ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের দীর্ঘ অপেক্ষা: সুযোগ, বাধা ও ভোগান্তি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৭:৫৪:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: শীতের শেষভাগ এলেই আমাদের সমাজজুড়ে উৎসবের এক নীরব আলোড়ন শুরু হয়। কুয়াশা সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও বনভোজনের আয়োজন, কোথাও আবার কালো গাউনে মোড়া এক অনন্য উৎসব—সমাবর্তন। পিঠা, খেলাধুলা কিংবা বিয়ের আমেজের ভিড়ে সমাবর্তন আলাদা হয়ে ওঠে তার গাম্ভীর্য, আনুষ্ঠানিকতা ও আবেগের গভীরতায়। এটি কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; এটি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সাধনার এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ও আরেক অধ্যায়ের সূচনা।
সাধারণ অর্থে, কনভোকেশন বা সমাবর্তন মানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের একত্র হওয়া। কিন্তু আধুনিক বাস্তবতায় সমাবর্তন মানে আরও অনেক কিছু—ডিগ্রিধারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ গ্রহণ, আচার্যের হাত থেকে অর্জনের স্বীকৃতি পাওয়া এবং সমাজের সামনে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতীকী মুহূর্ত। কেউ একে গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি বলেন, কেউ বলেন জীবনের সবচেয়ে গর্বের দিন।

একজন শিক্ষার্থীর মনে সমাবর্তনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বুনে ওঠে প্রথম বর্ষ থেকেই। কোনো এক সকালে গাউন ও হ্যাট পরে সারিবদ্ধভাবে সমাবর্তন প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যাওয়া, গুরুগম্ভীর পরিবেশে আচার্যের কাছ থেকে সনদ কিংবা স্বর্ণপদক গ্রহণ—এই কল্পনাই তাকে ক্লান্তির মধ্যেও টিকে থাকার শক্তি দেয়। সেদিন বাবা–মায়ের চোখে থাকে গর্বের দীপ্তি, পরিবারে নেমে আসে আনন্দের ঢেউ, আর বন্ধুদের সঙ্গে পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার এক অনাবিল সুযোগ। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেও সমাবর্তনের এই গাম্ভীর্য ও মর্যাদার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। জানা যায়, ১৫৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্নকারীদের ডিগ্রি প্রদান থেকেই আধুনিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রচলন সুসংহত রূপ পায়। তারও বহু আগে, মধ্যযুগে গির্জা-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় গাউন, হ্যাট ও আনুষ্ঠানিক মিছিলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা হতো। কালো গাউন, মাথার বর্গাকৃতির টুপি, টাসেলের দোল—সবকিছুই অর্জন, উত্তরণ ও নতুন স্তরে প্রবেশের প্রতীক।

অথচ এই মর্যাদাপূর্ণ সমাবর্তনই আজ বাংলাদেশের বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিণত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও হতাশার প্রতীকে। দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘সমাবর্তনজট’। কোথাও সরকারি অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, কোথাও প্রশাসনিক অদক্ষতা, কোথাও আর্থিক অনীহা—সব মিলিয়ে বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একবারও সমাবর্তনের আয়োজন করতে পারেনি, অথচ নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদান চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তোলে—সমাবর্তন কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব, নাকি এটি শিক্ষার মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও শিক্ষার্থীর অধিকার? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রয়োজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের দীর্ঘ অপেক্ষা, তার সুযোগ, বাধা ও ভোগান্তির গভীর অনুসন্ধান।

দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে বর্তমানে এক ধরনের ‘সমাবর্তনজট’ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও সরকারি অনুমোদনের অভাব, কোথাও প্রশাসনিক অযোগ্যতা, কোথাও আর্থিক অনীহা—সব মিলিয়ে বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বছরের পর বছর সমাবর্তন আয়োজন করতে পারছে না। আবার কেউ কেউ ইচ্ছা থাকলেও অনুমতির অপেক্ষায় আটকে আছে। আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক দশকের বেশি সময় ধরে একবারও সমাবর্তনের আয়োজন করেনি, অথচ নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদপ্রদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

করোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিক্য ও প্রশাসনিক জট :
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র জানায়, সমাবর্তন সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে করোনা মহামারিতে। ২০২০ সালের মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সমাবর্তনসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে সীমিত পরিসরে অনলাইনে সমাবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল সাময়িক ব্যবস্থা। ২০২২ সালে সরাসরি সমাবর্তন শুরু হলেও তত দিনে জমে ওঠে দীর্ঘসূত্রতা ও বিশাল জট।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বাভাবিক বিস্তার। বর্তমানে দেশে ১০৯টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের সমাবর্তন আয়োজন, অনুমোদন ও তদারকি প্রশাসনিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি চ্যান্সেলর হওয়ায় এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় সময় ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে উঠেছে।

খরচের অজুহাত ও আইনের ফাঁকফোকর : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি বাস্তবতা—সমাবর্তন আয়োজনকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ হিসেবে দেখছে। একাধিক ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য স্বীকার করেছেন, সমাবর্তন আয়োজন করতে গেলে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। গাউন, মঞ্চ, অতিথি, হল ভাড়া—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় ব্যয়ের বিষয়। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক বছরের শিক্ষার্থী একত্র করে একবার সমাবর্তন আয়োজন করে দায় সারতে চায়। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে কত বছর পরপর সমাবর্তন করতে হবে—তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। ফলে এটি পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদেশে সমাবর্তন অনেক বেশি নিয়মিত হলেও সেখানে জাঁকজমক নেই। অথচ বাংলাদেশে সমাবর্তন মানেই বিশাল আয়োজন, যা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই আইনি অস্পষ্টতাই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার।

অনুমতির জটিল পথ : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন আয়োজন একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়। এ ক্ষেত্রে চ্যান্সেলরের সচিবালয় হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ দায়িত্ব পালন করে। সমাবর্তনের অনুমতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে সেখানে আবেদন করতে হয়, এরপর ইউজিসির মাধ্যমে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা হয়—আইন অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠিত হয়েছে কিনা, কোনো অননুমোদিত আউটার ক্যাম্পাস আছে কিনা, সরকারের বিরুদ্ধে বা মালিকানা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে কিনা, নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চলছে কিনা, দুর্নীতি বা অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তাধীন আছে কিনা এবং চ্যান্সেলর নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার দায়িত্বে আছেন কিনা। এই শর্তগুলোর যেকোনো একটিতে ঘাটতি থাকলে সমাবর্তনের অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়। পাশাপাশি স্থায়ী ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক সক্ষমতা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতাও সমাবর্তন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে একবারও সমাবর্তন হয়নি যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।ইউজিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন পর্যন্ত একবারও সমাবর্তন আয়োজন করতে পারেনি। এর ফলে হাজারো শিক্ষার্থী তাদের মৌলিক অধিকার—মূল সনদ গ্রহণ—থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা কর্মজীবন, উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সমস্যা তৈরি করছে। এই তালিকায় রয়েছে রাজধানীর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি সহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। ঢাকার বাইরে উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো—ফরিদপুরের টাইমস্ ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (মুন্সীগঞ্জ), নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (সিলেট), ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি (চুয়াডাঙ্গা), ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (কিশোরগঞ্জ), এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় (সিরাজগঞ্জ), ফেনী ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (গাজীপুর) সহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান।

দীর্ঘ প্রতিষ্ঠাকাল, অল্প সমাবর্তন : পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গণবিশ্ববিদ্যালয় ২৬ বছরে মাত্র তিনটি সমাবর্তন করতে পেরেছে। একই সময়ে দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ করেছে মাত্ৰ দুটি করে, আর সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি ২৯ বছরে আয়োজন করেছে মাত্র দুটি সমাবর্তন। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও নিয়মিততার প্রশ্ন থেকে যায়। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি—এগুলো সমাবর্তন আয়োজনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, তবে সব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অধিকার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ মানদণ্ড পূরণ করা হয়নি।

এ মুহূর্তে সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি), ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আহ্‌ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি সিলেট, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (মুন্সীগঞ্জ), নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (সিলেট), খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় (সিরাজগঞ্জ), ফেনী ইউনিভার্সিটি, দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, খুলনার নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি।

২০১২ সালের পর গত ১৩ বছরে একবারও সমাবর্তন আয়োজন করতে পারেনি ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, জেএডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি খুলনা, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনী ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লা। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় একবার, রাজশাহীর নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, জামালপুরের শেখ ফাজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নারায়ণগঞ্জের রণদাপ্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরের জার্মান ইউনিভার্সিটি এবং বরিশালের গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি একবারও সমাবর্তন করতে পারেনি।

সমাবর্তনের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন থাকা বিশ্ববিদ্যালয় :
পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কিছু শুধু কয়েকবারই আয়োজন করেছে। উদাহরণস্বরূপ গণবিশ্ববিদ্যালয়: ২৬ বছরে ৩টি সমাবর্তন। দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ: ২৬ বছরে ২টি করে।
সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি: ২৯ বছরে ২টি।ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি উত্তরার: ২৯ বছরে ৬টি। আহ্‌ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: ২৭ বছরে ১০টি। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ: ২০টি। অন্যদিকে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউএসটিসি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি—এইসব প্রতিষ্ঠানে সমাবর্তন তুলনামূলকভাবে নিয়মিত হলেও শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণে এখনও শতভাগ সক্ষম নয়।

শিক্ষার্থীর ভোগান্তি: সনদ নেই, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে : সমাবর্তন না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কারণ সমাবর্তন ছাড়া মূল সনদ প্রদান করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয় ‘প্রবেশনারি সার্টিফিকেট’, যা দেশি-বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে না। ফলে উচ্চশিক্ষা, বিদেশে পড়াশোনা কিংবা ভালো চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এটি সরাসরি শিক্ষার্থীর অধিকার লঙ্ঘন।

অভিভাবকের বক্তব্য : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সমাবর্তন পাওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার। একজন অভিভাবক হিসেবে আমি বিষয়টি খুব কাছ থেকে অনুভব করি। আমার নিজের সন্তানরাও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তারা নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে ডিগ্রি অর্জন করছে, অথচ বছরের পর বছর সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকতে হবে—এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। যারা শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করছে, কিন্তু শিক্ষার্থীর অধিকার নিশ্চিত করছে না—তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।”

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তরফদার মোঃ আক্তার জামীল বলেন,“সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের অধিকার। নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষা হলে নিয়মিত সমাবর্তনও হওয়া উচিত। দীর্ঘদিন সমাবর্তন না হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার চায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন মেনে সময়মতো সমাবর্তন আয়োজন করুক।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোঃ তানজিম উদ্দিন খান বলেন, “প্রতিবছর সমাবর্তন হওয়া উচিত। যারা করছে না, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, “সমাবর্তন না করলে শিক্ষার্থীরা চরম সমস্যায় পড়ে। তাই প্রতি বছর সমাবর্তন হওয়া জরুরি।” প্রবীণ শিক্ষাবিদ, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী এ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীর অধিকার সেখানে উপেক্ষিত।”

পরিশেষে বলা যায়—সমাবর্তন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, এটি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সাধনা, নির্ঘুম রাত, সীমাহীন ত্যাগ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের এক মর্যাদাপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এই এক দিনের আয়োজনে凝বদ্ধ হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। একজন শিক্ষার্থীর কাছে সমাবর্তন মানে শুধু সনদ হাতে পাওয়া নয়; মানে নিজেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে যোগ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মুহূর্ত।
কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারও সমাবর্তন না হওয়ার বাস্তবতা আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীর প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দায়হীনতার নির্মম সাক্ষ্য বহন করে। এটি শুধু একটি আয়োজনের অনুপস্থিতি নয়, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতির বিলম্বিত বা অস্বীকৃত বাস্তবতা। যেখানে নিয়মিত সমাবর্তন হয় না, সেখানে শিক্ষার মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং শিক্ষার্থীর স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিক্ষার্থীর অধিকার কেবল সনদে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে সম্মান, ন্যায়বোধ ও স্বীকৃতির নিশ্চয়তা। তাই উচ্চশিক্ষার সত্যিকারের মানোন্নয়ন চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন, স্থায়ী ক্যাম্পাস গঠন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যায় নয়, বরং শিক্ষার্থীর মর্যাদা রক্ষায়। কারণ যেখানে সমাবর্তন অনুপস্থিত, সেখানে স্বপ্নের স্বীকৃতিও অপূর্ণ থেকে যায়—আর সেই অপূর্ণতাই একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

জনপ্রিয় সংবাদ

As the New Year unfolds, may every effort turn into achievement and every dream into reality. Wish you all a very Happy New Year 2026.

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের দীর্ঘ অপেক্ষা: সুযোগ, বাধা ও ভোগান্তি

প্রকাশিত : ০৭:৫৪:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: শীতের শেষভাগ এলেই আমাদের সমাজজুড়ে উৎসবের এক নীরব আলোড়ন শুরু হয়। কুয়াশা সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও বনভোজনের আয়োজন, কোথাও আবার কালো গাউনে মোড়া এক অনন্য উৎসব—সমাবর্তন। পিঠা, খেলাধুলা কিংবা বিয়ের আমেজের ভিড়ে সমাবর্তন আলাদা হয়ে ওঠে তার গাম্ভীর্য, আনুষ্ঠানিকতা ও আবেগের গভীরতায়। এটি কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; এটি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সাধনার এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ও আরেক অধ্যায়ের সূচনা।
সাধারণ অর্থে, কনভোকেশন বা সমাবর্তন মানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের একত্র হওয়া। কিন্তু আধুনিক বাস্তবতায় সমাবর্তন মানে আরও অনেক কিছু—ডিগ্রিধারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ গ্রহণ, আচার্যের হাত থেকে অর্জনের স্বীকৃতি পাওয়া এবং সমাজের সামনে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতীকী মুহূর্ত। কেউ একে গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি বলেন, কেউ বলেন জীবনের সবচেয়ে গর্বের দিন।

একজন শিক্ষার্থীর মনে সমাবর্তনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বুনে ওঠে প্রথম বর্ষ থেকেই। কোনো এক সকালে গাউন ও হ্যাট পরে সারিবদ্ধভাবে সমাবর্তন প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যাওয়া, গুরুগম্ভীর পরিবেশে আচার্যের কাছ থেকে সনদ কিংবা স্বর্ণপদক গ্রহণ—এই কল্পনাই তাকে ক্লান্তির মধ্যেও টিকে থাকার শক্তি দেয়। সেদিন বাবা–মায়ের চোখে থাকে গর্বের দীপ্তি, পরিবারে নেমে আসে আনন্দের ঢেউ, আর বন্ধুদের সঙ্গে পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার এক অনাবিল সুযোগ। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেও সমাবর্তনের এই গাম্ভীর্য ও মর্যাদার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। জানা যায়, ১৫৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্নকারীদের ডিগ্রি প্রদান থেকেই আধুনিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রচলন সুসংহত রূপ পায়। তারও বহু আগে, মধ্যযুগে গির্জা-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় গাউন, হ্যাট ও আনুষ্ঠানিক মিছিলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা হতো। কালো গাউন, মাথার বর্গাকৃতির টুপি, টাসেলের দোল—সবকিছুই অর্জন, উত্তরণ ও নতুন স্তরে প্রবেশের প্রতীক।

অথচ এই মর্যাদাপূর্ণ সমাবর্তনই আজ বাংলাদেশের বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিণত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও হতাশার প্রতীকে। দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘সমাবর্তনজট’। কোথাও সরকারি অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, কোথাও প্রশাসনিক অদক্ষতা, কোথাও আর্থিক অনীহা—সব মিলিয়ে বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একবারও সমাবর্তনের আয়োজন করতে পারেনি, অথচ নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদান চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তোলে—সমাবর্তন কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব, নাকি এটি শিক্ষার মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও শিক্ষার্থীর অধিকার? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রয়োজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের দীর্ঘ অপেক্ষা, তার সুযোগ, বাধা ও ভোগান্তির গভীর অনুসন্ধান।

দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে বর্তমানে এক ধরনের ‘সমাবর্তনজট’ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও সরকারি অনুমোদনের অভাব, কোথাও প্রশাসনিক অযোগ্যতা, কোথাও আর্থিক অনীহা—সব মিলিয়ে বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বছরের পর বছর সমাবর্তন আয়োজন করতে পারছে না। আবার কেউ কেউ ইচ্ছা থাকলেও অনুমতির অপেক্ষায় আটকে আছে। আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক দশকের বেশি সময় ধরে একবারও সমাবর্তনের আয়োজন করেনি, অথচ নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদপ্রদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

করোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিক্য ও প্রশাসনিক জট :
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র জানায়, সমাবর্তন সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে করোনা মহামারিতে। ২০২০ সালের মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সমাবর্তনসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে সীমিত পরিসরে অনলাইনে সমাবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল সাময়িক ব্যবস্থা। ২০২২ সালে সরাসরি সমাবর্তন শুরু হলেও তত দিনে জমে ওঠে দীর্ঘসূত্রতা ও বিশাল জট।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বাভাবিক বিস্তার। বর্তমানে দেশে ১০৯টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের সমাবর্তন আয়োজন, অনুমোদন ও তদারকি প্রশাসনিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি চ্যান্সেলর হওয়ায় এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় সময় ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে উঠেছে।

খরচের অজুহাত ও আইনের ফাঁকফোকর : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি বাস্তবতা—সমাবর্তন আয়োজনকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ হিসেবে দেখছে। একাধিক ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য স্বীকার করেছেন, সমাবর্তন আয়োজন করতে গেলে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। গাউন, মঞ্চ, অতিথি, হল ভাড়া—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় ব্যয়ের বিষয়। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক বছরের শিক্ষার্থী একত্র করে একবার সমাবর্তন আয়োজন করে দায় সারতে চায়। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে কত বছর পরপর সমাবর্তন করতে হবে—তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। ফলে এটি পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদেশে সমাবর্তন অনেক বেশি নিয়মিত হলেও সেখানে জাঁকজমক নেই। অথচ বাংলাদেশে সমাবর্তন মানেই বিশাল আয়োজন, যা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই আইনি অস্পষ্টতাই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার।

অনুমতির জটিল পথ : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন আয়োজন একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়। এ ক্ষেত্রে চ্যান্সেলরের সচিবালয় হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ দায়িত্ব পালন করে। সমাবর্তনের অনুমতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে সেখানে আবেদন করতে হয়, এরপর ইউজিসির মাধ্যমে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা হয়—আইন অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠিত হয়েছে কিনা, কোনো অননুমোদিত আউটার ক্যাম্পাস আছে কিনা, সরকারের বিরুদ্ধে বা মালিকানা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে কিনা, নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চলছে কিনা, দুর্নীতি বা অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তাধীন আছে কিনা এবং চ্যান্সেলর নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার দায়িত্বে আছেন কিনা। এই শর্তগুলোর যেকোনো একটিতে ঘাটতি থাকলে সমাবর্তনের অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়। পাশাপাশি স্থায়ী ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক সক্ষমতা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতাও সমাবর্তন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে একবারও সমাবর্তন হয়নি যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।ইউজিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন পর্যন্ত একবারও সমাবর্তন আয়োজন করতে পারেনি। এর ফলে হাজারো শিক্ষার্থী তাদের মৌলিক অধিকার—মূল সনদ গ্রহণ—থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা কর্মজীবন, উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সমস্যা তৈরি করছে। এই তালিকায় রয়েছে রাজধানীর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি সহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। ঢাকার বাইরে উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো—ফরিদপুরের টাইমস্ ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (মুন্সীগঞ্জ), নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (সিলেট), ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি (চুয়াডাঙ্গা), ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (কিশোরগঞ্জ), এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় (সিরাজগঞ্জ), ফেনী ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (গাজীপুর) সহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান।

দীর্ঘ প্রতিষ্ঠাকাল, অল্প সমাবর্তন : পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গণবিশ্ববিদ্যালয় ২৬ বছরে মাত্র তিনটি সমাবর্তন করতে পেরেছে। একই সময়ে দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ করেছে মাত্ৰ দুটি করে, আর সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি ২৯ বছরে আয়োজন করেছে মাত্র দুটি সমাবর্তন। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও নিয়মিততার প্রশ্ন থেকে যায়। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি—এগুলো সমাবর্তন আয়োজনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, তবে সব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অধিকার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ মানদণ্ড পূরণ করা হয়নি।

এ মুহূর্তে সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি), ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আহ্‌ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি সিলেট, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (মুন্সীগঞ্জ), নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (সিলেট), খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় (সিরাজগঞ্জ), ফেনী ইউনিভার্সিটি, দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, খুলনার নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি।

২০১২ সালের পর গত ১৩ বছরে একবারও সমাবর্তন আয়োজন করতে পারেনি ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, জেএডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি খুলনা, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনী ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লা। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় একবার, রাজশাহীর নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, জামালপুরের শেখ ফাজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নারায়ণগঞ্জের রণদাপ্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরের জার্মান ইউনিভার্সিটি এবং বরিশালের গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি একবারও সমাবর্তন করতে পারেনি।

সমাবর্তনের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন থাকা বিশ্ববিদ্যালয় :
পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কিছু শুধু কয়েকবারই আয়োজন করেছে। উদাহরণস্বরূপ গণবিশ্ববিদ্যালয়: ২৬ বছরে ৩টি সমাবর্তন। দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ: ২৬ বছরে ২টি করে।
সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি: ২৯ বছরে ২টি।ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি উত্তরার: ২৯ বছরে ৬টি। আহ্‌ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: ২৭ বছরে ১০টি। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ: ২০টি। অন্যদিকে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউএসটিসি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি—এইসব প্রতিষ্ঠানে সমাবর্তন তুলনামূলকভাবে নিয়মিত হলেও শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণে এখনও শতভাগ সক্ষম নয়।

শিক্ষার্থীর ভোগান্তি: সনদ নেই, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে : সমাবর্তন না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কারণ সমাবর্তন ছাড়া মূল সনদ প্রদান করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয় ‘প্রবেশনারি সার্টিফিকেট’, যা দেশি-বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে না। ফলে উচ্চশিক্ষা, বিদেশে পড়াশোনা কিংবা ভালো চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এটি সরাসরি শিক্ষার্থীর অধিকার লঙ্ঘন।

অভিভাবকের বক্তব্য : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সমাবর্তন পাওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার। একজন অভিভাবক হিসেবে আমি বিষয়টি খুব কাছ থেকে অনুভব করি। আমার নিজের সন্তানরাও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তারা নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে ডিগ্রি অর্জন করছে, অথচ বছরের পর বছর সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকতে হবে—এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। যারা শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করছে, কিন্তু শিক্ষার্থীর অধিকার নিশ্চিত করছে না—তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।”

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তরফদার মোঃ আক্তার জামীল বলেন,“সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের অধিকার। নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষা হলে নিয়মিত সমাবর্তনও হওয়া উচিত। দীর্ঘদিন সমাবর্তন না হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার চায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন মেনে সময়মতো সমাবর্তন আয়োজন করুক।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোঃ তানজিম উদ্দিন খান বলেন, “প্রতিবছর সমাবর্তন হওয়া উচিত। যারা করছে না, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, “সমাবর্তন না করলে শিক্ষার্থীরা চরম সমস্যায় পড়ে। তাই প্রতি বছর সমাবর্তন হওয়া জরুরি।” প্রবীণ শিক্ষাবিদ, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী এ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীর অধিকার সেখানে উপেক্ষিত।”

পরিশেষে বলা যায়—সমাবর্তন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, এটি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সাধনা, নির্ঘুম রাত, সীমাহীন ত্যাগ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের এক মর্যাদাপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এই এক দিনের আয়োজনে凝বদ্ধ হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। একজন শিক্ষার্থীর কাছে সমাবর্তন মানে শুধু সনদ হাতে পাওয়া নয়; মানে নিজেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে যোগ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মুহূর্ত।
কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারও সমাবর্তন না হওয়ার বাস্তবতা আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীর প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দায়হীনতার নির্মম সাক্ষ্য বহন করে। এটি শুধু একটি আয়োজনের অনুপস্থিতি নয়, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতির বিলম্বিত বা অস্বীকৃত বাস্তবতা। যেখানে নিয়মিত সমাবর্তন হয় না, সেখানে শিক্ষার মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং শিক্ষার্থীর স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিক্ষার্থীর অধিকার কেবল সনদে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে সম্মান, ন্যায়বোধ ও স্বীকৃতির নিশ্চয়তা। তাই উচ্চশিক্ষার সত্যিকারের মানোন্নয়ন চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন, স্থায়ী ক্যাম্পাস গঠন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যায় নয়, বরং শিক্ষার্থীর মর্যাদা রক্ষায়। কারণ যেখানে সমাবর্তন অনুপস্থিত, সেখানে স্বপ্নের স্বীকৃতিও অপূর্ণ থেকে যায়—আর সেই অপূর্ণতাই একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।