ঢাকা ১২:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

বরিশালে ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, আকাশছোঁয়া দামে স্বাদ হারাচ্ছে মানুষ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:৫৬:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ১০(বুধবার)  জুন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বরিশালের নদ-নদী, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বাজারে দেখা দিয়েছে এক ভিন্ন চিত্র। যে সময়ে আড়তগুলোতে হাজার হাজার মণ ইলিশে ভরে থাকার কথা, সেই সময়ে মাছের সরবরাহ নেমে এসেছে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে। ফলে বাজারে ইলিশের দাম পৌঁছেছে আকাশছোঁয়া অবস্থানে। এতে জাতীয় মাছের স্বাদ ভুলতে বসেছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
এদিকে, বর্তমান সংকটের মধ্যেও আশার খবর শুনিয়েছেন মৎস্য গবেষক ও কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, চলতি বছর অভয়াশ্রম এলাকায় বেড়ে ওঠা প্রায় ৯০ শতাংশ জাটকা নিরাপদে সাগরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মৌসুমের শেষভাগে এবং আগামী বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, যেখানে এই সময়ে প্রতিদিন কয়েকশ থেকে হাজার মণ ইলিশ আসার কথা, সেখানে পুরো মোকামে এসেছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ ইলিশ। মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগেও মৌসুমের শুরুতে এই মোকামে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দুই হাজার মণ পর্যন্ত ইলিশ বেচাকেনা হতো। কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলত। কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
পোর্ট রোড ইলিশ মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় নদীতে ইলিশ একেবারেই কম। গত কয়েকদিন ধরে মোকামে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ মাছ আসছে। অথচ এই সময়ে কমপক্ষে ২০০ থেকে ৩০০ মণ ইলিশ পাওয়ার কথা।
মেসার্স দুলাল ফিশের ম্যানেজার মো. রবিন বলেন, দুই-তিন বছর আগেও ভরা মৌসুমে দিনশেষে দুই হাজার মণ পর্যন্ত ইলিশ বেচাকেনা হতো। এখন ৬০ মণের বেশি মাছ আসছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়ছে।
পোর্টরোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক-সমিতির সাবেক অর্থ সম্পাদক ইয়ার হোসেন শিকদার বলেন, আমাদের ১৭০টি আড়তে আগে প্রতিদিন এক হাজার থেকে বারোশ মণ পর্যন্ত ইলিশ আসত। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হতো। এখন প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে না।
বাজারে আগুন, নাগালের বাইরে জাতীয় মাছ :
সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের (এলসি) ইলিশের দাম ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকায় এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। সকালে পোর্ট রোড মোকাম থেকে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনেছেন ব্যবসায়ী মোতালেব মিয়া। ঈদে অতিথি আপ্যায়নের জন্য মাছটি কিনেছেন বলে জানান তিনি।
ক্রেতাদের অভিযোগ, দাম বাড়ছে অযৌক্তিকভাবে :
ইলিশের উচ্চমূল্যে হতাশ সাধারণ ক্রেতারা। অনেকেই অভিযোগ করছেন, সরবরাহ কম থাকার সুযোগে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হচ্ছে। পোর্ট রোড পাইকারি বাজারে মাছ কিনতে আসা শাহিন বলেন, আগে যে ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। নিজেদের নদী ও সাগরের মাছের দাম এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।
ক্রেতা সোহেল রানা বলেন, খুচরা বাজারের চেয়ে কম দামে মাছ পাওয়ার আশায় পাইকারি বাজারে এসেছিলাম। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। তারপরও ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশ কিনতে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
রাসেল সিকদার নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ইলিশের দাম শুনে শেষ পর্যন্ত পাঙ্গাশ মাছ কিনে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আগে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন ১ হাজার ৮০০ টাকা। পাঙ্গাশের দামও বেড়েছে।
নদীতে নেই ইলিশ, দুশ্চিন্তায় জেলেরা :
শুধু ক্রেতা নয়, সংকটে পড়েছেন জেলেরাও। মৌসুম শুরু হলেও নদীতে ইলিশের দেখা না মেলায় হতাশ তারা।কালাবদর নদীতে মাছ ধরা জেলে আসলাম বলেন, ইলিশও নেই, জাটকাও নেই। ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছি। বৃষ্টি হলে হয়তো মাছ পাওয়া যাবে।
বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের টুমচর এলাকার জেলে সালামও একই কথা বলেন। তার মতে, নদীতে এখন মাছ নেই বললেই চলে। বৃষ্টি নামলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
কীর্তনখোলা নদীর জেলে সগির বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে নেমেছি। কিন্তু জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে দেনা শোধ করতে জাল বিক্রি করতে হবে।
কেন কম ধরা পড়ছে ইলিশ? :
