পটুয়াখালী প্রতিনিধি: ‘কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া, আমার ভাইধন রে কইয়ে, নাইওর নিতে বইলা’ ভাটিয়ালি গানের এই চিরচেনা সুরে যেন ফিরে এল বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক আবেগঘন ঐতিহ্য। বিয়ের পর মেয়ের বাবার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সেই চিরায়ত ‘নাইওর’ প্রথাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে পটুয়াখালীতে আয়োজন করা হলো ব্যতিক্রমধর্মী নাইওর উৎসব।
শনিবার সকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘দখিনের কবিয়াল’ ও ‘শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে দিনব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৭৫টি পরিবারের প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষ অংশ নেন।
বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের আবহে পালকির আদলে ‘নাইওর’ আসা বধূদের বরণ করে নেওয়া হয়। নাচ, গান, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। অতিথিদের পরিবেশন করা হয় নানা ধরনের পিঠাপুলি, মৌসুমি ফল ও গ্রামীণ স্বাদের বাহারি খাবার, যা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
একসময় গ্রামবাংলায় নাইওর ছিল পারিবারিক সম্পর্ক ও ভালোবাসার এক অনন্য বন্ধন। ভাদ্র কাটানি, জোড়া মাস, প্রথম সন্তান জন্মের পর, শীতে পিঠাপুলি খাওয়া কিংবা জ্যৈষ্ঠে আম-কাঁঠাল উপভোগ, বিভিন্ন উপলক্ষে মেয়েরা বাবার বাড়িতে নাইওর যেতেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রথা এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
উৎসবের আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন,‘নাইওর শুধু একটি প্রথা নয়, এটি বাঙালির পারিবারিক সংস্কৃতি, আবেগ ও আত্মীয়তার প্রতীক। আগের মতো এখন আর নববধূরা নাইওর যান না, বাবার বাড়ি থেকেও সেভাবে নিতে আসা হয় না। তাই হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই আয়োজন। ৭৫টি নাইওর পরিবারকে একত্র করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নবদম্পতিরাও এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও এমন আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির শেকড়কে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করেছে।
স্নেহাংশু সরকার কুট্টির সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সুধীজন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গ্রামীণ বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ‘নাইওর’ প্রথাকে ঘিরে এই উৎসব যেন মনে করিয়ে দিল, ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিতে নয়, চর্চার মধ্যেই বেঁচে থাকে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















