পরিকল্পিত নগরায়নের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জে পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের যে খসড়া অধ্যাদেশ সরকার প্রস্তুত করেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন জেলার ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের অভিযোগ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ অবহেলিত থেকে যাচ্ছে এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরটি ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও শিল্পসমৃদ্ধ জেলা হওয়া সত্ত্বেও নারায়ণগঞ্জ আজও একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরেই রাজউকের তদারকিতে থাকা এই জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় স্থানীয় সমস্যা ও প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে- এমন অভিযোগ ব্যবসায়ী মহলের।

এ বাস্তবতা অনুধাবন করে গত এক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও প্রশাসনিক বৈঠকে নারায়ণগঞ্জে আলাদা একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দিপুর নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি তোলে। একই দাবি জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও একাধিক বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
সবশেষ গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর প্রায় এক হাজার ব্যবসায়ীর উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক সাধারণ সভায়ও পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পক্ষে সর্বসম্মত মত প্রকাশ করা হয়। সভায় উপস্থিত ব্যবসায়ীরা এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও জরুরি বলে অভিহিত করেন।
এ দাবির প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আয়তন প্রায় ৭২ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার এবং এখানে বসবাস করছে প্রায় ২০ লাখ মানুষ। যেখানে নগরায়নের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে সারা দেশে এ হার প্রায় ৩ শতাংশ এবং ঢাকায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ভবিষ্যতে নগরের আয়তন ও জনসংখ্যা আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি নাসিকের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘নারায়ণগঞ্জ নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৮ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের একটি খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তুত করে। বর্তমানে এ খসড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, রাজউকের অধীনে থেকে নারায়ণগঞ্জের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নবঞ্চিত। শহরের শৃঙ্খলা ফেরাতে ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নারায়ণগঞ্জকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। ‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি বোর্ড গঠন করে এখান থেকেই নগরের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। আমরা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাই না। সরকার ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে- এতে আমরা আশাবাদী এবং দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।
গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, নারায়ণগঞ্জ বর্তমানে একটি চরম অপরিকল্পিত নগরে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ন ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ঝুঁকিমুক্ত অবকাঠামো ও নগর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে আশপাশের জেলার সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে নগরবাসী ও ব্যবসা-বাণিজ্য দুটোই উপকৃত হবে।

নারায়ণগঞ্জ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি গোলাম সারোয়ার সাঈদ বলেন, যে কোনো নগর উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন, যার প্রধান দায়িত্ব হবে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন। আমরা আগেও একাধিকবার এ দাবি জানিয়েছি। খসড়া অধ্যাদেশ চূড়ান্ত হওয়ায় আমরা এটিকে স্বাগত জানাই। তবে কর্তৃপক্ষ গঠনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে তাদের কার্যপরিধি ও পরিকল্পনার মেয়াদ। পাঁচ বছরের নয়, অন্তত ৫০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলেই নারায়ণগঞ্জবাসী ও ব্যবসায়ীরা এর প্রকৃত সুফল পাবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের আশা, খসড়া অধ্যাদেশ দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ একটি পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে আরও গতিশীল নগরীতে রূপ নেবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