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, এবার এপ্রিলের শেষ দিকেই ঝাঁকে ঝাঁকে চাপিলা আকৃতির জাটকা সাগরে চলে গেছে। গত বছর জাটকার ঝাঁক সাগরে গিয়েছিল মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।
তিনি বলেন,চাপিলা আকৃতির এসব জাটকা স্রোতের বিপরীতে দলবদ্ধ হয়ে চলাচল করে। মেহেন্দীগঞ্জের বাগরজার মালদ্বীপের চর এলাকায় এবারও সেগুলো জড়ো হয়েছিল। মৎস্য অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারির কারণে পাই জাল দিয়ে ব্যাপক হারে জাটকা ধরা সম্ভব হয়নি।নদীতে পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি আকারে বেড়ে ওঠা প্রায় ৯০ শতাংশ জাটকা এবার নিরাপদে সাগরে পৌঁছেছে। এখন দরকার সেগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া।
গবেষকদের আশাবাদ :
ইলিশ নিয়ে গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো জাটকা সংরক্ষণ। তাদের মতে, চলতি বছর অভয়াশ্রম এলাকার অধিকাংশ জাটকা নিরাপদে সাগরে পৌঁছেছে। তবে এগুলোকে বড় হতে দিতে হবে। সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা আরও কিছুদিন বাড়ানো গেলে সুফল আরও বেশি পাওয়া যেতে পারে।
গবেষকরা জানান, গত দুই বছর ধরে ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ছোট আকারের ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীতে এসে ধরা পড়ে যাচ্ছে। ফলে বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একটি জাটকা এক কেজি ওজনের ইলিশ হতে প্রায় দুই বছরের বেশি সময় লাগে। তাদের মতে, এ বছর সাগরে পৌঁছানো জাটকাগুলোর পূর্ণ সুফল পাওয়া যেতে পারে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এবং আগামী বছরগুলোতে।
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন মাসে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও প্রকৃত ভরা মৌসুম শুরু হয় জুলাই থেকে। বৃষ্টি হলেই সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আগমন বাড়বে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে ষষ্ঠ অভয়াশ্রম এলাকায় কঠোর নজরদারির কারণে জাটকা নিধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে নদীতে ৩০ জুন পর্যন্ত এবং সাগরে ১১ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সংরক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে ইলিশ ধরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আবহাওয়া অনুকূলে এলে খুব দ্রুতই নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে।

বরিশালে ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, আকাশছোঁয়া দামে স্বাদ হারাচ্ছে মানুষ

বরিশালে ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, আকাশছোঁয়া দামে স্বাদ হারাচ্ছে মানুষ

প্রকাশিত : ১০:৫৬:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ১০(বুধবার)  জুন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বরিশালের নদ-নদী, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বাজারে দেখা দিয়েছে এক ভিন্ন চিত্র। যে সময়ে আড়তগুলোতে হাজার হাজার মণ ইলিশে ভরে থাকার কথা, সেই সময়ে মাছের সরবরাহ নেমে এসেছে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে। ফলে বাজারে ইলিশের দাম পৌঁছেছে আকাশছোঁয়া অবস্থানে। এতে জাতীয় মাছের স্বাদ ভুলতে বসেছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
এদিকে, বর্তমান সংকটের মধ্যেও আশার খবর শুনিয়েছেন মৎস্য গবেষক ও কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, চলতি বছর অভয়াশ্রম এলাকায় বেড়ে ওঠা প্রায় ৯০ শতাংশ জাটকা নিরাপদে সাগরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মৌসুমের শেষভাগে এবং আগামী বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, যেখানে এই সময়ে প্রতিদিন কয়েকশ থেকে হাজার মণ ইলিশ আসার কথা, সেখানে পুরো মোকামে এসেছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ ইলিশ। মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগেও মৌসুমের শুরুতে এই মোকামে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দুই হাজার মণ পর্যন্ত ইলিশ বেচাকেনা হতো। কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলত। কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
পোর্ট রোড ইলিশ মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় নদীতে ইলিশ একেবারেই কম। গত কয়েকদিন ধরে মোকামে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ মাছ আসছে। অথচ এই সময়ে কমপক্ষে ২০০ থেকে ৩০০ মণ ইলিশ পাওয়ার কথা।
মেসার্স দুলাল ফিশের ম্যানেজার মো. রবিন বলেন, দুই-তিন বছর আগেও ভরা মৌসুমে দিনশেষে দুই হাজার মণ পর্যন্ত ইলিশ বেচাকেনা হতো। এখন ৬০ মণের বেশি মাছ আসছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়ছে।
পোর্টরোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক-সমিতির সাবেক অর্থ সম্পাদক ইয়ার হোসেন শিকদার বলেন, আমাদের ১৭০টি আড়তে আগে প্রতিদিন এক হাজার থেকে বারোশ মণ পর্যন্ত ইলিশ আসত। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হতো। এখন প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে না।
বাজারে আগুন, নাগালের বাইরে জাতীয় মাছ :
সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের (এলসি) ইলিশের দাম ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকায় এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। সকালে পোর্ট রোড মোকাম থেকে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনেছেন ব্যবসায়ী মোতালেব মিয়া। ঈদে অতিথি আপ্যায়নের জন্য মাছটি কিনেছেন বলে জানান তিনি।
ক্রেতাদের অভিযোগ, দাম বাড়ছে অযৌক্তিকভাবে :
ইলিশের উচ্চমূল্যে হতাশ সাধারণ ক্রেতারা। অনেকেই অভিযোগ করছেন, সরবরাহ কম থাকার সুযোগে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হচ্ছে। পোর্ট রোড পাইকারি বাজারে মাছ কিনতে আসা শাহিন বলেন, আগে যে ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। নিজেদের নদী ও সাগরের মাছের দাম এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।
ক্রেতা সোহেল রানা বলেন, খুচরা বাজারের চেয়ে কম দামে মাছ পাওয়ার আশায় পাইকারি বাজারে এসেছিলাম। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। তারপরও ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশ কিনতে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
রাসেল সিকদার নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ইলিশের দাম শুনে শেষ পর্যন্ত পাঙ্গাশ মাছ কিনে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আগে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন ১ হাজার ৮০০ টাকা। পাঙ্গাশের দামও বেড়েছে।
নদীতে নেই ইলিশ, দুশ্চিন্তায় জেলেরা :
শুধু ক্রেতা নয়, সংকটে পড়েছেন জেলেরাও। মৌসুম শুরু হলেও নদীতে ইলিশের দেখা না মেলায় হতাশ তারা।কালাবদর নদীতে মাছ ধরা জেলে আসলাম বলেন, ইলিশও নেই, জাটকাও নেই। ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছি। বৃষ্টি হলে হয়তো মাছ পাওয়া যাবে।
বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের টুমচর এলাকার জেলে সালামও একই কথা বলেন। তার মতে, নদীতে এখন মাছ নেই বললেই চলে। বৃষ্টি নামলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
কীর্তনখোলা নদীর জেলে সগির বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে নেমেছি। কিন্তু জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে দেনা শোধ করতে জাল বিক্রি করতে হবে।
কেন কম ধরা পড়ছে ইলিশ? :
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, এবার এপ্রিলের শেষ দিকেই ঝাঁকে ঝাঁকে চাপিলা আকৃতির জাটকা সাগরে চলে গেছে। গত বছর জাটকার ঝাঁক সাগরে গিয়েছিল মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।
তিনি বলেন,চাপিলা আকৃতির এসব জাটকা স্রোতের বিপরীতে দলবদ্ধ হয়ে চলাচল করে। মেহেন্দীগঞ্জের বাগরজার মালদ্বীপের চর এলাকায় এবারও সেগুলো জড়ো হয়েছিল। মৎস্য অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারির কারণে পাই জাল দিয়ে ব্যাপক হারে জাটকা ধরা সম্ভব হয়নি।নদীতে পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি আকারে বেড়ে ওঠা প্রায় ৯০ শতাংশ জাটকা এবার নিরাপদে সাগরে পৌঁছেছে। এখন দরকার সেগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া।
গবেষকদের আশাবাদ :
ইলিশ নিয়ে গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো জাটকা সংরক্ষণ। তাদের মতে, চলতি বছর অভয়াশ্রম এলাকার অধিকাংশ জাটকা নিরাপদে সাগরে পৌঁছেছে। তবে এগুলোকে বড় হতে দিতে হবে। সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা আরও কিছুদিন বাড়ানো গেলে সুফল আরও বেশি পাওয়া যেতে পারে।
গবেষকরা জানান, গত দুই বছর ধরে ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ছোট আকারের ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীতে এসে ধরা পড়ে যাচ্ছে। ফলে বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একটি জাটকা এক কেজি ওজনের ইলিশ হতে প্রায় দুই বছরের বেশি সময় লাগে। তাদের মতে, এ বছর সাগরে পৌঁছানো জাটকাগুলোর পূর্ণ সুফল পাওয়া যেতে পারে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এবং আগামী বছরগুলোতে।
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন মাসে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও প্রকৃত ভরা মৌসুম শুরু হয় জুলাই থেকে। বৃষ্টি হলেই সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আগমন বাড়বে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে ষষ্ঠ অভয়াশ্রম এলাকায় কঠোর নজরদারির কারণে জাটকা নিধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে নদীতে ৩০ জুন পর্যন্ত এবং সাগরে ১১ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সংরক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে ইলিশ ধরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আবহাওয়া অনুকূলে এলে খুব দ্রুতই নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে।