ মির্জাগঞ্জ গ্রামে। বাবা মো. মজিবর সিকদার রিকশা চালানোসহ দিনমজুরের কাজ করতেন। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে পড়ায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। মা শাহিনুর বেগম গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রবিউল ছিল সবার ছোট। বড় ভাই রেজাউল সিকদার গভীর নলকূপ বসানোর কাজ করেন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে আগেই।
অভাব-অনটনের সংসারেও হার মানেননি রবিউল। ২০২৪ সালে মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন দরগাহ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর বাবার অসুস্থতা ও সংসারের কষ্ট দেখে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় গিয়ে উত্তরার একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় চাকরি নেন। মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন পেতেন। সেই টাকাতেই চলত পুরো পরিবার।
ঈদুল আজহা সামনে রেখে কয়েকদিন ধরেই বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাকুল ছিলেন রবিউল। পরিবারের জন্য নতুন কাপড় কিনেছিলেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার স্বপ্ন ছিল তার চোখে। মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বাবাকে ফোন করে জানান, অবশেষে ছুটি পেয়েছেন। রাতে রওনা দিতে চাইলে বাবা তাকে সকালে আসতে বলেন।
কিন্তু সেই সকালই হয়ে উঠল পরিবারের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সকাল।
রবিউলের বাবা মজিবর সিকদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“পোলাডা কইছিল, আব্বা আমি আইতাছি, একসাথে ঈদ করুম। রাতে রওনা দিতে চাইছিল, আমি সকালে আসতে কইছি। সকালে খবর আইলো, আমার রবিউল আর নাই…”কথা বলতে বলতেই বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। মা শাহিনুর বেগমের কান্না যেন থামছেই না। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হচ্ছিল তার।
তিনি বলেন, “রবিউল কামাই কইরা টাকা পাঠাইতো। ওই টাকায় ওর বাবার চিকিৎসা করতেছি। কত আশা কইরা বাড়ি আইতেছিল। এখন কেউ বাড়িতে আইলেই আমি জিগাই—আমার রবিউল আইছে?”
স্বজনদের আহাজারিতে এখন ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ। যে ছেলেটি ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, সে ফিরছে নিথর দেহ হয়ে।
উল্লেখ্য, বুধবার (২৭ মে) সকাল ৬টার দিকে রাজধানীর নর্দার নতুন বাজার এলাকায় ইসলাম পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রোড ডিভাইডার ভেঙে বিপরীত লেনের আকাশ পরিবহনের বাসকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং আরও অন্তত ১০ জন আহত হন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাটের লাইজু বেগম (৩৮), তার স্বামী কবির জমাদ্দার (৪৭), খুশি বেগম (৩৫) এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের রবিউল ইসলাম (২২)।