মেঘনা প্রতিনিধি: কুমিলার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন নিজেই রোগী। ৫০ শয্যার সরকারি এ হাসপাতালে প্রতিদিন বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে শত শত রুগী আসে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব। চিকিৎসক ও নার্স সংকট। নেই নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা। হাসপাতালের অবন্তরে মাদকসেবী ও বখাটেদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন রোগীর চাপ অনুযায়ী চিকিৎসক ও নার্স সংকট রয়েছে। ফলে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৪০০-৫০০ শত রোগী থাকে। এছাড়া জরুরি বিভাগে শতাধিক ও ভর্তি থাকে অসংখ। এখানে জুনিয়র কিসালট্যান্ট (সার্জারী) ১ টি পদ থাকরেও এই পদটি দির্ঘ দিন যাবত খালি পরে আছে। আবাসিক মেডিকেল অফিসার, মেডিকেল অফিসার এর ১টি পদ খালি পরে আছে। ২৫ জন সিনিয়র নার্স থাকার নিয়ম থাকলেও দিনে রাতে দায়িত্ব পালন করছে ১৯ জন বর্তমারে ১৯ জনের মধ্যে ছুটিতে আছেন ৬ জন। মোট ৭৭জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছে ৪৭ জন। আবার কেউ কেউ আছেন ছুটিতে। এসব কারণে মেঘনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিৎসক ও নার্স সংকট থাকার কারণে একদিকে রোগীরা সেবা পাচ্ছে না; অপরদিকে উপস্থিত চিকিৎসক ও নার্সরা তাদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সরেজমিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে দেখা যায়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। এছাড়া মশা, মাছি ও বিড়ালের উৎপাত যেন লেগেই আছে। দিনের বেলাতেও মশার যন্ত্রণা পোহাতে হয় রোগীদের। এসব থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় আছে কিনা জানা নেই তাদের। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্সসহ কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে এসে চাকরি করছেন। ফলে অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বখাটেদের তেমন কিছুই বলতে পারেন না। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এসব বখাটে ও মাদকসেবীরা মোবাইল চুরি করা থেকে শুরু করে সুযোগ বুঝে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে থাকে হাসপাতালে। এছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত কেবিনে বৈদ্যুতিক ফ্যান ও পানির সমস্যায় পড়তে হয় প্রতিনিয়ত। গোসলখানা ও বাথরুমে অধিকাংশ সময় পানি থাকে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের জুলাই মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য অনুমোদন চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। অথচ অনুমোদন ছাড়াই বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ৫০ শয্যার ভিত্তিতে। ৫০ শয্যা তো দূরের কথা, বিদ্যমান ৩১ শয্যার জন্যও নতুন কোনো চিকিৎসক কিংবা নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে হাসপাতালটির আউটডোর বিভাগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো রোগী এবং ইনডোরে গড়ে প্রায় ৪০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। হাসপাতালটিতে ৩১ শয্যার জন্য ১৬ জন চিকিৎসকের পদ অনুমোদিত থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। ফলে অধিকাংশ চিকিৎসকের পদসহ অন্যান্য পদে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এরমধ্যে অফিস সহায়ক, আয়া/ক্লিনার, এম্বুলেন্স ড্রাইভার, স্টোর কিপার, কোষাধ্যক্ষ, উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, আবাসিক মেডিকেল অফিসার, সনোলজিষ্ট এবং মেডিসিন ও সার্জারী বিভাগের কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বর্তমানে কর্মরত নেই। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির ৭৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৭ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ২১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪ জন। অন্যান্য ক্যাটাগরির পদে কর্মরত আছেন ২৪ জন। সব মিলিয়ে হাসপাতালটির মোট ১০৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৪০ জন, আর বাকি পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এর মধ্যেও ২ জন শিক্ষা ছুটিতে এবং ২ জন মাতৃকালীন ছুটিতে অবস্থান করছেন। প্রতি মাসে হাসপাতালটিতে শতাধিক স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হলেও তীব্র চিকিৎসক সংকটের কারণে সিজারিয়ান ও অন্যান্য মাইনর অপারেশন প্রায়ই সীমিত পরিসরে করতে হচ্ছে। এতে প্রসূতি নারী ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জীবনঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা বাধ্য হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা অন্যত্র রেফার হতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে ৩১ শয্যার জন্য নির্ধারিত খাদ্য বরাদ্দ দিয়েই ৫০ শয্যার রোগীদের খাবার সরবরাহ করায় খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়েও রোগীর স্বজনদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা বড় সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আওলাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য একদিন সকালে এসে আমাকে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে ডাক্তার অন্য রোগীদের দেখেশুনা শেষ করে এসে আমার রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করান। ডাক্তার সংকটের কারণে এখানে রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়মা রহমান বলেন, “উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পর্যাপ্ত না থাকায় জরুরি বিভাগে বহিরাগত রোগীদের সন্তোষজনক সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অনেক সময় আমাদের ভুল বুঝে থাকেন। এছাড়াও আউটসোর্সিং কর্মীদের দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বেতন দিতে পারছি না, সেজন্য হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। তবে জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও সীমিত সক্ষমতা নিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য পদে জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 























