ঢাকা ০৪:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা ঝাড়ফুঁক আর গ্রাম্য চিকিৎসকেই ভরসা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৩:০৪:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: উপজেলা হিসেবে ১৪ বছর আগে কার্য়কত্রম শুরু হলেও চিকিৎসার অভাব মিটছে না । বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র হাতেগোনা থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ। পদ থাকলেও চিকিৎসক নেই। সামান্য জ্বর ও ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হলে তাদের ঝাড়ফুঁক আর গ্রাম্য চিকিৎসকের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।

এমন চিত্র পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর। তিন দিকে নদী ও একদিকে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত এই উপজেলা। জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটি ইউনিয়ন আবার উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন। দুর্গম উপজেলার এই চরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সরকারি সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত উপজেলার প্রায় ২ লাখ বাসিন্দা।
নদী পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে চাওয়া তাদের কাছে যেন এক মহাযুদ্ধ। অসুস্থতা বা রোগ বালাইয়ে এক অনিশ্চিত জীবন তাদের। দীর্ঘ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কেউই তাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি। গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এতে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা।
রাঙ্গাবালী উপজেলা ঘোষনা হয় ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ১৪ বছর আগে উপজেলা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্য়াক্রম শুরু ।

উপজেলা হিসেবে ঘোষনার ২০২৩ সালের জুলাই মাসে রাঙ্গাবালীতে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নির্মঅণ কাজ শেষ হয়নি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বরাদ্ধ না থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারছেন না তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় পাশ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই রাঙ্গাবালী উপজেলার স্বাস্থ্য সেবা কার্য়াক্রম।
গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালী উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নের মধ্য একটি ইউনিয়ে রয়েছে একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও চারটি ইউনিয়নে রয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকের ৫ টি পদ থাকলেও সবকটি পদই শূন্য রয়েছে।
উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি রয়েছে উপজেলার চালিতাবুনিয় ইউনিয়নে। উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ ইউনিয়নের উপস্বাস্ধ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকসহ পাঁচটি পদ রয়েছে। একজন চিকিৎসক, একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিট , একজন পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা , একজন অফিস সহায়ক । এর মধ্যে শুধু সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা কর্মরত রয়েছেন।
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মেজবাহউদ্দিন জানান, রাঙ্গাবালী বিচ্ছিন্ন একটি উপজেলা। তাঁরা চিকিৎসা কর্মকর্তা পাঠিয়ে দ্বীপবাসীর কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে
চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটির ভবন ব্যবহারে অনুপযোগি হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে ভবনটি পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়। বর্তমানে কর্মরত দুই পাশেই অন্যের বাড়ির আঙ্গিনায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সেখানকার চিকিৎসক গলাচিপার স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ও চর বিশ্বাসে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলার চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার চারটি পদই শূন্য রয়েছে । উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার চারটি পদের মধ্যে একটি পদ শূন্য রয়েছে।

এই অবস্থায় উপজেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চর মোন্তাজের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি লোকবল না থাকায় বন্ধ পড়ে রয়েছে।
অপর তিনজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার জনগনকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু চিকিৎসক সংকটই নয় এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে জরুরী ওষুধেরও সরবরাহ নেই । বিশেষ করে জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতির ওষূধপত্র সরবরাহ নেই।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, এখানকার প্রধান নির্দিষ্ট সময়ে লঞ্চ অথবা ট্রলার। তবে বেশি অসুস্থ রোগীকে ট্রলার ও অনেক সময় জরুরী স্পিট বোর্ডে পাশ্ববর্তী গলাচিপা অথবা কলাপাড়া উপজেলাতে নিয়ে যেতে হয়।
গত রোববার সকাল ৯ টায় সরেজমিনে উপজেলার প্রথমে ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, লোকজন শূন্য । এরই মধ্যে সেখানে কর্মরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ফিরোজ মাহমুদ এসে উপস্থিত হন। নিজেই কক্ষের তালা খুলে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।
ফিরোজ আলম জানান, এই কেন্দ্রে শুধু তিনি রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এখানে সাধারণত গর্ভবতী মা ও শিশু, কিশোর-কিশোরী, সাধারণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে।
তিনি জানান, মেডিকেল অফিসার না থাকায় জটিল রোগীদের উপজেলা ও জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসদের দেখানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন তারা। চিকিৎসক নেই এই কেন্দ্রে। তারপরও তারা এই কেন্দ্রে থেকে তাদের সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। গত মে মাসে
এই কেন্দ্র থেকে ৩৫০ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেকরও বেশি মহিলা রোগী ছিল।

এসময় কথা হয় সেবা নিতে আসা ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের শাহানাজ বেগমের (৭০) সাথে। হাপানি রোগে ভূগছেন তিনি। এসময় শাহনাজ বেগম বলেন, ‘বড় ডাক্তার নাই। গরিব মানুষ পটুয়াখালী যাইয়া ডাক্তার দেহাইতে অনেক টাকা খরচ হইবে। এই জায়গায় একজন ডাক্তার থাকলে হেরে দেহাইতে পারতাম।’


চর মোন্তাজ এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন হাওলাদার (৫০) । ডায়বেটিকসহনানা জটিল রোগে আক্রান্ত। তার স্ত্রী ইছামতি বেগম (৪০) জানায়, মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ট্রলারে নদী পাড়ি দিয়ে গলাচিপা যেতে অন্তত চারঘন্টা সময় লাগে তাদের। অনেক সময় টাকাপয়সার অভাবে গলাচিপায় যেতে পারে না তারা।
একই ধরনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইউনিয়নের চর আন্ডা এলাকার জাকির হোসেন জানান, তার সাড়ে তিন বছরেরে মেয়ে জামিলা ঠান্ডা ও জ্বর হয়েছে। রাতে সারা শরীল পুড়ে যাচ্ছিল। ওই অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার মত উপায় নেই। নিরুপায় হয়ে সবটা আল্লাহর ওপর ছাইড়া দিছিলাম। এই চরে যারা বাস করে তারা আল্লাহর ওপরেই ছাইড়া দেয়।’

এলাকার বাসিন্দা মু , ফরিদউদ্দিন জানায়, এ অঞ্চলের মানুষ অধিকাংশই জেলে ও কৃষক। অসুস্থ হলে নদী পেরোনোর অনেক ব্যয়বহুল। অসুখ-বিসুখে সাধারণ মানুষ ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এই চরাঞ্চলের মানুষেরা। তাদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেটি বন্ধ। কেন্দ্রটি চিকিৎসকসহ লোকবল দিয়ে চালু করলে এই চরাঞ্চলের মানুষজন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলার পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, আসলেই রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসক ও লোকবলের সংকট রয়েছে। তাদের একটি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। জরুরী প্রয়োজনীয় ওষূধ সরবরাহ পর্াপ্ত নেই। তবে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসকদের আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসক সেখানে রাখা যাচ্ছে না। তারপরও দুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে আমরা দুইজন চিকিৎসককে সপ্তাহে দুইদিন যাতে সেখানে গিয়ে সেবা দিতে পারে সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স র্নিমান হলে চিকিৎসক সংকট থাকবে না।

রচনা ব্যানার্জি আইনি বিপাকে

চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা ঝাড়ফুঁক আর গ্রাম্য চিকিৎসকেই ভরসা

প্রকাশিত : ০৩:০৪:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: উপজেলা হিসেবে ১৪ বছর আগে কার্য়কত্রম শুরু হলেও চিকিৎসার অভাব মিটছে না । বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র হাতেগোনা থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ। পদ থাকলেও চিকিৎসক নেই। সামান্য জ্বর ও ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হলে তাদের ঝাড়ফুঁক আর গ্রাম্য চিকিৎসকের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।

এমন চিত্র পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর। তিন দিকে নদী ও একদিকে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত এই উপজেলা। জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটি ইউনিয়ন আবার উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন। দুর্গম উপজেলার এই চরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সরকারি সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত উপজেলার প্রায় ২ লাখ বাসিন্দা।
নদী পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে চাওয়া তাদের কাছে যেন এক মহাযুদ্ধ। অসুস্থতা বা রোগ বালাইয়ে এক অনিশ্চিত জীবন তাদের। দীর্ঘ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কেউই তাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি। গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এতে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা।
রাঙ্গাবালী উপজেলা ঘোষনা হয় ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ১৪ বছর আগে উপজেলা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্য়াক্রম শুরু ।

উপজেলা হিসেবে ঘোষনার ২০২৩ সালের জুলাই মাসে রাঙ্গাবালীতে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নির্মঅণ কাজ শেষ হয়নি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বরাদ্ধ না থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারছেন না তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় পাশ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই রাঙ্গাবালী উপজেলার স্বাস্থ্য সেবা কার্য়াক্রম।
গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালী উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নের মধ্য একটি ইউনিয়ে রয়েছে একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও চারটি ইউনিয়নে রয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকের ৫ টি পদ থাকলেও সবকটি পদই শূন্য রয়েছে।
উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি রয়েছে উপজেলার চালিতাবুনিয় ইউনিয়নে। উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ ইউনিয়নের উপস্বাস্ধ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকসহ পাঁচটি পদ রয়েছে। একজন চিকিৎসক, একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিট , একজন পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা , একজন অফিস সহায়ক । এর মধ্যে শুধু সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা কর্মরত রয়েছেন।
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মেজবাহউদ্দিন জানান, রাঙ্গাবালী বিচ্ছিন্ন একটি উপজেলা। তাঁরা চিকিৎসা কর্মকর্তা পাঠিয়ে দ্বীপবাসীর কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে
চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটির ভবন ব্যবহারে অনুপযোগি হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে ভবনটি পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়। বর্তমানে কর্মরত দুই পাশেই অন্যের বাড়ির আঙ্গিনায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সেখানকার চিকিৎসক গলাচিপার স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ও চর বিশ্বাসে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলার চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার চারটি পদই শূন্য রয়েছে । উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার চারটি পদের মধ্যে একটি পদ শূন্য রয়েছে।

এই অবস্থায় উপজেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চর মোন্তাজের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি লোকবল না থাকায় বন্ধ পড়ে রয়েছে।
অপর তিনজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার জনগনকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু চিকিৎসক সংকটই নয় এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে জরুরী ওষুধেরও সরবরাহ নেই । বিশেষ করে জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতির ওষূধপত্র সরবরাহ নেই।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, এখানকার প্রধান নির্দিষ্ট সময়ে লঞ্চ অথবা ট্রলার। তবে বেশি অসুস্থ রোগীকে ট্রলার ও অনেক সময় জরুরী স্পিট বোর্ডে পাশ্ববর্তী গলাচিপা অথবা কলাপাড়া উপজেলাতে নিয়ে যেতে হয়।
গত রোববার সকাল ৯ টায় সরেজমিনে উপজেলার প্রথমে ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, লোকজন শূন্য । এরই মধ্যে সেখানে কর্মরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ফিরোজ মাহমুদ এসে উপস্থিত হন। নিজেই কক্ষের তালা খুলে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।
ফিরোজ আলম জানান, এই কেন্দ্রে শুধু তিনি রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এখানে সাধারণত গর্ভবতী মা ও শিশু, কিশোর-কিশোরী, সাধারণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে।
তিনি জানান, মেডিকেল অফিসার না থাকায় জটিল রোগীদের উপজেলা ও জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসদের দেখানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন তারা। চিকিৎসক নেই এই কেন্দ্রে। তারপরও তারা এই কেন্দ্রে থেকে তাদের সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। গত মে মাসে
এই কেন্দ্র থেকে ৩৫০ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেকরও বেশি মহিলা রোগী ছিল।

এসময় কথা হয় সেবা নিতে আসা ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের শাহানাজ বেগমের (৭০) সাথে। হাপানি রোগে ভূগছেন তিনি। এসময় শাহনাজ বেগম বলেন, ‘বড় ডাক্তার নাই। গরিব মানুষ পটুয়াখালী যাইয়া ডাক্তার দেহাইতে অনেক টাকা খরচ হইবে। এই জায়গায় একজন ডাক্তার থাকলে হেরে দেহাইতে পারতাম।’


চর মোন্তাজ এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন হাওলাদার (৫০) । ডায়বেটিকসহনানা জটিল রোগে আক্রান্ত। তার স্ত্রী ইছামতি বেগম (৪০) জানায়, মাঝে মধ্যেই তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ট্রলারে নদী পাড়ি দিয়ে গলাচিপা যেতে অন্তত চারঘন্টা সময় লাগে তাদের। অনেক সময় টাকাপয়সার অভাবে গলাচিপায় যেতে পারে না তারা।
একই ধরনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইউনিয়নের চর আন্ডা এলাকার জাকির হোসেন জানান, তার সাড়ে তিন বছরেরে মেয়ে জামিলা ঠান্ডা ও জ্বর হয়েছে। রাতে সারা শরীল পুড়ে যাচ্ছিল। ওই অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার মত উপায় নেই। নিরুপায় হয়ে সবটা আল্লাহর ওপর ছাইড়া দিছিলাম। এই চরে যারা বাস করে তারা আল্লাহর ওপরেই ছাইড়া দেয়।’

এলাকার বাসিন্দা মু , ফরিদউদ্দিন জানায়, এ অঞ্চলের মানুষ অধিকাংশই জেলে ও কৃষক। অসুস্থ হলে নদী পেরোনোর অনেক ব্যয়বহুল। অসুখ-বিসুখে সাধারণ মানুষ ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এই চরাঞ্চলের মানুষেরা। তাদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেটি বন্ধ। কেন্দ্রটি চিকিৎসকসহ লোকবল দিয়ে চালু করলে এই চরাঞ্চলের মানুষজন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলার পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, আসলেই রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসক ও লোকবলের সংকট রয়েছে। তাদের একটি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। জরুরী প্রয়োজনীয় ওষূধ সরবরাহ পর্াপ্ত নেই। তবে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসকদের আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসক সেখানে রাখা যাচ্ছে না। তারপরও দুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে আমরা দুইজন চিকিৎসককে সপ্তাহে দুইদিন যাতে সেখানে গিয়ে সেবা দিতে পারে সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স র্নিমান হলে চিকিৎসক সংকট থাকবে না।