বছরের চলতি মে মাসে আজ পর্যন্ত পরিচালিত সাইবার নজরদারিতে জুয়ার সাথে জড়িত ১১৬টি ওয়েবসাইট শনাক্ত করে ডাউন করার জন্য বিটিআরসিতে তালিকা পাঠিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
শুধু তাই নয়, অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ৮৭৯টি হিসাবের বিবরণী বাংলাদেশের ব্যাংকের পাচার রোধে গঠিত কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ-তে (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৩টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য বিবরণী বিএফআইইউতে প্রেরণ করা হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, এমএফএস (MFS) বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস হলো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের একটি ডিজিটাল সেবা। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা ব্যাংকে না গিয়ে সরাসরি মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, কেনাকাটার মূল্য প্রদান এবং সঞ্চয় বা ঋণের মতো সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
সিআইডি বলছে, কয়েকটি লেয়ারে জুয়ার কার্যক্রম ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও অর্থপাচারের ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়ার প্রতি প্রলোভিত করে শুধু একটি চক্রেই গত ৬ মাস ধরে প্রতিদিন আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করতো। গড়ে দেড় কোটি করে লেনদেন হলে ৫ মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনলাইন জুয়ার সাইট নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে সংগ্রহ করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গ্রেপ্তাররা হলেন— আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ (৩২), সজীব চক্রবর্তী (২৯), আশরাফুল ইসলাম (৪০), জসীম উদ্দীন (৩৬), তৈয়ব খান (২৬), সৌমিক সাহা (২৮), মো. কামরুজ্জামান (৩৬) ও আব্দুর রহমান (৪৭)।
রোববার (১৭ মে) বিকেলে মালিবাগ সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সাইবার মনিটরিং সেল নিয়মিত অনলাইন নজরদারির সময় দেখতে পায় যে, কিছু চক্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনলাইন জুয়ার সাইট বাংলাদেশে অবৈধভাবে পরিচালনা করছে। এসব সাইটে জুয়াড়িরা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ), ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করে টাকা লেনদেন করছিল। এব্যাপারে ডিএমপির পল্টন মডেল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
তিনি বলেন, তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গত ৬ মে সিআইডির একটি দল ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ, সজীব চক্রবর্তী, আশরাফুল ইসলাম ও জসীম উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের দেওয়া তথ্য এবং সাইবার পুলিশ সেন্টারের ২৪/৭ অনলাইন সার্ভিলেন্সের বিশ্লেষণে গত ১৬ মে নরসিংদী জেলার বাকি চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধারাবাহিক দুটি অভিযানে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ডিভাইস ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করে।
সিআইডি প্রধান বলেন, গ্রেপ্তাররা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে আসছিল। এসব সাইটে জুয়াড়িরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা- বিকাশ, রকেট ও নগদ, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করতো। পরবর্তীতে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছে, সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়ার প্রতি প্রলোভিত করে তারা গত প্রায় ৬ মাস ধরে প্রতিদিন আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করতো এবং এর একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করে আসছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেন, গ্রেপ্তাররা অনলাইন গ্যাম্বলিং ও ডিজিটাল হুন্ডি কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। পাশাপাশি চক্রের একাধিক সদস্য স্বীকার করেছে যে, বিগত ৬ মাসেরও অধিক সময় ধরে সংঘবদ্ধ এই চক্রটি অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রলোভিত করে প্রতিদিন আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে সংগ্রহ করতো। পরবর্তীতে ওই অর্থের একটি বড় অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করতো।
অনলাইন জুয়া সংক্রান্তে সিআইডির সাইবার পেট্রোলিং কার্যক্রম সম্পর্কে মোসলেহ উদ্দিন বলেন, সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নিয়মিত সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। চলতি (মে/২০২৬) মাসের ১ তারিখ হতে আজ পর্যন্ত পরিচালিত সাইবার পেট্রোলিংয়ে সিআইডি কর্তৃক জুয়ার সাথে জড়িত ১১৬টি ওয়েবসাইট শনাক্ত করে ডাউন করার জন্য বিটিআরসিতে পাঠানো হয়েছে। অবৈধ লেনদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট ৮৭৯টি এমএফএস হিসাব ও অবৈধ লেনদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট ৪৩টি ব্যাংক হিসাব বিএফআইইউতে প্রেরণ করে ব্যবস্থা ও তদন্ত করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে সিআইডি প্রধান বলেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সিআইডি বিএফআইইউ ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো ওয়ালেট শনাক্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর আগে সিআইডি ‘এমটিএফই’ (MTFE) পনজি স্কিমে পাচার হওয়া প্রায় ৪৪ কোটি টাকা দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

অনেক বাংলাদেশি বিদেশে থেকে অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো পরিচালনা করেন। এরকম কোনো বাংলাদেশিকে আপনারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন কিনা? তিনজন রাশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেন, আমরা কাজ করছি। একটি বিশেষ অভিযান চলছে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে। আমরা সুনির্দিষ্ট করে এখনই বলছি না। আমরা এই ধরনের তথ্য পেলে তাদের অবশ্যই আইন আওতায় নিয়ে আসা হবে।
যদি প্রতিদিন ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা তারা লেনদেন করে থাকে তাহলে ছয় মাসে কত টাকা পাচার করেছে? বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিং সেক্টরের কোনো প্রতিনিধি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত কিনা? জানতে চাইলে বিশেষ পুলিশ সুপার আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেন, কয়েকটি লেয়ারে পুরো অনলাইন জুয়ার প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয়। কিছু কিছু লোক জড়িত যারা শুধু তথ্য কালেক্ট করে, তারপরে একটা লেয়ার থাকে যারা লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়, এজেন্ট সিমগুলো কালেক্ট করে। আরেকটা লেয়ারে থাকে যে তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিস্ট্রিবিউট করে। আরেকটা লেয়ার থাকে যারা বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপসের যে চ্যানেলগুলো বিশেষ করে টেলিগ্রামটা খুব জনপ্রিয়। টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে ডিরেকশন নেয়।
তিনি বলেন, আমরা তথ্য প্রমাণ পাচ্ছি যে দেশি এবং আন্তর্জাতিক অনেক সাসপেক্ট আমাদের রয়েছে। এখনই আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না যে এক্সাক্টলি কত টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তদন্ত চলছে।
কোনো এমএফএস সরাসরি জড়িত কিনা সেটা জানার চেষ্টা করছি। কিশোরগঞ্জের একটি ডিস্ট্রিবিউশন হাউজের ওখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত ছিলেন তাদের আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসছি।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, যেসব এমএফএস প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর সরাসরি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত হওয়ার প্রমাণ পাইনি।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ না। অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি তাহলে ব্যবহার হচ্ছে কীভাবে? এক্সেস কীভাবে পাচ্ছে? আর বিকাশ রকেট কিংবা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং থেকে অনলাইন জুয়ার পেমেন্ট করা যায়। কীভাবে পেমেন্ট করা সম্ভব হচ্ছে? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপনারা ধরবেন কিনা?
বিশেষ পুলিশ সুপার আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির ট্রানজেকশন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সার্কুলারে। তারপরও যেহেতু অনেক দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। সে কারণে এই ক্রিপ্টোকারেন্সির সাইটগুলো কিন্তু অনএয়ার আছে। এই মামলার তদন্তে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশ থেকে বাইনান্সের দুইটি প্লাটফর্ম ইউজ হয়েছে। এবং ট্রন এদের মাধ্যমে ইউএসডিটি এবং বিট কয়েনে ট্রান্সফার হয়েছে। আমরা এই লাইনে কাজ করছি।
তবে ঠিক এই মুহূর্তে পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের নজরে আসলে আমরা এটাকে অ্যাড্রেস করি। আর একইভাবে যারা প্রতারিত হন বা যারা ভিক্টিম হন তারা অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিবেন। এটা আমরা চাই যে আমাদের কাছে এটা কমপ্লেইন আসুক।
টাকা পাচার হওয়ার পরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু টাকা পাচার হওয়ার আগে মানে প্রিঅ্যাক্টিভিটি নেই। এই উদ্যোগ আপনারা নিবেন কিনা? পর্ন সাইটের মতো জুয়ার সাইটও এক্স থেকে ওয়াই হয়ে আবারও ফিরে আসবে কিনা? জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে এবং অনলাইন সাইটের বিরুদ্ধে আমাদের যে ফাইট এটা অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, ২৩টি ওয়েবসাইটের সবাইকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি এবং বন্ধ করে দিচ্ছি। পাশাপাশি আমাদের যে এমএফএস মোবাইল নম্বর গুলো বন্ধ করার জন্য বিএফআইইউ-তে পাঠিয়েছি। তারাও তদন্ত করবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করবো।
তিনি বলেন, ওয়েবসাইটগুলো বাংলাদেশে ব্যবহার হলেও এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওয়েবসাইটগুলো মেইনটেইন ও তৈরি করা হয় বাইরে থেকে। এগুলো আসলে এখন চাইলে এখনই বন্ধ করে ফেলাটা একটা কঠিন। এবং এখন চাইলে এখনই আসামি গ্রেপ্তারও কঠিন। আমরা লেগে থাকার প্রক্রিয়ায় আছি। আমরা প্রতিনিয়ত সাইবার পেট্রোলিং করছি। এটা আসলে এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেটা আসলে এখনই চাইলে এখনই সবগুলো ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া অথবা সব আসামি গ্রেপ্তার করা সম্ভব না। বাংলাদেশ সরকার এই অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। এটা আমরা অবশ্যই পালন করবো।
তিনি বলেন, জুয়ার একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যারা খেলছেন বা সাসপেক্ট তারা নিজেরাই তো অপরাধী। জুয়ায় পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা হলে তারা সেই টাকা আদৌ পাবেন কিনা আমি সন্দিহান। আমরা বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনা পেলে বলা যাবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সিআইডি অর্গানাইজ ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি আলী আকবর খান, সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন শাহিন।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















