পটুয়াখালী প্রতিনিধি: সকালের আলো ফুটতেই বই-খাতা নিয়ে ঘর থেকে বের হয় শিশুরা। গন্তব্য স্কুল। কিন্তু অন্য শিশুদের মতো তাদের স্কুলযাত্রা সড়ক ধরে নয়। প্রথমে খেয়ায় নদী পার হতে হয়। এরপর হাঁটতে হয় কিছুটা পথ। তারপর একে একে সাঁতরে পার হতে হয় পাঁচটি খাল।
বৃষ্টি থাকলে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। শরীরের সঙ্গে ভিজে যায় বই-খাতা। স্কুলে পৌঁছানোর পরও ভেজা কাপড়েই থাকতে হয় দিনের বড় একটা সময়। কখনো শরীর খারাপ হলে স্কুলে যাওয়া হয় না। এভাবেই চলছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শিক্ষাজীবন।
শীত, বর্ষা কিংবা বসন্ত, ঋতু বদলায়, কিন্তু বদলায় না তাদের স্কুলে যাওয়ার পথ। বছরের প্রায় সব সময়ই খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাদের। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নেই কোনো নৌযান, নেই রাস্তা কিংবা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা। ফলে ধীরে ধীরে স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে অনেক শিশু।
চরকারফারমা গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশ। আগুনমুখা মোহনায় বিভক্ত এই দ্বীপের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের একেবারে কাছাকাছি।
দ্বীপের দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন, তার পরেই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে আগুনমুখার মোহনা। চারপাশে নদী আর সাগরঘেরা এই জনপদ দূর থেকে দেখতে যতটা সুন্দর,সেখানে বসবাসকারীদের জীবন ততটাই কঠিন।
দ্বীপে নেই কোনো বেড়িবাঁধ। স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতেই বছরের বিভিন্ন সময় ডুবে যায় রাস্তাঘাট। পানিতে তলিয়ে যায় বিদ্যালয়ের মাঠও। বর্ষায় সেই দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়।
চরকারফারমায় বসবাস করে প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার। এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ৫১ জন। এর মধ্যে ২৬ জন ছাত্র ও ২৫ জন ছাত্রী। তাঁদের পড়ানোর জন্য আছেন তিনজন শিক্ষক। কিন্তু বিদ্যালয় আছে, শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থীও আছে, নেই শুধু নিরাপদে স্কুলে যাওয়ার পথ।
চরকারফারমায় যেতে হলে গলাচিপা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে সদর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া স্লুইসগেটে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছাতে হয় আগুনমুখার তীরে একটি খেয়াঘাটে।
কারফারমা দ্বীপে যাওয়ার প্রধান যোগাযোগমাধ্যম এই একটি খেয়া। শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাইকে এই খেয়া ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় খেয়ায় উঠতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
উত্তাল আগুনমুখা পার হয়ে কারফারমা ঘাটে নামার পরও শেষ হয় না পথ। বিদ্যালয়ে যেতে হলে পেরোতে হয় অন্তত ছোট-বড় পাঁচটি খাল।
কোনো খালের ওপর সেতু নেই। নেই বাঁশের সাঁকোও। তাই শিশুদের অনেকের ভরসা নিজের সাঁতার।
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র মো. জহিরুল ইসলামের বাড়ি চরকারফারমার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে বন এলাকার পাশে।
স্কুলে যাওয়ার পথ সম্পর্কে জহিরুল বলে, ‘আমাগো বাড়ি দিয়া স্কুলে আইতে পাঁচটা খাল সাঁতরাইয়া আসতে হয়। প্রত্যেকদিনই আমার সঙ্গে ৭-৮ জন খালে সাঁতার কেটে স্কুলে আই। বেশি বৃষ্টি থাকলে বই-খাতা ভিইজ্জা যায়।’
শিশুটির কথায় বোঝা যায়, এই বিপজ্জনক পথ তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে খাল সাঁতরে স্কুলে যাওয়া।
প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিনের অভিজ্ঞতাও একই। বৃষ্টি আর খালের পানিতে ভিজতে ভিজতেই তার স্কুলে যেতে হয়।
ইয়াসিন বলে, ‘বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর সারাদিনই ভিইজ্যা থাকে। এতে শরীর খারাপ করে। বেশি খারাপ লাগলে কয়েকদিন বাড়িতেই থাকি।’
পরিবারের একটি নৌকা আছে তাদের। কিন্তু সেই নৌকা দিয়ে পরিবারের সদস্যরা নদীতে মাছ ধরতে যান। ফলে স্কুলে যাওয়ার সময় নৌকাটি ব্যবহার করার সুযোগ হয় না তার।
শিক্ষার্থীদের এই যাতায়াত শুধু সময়সাপেক্ষ নয়, স্বাস্থ্য ও পড়াশোনার জন্যও বড় বাধা।বর্ষার দিনে খাল ও বৃষ্টির পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বই-খাতা রক্ষা করাই তখন কঠিন হয়ে পড়ে। শরীর ভিজে গেলে সেই অবস্থায় ক্লাস করতে হয়।
অসুস্থ হয়ে পড়লে কয়েক দিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকে। এভাবে নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাস্তা না থাকায় শুধু শিশুরাই নয়, পুরো দ্বীপের মানুষই যোগাযোগের সমস্যায় ভুগছেন। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। কারণ প্রতিদিন তাদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
চরকারফারমার শিশুরা স্কুলে যেতে চায়। তাদের হাতে বই আছে, স্কুল আছে, শিক্ষকও আছেন। নেই শুধু স্কুলে পৌঁছানোর নিরাপদ পথ। যে বয়সে দেশের অন্য শিশুরা স্কুলে যায় রাস্তা ধরে, বাসে কিংবা রিকশায়, সেই বয়সে চরকারফারমার শিশুরা সাঁতার কেটে বিদ্যালয়ে যায়। তাদের স্কুলের পোশাক ভিজে যায়, বই-খাতা ভিজে যায়। কখনো শরীর খারাপ হয়, কখনো স্কুলে যাওয়া হয় না।
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, দ্বীপের ৮০টি পরিবারের শিশুদের জন্য স্কুলটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এ চরে ৮০টি পরিবার বসবাস করে। আমি জায়গা দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু রাস্তা করার মতো আমার সামর্থ্য নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।’
সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই,এ কথাটি সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। সামনে বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। রাস্তা না থাকার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও কমে গেছে।
তিনি বলেন, ‘স্কুলের রাস্তা না থাকার বিষয়টি ইউএনও মহোদয়কে অবহিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করা হবে।’
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। শিশুদের এভাবে খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
তিনি বলেন, “বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিদ্যালয়ের যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ইউএনও আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটিও দেখা হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হবে।”
চরকারফারমার মানুষের চাওয়া খুব বড় কিছু নয়, শিশুরা যেন খাল সাঁতরে নয়, নিরাপদ পথে স্কুলে যেতে পারে। একটি রাস্তা , কয়েকটি সেতু কিংবা অন্তত নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা তাদের জন্য বদলে দিতে পারে পুরো শিক্ষাজীবন।
কারণ একটি দুর্গম দ্বীপের শিশুদের কাছে স্কুলে যাওয়ার পথ শুধু একটি পথ নয়, সেটিই তাদের ভবিষ্যতের পথে যাওয়ার প্রথম সেতু।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















