ঢাকা ১২:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬

নতুন সরকারের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা: নিরাপদ হোক ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৫:৪৮:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
  • ৩০ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: ঈদ বাঙালির জীবনে আনন্দ, ভালোবাসা এবং পারিবারিক মিলনের এক অনন্য উৎসব। সারা বছর জীবিকার তাগিদে শহরের ব্যস্ত জীবনে ছুটে চলা মানুষগুলো ঈদের সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করে। এই সময়েই তারা ফিরে যেতে চায় শৈশবের সেই পরিচিত গ্রামে, মা-বাবার স্নেহমাখা ছায়ায়, আপনজনদের সান্নিধ্যে। তাই ঈদযাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি এবং পারিবারিক বন্ধনের এক গভীর প্রতীক। কিন্তু যখন সেই আনন্দময় যাত্রা আতঙ্কের রূপ নেয়, যখন প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল, তখন সেই যাত্রা আর আনন্দের থাকে না; হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের প্রতীক। দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক আজ অনেকটা তেমনই এক বাস্তবতার নাম। প্রতি ঈদেই এই সড়ক ধরে হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফেরেন, কিন্তু তাদের অনেকের মনে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগই বেশি কাজ করে – এই পথ কি নিরাপদ? দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আশা করছে ঈদের আগেই অন্তত জরুরি ভিত্তিতে এই মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো মেরামত করে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হবে। কারণ একটি সড়কের নিরাপত্তা কেবল উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণরেখা : ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে মাদারীপুর, বরিশাল এবং পর্যটন নগরী কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এই ছয়টি জেলার মানুষ রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রধানত এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের বিশাল জনগোষ্ঠীরও প্রধান যাতায়াতপথ এটি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই মহাসড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণাঞ্চল দেশের অন্যতম কৃষি উৎপাদন অঞ্চল। এখানকার ধান, মাছ, সবজি এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রতিদিন এই সড়কপথেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে কুয়াকাটা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। ফলে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও এই সড়কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পদ্মা সেতুর সুফল, কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি : পদ্মা সেতু চালুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সেতু দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
কিন্তু পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুফল পেতে হলে সংযোগ মহাসড়কগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ করা অত্যন্ত জরুরি। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের অনেক অংশ এখনো সংকীর্ণ, ভাঙাচোরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন এই মহাসড়কে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বড় অংশ এখনো মাত্র ১৮ থেকে ২৪ ফুট প্রশস্ত। ফলে দুই দিক থেকে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

ভাঙ্গা থেকে বরিশাল: দুর্ভোগের দীর্ঘ পথ : ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ৯৭ কিলোমিটার পথের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক।
অনেক জায়গায় রাস্তার বিটুমিন উঠে গিয়ে নিচের সুরকি বেরিয়ে এসেছে। কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তা দেবে গিয়ে অসমান হয়ে গেছে। বরিশালের কাশীপুর চৌমাথা থেকে রহমতপুর, গৌরনদীর জয়শ্রী থেকে কাশেমাবাদ এবং মাদারীপুরের ভুরঘাটা থেকে মস্তফাপুর পর্যন্ত অংশে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। এই গর্তগুলো অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে ঢেকে যায়। ফলে চালকেরা বুঝতেই পারেন না কোথায় গভীর গর্ত রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা বা ছোট যানবাহনের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক বাস্তবতা : বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশেই গত ছয় মাসে প্রায় ৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়কের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই পুরো মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে থাকে, যা আহতদের জন্য আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক, ভয়ংকর বাঁকের ফাঁদ :
ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের পাশাপাশি বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। পটুয়াখালীর শাখারিয়া থেকে বরগুনার আমতলী উপজেলার বান্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মহাসড়কে রয়েছে ১৭টি ভয়ংকর বাঁক। এই বাঁকগুলোতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। গত ছয় মাসে এখানে শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
অনেক বাঁকে কোনো কার্যকর সংকেতচিহ্ন নেই। কোথাও থাকা সংকেতগুলোও বিবর্ণ হয়ে গেছে। রাতের বেলায় চালকেরা বুঝতেই পারেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে।
বাসচালকরা বলছেন, বড় বাঁকগুলোতে কনভেক্স মিরর বা উন্নত সতর্কসংকেত স্থাপন করা হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

নিম্নমানের সংস্কার ও দুর্নীতির অভিযোগ : স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের অভিযোগ—মাঝেমধ্যে সড়ক সংস্কার করা হলেও তা বেশিদিন টেকে না। ইট, বালু ও সুরকি দিয়ে সাময়িকভাবে গর্ত ভরাট করা হয়, কিন্তু প্রথম বৃষ্টিতেই তা আবার উঠে যায়। অনেকে অভিযোগ করছেন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একজন পরিবহন ব্যবসায়ীর কথায় “সরকারের টাকা যায়, কিন্তু দুর্ভোগ কমে না।” এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে তা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়—মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি অবিচার।

পুরোনো সড়ক, নতুন চাপ : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাসড়কের মূল অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল প্রায় ১৯৬০–৬৫ সালের দিকে, যখন যানবাহনের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। তখন মাত্র পাঁচ টন বহনক্ষমতার জন্য পরিকল্পিত ছিল এই সড়ক। পরবর্তী সময়ে দুই পাশে কিছুটা প্রশস্ত করা হলেও মূল কাঠামোগত সক্ষমতা তেমন বাড়েনি। কিন্তু গত কয়েক দশকে যানবাহনের সংখ্যা কয়েকশ গুণ বেড়ে গেছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর সেই চাপ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বহু প্রতীক্ষিত ছয় লেন প্রকল্প : ২০১৫ সালে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আজও অপেক্ষা করছে কবে শুরু হবে এই মহাসড়কের প্রকৃত উন্নয়ন।

ঈদযাত্রা: আনন্দ না আতঙ্ক? ঈদের সময় এই সড়কে যাত্রীসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেকেই রাতের বেলা যাত্রা করেন। কিন্তু তখন সড়কের গর্ত, সংকীর্ণতা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যাত্রীরা বলছেন, বরিশাল থেকে ঢাকার পথে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি হয় মাদারীপুর অংশে প্রবেশ করার পর। বাসের যাত্রী ঝালকাঠির নলছিটি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সভাপতি মাহমুদা বেগম পাখির কথায়, “বাসে উঠলেই মাথা ব্যথা শুরু হয়। একটু পরপর গর্ত, কখনো ডানে, কখনো বামে। মনে হয় কখন যে দুর্ঘটনা ঘটে!” এই বাস্তবতা কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সুখকর নয়।

 

অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য : এই মহাসড়কের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ধীরগতির অবৈধ যানবাহন। মাহেন্দ্র, , ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এসব যানবাহন প্রায়ই মহাসড়কে চলাচল করে। দ্রুতগতির বাস বা ট্রাক যখন এসব যানবাহনকে অতিক্রম করতে যায়, তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত অভিযান থাকলেও এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

কেন দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি : ঈদের সময় এই মহাসড়কে যাত্রীসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ একই সময়ে যাতায়াত করেন। ফলে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এ কারণে ঈদের আগে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
সরকারের জন্য আমার পক্ষ থেকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশ : ১. ঈদের আগেই মহাসড়কের বড় গর্তগুলো টেকসইভাবে মেরামত করা। ২. ঈদের সময় চলমান নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা। ৩. ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে কনভেক্স মিরর ও প্রতিফলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা। ৪. সোলার লাইট ও পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ৫. মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ৬. হাইওয়ে পুলিশের বিশেষ টহল জোরদার করা।
৭. গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি স্থাপন করা। ৮. অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি উদ্ধার টিম প্রস্তুত রাখা। ৯. ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। ১০. দীর্ঘমেয়াদে মহাসড়ককে চার বা ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ দ্রুত শুরু করা।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান : দীর্ঘমেয়াদে ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, বাণিজ্য এবং পর্যটনের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে কুয়াকাটা আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

পরিশেষে, একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম সূচক হলো তার সড়কব্যবস্থা। যদি মানুষের যাতায়াতের পথই অনিরাপদ হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি সড়ক নয়; এটি তাদের আশা, স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার প্রতীক। ঈদ সামনে। লাখো মানুষ আবারও এই সড়ক ধরে প্রিয়জনের কাছে ফিরবে। তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয় তারা শুধু নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাতে চায়। তাই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের পক্ষ থেকে নতুন সরকারের প্রতি বিনীত আহ্বান, প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঈদের আগেই ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ‘মরণফাঁদ’ থেকে মুক্ত করে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হবে। কারণ একটি নিরাপদ সড়ক মানে শুধু উন্নয়ন নয় এটি মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকার।

নতুন সরকারের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা: নিরাপদ হোক ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক

প্রকাশিত : ০৫:৪৮:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: ঈদ বাঙালির জীবনে আনন্দ, ভালোবাসা এবং পারিবারিক মিলনের এক অনন্য উৎসব। সারা বছর জীবিকার তাগিদে শহরের ব্যস্ত জীবনে ছুটে চলা মানুষগুলো ঈদের সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করে। এই সময়েই তারা ফিরে যেতে চায় শৈশবের সেই পরিচিত গ্রামে, মা-বাবার স্নেহমাখা ছায়ায়, আপনজনদের সান্নিধ্যে। তাই ঈদযাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি এবং পারিবারিক বন্ধনের এক গভীর প্রতীক। কিন্তু যখন সেই আনন্দময় যাত্রা আতঙ্কের রূপ নেয়, যখন প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল, তখন সেই যাত্রা আর আনন্দের থাকে না; হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের প্রতীক। দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক আজ অনেকটা তেমনই এক বাস্তবতার নাম। প্রতি ঈদেই এই সড়ক ধরে হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফেরেন, কিন্তু তাদের অনেকের মনে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগই বেশি কাজ করে – এই পথ কি নিরাপদ? দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আশা করছে ঈদের আগেই অন্তত জরুরি ভিত্তিতে এই মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো মেরামত করে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হবে। কারণ একটি সড়কের নিরাপত্তা কেবল উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণরেখা : ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে মাদারীপুর, বরিশাল এবং পর্যটন নগরী কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এই ছয়টি জেলার মানুষ রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রধানত এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের বিশাল জনগোষ্ঠীরও প্রধান যাতায়াতপথ এটি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই মহাসড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণাঞ্চল দেশের অন্যতম কৃষি উৎপাদন অঞ্চল। এখানকার ধান, মাছ, সবজি এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রতিদিন এই সড়কপথেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে কুয়াকাটা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। ফলে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও এই সড়কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পদ্মা সেতুর সুফল, কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি : পদ্মা সেতু চালুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সেতু দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
কিন্তু পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুফল পেতে হলে সংযোগ মহাসড়কগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ করা অত্যন্ত জরুরি। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের অনেক অংশ এখনো সংকীর্ণ, ভাঙাচোরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন এই মহাসড়কে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বড় অংশ এখনো মাত্র ১৮ থেকে ২৪ ফুট প্রশস্ত। ফলে দুই দিক থেকে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

ভাঙ্গা থেকে বরিশাল: দুর্ভোগের দীর্ঘ পথ : ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ৯৭ কিলোমিটার পথের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক।
অনেক জায়গায় রাস্তার বিটুমিন উঠে গিয়ে নিচের সুরকি বেরিয়ে এসেছে। কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তা দেবে গিয়ে অসমান হয়ে গেছে। বরিশালের কাশীপুর চৌমাথা থেকে রহমতপুর, গৌরনদীর জয়শ্রী থেকে কাশেমাবাদ এবং মাদারীপুরের ভুরঘাটা থেকে মস্তফাপুর পর্যন্ত অংশে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। এই গর্তগুলো অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে ঢেকে যায়। ফলে চালকেরা বুঝতেই পারেন না কোথায় গভীর গর্ত রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা বা ছোট যানবাহনের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক বাস্তবতা : বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশেই গত ছয় মাসে প্রায় ৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়কের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই পুরো মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে থাকে, যা আহতদের জন্য আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক, ভয়ংকর বাঁকের ফাঁদ :
ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের পাশাপাশি বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। পটুয়াখালীর শাখারিয়া থেকে বরগুনার আমতলী উপজেলার বান্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মহাসড়কে রয়েছে ১৭টি ভয়ংকর বাঁক। এই বাঁকগুলোতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। গত ছয় মাসে এখানে শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
অনেক বাঁকে কোনো কার্যকর সংকেতচিহ্ন নেই। কোথাও থাকা সংকেতগুলোও বিবর্ণ হয়ে গেছে। রাতের বেলায় চালকেরা বুঝতেই পারেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে।
বাসচালকরা বলছেন, বড় বাঁকগুলোতে কনভেক্স মিরর বা উন্নত সতর্কসংকেত স্থাপন করা হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

নিম্নমানের সংস্কার ও দুর্নীতির অভিযোগ : স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের অভিযোগ—মাঝেমধ্যে সড়ক সংস্কার করা হলেও তা বেশিদিন টেকে না। ইট, বালু ও সুরকি দিয়ে সাময়িকভাবে গর্ত ভরাট করা হয়, কিন্তু প্রথম বৃষ্টিতেই তা আবার উঠে যায়। অনেকে অভিযোগ করছেন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একজন পরিবহন ব্যবসায়ীর কথায় “সরকারের টাকা যায়, কিন্তু দুর্ভোগ কমে না।” এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে তা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়—মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি অবিচার।

পুরোনো সড়ক, নতুন চাপ : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাসড়কের মূল অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল প্রায় ১৯৬০–৬৫ সালের দিকে, যখন যানবাহনের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। তখন মাত্র পাঁচ টন বহনক্ষমতার জন্য পরিকল্পিত ছিল এই সড়ক। পরবর্তী সময়ে দুই পাশে কিছুটা প্রশস্ত করা হলেও মূল কাঠামোগত সক্ষমতা তেমন বাড়েনি। কিন্তু গত কয়েক দশকে যানবাহনের সংখ্যা কয়েকশ গুণ বেড়ে গেছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর সেই চাপ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বহু প্রতীক্ষিত ছয় লেন প্রকল্প : ২০১৫ সালে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আজও অপেক্ষা করছে কবে শুরু হবে এই মহাসড়কের প্রকৃত উন্নয়ন।

ঈদযাত্রা: আনন্দ না আতঙ্ক? ঈদের সময় এই সড়কে যাত্রীসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেকেই রাতের বেলা যাত্রা করেন। কিন্তু তখন সড়কের গর্ত, সংকীর্ণতা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যাত্রীরা বলছেন, বরিশাল থেকে ঢাকার পথে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি হয় মাদারীপুর অংশে প্রবেশ করার পর। বাসের যাত্রী ঝালকাঠির নলছিটি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সভাপতি মাহমুদা বেগম পাখির কথায়, “বাসে উঠলেই মাথা ব্যথা শুরু হয়। একটু পরপর গর্ত, কখনো ডানে, কখনো বামে। মনে হয় কখন যে দুর্ঘটনা ঘটে!” এই বাস্তবতা কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সুখকর নয়।

 

অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য : এই মহাসড়কের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ধীরগতির অবৈধ যানবাহন। মাহেন্দ্র, , ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এসব যানবাহন প্রায়ই মহাসড়কে চলাচল করে। দ্রুতগতির বাস বা ট্রাক যখন এসব যানবাহনকে অতিক্রম করতে যায়, তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত অভিযান থাকলেও এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

কেন দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি : ঈদের সময় এই মহাসড়কে যাত্রীসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ একই সময়ে যাতায়াত করেন। ফলে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এ কারণে ঈদের আগে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
সরকারের জন্য আমার পক্ষ থেকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশ : ১. ঈদের আগেই মহাসড়কের বড় গর্তগুলো টেকসইভাবে মেরামত করা। ২. ঈদের সময় চলমান নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা। ৩. ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে কনভেক্স মিরর ও প্রতিফলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা। ৪. সোলার লাইট ও পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ৫. মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ৬. হাইওয়ে পুলিশের বিশেষ টহল জোরদার করা।
৭. গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি স্থাপন করা। ৮. অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি উদ্ধার টিম প্রস্তুত রাখা। ৯. ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। ১০. দীর্ঘমেয়াদে মহাসড়ককে চার বা ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ দ্রুত শুরু করা।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান : দীর্ঘমেয়াদে ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, বাণিজ্য এবং পর্যটনের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে কুয়াকাটা আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

পরিশেষে, একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম সূচক হলো তার সড়কব্যবস্থা। যদি মানুষের যাতায়াতের পথই অনিরাপদ হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি সড়ক নয়; এটি তাদের আশা, স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার প্রতীক। ঈদ সামনে। লাখো মানুষ আবারও এই সড়ক ধরে প্রিয়জনের কাছে ফিরবে। তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয় তারা শুধু নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাতে চায়। তাই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের পক্ষ থেকে নতুন সরকারের প্রতি বিনীত আহ্বান, প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঈদের আগেই ঢাকা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ককে ‘মরণফাঁদ’ থেকে মুক্ত করে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হবে। কারণ একটি নিরাপদ সড়ক মানে শুধু উন্নয়ন নয় এটি মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকার।