আবারও অস্থির হচ্ছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক পরিস্থিতিকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী ‘তাতমাদাও’-এর মধ্যে চলমান যুদ্ধ যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কক্সবাজার–টেকনাফ সীমান্ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকাগুলোতে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— এই অঞ্চলের শত শত বাংলাদেশি পাহাড়ি যুবক আরাকান আর্মির পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা আধুনিক অস্ত্রসহ দেশে ফিরে আসছে। সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। যুদ্ধফেরত এসব যুবক ভবিষ্যতে সংঘবদ্ধ অপরাধ বা সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তাদের মতে, সীমান্ত পেরিয়ে এর অভিঘাত পড়ছে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। এই পরিস্থিতি দেশের পর্যটন জেলা কক্সবাজার–টেকনাফ এলাকাকে একটি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ নিরাপত্তা অঞ্চলে পরিণত করেছে।
প্রতিবেদনে যা আছে
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ড্রোন হামলা, সশস্ত্র সংঘর্ষ, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধমূলক তৎপরতা উদ্বেগজনক আকার ধারণ করতে পারে। প্রতিবেদনটি সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থায় প্রেরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে নতুন করে মিয়ানমার নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতার সুপারিশ করা হয়েছে।
ড্রোন হামলায় যুদ্ধপ্রযুক্তির বিস্তার
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ৬ জানুয়ারি রাখাইন রাজ্যের সিত্তে টাউনশিপের থেইন তান এলাকায় আরাকান আর্মি ড্রোন ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অবস্থানে বোমা হামলা চালায়। এতে অন্তত আট থেকে ১০ জন সেনা আহত হন। বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন ব্যবহারের অর্থ হলো আরাকান আর্মি এখন কেবল স্থানীয় গেরিলা গোষ্ঠী নয়, বরং একটি আধুনিক বিদ্রোহী বাহিনীতে রূপ নিচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।
রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন বনাম আরাকান আর্মি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ জানুয়ারি মংডু জেলার টে চং ও গদুরা বাজার এলাকায় আরাকান আর্মির ক্যাম্পে হামলা চালায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন ‘এআরএ’ ও ‘ইসলামিক আল-মাহাজ’। এই হামলায় আরাকান আর্মির ছয় সদস্য এবং একজন এআরএ সদস্য নিহত হন। একই দিনে রাথেডাউংয়ের কু লার চং এলাকায় আরাকান আর্মি ও আরসা সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘর্ষ রোহিঙ্গা সমাজকে আরও বিভক্ত করছে। একদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে সমঝোতায় থাকা কিছু গোষ্ঠী, অন্যদিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া সশস্ত্র সংগঠনগুলোর এই দ্বন্দ্বে শেষপর্যন্ত ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। তাদের মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত সীমান্তে অস্থিরতা বাড়াবে এবং বাংলাদেশে নতুন করে অনুপ্রবেশের চাপ তৈরি করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক বলেন, ‘রাখাইনের সংঘাত এখন আর শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশকে জড়িয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে’। তার মতে, ‘একদিকে আরাকান আর্মির শক্তি বৃদ্ধি, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিভক্তি— এই পরিস্থিতিতে সাধারণ রোহিঙ্গারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। যুদ্ধ তীব্র হলে নতুন করে শরণার্থী ঢল নামার আশঙ্কা বাস্তব।’
‘বাংলাদেশকে এখানে খুব সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানবিক প্রস্তুতি— সবকিছু একসঙ্গে নিতে হবে। নইলে সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠবে’— বলেন এই গবেষক।

ডেস্ক রিপোর্ট 























