ঢাকা ১০:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণের নতুন দিগন্ত: প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের কাছে বরিশালবাসীর প্রত্যাশা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৭:২২:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
  • ৮ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি নদী, সাগর, পলি, সবুজ শস্যক্ষেত, লোকঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং অফুরন্ত সম্ভাবনার এক জীবন্ত ভূখণ্ড। কীর্তনখোলা, সুগন্ধা, বিষখালী, তেঁতুলিয়া, মেঘনা ও পায়রার অবিরাম স্রোত যেমন এ জনপদকে দিয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তেমনি এখানকার মানুষের শ্রম, মেধা, জ্ঞানচর্চা, অতিথিপরায়ণতা ও সহনশীলতা যুগের পর যুগ বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌ-বাণিজ্য এবং উপকূলীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলার শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি এর মানুষের জীবনসংগ্রাম আগামী দিনের প্রেরণার উৎস।

প্রায় ১৩ হাজার ৬৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছয় জেলার বরিশাল বিভাগে বসবাস করেন প্রায় কোটির কাছাকাছি মানুষ। সাক্ষরতার হার ৭১%, কৃষি ও মৎস্যসম্পদে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। ধান, ইলিশ, পেয়ারা, সুপারি, নারিকেল, উপকূলীয় সম্পদ ও কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা দক্ষিণাঞ্চলকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তবুও স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর রেল যোগাযোগ, বৃহৎ শিল্পায়ন, উচ্চপ্রযুক্তি গবেষণা, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, গ্যাস সরবরাহ, উচ্চশিক্ষা এবং বৃহৎ বিনিয়োগের মতো বহু ক্ষেত্রে এই অঞ্চল এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির অপেক্ষায় রয়েছে। এই বাস্তবতায় আগামীকাল ১৩ জুলাই জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যের অহংকার দেশনায়ক তারেক রহমানের বরিশাল সফর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা, এ সফরকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়কের উন্নয়ন, বরিশাল–ভোলা সেতু, ঝালকাঠিতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়, রেল যোগাযোগ, পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্পায়ন, কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, গ্যাস সরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মতো দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়গুলো নতুন করে অগ্রাধিকার পাবে। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর একটাই প্রত্যাশা সম্ভাবনার এই জনপদ যেন পরিকল্পিত উন্নয়ন, সুষম বিনিয়োগ এবং দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অগ্রযাত্রায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি সফর, নতুন প্রত্যাশার এক অধ্যায় : ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা ঘটে প্রতীকী কিছু মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে আগামীকাল তেমনই একটি দিন। রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বরিশাল সফর প্রশাসনিক কর্মসূচির গণ্ডি ছাড়িয়ে উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অগ্রগতির প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব, মিডিয়া সেল এর সদস্য ও সফরসঙ্গী মো. আতিকুর রহমান রুমন ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বরিশালের মানুষের একটি বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, আর এ কারণেই দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন তাঁর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোর অন্যতম। বৃক্ষরোপণ, খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি, সেনাবাহিনীর মহড়া পরিদর্শন, আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সাংগঠনিক বৈঠক সব মিলিয়ে এই সফর দক্ষিণাঞ্চলকে ঘিরে সরকারের কর্মপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষ আশা করছেন, রেল সংযোগ, ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়কের উন্নয়ন, বরিশাল–ভোলা সেতু, গ্যাস সরবরাহ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও পর্যটন বিকাশের মতো দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়গুলো নতুন করে অগ্রাধিকার পাবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা সামনে আসবে।

ঝালকাঠিতে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এখন সময়ের দাবি :চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অতিক্রম করে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সায়েন্স ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, তখন দক্ষিণাঞ্চলেও বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীনির্ভর অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ ঝালকাঠিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে এ অঞ্চলে আধুনিক প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, মেরিন ও শিপবিল্ডিং, চিকিৎসা, কৃষি ও জলবায়ুবিজ্ঞানসহ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে গবেষণা কেন্দ্র, প্রযুক্তি পার্ক, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠবে, যা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই বরিশাল সফরে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ঝালকাঠিতে একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা।

ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক: দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির মহাসড়ক : দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের প্রশ্নে আজ যে প্রকল্পটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, সেটি হলো ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা। পদ্মা সেতুর সুফলকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে হলে এই মহাসড়ককে আন্তর্জাতিক মানের করিডরে রূপান্তর করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। এই সড়ক শুধু বরিশাল, পটুয়াখালী কিংবা কুয়াকাটার মানুষের যাতায়াত সহজ করবে না; এটি কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, শিল্প এবং সমুদ্রবন্দরভিত্তিক অর্থনীতিকে এক সুতোয় গেঁথে দেবে। প্রতিদিন হাজার হাজার টন কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি এবং শিল্পপণ্য দ্রুত রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছাতে পারবে। পরিবহন ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে। বরিশালবাসীর দৃঢ় প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা অগ্রগতির ঘোষণা আসবে। কারণ এই মহাসড়ক শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক।

বরিশাল–ভোলা সেতু: নদীর দুই তীর নয়, দুই অর্থনীতির সংযোগ : মেঘনার বুকে একটি সেতু বহুদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন। বরিশাল–ভোলা সেতু নির্মিত হলে শুধু দুটি জেলার সংযোগই প্রতিষ্ঠিত হবে না; এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ভোলা বাংলাদেশের অন্যতম গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা। অপরদিকে বরিশাল বিভাগ শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দুই সম্ভাবনাকে একটি সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করা গেলে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এবং পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে যাবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে বরিশাল–ভোলা সেতুর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

পায়রা সমুদ্রবন্দর: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে পায়রা সমুদ্রবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থান, গভীর সমুদ্রের নৈকট্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সুবিধার কারণে এটি শুধু একটি বন্দর নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। কিন্তু একটি বন্দর তখনই সফল হয়, যখন তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে শিল্পাঞ্চল, আধুনিক সড়ক ও রেল যোগাযোগ, লজিস্টিক হাব, গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ। বরিশালের মানুষ আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো আধুনিকায়নের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘোষণা আসবে। কারণ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে আজ পায়রা বন্দরের ভবিষ্যৎ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

কুয়াকাটা: পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সময় : যেখানে একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়, সেই কুয়াকাটা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম অনন্য পর্যটন গন্তব্য হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে। অথচ পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ, আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং পরিবহন সুবিধার অভাবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ এখনো ঘটেনি। কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে যদি আধুনিক পর্যটন নগরী, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট, সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎসে পরিণত হতে পারে। বরিশালবাসীর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন উন্নয়নের নতুন রূপরেখা ঘোষণা করবে এবং কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করবে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান: উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড : কোনো অঞ্চলের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক কিংবা ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়নের পরিচয় মেলে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান এবং জীবনমানের পরিবর্তনে। দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ আজও কর্মসংস্থানের আশায় রাজধানীমুখী। অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করেও নিজ অঞ্চলে যোগ্যতার উপযোগী কাজের সুযোগ পান না। ফলে মেধা ও মানবসম্পদের একটি বড় অংশ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বরিশাল বিভাগে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল, ইপিজেড, কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক অর্থনীতিভিত্তিক নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে তাই তরুণ সমাজের প্রত্যাশা দক্ষিণাঞ্চলকে এমন একটি উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হবে, যেখানে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষকে রাজধানীমুখী হতে হবে না; বরং দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেই মানুষ কাজের সন্ধানে দক্ষিণাঞ্চলে আসবে। সেই দিনই প্রকৃত অর্থে বরিশালের উন্নয়নের নতুন ইতিহাস রচিত হবে।

রেল যোগাযোগ: দক্ষিণাঞ্চলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা : স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও বরিশাল বিভাগ আজও দেশের একমাত্র বিভাগ, যার সঙ্গে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই বাস্তবতা শুধু একটি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং উন্নয়নের অসম বণ্টনের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। সড়কপথের উন্নয়ন যতই হোক, টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য রেল যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই।

বরিশালের কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী সকলেরই দীর্ঘদিনের দাবি, পদ্মা সেতুর সুফলকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল এবং পরবর্তীতে পটুয়াখালী ও কুয়াকাটা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হোক। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, শিল্পায়নের নতুন ভিত্তি তৈরি হবে এবং দক্ষিণাঞ্চল জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হবে। প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা—রেল সংযোগের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট অগ্রগতি কিংবা সময়োপযোগী ঘোষণা।

ভোলার গ্যাস, বরিশালের শিল্প: সম্ভাবনার শক্ত ভিত : ভোলা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার। কিন্তু সেই গ্যাসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। শিল্পের জন্য জ্বালানি যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্যও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশাল, পটুয়াখালী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। এর ফলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। আজ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করে, গ্যাস, বন্দর, মহাসড়ক ও সম্ভাব্য রেল যোগাযোগ এই চারটি শক্তিকে একত্রিত করতে পারলেই বরিশাল দেশের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

নদীভাঙন, খাল পুনঃখনন ও জলবায়ু অভিযোজন: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই : বরিশালের মানুষের জীবন নদীকেন্দ্রিক। নদী তাদের জীবিকা দেয়, আবার অনেক সময় সেই নদীই কেড়ে নেয় ঘরবাড়ি, জমি ও স্বপ্ন। প্রতিবছর নদীভাঙনে অসংখ্য পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ভরাট ও নাব্যতা সংকটের কারণে বহু খাল হারিয়ে যাচ্ছে, ফলে জলাবদ্ধতা, কৃষিক্ষতি ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ ও খাল পুনরুদ্ধার-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে বরিশালবাসীর প্রত্যাশা আরও বিস্তৃত। তারা চান, নদীভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, খাল পুনঃখননের ধারাবাহিক কর্মসূচি, উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হোক। কারণ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন প্রকৃতিকে রক্ষা করেই উন্নয়নের পথ নির্মাণ করা হবে।

কৃষি, মৎস্য ও নীল অর্থনীতি: দক্ষিণাঞ্চলের প্রকৃত শক্তি :
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ হলো কৃষি, মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ। উর্বর ভূমি, বিস্তীর্ণ নদ-নদী, উপকূলীয় অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের নৈকট্য এই অঞ্চলকে নীল অর্থনীতির এক অনন্য সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। প্রয়োজন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের কোল্ড চেইন, রপ্তানিমুখী মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, সামুদ্রিক গবেষণা এবং জেলেদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। বরিশালের মানুষ আশা করে, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও নীল অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মানুষের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : যে উন্নয়ন মানুষের জীবনমান বদলে দেয়, সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন। বরিশালের তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি। তারা এমন একটি দক্ষিণাঞ্চল দেখতে চায়, যেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে জীবিকার জন্য রাজধানীতে ছুটতে হবে না। একই সঙ্গে আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন উদ্যোগও আজ সময়ের দাবি। উন্নয়নের সুফল তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন একজন কৃষক থেকে একজন গবেষক সকলেই নিজ অঞ্চলে সম্মানজনক জীবন ও কাজের সুযোগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে তাই মানুষের প্রত্যাশা কেবল নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়; বরং এমন এক দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শন, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও আধুনিক দক্ষিণাঞ্চলের ভিত্তি রচনা করবে।

বরিশালবাসীর কণ্ঠে উন্নয়নের অভিন্ন দাবি : বরিশাল বিভাগের গ্রাম থেকে শহর, কৃষক থেকে ব্যবসায়ী, শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী, জেলে থেকে উদ্যোক্তা সবার দাবির ভাষা আজ প্রায় একই। তারা চান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, বৈষম্যের অবসান এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা। তাদের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়কের দ্রুত বাস্তবায়ন, বরিশাল–ভোলা সেতু নির্মাণ, জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে বরিশালের সংযোগ, ভোলার গ্যাস দক্ষিণাঞ্চলে সরবরাহ, পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, একটি রপ্তানিমুখী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসার এবং কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে উন্নীত করা।
এসব দাবি কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য উন্নয়ন-অধিকার। তাই প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও বাস্তবভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যাশা পূরণে সফরটি হোক নতুন দিগন্তের সূচনা : প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গন, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন এবং বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক, মিডিয়া সেলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খানের মতে, এই সফর দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাঁদের প্রত্যাশা, ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীতকরণ, বরিশাল–ভোলা সেতু, রেল সংযোগ, ঝালকাঠিতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পায়রা সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন, গ্যাস সরবরাহ, কুয়াকাটার পর্যটন উন্নয়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগের মতো প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাবে। তাঁদের বিশ্বাস, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নভিত্তিক সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনাই দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

পরিশেষে, নদী, সাগর, উর্বর মাটি এবং পরিশ্রমী মানুষের এই জনপদ বহুদিন ধরেই সম্ভাবনার আলো বুকে ধারণ করে আছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া। জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের বরিশাল সফর সেই প্রত্যাশারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। যদি এই সফরের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা, কার্যকর সিদ্ধান্ত এবং সময়োপযোগী ঘোষণা আসে, তবে তা শুধু বরিশাল নয়, সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। বরিশাল আজ আর অবহেলার প্রতীক হতে চায় না; বরং সম্ভাবনা, উৎপাদন, শিল্পায়ন, পর্যটন, নীল অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি জনগণেরও। আর সেই যৌথ যাত্রার সূচনালগ্নে দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের কণ্ঠে আজ একটিই প্রত্যাশা এই সফর যেন কেবল একটি সফর হয়ে না থাকে; এটি যেন হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের, প্রত্যাশা থেকে প্রাপ্তির এবং দক্ষিণাঞ্চলের নতুন ভোরের সূচনা। নদী, সমুদ্র, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, বন্দর, নীল অর্থনীতি এবং অফুরন্ত মানবসম্পদের এই অঞ্চলকে যদি পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে দক্ষিণাঞ্চল শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাবে না; বদলে যাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের মানচিত্রও। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের বরিশাল সফরটি হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উন্নয়ন-যাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বরিশালবাসীর প্রত্যাশা ভাঙ্গা-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক, বরিশাল-ভোলা সেতু, রেল সংযোগ, ভোলার গ্যাস, ঝালকাঠিতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পায়রা সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন, কুয়াকাটার আন্তর্জাতিক পর্যটন উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ এবং কর্মসংস্থানমুখী বৃহৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা এই সফরের মধ্য দিয়েই জাতির সামনে উঠে আসুক। কারণ উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত কেবল সময়ের অংশ নয়, ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে থাকে। বরিশালবাসীর বিশ্বাস, আগামীকাল (১৩ জুলাই) তেমনই একটি দিন হয়ে উঠতে পারে যেদিন দক্ষিণের নদীবিধৌত জনপদ নতুন আস্থায়, নতুন আত্মবিশ্বাসে এবং নতুন স্বপ্নে ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করবে। সেই স্বপ্ন শুধু বরিশালের নয়; সেটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাই দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় কোটি মানুষ জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যের অহংকার দেশনায়ক তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছে একটি নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

দাউদকান্দিতে পৃথক অভিযানে মাদক কারবারিসহ গ্রেপ্তার -৫

দক্ষিণের নতুন দিগন্ত: প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের কাছে বরিশালবাসীর প্রত্যাশা

প্রকাশিত : ০৭:২২:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি নদী, সাগর, পলি, সবুজ শস্যক্ষেত, লোকঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং অফুরন্ত সম্ভাবনার এক জীবন্ত ভূখণ্ড। কীর্তনখোলা, সুগন্ধা, বিষখালী, তেঁতুলিয়া, মেঘনা ও পায়রার অবিরাম স্রোত যেমন এ জনপদকে দিয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তেমনি এখানকার মানুষের শ্রম, মেধা, জ্ঞানচর্চা, অতিথিপরায়ণতা ও সহনশীলতা যুগের পর যুগ বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌ-বাণিজ্য এবং উপকূলীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলার শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি এর মানুষের জীবনসংগ্রাম আগামী দিনের প্রেরণার উৎস।

