জুবাইয়া বিন্তে কবির: একজন শিক্ষার্থীর চার বা পাঁচ বছরের নিরলস পরিশ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং সামাজিক অবদান—সবকিছুকে কি সত্যিই একটি মাত্র সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব? বর্তমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সিজিপিএ (CGPA) যেন সেই একক সংখ্যার প্রতীক, যার ওপর নির্ভর করেই অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতা বিচার করা হয়। অথচ বাস্তব জীবন বারবার প্রমাণ করেছে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল পরীক্ষার খাতায় লেখা উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান, দক্ষতা, চরিত্র, মূল্যবোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই একজন মানুষ পূর্ণতা লাভ করে। তাই সময়ের দাবি হলো উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও সময়োপযোগী ও মানবিক করে তোলা।
সিজিপিএর সীমাবদ্ধতা ও একক সংখ্যার জাল :
সিজিপিএ নিঃসন্দেহে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন পদ্ধতি। এটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক পারফরম্যান্সের একটি পরিমাপযোগ্য সূচক। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ব্যক্তিত্বকে ধারণ করতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী হয়তো অসাধারণ গবেষক, দক্ষ সংগঠক, অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা কিংবা নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক কিন্তু সিজিপিএ সেই পরিচয় বহন করে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণীর প্রকৃত সক্ষমতা একটি সংখ্যার আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
নম্বরের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার আত্মা : আজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতাই যেন বড় হয়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষার্থী নতুন কিছু শেখার আনন্দের পরিবর্তে শুধু পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার কৌশল আয়ত্ত করতেই ব্যস্ত থাকে। মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি এবং গ্রেডের চাপ ধীরে ধীরে সৃজনশীল চিন্তা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ও গবেষণামনস্কতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা ও জ্ঞানের বিকাশ, সেখানে অতিরিক্ত সিজিপিএ-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি সেই উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মানসিক চাপের নীরব সংকট : উচ্চ সিজিপিএ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা এখন বহু শিক্ষার্থীর জন্য মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট, এমনকি বিষণ্নতার মতো সমস্যাও ক্রমেই বাড়ছে। একটি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না হলে অনেকেই মনে করেন যেন তাদের পুরো ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেছে। অথচ শিক্ষা কখনোই ভয়ের নাম হতে পারে না; শিক্ষা হওয়া উচিত আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল ও সম্ভাবনার আরেক নাম। তাই এমন মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীকে কেবল নম্বর নয়, মানুষ হিসেবেও বিকশিত হতে উৎসাহিত করবে।
আই-সিজিপিএ: মূল্যায়নের নতুন দিগন্ত : এই প্রেক্ষাপটে Integrated Cumulative Grade Point Average (I-CGPA) বা সমন্বিত সিজিপিএ একটি যুগোপযোগী ধারণা হিসেবে সামনে এসেছে। এর মূল দর্শন হলো—একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন শুধু শ্রেণিকক্ষের পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নেতৃত্ব, গবেষণা, সৃজনশীলতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা, সফট স্কিল, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশও মূল্যায়নের অংশ হবে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রই হবে আই-সিজিপিএ।
বিশ্ব যেদিকে এগোচ্ছে : বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ইতোমধ্যেই সমন্বিত মূল্যায়নের ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। মালয়েশিয়া উচ্চশিক্ষায় I-CGPA 2.0 বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ধাপে ধাপে এটি কার্যকর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একইভাবে বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে Graduate Attributes Framework, Student Portfolio, Co-Curricular Transcript, Competency-Based Assessment এবং Holistic Evaluation ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষের বাইরের অর্জনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কারণ আধুনিক বিশ্ব এখন শুধু পরীক্ষার ফল নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজার কী বলছে? বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে নিয়োগদাতারা এখন শুধু ভালো সিজিপিএ খোঁজেন না। তারা খোঁজেন এমন মানুষ, যিনি সমস্যা সমাধান করতে পারেন, দল পরিচালনা করতে পারেন, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন, নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারেন এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। Critical Thinking, Communication, Leadership, Teamwork, Creativity, Emotional Intelligence এসব দক্ষতা আজ বৈশ্বিক চাকরির বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ব্যবস্থাও যদি এসব গুণকে স্বীকৃতি দেয়, তবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা ও পরিবর্তনের প্রয়োজন : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর যোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে সিজিপিএকেই বিবেচনা করা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চার-পাঁচটি বছর অনেকের কাছে জ্ঞানচর্চার চেয়ে গ্রেড অর্জনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। বিতর্ক, গবেষণা, উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা কিংবা সামাজিক নেতৃত্ব এসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণের আগ্রহ অনেক সময় কমে যায়, কারণ এগুলোর প্রতিফলন চূড়ান্ত ফলাফলে থাকে না। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য কেবল উচ্চ সিজিপিএধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়; বরং এমন নাগরিক গড়ে তোলা, যারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে জ্ঞানকে কাজে লাগাতে সক্ষম। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকেও ধীরে ধীরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন থেকে দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক মূল্যায়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
৩৬০ ডিগ্রি মূল্যায়ন: এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি :
আই-সিজিপিএ বাস্তবায়নের অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে ৩৬০ ডিগ্রি ফিডব্যাক। এই পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন শুধু একজন শিক্ষকের মাধ্যমে নয়; বরং শিক্ষক, একাডেমিক উপদেষ্টা, সহপাঠী, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সমন্বয়কারী এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব আত্মমূল্যায়নের সমন্বয়ে সম্পন্ন হতে পারে। এতে মূল্যায়ন হবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। তবে এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং শিক্ষার্থীর শক্তি ও দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করে তাকে আরও দক্ষ ও পরিণত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
বাস্তবায়নের পথে যেসব চ্যালেঞ্জ : যে কোনো নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থার মতো আই-সিজিপিএও নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্যের গোপনীয়তা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সুস্পষ্ট মূল্যায়ন সূচক ছাড়া এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পক্ষপাতিত্ব বা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব মূল্যায়নের নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই শুরুতেই এটি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক না করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা, অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিকতার মূল্যায়ন কি সম্ভব? অনেকে মনে করেন দেশপ্রেম, সততা বা নৈতিকতার মতো গুণাবলি পরিমাপ করা যায় না। বাস্তবে এগুলোর অন্তর্নিহিত অনুভূতি মাপা না গেলেও এর বহিঃপ্রকাশ অবশ্যই মূল্যায়ন করা সম্ভব। একজন শিক্ষার্থী জাতীয় দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন কি না, পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছেন কি না, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হচ্ছেন কি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষা করছেন কি না কিংবা সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করছেন কি না এসবই তার মূল্যবোধের বাস্তব প্রকাশ। তাই ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য আচরণকে মূল্যায়নের ভিত্তি করা যেতে পারে।
সফট স্কিল, গবেষণা ও নেতৃত্বের নতুন মূল্য :
আজকের পৃথিবীতে একটি সনদ চাকরির দরজা খুলতে পারে, কিন্তু সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। নেতৃত্বের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা, যোগাযোগের নৈপুণ্য, সময় ব্যবস্থাপনা, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাই একজন মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব, গবেষণা সংগঠন, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক চর্চা, রোবোটিক্স, বিতর্ক কিংবা কমিউনিটি সার্ভিস এসবই সফট স্কিল বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আই-সিজিপিএতে এসব অর্জনের স্বীকৃতি থাকলে শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফলের জন্য নয়, বরং নিজেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও আগ্রহী হবে।
চাকরি, উচ্চশিক্ষা ও বাস্তব জীবনের চাহিদা :
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট ন্যূনতম সিজিপিএ থাকলেই আবেদন করা যায়; পরবর্তী সাফল্য নির্ভর করে লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং দক্ষতার ওপর। অন্যদিকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার ক্ষেত্রে ভালো সিজিপিএ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটিই একমাত্র শর্ত নয়। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা প্রকাশনা, নেতৃত্ব, সামাজিক সম্পৃক্ততা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ বিশ্ব ইতোমধ্যেই বুঝে গেছে—একজন মানুষের সামগ্রিক যোগ্যতা কখনোই একটি সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পরিবর্তনের সূচনা হোক পরীক্ষামূলক উদ্যোগ দিয়ে : বাংলাদেশে আই-সিজিপিএ চালুর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে পরিকল্পিত ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। প্রথমে কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালু করে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা উচিত। প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল পোর্টফোলিও, স্বচ্ছ মূল্যায়ন রুব্রিক, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে আই-সিজিপিএকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মূল্যায়ন কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
পরিবর্তন শুরু হোক একাডেমিক সংস্কৃতি থেকে :
কোনো নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির সফলতা শুধু নীতিমালা প্রণয়নের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে একাডেমিক সংস্কৃতির ওপর। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা নেই, গবেষণাকে উৎসাহ দেওয়া হয় না, মতের ভিন্নতাকে সম্মান করা হয় না এবং শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ রাখা হয়—সেখানে আই-সিজিপিএর মতো আধুনিক মূল্যায়ন কাঠামোও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না। তাই পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তাচর্চা, গবেষণা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কৌতূহল জাগায়, মুক্ত চিন্তার পথ খুলে দেয় এবং একজন শিক্ষার্থীকে আজীবন শেখার অনুপ্রেরণা দেয়।
অংশীজনের আস্থা অর্জনই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি : যেকোনো শিক্ষা সংস্কারের আগে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, অভিভাবক, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও ঐকমত্য তৈরি করা অপরিহার্য। আই-সিজিপিএ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বিষয় নয়; বরং এটি হতে হবে আলোচনাভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য একটি উদ্যোগ। কর্মশালা, সেমিনার, পাইলট প্রকল্প, মতবিনিময় সভা এবং গবেষণার মাধ্যমে এর সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতে হবে। মানুষ যখন পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা বুঝতে পারে, তখন পরিবর্তনের প্রতিরোধও অনেকটাই কমে যায়।
প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই হবে ভিত্তি :
সমন্বিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা সফল করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি ডিজিটাল পোর্টফোলিও তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তার একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি গবেষণা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, নেতৃত্ব, সামাজিক সেবা, উদ্ভাবনী কাজ ও অন্যান্য অর্জনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। মূল্যায়নের জন্য সুস্পষ্ট রুব্রিক, স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের পক্ষপাত, বৈষম্য বা ব্যক্তিগত প্রভাব যাতে মূল্যায়নে স্থান না পায়, সেদিকেও কঠোর নজর দিতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবস্থা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সমাজ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান, চরিত্র ও নেতৃত্ব গড়ার কেন্দ্র : একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল কতজন শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণি পেলেন, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে কতজন সৎ প্রশাসক, দক্ষ বিজ্ঞানী, মানবিক চিকিৎসক, দায়িত্বশীল প্রকৌশলী, নীতিবান বিচারক, উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা এবং সমাজসচেতন নাগরিক তৈরি হলো, তার ওপর। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবে, যেখানে বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকতা, সহমর্মিতা, সততা, পরিবেশ সচেতনতা, দেশপ্রেম, গবেষণামনস্কতা ও নেতৃত্বের চর্চা সমানভাবে বিকশিত হবে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে যেমন, তেমনি শ্রেণিকক্ষের বাইরের জীবনচর্চার মধ্য দিয়েও।
আই-সিজিপিএ: একটি ধারণা নয়, ভবিষ্যতের রূপরেখা : আই-সিজিপিএকে শুধু একটি নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি উচ্চশিক্ষার দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব। এর উদ্দেশ্য সিজিপিএকে বাতিল করা নয়, বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ, মানবিক ও বাস্তবমুখী করে তোলা। একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি চরিত্র, দক্ষতা, মূল্যবোধ, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমান গুরুত্ব দিলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরিপ্রার্থী হবেন না; তিনি হবেন সমাজ পরিবর্তনের একজন সচেতন অংশীদার। এ কারণেই আই-সিজিপিএ নিয়ে এখনই জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা, নীতিগত আলোচনা এবং সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু করা সময়ের দাবি।
পরিশেষে, আগামী পৃথিবী শুধু উচ্চ নম্বরধারী স্নাতক খুঁজবে না; খুঁজবে এমন মানুষ, যিনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, চরিত্রে দৃঢ়, চিন্তায় সৃজনশীল, আচরণে মানবিক, নেতৃত্বে সাহসী এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল। একটি ডিগ্রি কর্মজীবনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে তার মূল্যবোধ, সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। তাই উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন হওয়া উচিত। সিজিপিএর গুরুত্ব অটুট রেখেই যদি আই-সিজিপিএর মতো সমন্বিত মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট নয়, বরং আলোকিত মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব গড়ে তোলার জাতীয় অঙ্গীকার পূরণে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় হবে না কেবল একটি সংখ্যা; তার পরিচয় হবে তার সামগ্রিক যোগ্যতা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি অবদানের মধ্য দিয়ে।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

ডেস্ক রিপোর্ট 






















