চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: ডেঙ্গুর আতঙ্কেই চুয়াডাঙ্গায় আবারও বাড়তে শুরু করেছে হাম। হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমের টিকা প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর না হওয়ায় শিশুদের মধ্যে নতুন করে হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই প্রথমে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। এতে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। ২২ শয্যার ওয়ার্ডটিতে বর্তমানে বিভিন্ন সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি রয়েছে ১৩০ শিশু। হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২০ শিশু। প্রতিদিন গড়ে আরও চার থেকে পাঁচজন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপের পাশাপাশি জনবল সংকটে চিকিৎসক ও নার্সদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ময়লা আবর্জনা ও মশার উপদ্রব নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন রোগীর স্বজনরা। তাদের আশঙ্কা, হামের চিকিৎসা নিতে এসে শিশুরা আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৭১২ শিশু হাম নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আটজন রোগী ভর্তি রয়েছে। শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা শতাধিক হওয়ায় অনেক শিশুকে মেঝে ও বারান্দায় রেখেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। সরেজমিনে সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত বেডগুলোতে জায়গা না থাকায় মেঝে ও বারান্দাতেও শিশুদের রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোনো শিশু হামে আক্রান্ত, কেউ নিউমোনিয়ায়, আবার কেউ ঠাণ্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন হাসপাতালে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডের চারপাশের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ময়লা-আবর্জনা নিয়ে রোগীর স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। তাদের আশঙ্কা, বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়ের মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকলে রোগের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। এর সঙ্গে মশার উপদ্রব থাকায় হামের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই প্রথমে ঠাণ্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা দেয়।
হাম আক্রান্ত ছয় বছর বয়সী ইন্তিয়া খাতুনের মা রাবেয়া আক্তার বলেন, হামের শুরুতেই টিকা দিয়েছিলাম মেয়েকে। তারপর কয়েকমাস পর হামের উপসর্গ দেখা যাওয়ার পর সদর হাসপাতালে নিয়ে আসছি। এখন চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা ভালো পেলেও বেড না থাকায় মেঝেতে অবস্থান করতে হয়েছে। এতে জীবাণু তৈরি হচ্ছে।
আরেক হাম আক্রান্ত শিশুর মা পলি খাতুন বলেন, প্রথমে আমার বাচ্চা মেয়ের ঠাণ্ডা জ্বর আসে। এরপর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তারপর আবার দেখি হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এখন সারা শরীরে হামের লালচে ফুসকুড়ি বের হয়েছে। তারপর থেকেই তিন দিন ধরে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এখনো সুস্থ না।
রোগীর স্বজন কামাল হোসেন বলেন, আমার নাতি ছেলের ঠাণ্ডা কাশির পর নিউমোনিয়া। তারপর শুরু হলো হাম। নিয়মিতভাবে হাসপাতালে ডাক্তার দেখছে এবং চিকিৎসা দিচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালের পরিবেশ খুবই নোংরা। চারপাশে ময়লা-আবর্জনা ভর্তি। এর মধ্যে আবার বেড নেই। মেঝে-বারান্দায় বসে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
আরেক রোগীর স্বজন জাহানারা খাতুন বলেন, শিশু ওয়ার্ডের চারপাশে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। এতে মশার উপদ্রব বাড়ছে। ফলে এই হামের মধ্যে ডেঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ এপ্রিল জেলায় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয় এবং তা ১০ মে পর্যন্ত চলে। জেলার চারটি উপজেলা ও চারটি পৌর এলাকার আটটি স্থায়ী কেন্দ্রসহ মোট ৯৮০টি কেন্দ্রে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম নেওয়া হয়। ওই ক্যাম্পেইনে জেলায় ১ লাখ ৩০৫ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে অতিরিক্ত রোগীর চাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের চাপ। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স বেবি আক্তার বলেন, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগী বেশি। মাত্র দুইটা নার্স দিয়ে ঠেকানো অসম্ভব অবস্থা। এর মধ্যেও রোগীসেবা অব্যাহত রেখেছি। এই কম লোকবল দিয়ে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি।
তবে টিকা নেওয়ার পরও শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। ছয় বছর বয়সী ইন্তিয়া খাতুনও হাম-রুবেলার টিকা নিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, টিকা দেওয়ার পর হামের প্রকোপ কম ছিল। গতবার হামের টিকা দেওয়ায় সেই টিকা খুব একটা কার্যকর হয়নি। যার কারণে ছোট ও বড়দের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। মাঝে কম ছিল, আবার বাড়তে শুরু করেছে হাম। তবে আতঙ্ক হওয়ার কিছু নেই। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে হাম থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 

