প্রায় ১৩ হাজার ৬৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছয় জেলার বরিশাল বিভাগে বসবাস করেন প্রায় কোটির কাছাকাছি মানুষ। সাক্ষরতার হার ৭১%, কৃষি ও মৎস্যসম্পদে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। ধান, ইলিশ, পেয়ারা, সুপারি, নারিকেল, উপকূলীয় সম্পদ ও কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা দক্ষিণাঞ্চলকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তবুও স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর রেল যোগাযোগ, বৃহৎ শিল্পায়ন, উচ্চপ্রযুক্তি গবেষণা, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, গ্যাস সরবরাহ, উচ্চশিক্ষা এবং বৃহৎ বিনিয়োগের মতো বহু ক্ষেত্রে এই অঞ্চল এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির অপেক্ষায় রয়েছে। এই বাস্তবতায় আগামীকাল ১৩ জুলাই জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যের অহংকার দেশনায়ক তারেক রহমানের বরিশাল সফর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা, এ সফরকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়কের উন্নয়ন, বরিশাল–ভোলা সেতু, ঝালকাঠিতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়, রেল যোগাযোগ, পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্পায়ন, কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, গ্যাস সরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মতো দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়গুলো নতুন করে অগ্রাধিকার পাবে। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর একটাই প্রত্যাশা সম্ভাবনার এই জনপদ যেন পরিকল্পিত উন্নয়ন, সুষম বিনিয়োগ এবং দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অগ্রযাত্রায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি সফর, নতুন প্রত্যাশার এক অধ্যায় : ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা ঘটে প্রতীকী কিছু মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে আগামীকাল তেমনই একটি দিন। রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বরিশাল সফর প্রশাসনিক কর্মসূচির গণ্ডি ছাড়িয়ে উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অগ্রগতির প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব, মিডিয়া সেল এর সদস্য ও সফরসঙ্গী মো. আতিকুর রহমান রুমন ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বরিশালের মানুষের একটি বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, আর এ কারণেই দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন তাঁর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোর অন্যতম। বৃক্ষরোপণ, খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি, সেনাবাহিনীর মহড়া পরিদর্শন, আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সাংগঠনিক বৈঠক সব মিলিয়ে এই সফর দক্ষিণাঞ্চলকে ঘিরে সরকারের কর্মপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষ আশা করছেন, রেল সংযোগ, ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়কের উন্নয়ন, বরিশাল–ভোলা সেতু, গ্যাস সরবরাহ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও পর্যটন বিকাশের মতো দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়গুলো নতুন করে অগ্রাধিকার পাবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা সামনে আসবে।

ঝালকাঠিতে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এখন সময়ের দাবি :চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অতিক্রম করে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সায়েন্স ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, তখন দক্ষিণাঞ্চলেও বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীনির্ভর অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ ঝালকাঠিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে এ অঞ্চলে আধুনিক প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, মেরিন ও শিপবিল্ডিং, চিকিৎসা, কৃষি ও জলবায়ুবিজ্ঞানসহ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে গবেষণা কেন্দ্র, প্রযুক্তি পার্ক, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠবে, যা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই বরিশাল সফরে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ঝালকাঠিতে একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা।

ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক: দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির মহাসড়ক : দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের প্রশ্নে আজ যে প্রকল্পটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, সেটি হলো ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা। পদ্মা সেতুর সুফলকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে হলে এই মহাসড়ককে আন্তর্জাতিক মানের করিডরে রূপান্তর করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। এই সড়ক শুধু বরিশাল, পটুয়াখালী কিংবা কুয়াকাটার মানুষের যাতায়াত সহজ করবে না; এটি কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, শিল্প এবং সমুদ্রবন্দরভিত্তিক অর্থনীতিকে এক সুতোয় গেঁথে দেবে। প্রতিদিন হাজার হাজার টন কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি এবং শিল্পপণ্য দ্রুত রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছাতে পারবে। পরিবহন ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে। বরিশালবাসীর দৃঢ় প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা অগ্রগতির ঘোষণা আসবে। কারণ এই মহাসড়ক শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক।

বরিশাল–ভোলা সেতু: নদীর দুই তীর নয়, দুই অর্থনীতির সংযোগ : মেঘনার বুকে একটি সেতু বহুদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন। বরিশাল–ভোলা সেতু নির্মিত হলে শুধু দুটি জেলার সংযোগই প্রতিষ্ঠিত হবে না; এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ভোলা বাংলাদেশের অন্যতম গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা। অপরদিকে বরিশাল বিভাগ শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দুই সম্ভাবনাকে একটি সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করা গেলে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এবং পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে যাবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে বরিশাল–ভোলা সেতুর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

পায়রা সমুদ্রবন্দর: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে পায়রা সমুদ্রবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থান, গভীর সমুদ্রের নৈকট্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সুবিধার কারণে এটি শুধু একটি বন্দর নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। কিন্তু একটি বন্দর তখনই সফল হয়, যখন তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে শিল্পাঞ্চল, আধুনিক সড়ক ও রেল যোগাযোগ, লজিস্টিক হাব, গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ। বরিশালের মানুষ আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো আধুনিকায়নের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘোষণা আসবে। কারণ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে আজ পায়রা বন্দরের ভবিষ্যৎ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

কুয়াকাটা: পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সময় : যেখানে একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়, সেই কুয়াকাটা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম অনন্য পর্যটন গন্তব্য হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে। অথচ পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ, আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং পরিবহন সুবিধার অভাবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ এখনো ঘটেনি। কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে যদি আধুনিক পর্যটন নগরী, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট, সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎসে পরিণত হতে পারে। বরিশালবাসীর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন উন্নয়নের নতুন রূপরেখা ঘোষণা করবে এবং কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করবে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান: উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড : কোনো অঞ্চলের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক কিংবা ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়নের পরিচয় মেলে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান এবং জীবনমানের পরিবর্তনে। দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ আজও কর্মসংস্থানের আশায় রাজধানীমুখী। অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করেও নিজ অঞ্চলে যোগ্যতার উপযোগী কাজের সুযোগ পান না। ফলে মেধা ও মানবসম্পদের একটি বড় অংশ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বরিশাল বিভাগে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল, ইপিজেড, কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক অর্থনীতিভিত্তিক নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে তাই তরুণ সমাজের প্রত্যাশা দক্ষিণাঞ্চলকে এমন একটি উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হবে, যেখানে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষকে রাজধানীমুখী হতে হবে না; বরং দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেই মানুষ কাজের সন্ধানে দক্ষিণাঞ্চলে আসবে। সেই দিনই প্রকৃত অর্থে বরিশালের উন্নয়নের নতুন ইতিহাস রচিত হবে।

রেল যোগাযোগ: দক্ষিণাঞ্চলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা : স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও বরিশাল বিভাগ আজও দেশের একমাত্র বিভাগ, যার সঙ্গে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই বাস্তবতা শুধু একটি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং উন্নয়নের অসম বণ্টনের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। সড়কপথের উন্নয়ন যতই হোক, টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য রেল যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই।

বরিশালের কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী সকলেরই দীর্ঘদিনের দাবি, পদ্মা সেতুর সুফলকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল এবং পরবর্তীতে পটুয়াখালী ও কুয়াকাটা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হোক। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, শিল্পায়নের নতুন ভিত্তি তৈরি হবে এবং দক্ষিণাঞ্চল জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হবে। প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা—রেল সংযোগের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট অগ্রগতি কিংবা সময়োপযোগী ঘোষণা।

ভোলার গ্যাস, বরিশালের শিল্প: সম্ভাবনার শক্ত ভিত : ভোলা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার। কিন্তু সেই গ্যাসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। শিল্পের জন্য জ্বালানি যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্যও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশাল, পটুয়াখালী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। এর ফলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। আজ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করে, গ্যাস, বন্দর, মহাসড়ক ও সম্ভাব্য রেল যোগাযোগ এই চারটি শক্তিকে একত্রিত করতে পারলেই বরিশাল দেশের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

নদীভাঙন, খাল পুনঃখনন ও জলবায়ু অভিযোজন: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই : বরিশালের মানুষের জীবন নদীকেন্দ্রিক। নদী তাদের জীবিকা দেয়, আবার অনেক সময় সেই নদীই কেড়ে নেয় ঘরবাড়ি, জমি ও স্বপ্ন। প্রতিবছর নদীভাঙনে অসংখ্য পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ভরাট ও নাব্যতা সংকটের কারণে বহু খাল হারিয়ে যাচ্ছে, ফলে জলাবদ্ধতা, কৃষিক্ষতি ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ ও খাল পুনরুদ্ধার-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে বরিশালবাসীর প্রত্যাশা আরও বিস্তৃত। তারা চান, নদীভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, খাল পুনঃখননের ধারাবাহিক কর্মসূচি, উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হোক। কারণ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন প্রকৃতিকে রক্ষা করেই উন্নয়নের পথ নির্মাণ করা হবে।

কৃষি, মৎস্য ও নীল অর্থনীতি: দক্ষিণাঞ্চলের প্রকৃত শক্তি :
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ হলো কৃষি, মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ। উর্বর ভূমি, বিস্তীর্ণ নদ-নদী, উপকূলীয় অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের নৈকট্য এই অঞ্চলকে নীল অর্থনীতির এক অনন্য সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। প্রয়োজন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের কোল্ড চেইন, রপ্তানিমুখী মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, সামুদ্রিক গবেষণা এবং জেলেদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। বরিশালের মানুষ আশা করে, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও নীল অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মানুষের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : যে উন্নয়ন মানুষের জীবনমান বদলে দেয়, সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন। বরিশালের তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি। তারা এমন একটি দক্ষিণাঞ্চল দেখতে চায়, যেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে জীবিকার জন্য রাজধানীতে ছুটতে হবে না। একই সঙ্গে আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন উদ্যোগও আজ সময়ের দাবি। উন্নয়নের সুফল তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন একজন কৃষক থেকে একজন গবেষক সকলেই নিজ অঞ্চলে সম্মানজনক জীবন ও কাজের সুযোগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে তাই মানুষের প্রত্যাশা কেবল নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়; বরং এমন এক দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শন, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও আধুনিক দক্ষিণাঞ্চলের ভিত্তি রচনা করবে।

