ঢাকা ১১:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান: একুশ শতকের বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। চাকরিক্ষেত্রে কোটা সুবিধার যৌক্তিক সংস্কার, রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবায়ন, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর জন্য এই অভ্যুত্থানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জুলাই মাসে কী ঘটেছিল, তা বোঝার জন্য শুরুতে অনেকের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এর মিল খোঁজা। জুলাই আন্দোলন কেবল একটি আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা ক্ষোভ, হতাশা ও গণতন্ত্রের দাবির এক অগ্নিঝরা প্রতিফলন। ২০০৮ সালে সামরিক ছাউনি নিয়ন্ত্রিত প্রশ্নবিদ্ধ ভোটে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার ধীরে ধীরে প্রতিহিংসাপরায়ণতা, লুটপাট-দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়। নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি, আমলা-পুলিশের চাটুকারিতা, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর তৈরি হওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে সব অপকর্ম এই সব মিলিয়ে জনমনে এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে বিরোধী দলকে মাঠের বাইরে রেখে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালে ‘দিনের ভোট রাতে’ করার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং ২০২৪ সালে ‘আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ’-এর ডামি ভোটের মাধ্যমে আরেক মেয়াদে ক্ষমতা দখল এই ধারাবাহিকতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

কোটা সংস্কার থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর : ২০২৪ সালের ১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ধীরে ধীরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’ রূপ নেয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত ‘জুলাই বিদ্রোহে’ রূপ নেবে এটা ছিল কল্পনাতীত। সরকার প্রতিবাদকারীদের কঠোরভাবে দমন করতে চাইলে পরিস্থিতি বিদ্রোহে রূপ নেয়। জুলাই-আগস্ট মাসের এই আন্দোলন শুধু একটি দাবি পূরণের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের জনসাধারণের ন্যায়সংগত, যৌক্তিক ও মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এক অবিস্মরণীয় দুর্দমনীয় বৈপ্লবিক উৎক্ষেপ। এই আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ভিন্নধর্মী বাস্তবতা দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরবিরোধী আদর্শে অবস্থান নেওয়া ডানপন্থী ও বামপন্থী বিভিন্ন শক্তিকে একই আন্দোলনের পরিসরে দেখা যায়, যা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

রক্তাক্ত জুলাই: শহীদদের আত্মত্যাগ : স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার অসম সাহসিকতার ভেতর দিয়ে জুলাই আন্দোলনের যে দাবানল বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে। ১৬ জুলাই এমন একটি দিন, যখন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে কলেজশিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ কমপক্ষে ৬ জন শহীদ হয়েছিলেন। আবু সাঈদের বুকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। কোটা সংস্কারের দাবি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে মোড় নেয়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসক দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

দুই সহস্রাধিক শহীদ: দ্বিতীয় স্বাধীনতার মূল্য : দুই সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার শাহাদতের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। সরকারি হিসাব মোতাবেক আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা হাজারের কম হলেও প্রকৃতপক্ষে তা হাজারেরও ওপরে। এই বিজয় অর্জন এতটা সহজ ছিল না; দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে আগ্নেয়গিরির লাভা উত্তপ্ত হতে হতে মহাবিস্ফোরণে অগ্ন্যুৎপাতে উদ্গিরিত হয়েছে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই, ৫ আগস্টের দিপ্রহরে। ১৬ জুলাই ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস। শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, শোক আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং দেশে সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সারাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

অভ্যুত্থানের দুই সাফল্য : আমাদের এই গণঅভ্যুত্থান দাঁড়িয়ে আছে দুটি সাফল্য নিয়ে। প্রথমটি হলো গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অত্যাচারী ও আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সরকারের পতন হয়েছে। অন্য সফলতাটি হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ সামাজিক বিষণ্নতা কাটিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে চাচ্ছে বহু কাঙ্ক্ষিত অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে। মূলত আন্দোলনের সূত্রপাত চাকরিক্ষেত্রে কোটা সুবিধার যৌক্তিক সংস্কার নিয়ে হলেও মানুষের মূল চাহিদা ছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন অর্থাৎ স্বৈরশাসনের অবসান। ইউনূস থেকে তারেক রহমান: গণতন্ত্রের পথে যাত্রা : মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশা, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং গণতন্ত্রের দাবি একত্রিত হয়ে একটি ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে প্রথমে ইউনূস সরকারের উত্থান ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা ও সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এবছর ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। জনগণের মধ্যে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করছে।

দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ : ২০২৬ সালের জুলাই মাসে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর, তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অর্জনসমূহ: ১. কোটা সংস্কার বাস্তবায়ন: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে, যা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল। ২. বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার: সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
৩. দুর্নীতি দমন: জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে স্বৈরাচারী সরকারের দুর্নীতি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। ৪. নির্বাচনী সংস্কার: ২০২৫ সালের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫. গণহত্যার বিচার: জুলাই আন্দোলনে গণহত্যা চালানো রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা ও ক্যাডারদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলমান চ্যালেঞ্জ: ১. রাজনৈতিক সংস্কার: সংবিধান সংস্কার এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ২. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব কমানো এবং আমদানি-রপ্তানিতে সিন্ডিকেট দূরীকরণের কাজ চলমান। ৩. প্রতিষ্ঠান সংস্কার: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক হুকুমের প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

আমাদের প্রত্যাশা: আগামীর বাংলাদেশ : তারেক রহমান সরকারের সামনে জনগণের প্রত্যাশা এখনো অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। পাঁচ বছর পর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনব্যবস্থা হবে স্বচ্ছ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কিংবা অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাবে বিচার বা প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান বন্ধ করতে হবে। সরকারের প্রতিটি কাজের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখতে হবে। ক্ষমতার কাঠামোকে কেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন আন্দোলনকারীর কণ্ঠ : ২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল রক্তে লেখা গণজাগরণের অধ্যায়, যেখানে ঘামের গন্ধে ভেজা রাজপথে তারুণ্য জেগেছিল। আমি ছিলাম সেই অসংখ্য মানুষের একজন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেবল প্রতিবাদ নয়, এটা ছিল আত্মার জাগরণ। ওই সময়ে মুক্ত পরিবেশে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। সেদিন আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম প্রিয় মাতৃভূমিকে বাঁচাতে। তপ্ত রোদে রাজপথের মিছিলে আমার প্রথম স্লোগান দেওয়ার দিনটার কথা ভাবলে আজও শিহরণ জাগে। আমার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল সাহস আর দৃঢ়চেতা মনোবল। মিছিলে সহযাত্রী হিসেবে থাকা ভাইবোনের চোখে ছিল না ভয়। তাদের ক্ষিপ্র চোখে ছিল আগুন! আমাদের প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি পদক্ষেপ জানান দিচ্ছিল ‘বাংলাদেশ ঘুমিয়ে নেই’। নিরাপত্তা বাহিনীর লাঠির আঘাত, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস কিছুই থামাতে পারেনি আমাদের সেই অগ্নিযুগের পদচারণ। আমাদের আন্দোলন শুধু সরকারের বিরুদ্ধেই ছিল না, এটা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের বিদ্রোহ। আমরা চাইছিলাম এমন একটা দেশ, যেখানে সত্যিকার অর্থেই থাকবে ভোটের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার। যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি সোনালি ভবিষ্যৎ গড়বে।

আমার প্রত্যাশা: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ : আমার প্রত্যাশা খুব বড় কিছু নয় আমি শুধু চাই, বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হোক। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর অন্যদের মতো আমার প্রত্যাশাও বেড়েছে। আমি চাই নতুন মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সরকারের সমালোচনা করা যাবে। যেখানে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে এবং সবাই ন্যায়বিচার পাবে। রাষ্ট্র যেন তার প্রতিটা নাগরিকের কথা গুরুত্বের সঙ্গে শোনে। আমি চাই, বাংলাদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচুক। যার যে বিশ্বাস, তা নিয়েই বেঁচে থাকুক। আমি চাই আগামীর বাংলাদেশ হোক মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও পরমতসহিষ্ণু। বিভেদের বদলে হোক ঐক্য। আমরা যারা জুলাইয়ের যোদ্ধা হয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম, তারা শুধু সরকারের পতন নয়, একটি নতুন বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সবশেষে বলি, আমাদের প্রত্যাশা হলো—যে দল ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাবে, তারা যেন নতুন করে ফ্যাসিস্ট ও রক্তপিপাসু না হয়। তারা যেন অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সবার বাংলাদেশ গড়ে তোলে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধপরিকর।

পরিশেষে বলতে চাই, জুলাই ২০২৪-এর গণআন্দোলন একটি নতুন ভোরের সূচনা করেছে। তবে এই নতুন দিনের আলো টিকিয়ে রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। বিপ্লব-পরবর্তী সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণআন্দোলনের ত্যাগ ও চেতনা ম্লান হয়ে যাবে। একসঙ্গে কাজ করে এবং গণতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই কেবল আমরা একটি উন্নত ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবিচল থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলনই ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন, গুম, খুন, দমন-পীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের শক্তিতেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের মর্যাদা, অধিকার এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করেছে। জুলাইয়ের এই আন্দোলন ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ নিয়ে আশঙ্কা এবং একটি নতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবিকে উন্মোচিত করেছে। এটি আরো দেখিয়েছে, বিশ্বাস বা ধর্মের নীতি এবং ইতিহাস এখনো মানুষের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক সেই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অমর চেতনা আমাদের জন্য কেবল ইতিহাসের গৌরব নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। রাষ্ট্র এবং সমাজে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, সেইসব অকুতোভয় শহীদদের গৌরবময় আত্মত্যাগের পথ ধরে বর্তমানে দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। সকল নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে পারি। আমি আবারও মহান আল্লাহর দরবারে সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন, একটি জিনিস স্পষ্ট বাংলাদেশে মানুষ আবারও বুঝেছে যে পরিবর্তনের আসল শক্তি জনগণের মধ্যেই নিহিত। অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে এক নতুন অনিশ্চয়তাও। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ যেমন অসীম, ঝুঁকিও তেমনি প্রবল। তবে আমরা আশাবাদী শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করে আমরা গড়ে তুলবো প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

লেখক: প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান
ভাইস-চ্যান্সেলর
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

কলাপাড়া চৌকি আদালত আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দিন, সম্পাদক আবুল হোসেন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা

প্রকাশিত : ১০:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান: একুশ শতকের বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। চাকরিক্ষেত্রে কোটা সুবিধার যৌক্তিক সংস্কার, রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবায়ন, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর জন্য এই অভ্যুত্থানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জুলাই মাসে কী ঘটেছিল, তা বোঝার জন্য শুরুতে অনেকের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এর মিল খোঁজা। জুলাই আন্দোলন কেবল একটি আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা ক্ষোভ, হতাশা ও গণতন্ত্রের দাবির এক অগ্নিঝরা প্রতিফলন। ২০০৮ সালে সামরিক ছাউনি নিয়ন্ত্রিত প্রশ্নবিদ্ধ ভোটে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার ধীরে ধীরে প্রতিহিংসাপরায়ণতা, লুটপাট-দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়। নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি, আমলা-পুলিশের চাটুকারিতা, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর তৈরি হওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে সব অপকর্ম এই সব মিলিয়ে জনমনে এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে বিরোধী দলকে মাঠের বাইরে রেখে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালে ‘দিনের ভোট রাতে’ করার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং ২০২৪ সালে ‘আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ’-এর ডামি ভোটের মাধ্যমে আরেক মেয়াদে ক্ষমতা দখল এই ধারাবাহিকতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

কোটা সংস্কার থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর : ২০২৪ সালের ১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ধীরে ধীরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’ রূপ নেয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত ‘জুলাই বিদ্রোহে’ রূপ নেবে এটা ছিল কল্পনাতীত। সরকার প্রতিবাদকারীদের কঠোরভাবে দমন করতে চাইলে পরিস্থিতি বিদ্রোহে রূপ নেয়। জুলাই-আগস্ট মাসের এই আন্দোলন শুধু একটি দাবি পূরণের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের জনসাধারণের ন্যায়সংগত, যৌক্তিক ও মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এক অবিস্মরণীয় দুর্দমনীয় বৈপ্লবিক উৎক্ষেপ। এই আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ভিন্নধর্মী বাস্তবতা দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরবিরোধী আদর্শে অবস্থান নেওয়া ডানপন্থী ও বামপন্থী বিভিন্ন শক্তিকে একই আন্দোলনের পরিসরে দেখা যায়, যা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

রক্তাক্ত জুলাই: শহীদদের আত্মত্যাগ : স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার অসম সাহসিকতার ভেতর দিয়ে জুলাই আন্দোলনের যে দাবানল বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে। ১৬ জুলাই এমন একটি দিন, যখন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে কলেজশিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ কমপক্ষে ৬ জন শহীদ হয়েছিলেন। আবু সাঈদের বুকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। কোটা সংস্কারের দাবি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে মোড় নেয়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসক দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

দুই সহস্রাধিক শহীদ: দ্বিতীয় স্বাধীনতার মূল্য : দুই সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার শাহাদতের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। সরকারি হিসাব মোতাবেক আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা হাজারের কম হলেও প্রকৃতপক্ষে তা হাজারেরও ওপরে। এই বিজয় অর্জন এতটা সহজ ছিল না; দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে আগ্নেয়গিরির লাভা উত্তপ্ত হতে হতে মহাবিস্ফোরণে অগ্ন্যুৎপাতে উদ্গিরিত হয়েছে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই, ৫ আগস্টের দিপ্রহরে। ১৬ জুলাই ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস। শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, শোক আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং দেশে সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সারাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

অভ্যুত্থানের দুই সাফল্য : আমাদের এই গণঅভ্যুত্থান দাঁড়িয়ে আছে দুটি সাফল্য নিয়ে। প্রথমটি হলো গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অত্যাচারী ও আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সরকারের পতন হয়েছে। অন্য সফলতাটি হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ সামাজিক বিষণ্নতা কাটিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে চাচ্ছে বহু কাঙ্ক্ষিত অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে। মূলত আন্দোলনের সূত্রপাত চাকরিক্ষেত্রে কোটা সুবিধার যৌক্তিক সংস্কার নিয়ে হলেও মানুষের মূল চাহিদা ছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন অর্থাৎ স্বৈরশাসনের অবসান। ইউনূস থেকে তারেক রহমান: গণতন্ত্রের পথে যাত্রা : মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশা, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং গণতন্ত্রের দাবি একত্রিত হয়ে একটি ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে প্রথমে ইউনূস সরকারের উত্থান ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা ও সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এবছর ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। জনগণের মধ্যে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করছে।

দেশনায়ক তারেক রহমান সরকারের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ : ২০২৬ সালের জুলাই মাসে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর, তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অর্জনসমূহ: ১. কোটা সংস্কার বাস্তবায়ন: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে, যা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল। ২. বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার: সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
৩. দুর্নীতি দমন: জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে স্বৈরাচারী সরকারের দুর্নীতি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। ৪. নির্বাচনী সংস্কার: ২০২৫ সালের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫. গণহত্যার বিচার: জুলাই আন্দোলনে গণহত্যা চালানো রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা ও ক্যাডারদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলমান চ্যালেঞ্জ: ১. রাজনৈতিক সংস্কার: সংবিধান সংস্কার এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ২. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব কমানো এবং আমদানি-রপ্তানিতে সিন্ডিকেট দূরীকরণের কাজ চলমান। ৩. প্রতিষ্ঠান সংস্কার: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক হুকুমের প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

আমাদের প্রত্যাশা: আগামীর বাংলাদেশ : তারেক রহমান সরকারের সামনে জনগণের প্রত্যাশা এখনো অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। পাঁচ বছর পর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনব্যবস্থা হবে স্বচ্ছ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কিংবা অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাবে বিচার বা প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান বন্ধ করতে হবে। সরকারের প্রতিটি কাজের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখতে হবে। ক্ষমতার কাঠামোকে কেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন আন্দোলনকারীর কণ্ঠ : ২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল রক্তে লেখা গণজাগরণের অধ্যায়, যেখানে ঘামের গন্ধে ভেজা রাজপথে তারুণ্য জেগেছিল। আমি ছিলাম সেই অসংখ্য মানুষের একজন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেবল প্রতিবাদ নয়, এটা ছিল আত্মার জাগরণ। ওই সময়ে মুক্ত পরিবেশে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। সেদিন আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম প্রিয় মাতৃভূমিকে বাঁচাতে। তপ্ত রোদে রাজপথের মিছিলে আমার প্রথম স্লোগান দেওয়ার দিনটার কথা ভাবলে আজও শিহরণ জাগে। আমার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল সাহস আর দৃঢ়চেতা মনোবল। মিছিলে সহযাত্রী হিসেবে থাকা ভাইবোনের চোখে ছিল না ভয়। তাদের ক্ষিপ্র চোখে ছিল আগুন! আমাদের প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি পদক্ষেপ জানান দিচ্ছিল ‘বাংলাদেশ ঘুমিয়ে নেই’। নিরাপত্তা বাহিনীর লাঠির আঘাত, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস কিছুই থামাতে পারেনি আমাদের সেই অগ্নিযুগের পদচারণ। আমাদের আন্দোলন শুধু সরকারের বিরুদ্ধেই ছিল না, এটা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের বিদ্রোহ। আমরা চাইছিলাম এমন একটা দেশ, যেখানে সত্যিকার অর্থেই থাকবে ভোটের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার। যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি সোনালি ভবিষ্যৎ গড়বে।

আমার প্রত্যাশা: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ : আমার প্রত্যাশা খুব বড় কিছু নয় আমি শুধু চাই, বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হোক। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর অন্যদের মতো আমার প্রত্যাশাও বেড়েছে। আমি চাই নতুন মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সরকারের সমালোচনা করা যাবে। যেখানে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে এবং সবাই ন্যায়বিচার পাবে। রাষ্ট্র যেন তার প্রতিটা নাগরিকের কথা গুরুত্বের সঙ্গে শোনে। আমি চাই, বাংলাদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচুক। যার যে বিশ্বাস, তা নিয়েই বেঁচে থাকুক। আমি চাই আগামীর বাংলাদেশ হোক মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও পরমতসহিষ্ণু। বিভেদের বদলে হোক ঐক্য। আমরা যারা জুলাইয়ের যোদ্ধা হয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম, তারা শুধু সরকারের পতন নয়, একটি নতুন বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সবশেষে বলি, আমাদের প্রত্যাশা হলো—যে দল ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাবে, তারা যেন নতুন করে ফ্যাসিস্ট ও রক্তপিপাসু না হয়। তারা যেন অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সবার বাংলাদেশ গড়ে তোলে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধপরিকর।

পরিশেষে বলতে চাই, জুলাই ২০২৪-এর গণআন্দোলন একটি নতুন ভোরের সূচনা করেছে। তবে এই নতুন দিনের আলো টিকিয়ে রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। বিপ্লব-পরবর্তী সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণআন্দোলনের ত্যাগ ও চেতনা ম্লান হয়ে যাবে। একসঙ্গে কাজ করে এবং গণতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই কেবল আমরা একটি উন্নত ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবিচল থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলনই ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন, গুম, খুন, দমন-পীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের শক্তিতেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের মর্যাদা, অধিকার এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করেছে। জুলাইয়ের এই আন্দোলন ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ নিয়ে আশঙ্কা এবং একটি নতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবিকে উন্মোচিত করেছে। এটি আরো দেখিয়েছে, বিশ্বাস বা ধর্মের নীতি এবং ইতিহাস এখনো মানুষের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক সেই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অমর চেতনা আমাদের জন্য কেবল ইতিহাসের গৌরব নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। রাষ্ট্র এবং সমাজে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, সেইসব অকুতোভয় শহীদদের গৌরবময় আত্মত্যাগের পথ ধরে বর্তমানে দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। সকল নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে পারি। আমি আবারও মহান আল্লাহর দরবারে সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন, একটি জিনিস স্পষ্ট বাংলাদেশে মানুষ আবারও বুঝেছে যে পরিবর্তনের আসল শক্তি জনগণের মধ্যেই নিহিত। অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে এক নতুন অনিশ্চয়তাও। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ যেমন অসীম, ঝুঁকিও তেমনি প্রবল। তবে আমরা আশাবাদী শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করে আমরা গড়ে তুলবো প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

লেখক: প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান
ভাইস-চ্যান্সেলর
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।