ঢাকা ১১:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রোজা ও তারাবির ফজিলত : আধুনিক বিজ্ঞান ও আত্মিক পুনর্গঠনের সম্মিলিত মহাকাব্য

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৭:৩৯:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: পবিত্র মাহে রমজান এ যেন সময়ের বুকজুড়ে অবতীর্ণ এক নূরানী অধ্যায়; যেখানে আসমান ও জমিনের মাঝখানে খুলে যায় রহমতের দরজা, আর মানুষের অন্তরজগতে শুরু হয় এক মহিমান্বিত পুনর্গঠন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুশাসনের মাস নয়; এটি আত্মার শুদ্ধি, চেতনার জাগরণ এবং মানবসত্তার গভীরতম স্তরে নবায়নের এক অনন্য মহাকাব্য।

দিনের বেলায় সিয়াম সংযমের দীপ্ত সাধনা। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার আগুনে দগ্ধ হয়ে নফসের অহংকার ভেঙে যায়, আত্মা পায় স্বচ্ছতা। বাহ্যিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে অন্তর লাভ করে পরিপূর্ণতা। আর রাতের নিস্তব্ধতায় তারাবি দীর্ঘ কিয়ামের প্রশান্ত আরাধনা। কুরআনের তিলাওয়াতের সুরে, রুকু-সিজদার বিনম্রতায়, অশ্রুসিক্ত দোয়ায় একজন মুমিন নিজেকে বিলিয়ে দেয় মহান রবের দরবারে। রমজান যেন এক বার্ষিক আত্মসমীক্ষার আয়না যেখানে মানুষ নিজেকে দেখে, ভুলগুলো ঝেড়ে ফেলে, আর তাকওয়ার আলোয় নতুন পথ রচনা করে। এই মাসে সিয়াম ও কিয়াম একসঙ্গে গড়ে তোলে আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা; দিন শেখায় ধৈর্য, রাত শেখায় নিবেদন। অদ্ভুতভাবে, আধুনিক বিজ্ঞানও আজ এই সংযম ও সাধনার ভেতরে খুঁজে পাচ্ছে দেহ-মন পুনর্গঠনের ইঙ্গিত। দীর্ঘ সময় উপবাস শরীরে জাগিয়ে তোলে ‘অটোফ্যাজি’—যে প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত কোষ সরিয়ে নতুন কোষ গঠনে সহায়তা করে; আর রাতের ধীর-লয়ের ইবাদত মস্তিষ্কে প্রশান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়, কমায় মানসিক চাপ, বাড়ায় মনোসংযোগ। অর্থাৎ, রমজান কেবল আত্মার জাগরণ নয়—এ যেন দেহ ও মনেরও নবজন্ম।

তারাবি: বিশ্রামের মাঝে ইবাদতের দীপ্তি : ‘তারাবি’ শব্দটি আরবি ‘তারবিহা’ থেকে আগত, যার অর্থ বিশ্রাম বা আরাম। চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়ার কারণে এই নামাজের এমন নামকরণ। কিন্তু এই বিশ্রাম কেবল দেহের নয়; এটি আত্মারও বিশ্রাম—পাপের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার বিরাম। ইশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর এবং বিতরের আগে দুই রাকাত করে মোট ২০ রাকাত যে নামাজ আদায় করা হয়, তাকেই শরিয়তের পরিভাষায় তারাবি বলা হয়। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা—গুরুত্বের দিক থেকে ওয়াজিবের নিকটবর্তী। ওজর ছাড়া তা পরিত্যাগ করা গুনাহের কাজ।

নবীজির আমল ও সাহাবিদের ঐতিহ্য : তারাবির ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর যুগে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম–এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি (সা.) কয়েক রাত জামাতে তারাবি আদায় করেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে কিয়ামুল্লাইলের এই অপূর্ব ইবাদতে শরিক হন। কিন্তু চতুর্থ রাতে তিনি বের হননি। কারণ জিজ্ঞাসা করলে জানান—তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এটি উম্মতের ওপর ফরজ করে দেওয়া হতে পারে। তাঁর ইন্তেকালের পর খিলাফতের যুগে মুসলিম সমাজে তারাবির জামাত পুনরায় সুসংগঠিত হয়। হজরত উমর (রা.) মুসল্লিদের একজন কারীর পেছনে একত্রিত করেন, যাতে কুরআনের তিলাওয়াতের মাধ্যমে রমজানের রাতগুলো হয় ঐক্যবদ্ধ ইবাদতের আলোকমালা।