বরিশালবাসীর কণ্ঠে উন্নয়নের অভিন্ন দাবি : বরিশাল বিভাগের গ্রাম থেকে শহর, কৃষক থেকে ব্যবসায়ী, শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী, জেলে থেকে উদ্যোক্তা সবার দাবির ভাষা আজ প্রায় একই। তারা চান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, বৈষম্যের অবসান এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা। তাদের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—ভাঙ্গা–কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়কের দ্রুত বাস্তবায়ন, বরিশাল–ভোলা সেতু নির্মাণ, জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে বরিশালের সংযোগ, ভোলার গ্যাস দক্ষিণাঞ্চলে সরবরাহ, পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, একটি রপ্তানিমুখী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসার এবং কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে উন্নীত করা।
এসব দাবি কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য উন্নয়ন-অধিকার। তাই প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও বাস্তবভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যাশা পূরণে সফরটি হোক নতুন দিগন্তের সূচনা : প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গন, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন এবং বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক, মিডিয়া সেলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খানের মতে, এই সফর দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাঁদের প্রত্যাশা, ভাঙ্গা–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীতকরণ, বরিশাল–ভোলা সেতু, রেল সংযোগ, ঝালকাঠিতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পায়রা সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন, গ্যাস সরবরাহ, কুয়াকাটার পর্যটন উন্নয়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগের মতো প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাবে। তাঁদের বিশ্বাস, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নভিত্তিক সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনাই দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

পরিশেষে, নদী, সাগর, উর্বর মাটি এবং পরিশ্রমী মানুষের এই জনপদ বহুদিন ধরেই সম্ভাবনার আলো বুকে ধারণ করে আছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া। জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের বরিশাল সফর সেই প্রত্যাশারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। যদি এই সফরের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা, কার্যকর সিদ্ধান্ত এবং সময়োপযোগী ঘোষণা আসে, তবে তা শুধু বরিশাল নয়, সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। বরিশাল আজ আর অবহেলার প্রতীক হতে চায় না; বরং সম্ভাবনা, উৎপাদন, শিল্পায়ন, পর্যটন, নীল অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি জনগণেরও। আর সেই যৌথ যাত্রার সূচনালগ্নে দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের কণ্ঠে আজ একটিই প্রত্যাশা এই সফর যেন কেবল একটি সফর হয়ে না থাকে; এটি যেন হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের, প্রত্যাশা থেকে প্রাপ্তির এবং দক্ষিণাঞ্চলের নতুন ভোরের সূচনা। নদী, সমুদ্র, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, বন্দর, নীল অর্থনীতি এবং অফুরন্ত মানবসম্পদের এই অঞ্চলকে যদি পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে দক্ষিণাঞ্চল শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাবে না; বদলে যাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের মানচিত্রও। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের বরিশাল সফরটি হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উন্নয়ন-যাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বরিশালবাসীর প্রত্যাশা ভাঙ্গা-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক, বরিশাল-ভোলা সেতু, রেল সংযোগ, ভোলার গ্যাস, ঝালকাঠিতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পায়রা সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন, কুয়াকাটার আন্তর্জাতিক পর্যটন উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ এবং কর্মসংস্থানমুখী বৃহৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা এই সফরের মধ্য দিয়েই জাতির সামনে উঠে আসুক। কারণ উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত কেবল সময়ের অংশ নয়, ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে থাকে। বরিশালবাসীর বিশ্বাস, আগামীকাল (১৩ জুলাই) তেমনই একটি দিন হয়ে উঠতে পারে যেদিন দক্ষিণের নদীবিধৌত জনপদ নতুন আস্থায়, নতুন আত্মবিশ্বাসে এবং নতুন স্বপ্নে ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করবে। সেই স্বপ্ন শুধু বরিশালের নয়; সেটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাই দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় কোটি মানুষ জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যের অহংকার দেশনায়ক তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছে একটি নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট