ঢাকা ০৫:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

চুয়াডাঙ্গায় খুচরা বাজারে কলার দাম বাড়লেও প্রভাব পড়েনি পাইকারি হাটে

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:১২:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
  • ৯ বার দেখা হয়েছে

রমজান মাস জুড়ে খুচরা বাজারে কলার দাম বাড়লেও চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বদরগঞ্জ দশমাইল কলার হাটে তার তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতি কাঁদি কলার দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে সরবরাহ ও বেচাকেনা আগের তুলনায় প্রায় দশগুণ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারপরও ভালো দাম পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখানে কলা নিয়ে আসছেন। বর্তমানে প্রতি হাটে প্রায় ৫-৭ লাখ টাকার বেশি কলা কেনাবেচা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বদরগঞ্জ বাজারে অবস্থিত দশমাইল কলার হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে হাট জমে উঠেছে। এখানে চিনি চাঁপা, বগুড়া সবরি, মেহের সাগর, কাঁঠালি ও বাইশছড়িসহ বিভিন্ন জাতের কলা বিক্রি হচ্ছে। জাত ও কাঁদির আকারভেদে প্রতি কাঁদি কলা ৩৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

সপ্তাহে দুই দিন—বৃহস্পতিবার ও রোববার—এই হাট বসে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। চুয়াডাঙ্গা ছাড়াও মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এখানে কলা নিয়ে আসেন। এখান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সপ্তাহে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ট্রাক কলা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন।

স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলের কলার মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাহিদা রয়েছে। এক কলাচাষি জানান, চুয়াডাঙ্গার প্রায় সব এলাকার কৃষকই এ হাটে কলা নিয়ে আসেন। রমজান মাসে দাম ভালো থাকায় তারা কিছুটা লাভবান হচ্ছেন। আশা করা হচ্ছে, চলতি মৌসুমের বড় অংশের কলা এখান থেকেই বিক্রি হয়ে যাবে।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বদরগঞ্জ কলার হাট। প্রায় তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করা এ হাট একসময় জেলার অন্যতম বড় কলা বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন চুয়াডাঙ্গায় উৎপাদিত অমৃতসাগর, সবরি ও চিনি চাঁপা জাতের কলা দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করেছিল। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা এসে ট্রাকভর্তি কলা কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যেতেন।

তবে সময়ের পরিবর্তনে অমৃতসাগর জাতের কলা প্রায় হারিয়ে গেছে এবং হাটের আগের সেই জৌলুসও অনেকটা কমেছে। আগে সপ্তাহে দুই দিনে প্রায় ১ কোটি টাকার বেশি কলা কেনাবেচা হলেও বর্তমানে তা কমে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরোজগঞ্জের দত্তাইল গ্রামের কলা ব্যবসায়ী হযরত আলী জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের ক্ষেত থেকে কলা কিনে বদরগঞ্জ হাটে এনে বিক্রি করেন। এই ব্যবসাই তার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

হাটে আসা অনেক ব্যবসায়ী এখান থেকে কলা কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের বাজারে বিক্রি করেন। মাহাম্মুজমা গ্রামের রনি ও বাগুন্দা গ্রামের শহিদ জানান, তারা নিয়মিত এখান থেকে কলা কিনে ঢাকার বাজারে বিক্রি করেন এবং এতে ভালো লাভ হয়।

তবে কলা চাষে নানা সমস্যার কথাও জানিয়েছেন কৃষকেরা। তাদের মতে, ঝড়-বাতাসে প্রায়ই কলাগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি গাছে ফল ধরতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। এছাড়া রোগবালাইয়ের কারণেও অনেক সময় ফলন কমে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না।

এই হাটের সূচনার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী জানান, ১৯৯০ সালের দিকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে তিনি বদরগঞ্জ কলার হাটটি চালু করেছিলেন। সে সময় ঢাকার ব্যবসায়ীদের এনে এখান থেকে কলা কিনে ট্রাকে করে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে বর্তমানে আগের মতো জমজমাট না থাকায় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ মিন্টু বলেন, “বদরগঞ্জ কলার হাট একসময় জেলার গর্ব ছিল। আমরা আবার সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য হাটের পরিসর বাড়ানো ও পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

চুয়াডাঙ্গা শহরের কাঠপট্টি এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী এবং দামুড়হুদা উপজেলার পুড়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন আলী বলেন, “বাইশছড়ি জাতের এক কাঁদি কলা ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছি। প্রতি কাঁদিতে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ছড়ি থাকে এবং প্রতি ছড়িতে ১৮ থেকে ২০টি কলা পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি হালি কলা ৪০ টাকা দরে বিক্রি করছি।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হলে বদরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দশমাইল কলার হাট আবারও আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রণতরীতে আগুন

চুয়াডাঙ্গায় খুচরা বাজারে কলার দাম বাড়লেও প্রভাব পড়েনি পাইকারি হাটে

প্রকাশিত : ১০:১২:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

রমজান মাস জুড়ে খুচরা বাজারে কলার দাম বাড়লেও চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী বদরগঞ্জ দশমাইল কলার হাটে তার তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতি কাঁদি কলার দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে সরবরাহ ও বেচাকেনা আগের তুলনায় প্রায় দশগুণ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারপরও ভালো দাম পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখানে কলা নিয়ে আসছেন। বর্তমানে প্রতি হাটে প্রায় ৫-৭ লাখ টাকার বেশি কলা কেনাবেচা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বদরগঞ্জ বাজারে অবস্থিত দশমাইল কলার হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে হাট জমে উঠেছে। এখানে চিনি চাঁপা, বগুড়া সবরি, মেহের সাগর, কাঁঠালি ও বাইশছড়িসহ বিভিন্ন জাতের কলা বিক্রি হচ্ছে। জাত ও কাঁদির আকারভেদে প্রতি কাঁদি কলা ৩৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

সপ্তাহে দুই দিন—বৃহস্পতিবার ও রোববার—এই হাট বসে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। চুয়াডাঙ্গা ছাড়াও মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এখানে কলা নিয়ে আসেন। এখান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সপ্তাহে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ট্রাক কলা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন।

স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলের কলার মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাহিদা রয়েছে। এক কলাচাষি জানান, চুয়াডাঙ্গার প্রায় সব এলাকার কৃষকই এ হাটে কলা নিয়ে আসেন। রমজান মাসে দাম ভালো থাকায় তারা কিছুটা লাভবান হচ্ছেন। আশা করা হচ্ছে, চলতি মৌসুমের বড় অংশের কলা এখান থেকেই বিক্রি হয়ে যাবে।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বদরগঞ্জ কলার হাট। প্রায় তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করা এ হাট একসময় জেলার অন্যতম বড় কলা বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন চুয়াডাঙ্গায় উৎপাদিত অমৃতসাগর, সবরি ও চিনি চাঁপা জাতের কলা দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করেছিল। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা এসে ট্রাকভর্তি কলা কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যেতেন।

তবে সময়ের পরিবর্তনে অমৃতসাগর জাতের কলা প্রায় হারিয়ে গেছে এবং হাটের আগের সেই জৌলুসও অনেকটা কমেছে। আগে সপ্তাহে দুই দিনে প্রায় ১ কোটি টাকার বেশি কলা কেনাবেচা হলেও বর্তমানে তা কমে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরোজগঞ্জের দত্তাইল গ্রামের কলা ব্যবসায়ী হযরত আলী জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের ক্ষেত থেকে কলা কিনে বদরগঞ্জ হাটে এনে বিক্রি করেন। এই ব্যবসাই তার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

হাটে আসা অনেক ব্যবসায়ী এখান থেকে কলা কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের বাজারে বিক্রি করেন। মাহাম্মুজমা গ্রামের রনি ও বাগুন্দা গ্রামের শহিদ জানান, তারা নিয়মিত এখান থেকে কলা কিনে ঢাকার বাজারে বিক্রি করেন এবং এতে ভালো লাভ হয়।

তবে কলা চাষে নানা সমস্যার কথাও জানিয়েছেন কৃষকেরা। তাদের মতে, ঝড়-বাতাসে প্রায়ই কলাগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি গাছে ফল ধরতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। এছাড়া রোগবালাইয়ের কারণেও অনেক সময় ফলন কমে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না।

এই হাটের সূচনার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী জানান, ১৯৯০ সালের দিকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে তিনি বদরগঞ্জ কলার হাটটি চালু করেছিলেন। সে সময় ঢাকার ব্যবসায়ীদের এনে এখান থেকে কলা কিনে ট্রাকে করে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে বর্তমানে আগের মতো জমজমাট না থাকায় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ মিন্টু বলেন, “বদরগঞ্জ কলার হাট একসময় জেলার গর্ব ছিল। আমরা আবার সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য হাটের পরিসর বাড়ানো ও পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

চুয়াডাঙ্গা শহরের কাঠপট্টি এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী এবং দামুড়হুদা উপজেলার পুড়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন আলী বলেন, “বাইশছড়ি জাতের এক কাঁদি কলা ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছি। প্রতি কাঁদিতে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ছড়ি থাকে এবং প্রতি ছড়িতে ১৮ থেকে ২০টি কলা পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি হালি কলা ৪০ টাকা দরে বিক্রি করছি।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হলে বদরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দশমাইল কলার হাট আবারও আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।