তারাবির ফজিলত: গুনাহমুক্তির সুবর্ণ সুযোগ : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,“যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)।
এই হাদিসের মর্ম হলো—যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে এবং কেবল তাঁর সন্তুষ্টির আশায় রমজানের রাতে নামাজ, তিলাওয়াত ও জিকিরে মশগুল থাকবে, আল্লাহ তার সগিরা গুনাহ ক্ষমা করবেন। কবিরা গুনাহের জন্য প্রয়োজন খালেস তওবা। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রমজানে দিনের সিয়াম ও রাতের কিয়াম মিলিয়ে একজন মুমিন এমন পবিত্র হয়ে যায়, যেমন নবজাতক শিশু মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়।

কুরআনের মাসে কুরআনের সঙ্গে সংযোগ : পবিত্র রমজান হলো আল কুরআন নাজিলের মাস। মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, “রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির পথনির্দেশক হিসেবে…” (সূরা বাকারা: ১৮৫)।
তারাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন খতম। আমাদের দেশে দুই ধরনের তারাবি প্রচলিত—সুরা তারাবি ও খতম তারাবি। উভয় পদ্ধতিই শরিয়তসম্মত। তবে খতম তারাবিতে সম্পূর্ণ কুরআন শ্রবণের সৌভাগ্য হয়, যা রমজানের রূহানিয়াতকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে।

তারাবির নিয়ম ও নিয়ত : তারাবি দুই রাকাত করে আদায় করা হয়। প্রতি চার রাকাত পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া সুন্নত। এই বিরতিতে দোয়া, দরুদ, তাসবিহ ও ইস্তেগফার পাঠ করা উত্তম। নিয়ত আরবিতে করা বাধ্যতামূলক নয়। অন্তরের দৃঢ় সংকল্পই আসল নিয়ত। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কেবলামুখী হয়ে তারাবির সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ আদায়ের সংকল্প করলেই নিয়ত সম্পূর্ণ হয়। আমাদের দেশে প্রচলিত একটি দোয়া রয়েছে যা চার রাকাত পর পড়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে, এই দোয়া তারাবির শুদ্ধতার শর্ত নয়। যে কোনো সহিহ দোয়া, ইস্তেগফার বা কুরআনের আয়াত পাঠ করাই উত্তম।

রোজা ও তারাবি: আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক বিস্ময় : রমজান কেবল ইবাদতের ঋতু নয়; এটি মানুষের দেহ–মন–আত্মার সমন্বিত পুনর্জাগরণের এক অপূর্ব অধ্যায়। দিনের সিয়াম ও রাতের কিয়াম মিলিয়ে রমজান গড়ে তোলে এক সুশৃঙ্খল, সংযমী ও আত্মনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা। কুরআনের ভাষায় এটি তাকওয়া অর্জনের মাস; আর আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এটি শারীরিক পুনর্গঠন ও মানসিক স্থিতির এক অনন্য অনুশীলন। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, রোজা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি মানবদেহের জন্য গভীর উপকারী একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

নিচে পবিত্র রোজা ও তারাবির নামাজের বৈজ্ঞানিক উপকারিতাগুলো আরও বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো ১. অটোফ্যাজি ও কোষ পুনর্গঠন: দেহের অন্তর্গত পরিশুদ্ধি: দীর্ঘ সময় খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকার ফলে শরীরে যে প্রক্রিয়াটি সক্রিয় হয়, তাকে বলা হয় অটোফ্যাজি—অর্থাৎ ‘নিজেকে নিজে পরিষ্কার করা’। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত, অকার্যকর কোষগুলো ভেঙে নতুন কোষ গঠনের উপাদান তৈরি হয়। জাপানের বিজ্ঞানী Yoshinori Ohsumi অটোফ্যাজি প্রক্রিয়া নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য ২০১৬ সালে Nobel Prize in Physiology or Medicine লাভ করেন। তাঁর গবেষণায় প্রমাণিত হয়, উপবাস কোষের পুনর্গঠন ও বার্ধক্য বিলম্বিত করতে সহায়ক। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত উপবাস—যেমন রমজানের রোজা—দেহের কোষকে পুনরুজ্জীবিত করে, প্রদাহ কমায় এবং কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। ২. বিপাকীয় ভারসাম্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণ: দেহের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা : রোজা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় না খাওয়ার ফলে শরীর জমে থাকা চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা হয়। রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে। ‘মেটাবলিক সিনড্রোম’-এর ঝুঁকি কমে, অনেক পুষ্টিবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক আজ ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’-এর উপকারিতার কথা বলছেন, যা রোজার নীতির সঙ্গে অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত উপবাস হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তচাপ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।
৩. মানসিক প্রশান্তি ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রভাব : রমজানের রাতের তারাবি নামাজ কেবল ইবাদত নয়; এটি একধরনের ধ্যানমগ্ন শারীরিক অনুশীলন। দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো, রুকু ও সিজদায় ধীরগতির পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া—এসব মস্তিষ্কে প্রশান্তির বার্তা পাঠায়। গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত প্রার্থনা ও ধ্যান কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) কমায়। মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। তারাবির সময় কুরআন তিলাওয়াতের ধীর ছন্দময় ধ্বনি মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ সক্রিয় করতে পারে, যা গভীর প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আবেগ, কৃতজ্ঞতা ও আত্মসম্মানবোধ বাড়ায়।
৪. হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও রক্তসঞ্চালন : তারাবির নামাজে বারবার দাঁড়ানো, রুকু ও সিজদা করা একধরনের হালকা কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়ামের মতো কাজ করে। এতে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। জয়েন্টের নমনীয়তা বাড়ে। পেশির কার্যকারিতা উন্নত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা জীবনযাত্রার তুলনায় এ ধরনের নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী।
৫. ঘুমের শৃঙ্খলা ও জৈবিক ঘড়ির সামঞ্জস্য : রমজানে সাহরি ও তারাবির কারণে জীবনযাত্রায় একটি সুশৃঙ্খল সময়সূচি তৈরি হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ও জাগরণ শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়িকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সহায়তা করে। রাতের শেষভাগে জাগ্রত থাকা ও প্রার্থনা করা মানসিক স্থিতি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জাগরণ মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করতে পারে।


৬. আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আচরণগত পরিবর্তন : রোজা মানুষকে শেখায় সংযম—খাদ্য, ক্রোধ, কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকার অনুশীলন। আচরণবিজ্ঞানীরা বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বেচ্ছায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে আত্মশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি বাড়ায়। রমজান তাই কেবল শরীরের প্রশিক্ষণ নয়; এটি চরিত্র গঠনেরও এক মহাসাধনা।
৭. সামাজিক সংযোগ ও মানসিক সুস্থতা : ইফতার, তারাবির জামাত ও সম্মিলিত ইবাদত সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। সামাজিক সংযোগ মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ধর্মীয় বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন, তাদের মধ্যে একাকিত্ব ও হতাশার হার তুলনামূলক কম।

আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের সমন্বয় : রমজানের রোজা ও তারাবি প্রমাণ করে ধর্মীয় অনুশাসন কেবল আখিরাতমুখী নয়; দুনিয়াতেও তার গভীর কল্যাণ রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান আজ যে উপবাসের উপকারিতা তুলে ধরছে, ইসলাম তা চৌদ্দ শতাব্দী আগেই মানবজাতিকে শিখিয়েছে। রোজা দেহকে শুদ্ধ করে, তারাবি আত্মাকে আলোকিত করে। একটি আমাদের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় ভার দূর করে, অন্যটি অন্তরের অন্ধকার সরিয়ে দেয়। রমজান তাই কেবল ইবাদতের মাস নয়; এটি মানবজীবনের এক সামগ্রিক পুনর্গঠন যেখানে আত্মা পায় নূর, মন পায় প্রশান্তি, আর শরীর পায় নবজীবনের শক্তি।

তারাবি: কিয়ামুল্লাইলের এক উজ্জ্বল রূপ : তারাবি মূলত কিয়ামুল্লাইলের অন্তর্ভুক্ত। কেউ চাইলে ২০ রাকাতের বেশি নফল পড়তে পারেন। পরবর্তী সময়ে তাহাজ্জুদ আদায় করে বিতর নামাজের মাধ্যমে রাতের ইবাদত সমাপ্ত করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহতায়ালা বান্দার নিকটতম আকাশে অবতরণ করে আহ্বান করেন, “কে আছে, যে আমাকে ডাকবে—আমি তার ডাকে সাড়া দেব?” (সহিহ বুখারি)। এই আহ্বান কেবল শব্দ নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক নিমন্ত্রণ পাপমোচনের, ক্ষমাপ্রার্থনার এবং আত্মশুদ্ধির।

ভুল ধারণা ও সঠিক উপলব্ধি : সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত তারাবি না পড়লে রোজা নষ্ট হয়। কুরআন-হাদিসে এমন কোনো কথা নেই। রোজা ও তারাবি দুটি পৃথক ইবাদত। তারাবি না পড়লে রোজা ভঙ্গ হয় না; তবে নামাজ পরিত্যাগের গুনাহ আলাদা। এছাড়া চার রাকাত পর নির্দিষ্ট দোয়া পড়া বাধ্যতামূলক এ ধারণাও সঠিক নয়। ইবাদতের সৌন্দর্য হলো আন্তরিকতা ও খুশু-খুজু।

সামাজিক ঐক্য ও সামষ্টিক প্রভাব : তারাবির জামাত মুসলিম সমাজে ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কুরআনের সুরে রমজানের রাতকে আলোকিত করে। এই সামষ্টিক ইবাদত সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও নৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করে। একজন মানুষ যখন নিয়মিত তারাবি আদায় করেন, তখন তাঁর চরিত্রে সংযম, ধৈর্য ও নম্রতা বৃদ্ধি পায়। কারণ দীর্ঘ সময় আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মানুষকে অহংকারমুক্ত করে।

রমজান: আত্মার পুনর্জাগরণের মহাকাব্য : রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধা কেবল দেহের নয়, আত্মারও। সিয়াম আমাদের সংযম শেখায়, তারাবি শেখায় ধৈর্য ও অধ্যবসায়। দিনভর না খেয়ে থাকা যেমন দেহকে শুদ্ধ করে, তেমনি রাতভর কিয়াম আত্মাকে পবিত্র করে। এই মাসে যে ব্যক্তি নিজেকে বদলাতে পারে না, তার জন্য পরিবর্তনের আর কী সময় অবশিষ্ট থাকে? রমজান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি যেখানে মুমিন শিখে নেয় তাকওয়া, শিখে নেয় আত্মনিয়ন্ত্রণ, শিখে নেয় বিনয়।

পরিশেষে, নূরের পথে প্রত্যাবর্তন : রমজানের তারাবি কেবল ২০ রাকাত নামাজ নয়; এটি আলোর দিকে প্রত্যাবর্তন। এটি আত্মার সঙ্গে স্রষ্টার এক নীরব সংলাপ। কুরআনের তিলাওয়াত যখন রাতের নীরবতায় ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয়—দুনিয়ার সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেছে, কেবল বান্দা ও রবের সম্পর্কই সেখানে মুখ্য। আসুন, আমরা এই রমজানে রোজার পাশাপাশি তারাবিকে জীবনের অপরিহার্য অংশ বানাই। ফরজ ইবাদতের সঙ্গে নফল ইবাদতের সৌন্দর্য যুক্ত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে ইমানের সঙ্গে, খুশু-খুজুর সঙ্গে তারাবি আদায় করার তাওফিক দান করুন; রোজার মাধ্যমে দেহকে, আর তারাবির মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার শক্তি দিন। আমিন।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুমকিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভারসাম্যহীন বিধবার বসতঘর পুড়ে ছাই

রোজা ও তারাবির ফজিলত : আধুনিক বিজ্ঞান ও আত্মিক পুনর্গঠনের সম্মিলিত মহাকাব্য

প্রকাশিত : ০৭:৩৯:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: পবিত্র মাহে রমজান এ যেন সময়ের বুকজুড়ে অবতীর্ণ এক নূরানী অধ্যায়; যেখানে আসমান ও জমিনের মাঝখানে খুলে যায় রহমতের দরজা, আর মানুষের অন্তরজগতে শুরু হয় এক মহিমান্বিত পুনর্গঠন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুশাসনের মাস নয়; এটি আত্মার শুদ্ধি, চেতনার জাগরণ এবং মানবসত্তার গভীরতম স্তরে নবায়নের এক অনন্য মহাকাব্য।

দিনের বেলায় সিয়াম সংযমের দীপ্ত সাধনা। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার আগুনে দগ্ধ হয়ে নফসের অহংকার ভেঙে যায়, আত্মা পায় স্বচ্ছতা। বাহ্যিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে অন্তর লাভ করে পরিপূর্ণতা। আর রাতের নিস্তব্ধতায় তারাবি দীর্ঘ কিয়ামের প্রশান্ত আরাধনা। কুরআনের তিলাওয়াতের সুরে, রুকু-সিজদার বিনম্রতায়, অশ্রুসিক্ত দোয়ায় একজন মুমিন নিজেকে বিলিয়ে দেয় মহান রবের দরবারে। রমজান যেন এক বার্ষিক আত্মসমীক্ষার আয়না যেখানে মানুষ নিজেকে দেখে, ভুলগুলো ঝেড়ে ফেলে, আর তাকওয়ার আলোয় নতুন পথ রচনা করে। এই মাসে সিয়াম ও কিয়াম একসঙ্গে গড়ে তোলে আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা; দিন শেখায় ধৈর্য, রাত শেখায় নিবেদন। অদ্ভুতভাবে, আধুনিক বিজ্ঞানও আজ এই সংযম ও সাধনার ভেতরে খুঁজে পাচ্ছে দেহ-মন পুনর্গঠনের ইঙ্গিত। দীর্ঘ সময় উপবাস শরীরে জাগিয়ে তোলে ‘অটোফ্যাজি’—যে প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত কোষ সরিয়ে নতুন কোষ গঠনে সহায়তা করে; আর রাতের ধীর-লয়ের ইবাদত মস্তিষ্কে প্রশান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়, কমায় মানসিক চাপ, বাড়ায় মনোসংযোগ। অর্থাৎ, রমজান কেবল আত্মার জাগরণ নয়—এ যেন দেহ ও মনেরও নবজন্ম।

তারাবি: বিশ্রামের মাঝে ইবাদতের দীপ্তি : ‘তারাবি’ শব্দটি আরবি ‘তারবিহা’ থেকে আগত, যার অর্থ বিশ্রাম বা আরাম। চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়ার কারণে এই নামাজের এমন নামকরণ। কিন্তু এই বিশ্রাম কেবল দেহের নয়; এটি আত্মারও বিশ্রাম—পাপের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার বিরাম। ইশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর এবং বিতরের আগে দুই রাকাত করে মোট ২০ রাকাত যে নামাজ আদায় করা হয়, তাকেই শরিয়তের পরিভাষায় তারাবি বলা হয়। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা—গুরুত্বের দিক থেকে ওয়াজিবের নিকটবর্তী। ওজর ছাড়া তা পরিত্যাগ করা গুনাহের কাজ।

নবীজির আমল ও সাহাবিদের ঐতিহ্য : তারাবির ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর যুগে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম–এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি (সা.) কয়েক রাত জামাতে তারাবি আদায় করেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে কিয়ামুল্লাইলের এই অপূর্ব ইবাদতে শরিক হন। কিন্তু চতুর্থ রাতে তিনি বের হননি। কারণ জিজ্ঞাসা করলে জানান—তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এটি উম্মতের ওপর ফরজ করে দেওয়া হতে পারে। তাঁর ইন্তেকালের পর খিলাফতের যুগে মুসলিম সমাজে তারাবির জামাত পুনরায় সুসংগঠিত হয়। হজরত উমর (রা.) মুসল্লিদের একজন কারীর পেছনে একত্রিত করেন, যাতে কুরআনের তিলাওয়াতের মাধ্যমে রমজানের রাতগুলো হয় ঐক্যবদ্ধ ইবাদতের আলোকমালা।

তারাবির ফজিলত: গুনাহমুক্তির সুবর্ণ সুযোগ : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,“যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)।
এই হাদিসের মর্ম হলো—যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে এবং কেবল তাঁর সন্তুষ্টির আশায় রমজানের রাতে নামাজ, তিলাওয়াত ও জিকিরে মশগুল থাকবে, আল্লাহ তার সগিরা গুনাহ ক্ষমা করবেন। কবিরা গুনাহের জন্য প্রয়োজন খালেস তওবা। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রমজানে দিনের সিয়াম ও রাতের কিয়াম মিলিয়ে একজন মুমিন এমন পবিত্র হয়ে যায়, যেমন নবজাতক শিশু মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়।

কুরআনের মাসে কুরআনের সঙ্গে সংযোগ : পবিত্র রমজান হলো আল কুরআন নাজিলের মাস। মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, “রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির পথনির্দেশক হিসেবে…” (সূরা বাকারা: ১৮৫)।
তারাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন খতম। আমাদের দেশে দুই ধরনের তারাবি প্রচলিত—সুরা তারাবি ও খতম তারাবি। উভয় পদ্ধতিই শরিয়তসম্মত। তবে খতম তারাবিতে সম্পূর্ণ কুরআন শ্রবণের সৌভাগ্য হয়, যা রমজানের রূহানিয়াতকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে।

তারাবির নিয়ম ও নিয়ত : তারাবি দুই রাকাত করে আদায় করা হয়। প্রতি চার রাকাত পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া সুন্নত। এই বিরতিতে দোয়া, দরুদ, তাসবিহ ও ইস্তেগফার পাঠ করা উত্তম। নিয়ত আরবিতে করা বাধ্যতামূলক নয়। অন্তরের দৃঢ় সংকল্পই আসল নিয়ত। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কেবলামুখী হয়ে তারাবির সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ আদায়ের সংকল্প করলেই নিয়ত সম্পূর্ণ হয়। আমাদের দেশে প্রচলিত একটি দোয়া রয়েছে যা চার রাকাত পর পড়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে, এই দোয়া তারাবির শুদ্ধতার শর্ত নয়। যে কোনো সহিহ দোয়া, ইস্তেগফার বা কুরআনের আয়াত পাঠ করাই উত্তম।

রোজা ও তারাবি: আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক বিস্ময় : রমজান কেবল ইবাদতের ঋতু নয়; এটি মানুষের দেহ–মন–আত্মার সমন্বিত পুনর্জাগরণের এক অপূর্ব অধ্যায়। দিনের সিয়াম ও রাতের কিয়াম মিলিয়ে রমজান গড়ে তোলে এক সুশৃঙ্খল, সংযমী ও আত্মনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা। কুরআনের ভাষায় এটি তাকওয়া অর্জনের মাস; আর আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এটি শারীরিক পুনর্গঠন ও মানসিক স্থিতির এক অনন্য অনুশীলন। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, রোজা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি মানবদেহের জন্য গভীর উপকারী একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

নিচে পবিত্র রোজা ও তারাবির নামাজের বৈজ্ঞানিক উপকারিতাগুলো আরও বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো ১. অটোফ্যাজি ও কোষ পুনর্গঠন: দেহের অন্তর্গত পরিশুদ্ধি: দীর্ঘ সময় খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকার ফলে শরীরে যে প্রক্রিয়াটি সক্রিয় হয়, তাকে বলা হয় অটোফ্যাজি—অর্থাৎ ‘নিজেকে নিজে পরিষ্কার করা’। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত, অকার্যকর কোষগুলো ভেঙে নতুন কোষ গঠনের উপাদান তৈরি হয়। জাপানের বিজ্ঞানী Yoshinori Ohsumi অটোফ্যাজি প্রক্রিয়া নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য ২০১৬ সালে Nobel Prize in Physiology or Medicine লাভ করেন। তাঁর গবেষণায় প্রমাণিত হয়, উপবাস কোষের পুনর্গঠন ও বার্ধক্য বিলম্বিত করতে সহায়ক। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত উপবাস—যেমন রমজানের রোজা—দেহের কোষকে পুনরুজ্জীবিত করে, প্রদাহ কমায় এবং কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। ২. বিপাকীয় ভারসাম্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণ: দেহের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা : রোজা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় না খাওয়ার ফলে শরীর জমে থাকা চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা হয়। রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে। ‘মেটাবলিক সিনড্রোম’-এর ঝুঁকি কমে, অনেক পুষ্টিবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক আজ ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’-এর উপকারিতার কথা বলছেন, যা রোজার নীতির সঙ্গে অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত উপবাস হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তচাপ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।
৩. মানসিক প্রশান্তি ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রভাব : রমজানের রাতের তারাবি নামাজ কেবল ইবাদত নয়; এটি একধরনের ধ্যানমগ্ন শারীরিক অনুশীলন। দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো, রুকু ও সিজদায় ধীরগতির পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া—এসব মস্তিষ্কে প্রশান্তির বার্তা পাঠায়। গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত প্রার্থনা ও ধ্যান কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) কমায়। মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। তারাবির সময় কুরআন তিলাওয়াতের ধীর ছন্দময় ধ্বনি মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ সক্রিয় করতে পারে, যা গভীর প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আবেগ, কৃতজ্ঞতা ও আত্মসম্মানবোধ বাড়ায়।
৪. হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও রক্তসঞ্চালন : তারাবির নামাজে বারবার দাঁড়ানো, রুকু ও সিজদা করা একধরনের হালকা কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়ামের মতো কাজ করে। এতে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। জয়েন্টের নমনীয়তা বাড়ে। পেশির কার্যকারিতা উন্নত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা জীবনযাত্রার তুলনায় এ ধরনের নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী।
৫. ঘুমের শৃঙ্খলা ও জৈবিক ঘড়ির সামঞ্জস্য : রমজানে সাহরি ও তারাবির কারণে জীবনযাত্রায় একটি সুশৃঙ্খল সময়সূচি তৈরি হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ও জাগরণ শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়িকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সহায়তা করে। রাতের শেষভাগে জাগ্রত থাকা ও প্রার্থনা করা মানসিক স্থিতি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জাগরণ মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করতে পারে।


৬. আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আচরণগত পরিবর্তন : রোজা মানুষকে শেখায় সংযম—খাদ্য, ক্রোধ, কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকার অনুশীলন। আচরণবিজ্ঞানীরা বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বেচ্ছায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে আত্মশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি বাড়ায়। রমজান তাই কেবল শরীরের প্রশিক্ষণ নয়; এটি চরিত্র গঠনেরও এক মহাসাধনা।
৭. সামাজিক সংযোগ ও মানসিক সুস্থতা : ইফতার, তারাবির জামাত ও সম্মিলিত ইবাদত সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। সামাজিক সংযোগ মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ধর্মীয় বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন, তাদের মধ্যে একাকিত্ব ও হতাশার হার তুলনামূলক কম।

আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের সমন্বয় : রমজানের রোজা ও তারাবি প্রমাণ করে ধর্মীয় অনুশাসন কেবল আখিরাতমুখী নয়; দুনিয়াতেও তার গভীর কল্যাণ রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান আজ যে উপবাসের উপকারিতা তুলে ধরছে, ইসলাম তা চৌদ্দ শতাব্দী আগেই মানবজাতিকে শিখিয়েছে। রোজা দেহকে শুদ্ধ করে, তারাবি আত্মাকে আলোকিত করে। একটি আমাদের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় ভার দূর করে, অন্যটি অন্তরের অন্ধকার সরিয়ে দেয়। রমজান তাই কেবল ইবাদতের মাস নয়; এটি মানবজীবনের এক সামগ্রিক পুনর্গঠন যেখানে আত্মা পায় নূর, মন পায় প্রশান্তি, আর শরীর পায় নবজীবনের শক্তি।

তারাবি: কিয়ামুল্লাইলের এক উজ্জ্বল রূপ : তারাবি মূলত কিয়ামুল্লাইলের অন্তর্ভুক্ত। কেউ চাইলে ২০ রাকাতের বেশি নফল পড়তে পারেন। পরবর্তী সময়ে তাহাজ্জুদ আদায় করে বিতর নামাজের মাধ্যমে রাতের ইবাদত সমাপ্ত করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহতায়ালা বান্দার নিকটতম আকাশে অবতরণ করে আহ্বান করেন, “কে আছে, যে আমাকে ডাকবে—আমি তার ডাকে সাড়া দেব?” (সহিহ বুখারি)। এই আহ্বান কেবল শব্দ নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক নিমন্ত্রণ পাপমোচনের, ক্ষমাপ্রার্থনার এবং আত্মশুদ্ধির।

ভুল ধারণা ও সঠিক উপলব্ধি : সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত তারাবি না পড়লে রোজা নষ্ট হয়। কুরআন-হাদিসে এমন কোনো কথা নেই। রোজা ও তারাবি দুটি পৃথক ইবাদত। তারাবি না পড়লে রোজা ভঙ্গ হয় না; তবে নামাজ পরিত্যাগের গুনাহ আলাদা। এছাড়া চার রাকাত পর নির্দিষ্ট দোয়া পড়া বাধ্যতামূলক এ ধারণাও সঠিক নয়। ইবাদতের সৌন্দর্য হলো আন্তরিকতা ও খুশু-খুজু।

সামাজিক ঐক্য ও সামষ্টিক প্রভাব : তারাবির জামাত মুসলিম সমাজে ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কুরআনের সুরে রমজানের রাতকে আলোকিত করে। এই সামষ্টিক ইবাদত সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও নৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করে। একজন মানুষ যখন নিয়মিত তারাবি আদায় করেন, তখন তাঁর চরিত্রে সংযম, ধৈর্য ও নম্রতা বৃদ্ধি পায়। কারণ দীর্ঘ সময় আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মানুষকে অহংকারমুক্ত করে।

রমজান: আত্মার পুনর্জাগরণের মহাকাব্য : রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধা কেবল দেহের নয়, আত্মারও। সিয়াম আমাদের সংযম শেখায়, তারাবি শেখায় ধৈর্য ও অধ্যবসায়। দিনভর না খেয়ে থাকা যেমন দেহকে শুদ্ধ করে, তেমনি রাতভর কিয়াম আত্মাকে পবিত্র করে। এই মাসে যে ব্যক্তি নিজেকে বদলাতে পারে না, তার জন্য পরিবর্তনের আর কী সময় অবশিষ্ট থাকে? রমজান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি যেখানে মুমিন শিখে নেয় তাকওয়া, শিখে নেয় আত্মনিয়ন্ত্রণ, শিখে নেয় বিনয়।

পরিশেষে, নূরের পথে প্রত্যাবর্তন : রমজানের তারাবি কেবল ২০ রাকাত নামাজ নয়; এটি আলোর দিকে প্রত্যাবর্তন। এটি আত্মার সঙ্গে স্রষ্টার এক নীরব সংলাপ। কুরআনের তিলাওয়াত যখন রাতের নীরবতায় ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয়—দুনিয়ার সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেছে, কেবল বান্দা ও রবের সম্পর্কই সেখানে মুখ্য। আসুন, আমরা এই রমজানে রোজার পাশাপাশি তারাবিকে জীবনের অপরিহার্য অংশ বানাই। ফরজ ইবাদতের সঙ্গে নফল ইবাদতের সৌন্দর্য যুক্ত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে ইমানের সঙ্গে, খুশু-খুজুর সঙ্গে তারাবি আদায় করার তাওফিক দান করুন; রোজার মাধ্যমে দেহকে, আর তারাবির মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার শক্তি দিন। আমিন।