ঢাকা ১০:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীচক্র নগরজীবনের নীরব আতঙ্ক ও আমাদের অসতর্কতার গল্প

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:১৫:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩৩ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির:  বরিশাল, খুলনা, চট্রগ্রাম, ঢাকারসহ দেশের সকল নগরজীবন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে সীমাহীন ব্যস্ততা, অন্যদিকে সীমাহীন নির্ভরতা। সকাল শুরু হয় অফিসের তাড়া দিয়ে, দিন গড়িয়ে যায় যানজট আর ক্লান্তিতে, আর সন্ধ্যায় ফিরে এসে মানুষ আশ্রয় খোঁজে নিজের ঘরে—যে ঘরটিকে সে নিরাপত্তার শেষ আশ্রয় বলে মনে করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সেই ঘরও আর আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত ৮ ডিসেম্বর ঘটে যাওয়া মা ও মেয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নগরবাসীর মনে নতুন করে এক অজানা আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। দিনের আলোয়, নিজ বাসায়—যেখানে থাকার কথা ছিল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—সেখানেই লায়লা আফরোজ ও তার কন্যা নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিয়া প্রাণ হারান। হত্যাকাণ্ডের পরপরই গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে থাকা সন্দেহভাজনের পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা এই আতঙ্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। এই একটি ঘটনা নয়। এটি যেন বহুদিনের জমে থাকা অবহেলার বিস্ফোরণ।

ব্যস্ত নগর, নির্ভরতার জাল : ঢাকা শহরের লক্ষাধিক পরিবার দৈনন্দিন কাজের জন্য গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল। ঘর মোছা, রান্নাবান্না, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা কিংবা শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া—সবখানেই গৃহকর্মীরা হয়ে উঠেছেন নীরব সহযাত্রী। কেউ খণ্ডকালীন, কেউ স্থায়ী; কেউ সকালে আসে, কেউ থাকে সারাদিন। ধীরে ধীরে তারা হয়ে ওঠে পরিবারের অংশ, ঘরের প্রতিটি কোণের সঙ্গে পরিচিত এক অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। কিন্তু এই নির্ভরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় এক ঝুঁকি—যার নাম অসতর্কতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহকর্মী নিয়োগের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা পূর্ব কর্মস্থলের কোনো যাচাই করা হয় না। অনেক সময় মানবিকতা, দয়া বা তাড়াহুড়োর কারণে অপরিচিত মানুষকে চোখ বন্ধ করে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সেই ঘরেই থাকে আমাদের সন্তান, আমাদের মা-বাবা, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

ছদ্মবেশে সংঘবদ্ধ অপরাধ : গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তারা অল্প সময়ের জন্য একাধিক বাসায় কাজ নেয়। কোথায় সিসি ক্যামেরা নেই, কোন বাসা দিনের বড় সময় ফাঁকা থাকে, কোথায় শিশু বা বৃদ্ধ একা থাকেন—এসব তথ্য তারা সংগ্রহ করে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। অপরাধ সংঘটনের আগে বাসার ভেতরের রুটিন, দরজা-জানালার অবস্থান, মূল্যবান জিনিসের জায়গা—সবই তাদের নখদর্পণে চলে আসে। পরে ঘটে খুন, চুরি কিংবা পরিকল্পিত লুটপাট। ভয়াবহ বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অপরাধে সহায়তা করছে দারোয়ান বা কেয়ারটেকারদের একটি অংশ। এটি নিছক বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং একটি নতুন অপরাধ কৌশল। অতীতের সতর্কবার্তা, বর্তমানের অবহেলা : গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ নতুন নয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডে নিজ বাসায় খুন হন ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনার রেশ ধরেই ২০২০ সালে আদালত গৃহকর্মী নিয়োগে ৬ দফা নির্দেশনা দেন।

এর মধ্যে ছিল—নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ। গৃহকর্মীর জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা। বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন। গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা। নিবন্ধিত গৃহকর্মীদের তথ্য থানায় সংরক্ষণ : পরবর্তীতে ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আরও বিস্তৃতভাবে ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করে। জাতীয় পরিচয়পত্র, সদ্য তোলা ছবি, শনাক্তকারী ব্যক্তি, পূর্ব কর্মস্থল যাচাই—সবই সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নগরবাসী এসব নির্দেশনা জানেন না, আর জানলেও মানেন না।

মোহাম্মদপুরের ঘটনা: একটি আয়না : মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত গৃহকর্মীকে জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থায়ী ঠিকানা যাচাই ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এই তথ্য আমাদের সমাজের একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়—আমরা নিয়ম জানি, কিন্তু মানতে চাই না। সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিহত লায়লা আফরোজের শরীরে প্রায় ৩০টি এবং তার মেয়ের শরীরে ৪টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। তদন্তকারীদের মতে, আঘাতের ধরন ও ঘটনার সময়সীমা দেখে এটি একটি পরিকল্পিত ও প্রশিক্ষিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্মমতা কেবল একজন অপরাধীর মানসিকতাই প্রকাশ করে না; বরং আমাদের সামষ্টিক অসচেতনতার প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে।

কীভাবে সতর্ক হব : ডিএমপি কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন—গৃহকর্মী নিয়োগের আগে সতর্ক হোন। এই সতর্কতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি। সতর্কতার কিছু মৌলিক ধাপ—দুই কপি সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি সংগ্রহ। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি রাখা। বর্তমান বাসার ঠিকানা ও ফোন নম্বর যাচাই। কমপক্ষে দুজন শনাক্তকারীর নাম-ঠিকানা সংরক্ষণ। পূর্ব কর্মস্থল ও কাজ ছাড়ার কারণ খোঁজ নেওয়া। সম্ভব হলে থানায় ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ মানেই কাউকে অবিশ্বাস করা নয়; বরং নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা।

মানবিকতা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য : এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—গৃহকর্মীদের সবাই অপরাধী নন। বরং দেশের প্রায় ২৫ লাখ গৃহকর্মীর বড় অংশই দরিদ্র, অসহায় এবং নির্যাতনের শিকার। নারী ও শিশুগৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে প্রণীত গৃহশ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা আজও আইনি কাঠামো পায়নি। ফলে তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা কিংবা নিরাপত্তা—সবই থেকে গেছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাই নিরাপত্তার নামে অমানবিক আচরণ নয়, বরং মানবিকতা ও সতর্কতার সমন্বয়ই হতে পারে সমাধান।

সচেতনতা ছাড়া নিরাপত্তা নয় : অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নগরজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মাদকাসক্তি এবং নাগরিক অসচেতনতা—এই চার উপাদান মিলেই গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়িয়ে তুলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের ভাষায়, “নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া কোনো নির্দেশনাই কার্যকর হয় না।” এই কথাটিই হয়তো পুরো আলোচনার সারকথা।

শেষ কথা : বিশ্বাসের সম্পর্ক যত গভীরই হোক, নিরাপত্তার প্রশ্নে অবহেলা মারাত্মক হতে পারে। মোহাম্মদপুরের মা ও মেয়ের হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে—নিজের ঘরও নিরাপদ রাখতে হলে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। আইন আছে, নির্দেশনা আছে, প্রযুক্তি আছে। নেই শুধু আমাদের সচেতন প্রয়োগ। গৃহকর্মীরা আমাদের জীবনের অংশ। তাদের পূর্ণ পরিচয় জেনে, মানবিক আচরণ বজায় রেখে, আইন মেনে নিয়োগ দেওয়াই পারে এই নীরব আতঙ্ক থেকে নগরজীবনকে রক্ষা করতে। নইলে, অবহেলার মূল্য দিতে হতে পারে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শিবালয়ে হত্যা মামলার আসামি ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার

গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীচক্র নগরজীবনের নীরব আতঙ্ক ও আমাদের অসতর্কতার গল্প

প্রকাশিত : ০৯:১৫:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

জুবাইয়া বিন্তে কবির:  বরিশাল, খুলনা, চট্রগ্রাম, ঢাকারসহ দেশের সকল নগরজীবন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে সীমাহীন ব্যস্ততা, অন্যদিকে সীমাহীন নির্ভরতা। সকাল শুরু হয় অফিসের তাড়া দিয়ে, দিন গড়িয়ে যায় যানজট আর ক্লান্তিতে, আর সন্ধ্যায় ফিরে এসে মানুষ আশ্রয় খোঁজে নিজের ঘরে—যে ঘরটিকে সে নিরাপত্তার শেষ আশ্রয় বলে মনে করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সেই ঘরও আর আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত ৮ ডিসেম্বর ঘটে যাওয়া মা ও মেয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নগরবাসীর মনে নতুন করে এক অজানা আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। দিনের আলোয়, নিজ বাসায়—যেখানে থাকার কথা ছিল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—সেখানেই লায়লা আফরোজ ও তার কন্যা নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিয়া প্রাণ হারান। হত্যাকাণ্ডের পরপরই গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে থাকা সন্দেহভাজনের পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা এই আতঙ্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। এই একটি ঘটনা নয়। এটি যেন বহুদিনের জমে থাকা অবহেলার বিস্ফোরণ।

ব্যস্ত নগর, নির্ভরতার জাল : ঢাকা শহরের লক্ষাধিক পরিবার দৈনন্দিন কাজের জন্য গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল। ঘর মোছা, রান্নাবান্না, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা কিংবা শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া—সবখানেই গৃহকর্মীরা হয়ে উঠেছেন নীরব সহযাত্রী। কেউ খণ্ডকালীন, কেউ স্থায়ী; কেউ সকালে আসে, কেউ থাকে সারাদিন। ধীরে ধীরে তারা হয়ে ওঠে পরিবারের অংশ, ঘরের প্রতিটি কোণের সঙ্গে পরিচিত এক অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। কিন্তু এই নির্ভরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় এক ঝুঁকি—যার নাম অসতর্কতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহকর্মী নিয়োগের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা পূর্ব কর্মস্থলের কোনো যাচাই করা হয় না। অনেক সময় মানবিকতা, দয়া বা তাড়াহুড়োর কারণে অপরিচিত মানুষকে চোখ বন্ধ করে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সেই ঘরেই থাকে আমাদের সন্তান, আমাদের মা-বাবা, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

ছদ্মবেশে সংঘবদ্ধ অপরাধ : গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তারা অল্প সময়ের জন্য একাধিক বাসায় কাজ নেয়। কোথায় সিসি ক্যামেরা নেই, কোন বাসা দিনের বড় সময় ফাঁকা থাকে, কোথায় শিশু বা বৃদ্ধ একা থাকেন—এসব তথ্য তারা সংগ্রহ করে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। অপরাধ সংঘটনের আগে বাসার ভেতরের রুটিন, দরজা-জানালার অবস্থান, মূল্যবান জিনিসের জায়গা—সবই তাদের নখদর্পণে চলে আসে। পরে ঘটে খুন, চুরি কিংবা পরিকল্পিত লুটপাট। ভয়াবহ বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অপরাধে সহায়তা করছে দারোয়ান বা কেয়ারটেকারদের একটি অংশ। এটি নিছক বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং একটি নতুন অপরাধ কৌশল। অতীতের সতর্কবার্তা, বর্তমানের অবহেলা : গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ নতুন নয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডে নিজ বাসায় খুন হন ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনার রেশ ধরেই ২০২০ সালে আদালত গৃহকর্মী নিয়োগে ৬ দফা নির্দেশনা দেন।

এর মধ্যে ছিল—নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ। গৃহকর্মীর জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা। বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন। গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা। নিবন্ধিত গৃহকর্মীদের তথ্য থানায় সংরক্ষণ : পরবর্তীতে ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আরও বিস্তৃতভাবে ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করে। জাতীয় পরিচয়পত্র, সদ্য তোলা ছবি, শনাক্তকারী ব্যক্তি, পূর্ব কর্মস্থল যাচাই—সবই সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নগরবাসী এসব নির্দেশনা জানেন না, আর জানলেও মানেন না।

মোহাম্মদপুরের ঘটনা: একটি আয়না : মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত গৃহকর্মীকে জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থায়ী ঠিকানা যাচাই ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এই তথ্য আমাদের সমাজের একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়—আমরা নিয়ম জানি, কিন্তু মানতে চাই না। সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিহত লায়লা আফরোজের শরীরে প্রায় ৩০টি এবং তার মেয়ের শরীরে ৪টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। তদন্তকারীদের মতে, আঘাতের ধরন ও ঘটনার সময়সীমা দেখে এটি একটি পরিকল্পিত ও প্রশিক্ষিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্মমতা কেবল একজন অপরাধীর মানসিকতাই প্রকাশ করে না; বরং আমাদের সামষ্টিক অসচেতনতার প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে।

কীভাবে সতর্ক হব : ডিএমপি কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন—গৃহকর্মী নিয়োগের আগে সতর্ক হোন। এই সতর্কতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি। সতর্কতার কিছু মৌলিক ধাপ—দুই কপি সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি সংগ্রহ। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি রাখা। বর্তমান বাসার ঠিকানা ও ফোন নম্বর যাচাই। কমপক্ষে দুজন শনাক্তকারীর নাম-ঠিকানা সংরক্ষণ। পূর্ব কর্মস্থল ও কাজ ছাড়ার কারণ খোঁজ নেওয়া। সম্ভব হলে থানায় ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ মানেই কাউকে অবিশ্বাস করা নয়; বরং নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা।

মানবিকতা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য : এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—গৃহকর্মীদের সবাই অপরাধী নন। বরং দেশের প্রায় ২৫ লাখ গৃহকর্মীর বড় অংশই দরিদ্র, অসহায় এবং নির্যাতনের শিকার। নারী ও শিশুগৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে প্রণীত গৃহশ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা আজও আইনি কাঠামো পায়নি। ফলে তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা কিংবা নিরাপত্তা—সবই থেকে গেছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাই নিরাপত্তার নামে অমানবিক আচরণ নয়, বরং মানবিকতা ও সতর্কতার সমন্বয়ই হতে পারে সমাধান।

সচেতনতা ছাড়া নিরাপত্তা নয় : অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নগরজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মাদকাসক্তি এবং নাগরিক অসচেতনতা—এই চার উপাদান মিলেই গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়িয়ে তুলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের ভাষায়, “নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া কোনো নির্দেশনাই কার্যকর হয় না।” এই কথাটিই হয়তো পুরো আলোচনার সারকথা।

শেষ কথা : বিশ্বাসের সম্পর্ক যত গভীরই হোক, নিরাপত্তার প্রশ্নে অবহেলা মারাত্মক হতে পারে। মোহাম্মদপুরের মা ও মেয়ের হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে—নিজের ঘরও নিরাপদ রাখতে হলে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। আইন আছে, নির্দেশনা আছে, প্রযুক্তি আছে। নেই শুধু আমাদের সচেতন প্রয়োগ। গৃহকর্মীরা আমাদের জীবনের অংশ। তাদের পূর্ণ পরিচয় জেনে, মানবিক আচরণ বজায় রেখে, আইন মেনে নিয়োগ দেওয়াই পারে এই নীরব আতঙ্ক থেকে নগরজীবনকে রক্ষা করতে। নইলে, অবহেলার মূল্য দিতে হতে পারে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে।