ঢাকা ০২:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান : রক্তে লেখা জাগরণ, ইতিহাসের বাঁকবদলের অম্লান অধ্যায়

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১১:৩৭:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ১২ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মাস আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা জাতির হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। জুলাই তেমনই এক মাস। এটি আমাদের স্মৃতি, বেদনা, প্রতিরোধ আর পুনর্জাগরণের নাম। এই জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, যখন অন্যায় দীর্ঘ হয়, তখন মানুষের নীরবতা একদিন বজ্রধ্বনিতে রূপ নেয়। যখন বৈষম্য সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে ইতিহাসের অক্ষরখচিত কাগজ। জুলাই তাই কোনো নির্জীব তারিখের সমষ্টি নয়; এটি একটি অনুভব, একটি প্রত্যয়, একটি জাগ্রত চেতনা। এ মাস যেন জাতির বিবেককে প্রশ্ন করে—তুমি কি ন্যায়কে রক্ষা করেছ? তুমি কি মানুষের অধিকারকে সম্মান করেছ? তুমি কি তরুণের স্বপ্নকে মর্যাদা দিয়েছ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, বুক পেতে দিয়েছিল গুলির সামনে, আর ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লিখে দিয়েছিল রক্তমাখা বিজয়ের নতুন অধ্যায়।

আমার শিকড়, আমার অবস্থান : আমি বিএনপির পরিবারের কন্যা। এই পরিচয় আমার কাছে কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়; এটি এক ধরনের দায়, এক ধরনের নৈতিক স্মৃতি। যে পরিবার গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন লালন করে, সেই পরিবারের কন্যা হয়ে জুলাইকে আমি কেবল দর্শকের চোখে দেখি না। আমি দেখি হৃদয়ের গভীরতম কোণে, যেখানে ইতিহাস আর আবেগ একাকার হয়ে যায়। এই অবস্থান আমাকে শিখিয়েছে জনগণের কষ্টকে বুঝতে হয়, মানুষের কান্নাকে শুনতে হয়, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে হয়। আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা, মানুষের রক্তের ঋণ শোধ করা, মানুষের স্বপ্নকে মর্যাদা দেওয়া। সেই জায়গা থেকেই জুলাই আমার কাছে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক এবং নৈতিক—তিন স্তরেই অত্যন্ত গভীর এক অভিজ্ঞতা।

কোটা সংস্কার থেকে গণজাগরণ : আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একটি আপাত প্রশাসনিক দাবিকে কেন্দ্র করে—কোটা সংস্কার। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি ছিল মেধার মর্যাদা, ন্যায়ের দাবি, আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রতিবাদ। তরুণেরা চেয়েছিল, যোগ্যতার মূল্য থাকুক, পরিশ্রমের সম্মান থাকুক, রাষ্ট্র যেন কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বন্দীশালা না হয়ে ওঠে। সেই দাবির মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি বড় প্রশ্ন—এই রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার? নাকি কিছু মানুষের? এ প্রশ্ন যখন রাজপথে উচ্চারিত হলো, তখন তা আর কেবল চাকরির প্রশ্ন রইল না; তা হয়ে উঠল নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন কোটার সীমানা ভেঙে সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিল। আর সেখানেই জন্ম নিল বৃহত্তর গণজাগরণ।

তরুণের চোখে ভবিষ্যৎ : বাংলাদেশের তরুণেরা বারবার প্রমাণ করেছে, তারা কেবল সময়ের ভোক্তা নয়, সময়ের নির্মাতা। জুলাইয়ের আন্দোলনে যেসব তরুণ রাজপথে নেমেছিল, তাদের চোখে ছিল এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন—যেখানে অসমতা থাকবে না, দমন থাকবে না, ভয় থাকবে না, থাকবে কেবল নাগরিক মর্যাদা আর মুক্ত কণ্ঠস্বর। তাদের কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের আগুন, কিন্তু হৃদয়ে ছিল নির্মল আশা। তারা জানত, পথ কঠিন; তবু তারা নেমেছিল, কারণ মৌনতা তখন আর বিকল্প ছিল না। তরুণদের সেই সাহস শুধু নিজেদের প্রজন্মের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্য এক জাগরণের বার্তা বহন করেছিল। এদেশের ইতিহাসে তরুণেরা সবসময়ই নতুন ভোরের বার্তাবাহক। জুলাই সেই সত্যকে আবারও প্রতিষ্ঠা করেছে।

আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া সাহস : আবু সাঈদ এই নামটি শুধু একজন শহীদের নাম নয়, এটি এক প্রতীক। বুক পেতে দেওয়া সেই তরুণের দৃশ্য আজও বাংলাদেশের বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনের ভাষাকে বদলে দিয়েছিল, হৃদয়ের গভীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এক তরুণ যখন নিরস্ত্র হয়ে রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে বুক মেলে দাঁড়ায়, তখন তা আর ব্যক্তিগত সাহস থাকে না; তা হয়ে ওঠে জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। আবু সাঈদের রক্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শোষণ কখনো চিরস্থায়ী হয় না। অন্যায় যতই বড় হোক, মানুষের ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা আরও বড়। সেই রক্তই আমাদের বলে—শহীদের জীবন ব্যর্থ যায় না, যদি তার নাম ধরে একটি জাতি জেগে ওঠে। জুলাইয়ের হৃদয়ে আবু সাঈদের নাম তাই অমলিন।

রাজপথে রক্ত, হৃদয়ে আগুন : প্রথমে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ, সংযত, দাবি-নির্ভর। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সংলাপের বদলে দমন বেছে নেয়, তখন আন্দোলনের চরিত্রও বদলে যায়। গুলি, লাঠি, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ভয়—এসবই জনতার হৃদয়ে জমে থাকা ক্ষোভকে আগুনে পরিণত করে। মানুষ বুঝে যায়, অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ালে আর কেউই নিরাপদ নয়। রাজপথ তখন কেবল চলাচলের স্থান ছিল না; সেটি ছিল রক্তের সাক্ষী, অশ্রুর সাক্ষী, সাহসের সাক্ষী। প্রতিটি ধাওয়া, প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি আহত মুখ যেন একেকটি করে ইতিহাসের বাক্য হয়ে উঠেছিল। মানুষ শিখেছিল—ভয়কে জয় করাই আসল বিজয়। আর সেই বিজয়ের বীজ জুলাইতেই বপন হয়েছিল।

সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ : জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল এর সর্বজনীনতা। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষক, শ্রমিক, অভিভাবক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখক, শিল্পী—সবাই এই আন্দোলনের অন্তর্গত হয়ে উঠেছিল। সমাজের নানা স্তরের মানুষ একই দাবিতে, একই প্রত্যয়ে, একই যন্ত্রণায় রাজপথে নেমে এসেছিল। এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, যখন রাষ্ট্র নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন জনগণ নিজেরাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের নৈতিক বিবেক। জুলাইয়ের রাজপথে সেই বিবেক একত্র হয়েছিল। এটিই ছিল আন্দোলনের শক্তি, সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য। এরকম সমষ্টিগত জাগরণ খুব কমই দেখা যায়। তাই জুলাই শুধু ছাত্র আন্দোলন নয়, এটি ছিল জাতীয় আত্মপ্রত্যয়ের এক মহোৎসব।

ডিজিটাল প্রজন্মের প্রতিরোধ : আজকের প্রজন্ম কেবল রাজপথে নয়, পর্দার ভেতরেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জুলাই আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছিল এক অনন্য প্রতিরোধ ক্ষেত্র। পোস্টার, স্লোগান, গ্রাফিতি, ভিডিও, বার্তা—সব মিলিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হয়েছিল। তরুণেরা দেখিয়েছিল, প্রযুক্তি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, তা প্রতিবাদেরও হাতিয়ার। অনলাইন ও অফলাইন যখন একাকার হয়ে যায়, তখন আন্দোলন আরও গভীর, আরও বিস্তৃত, আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। ডিজিটাল পোস্টারের ভাষা রাজপথের স্লোগানকে শক্তি দিয়েছে, আবার রাজপথের উত্তাপ অনলাইনকে প্রাণবন্ত করেছে। এই যুগলবন্দি জুলাইয়ের আন্দোলনকে সময়ের সীমা ছাড়িয়ে এক সাংস্কৃতিক চেতনায় রূপ দিয়েছে।

ভয়ভাঙার ইতিহাস : কোনো স্বৈরতন্ত্র কেবল অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না; তা টিকে থাকে মানুষের ভয়ের ওপর ভর করে। জুলাই সেই ভয়ভাঙার ইতিহাস। ইন্টারনেট বন্ধ, হাসপাতাল ঘিরে রাখা, আহতদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত করা, সংবাদমাধ্যমে চাপ, গুম, মামলা এসবের মধ্য দিয়েও মানুষ থামেনি। বরং প্রতিটি বাধা আন্দোলনকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে। ভয় যখন কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করতে চেয়েছিল, তখন মানুষ আরও জোরে স্লোগান দিয়েছে। নীরবতা যখন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন রাস্তায় জন্ম নিয়েছিল সমবেত উচ্চারণ। ভয়ভাঙা মানে কেবল সাহস পাওয়া নয়; ভয়ভাঙা মানে সত্যকে আর গোপন না রাখা। জুলাই আমাদের সেই সত্য উচ্চারণের সাহস দিয়েছে।

‘৩৬ জুলাই’ এর প্রতীকী বার্তা : ‘৩৬ জুলাই’ একটি প্রতীক। এটি সময়কে টেনে দীর্ঘ করার সাহিত্যিক কৌশল নয় শুধু; বরং এটি ছিল বিজয়ের প্রত্যাশাকে জীবন্ত রাখার এক মানসিক ঘোষণা। যখন আন্দোলনকারীরা দিন গুনছিল, তখন এই প্রতীক তাদের হতাশা ভেঙে নতুন শক্তি দিয়েছে। যেন সময়ও তাদের পক্ষে লড়ছে। প্রতীকী ভাষা আন্দোলনকে জনমানসে স্থায়ী করে তোলে। ‘৩৬ জুলাই’ তেমনই এক স্মারক যা বলে, মুক্তির পথে প্রতিটি দিনই সংগ্রামের দিন, প্রতিটি রাতই অপেক্ষার রাত, আর প্রতিটি ভোরই নতুন সম্ভাবনা। এই প্রতীক তরুণদের ভাষায় ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছে।

নারীর অভিজ্ঞতায় জুলাই : একজন নারী হিসেবে, একজন কন্যা হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে আমি জুলাইকে অন্য এক দৃষ্টিতে অনুভব করি। এই আন্দোলনে নারীরা শুধু সমর্থক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন অংশগ্রহণকারী, সংগঠক, প্রেরণাদাত্রী। রাজপথে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, পরিবারে, বিবেকের ভেতরে—নারীরা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের লড়াইয়ে নারী কখনো পেছনের সারির মানুষ নন। বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমতার প্রশ্নে নারীর কণ্ঠ আরও সংবেদনশীল, আরও অনুরণিত, আরও শক্তিশালী। জুলাইয়ের রক্তমাখা ইতিহাসে তাই নারীর অবদানও সমানভাবে স্মরণীয়।

শিক্ষাঙ্গনের বিবেক : বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন সবসময়ই রাজনৈতিক জাগরণের কেন্দ্র। জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন হয়ে উঠেছিল বিবেকের অস্থায়ী রাজধানী। ছাত্ররা সেখানে শুধু পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিল না; তারা রাষ্ট্র, সমাজ, অধিকার, ভবিষ্যৎ সবকিছু নতুনভাবে ভাবছিল।
শিক্ষাঙ্গনের সেই উত্তাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়; শিক্ষা মানে প্রশ্ন করার ক্ষমতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, আর ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নৈতিক শক্তি। জুলাইয়ের আন্দোলনে শিক্ষাঙ্গন আবার প্রমাণ করেছে, তরুণ মননই জাতির আসল সম্পদ।

ন্যায়বিচারের তৃষ্ণা : জুলাইয়ের অন্তর্নিহিত আবেগ ছিল ন্যায়বিচারের তৃষ্ণা। মানুষ শুধু একটি নীতিগত দাবি তুলেনি; তারা তুলেছিল রাষ্ট্রের কাঠামোগত জবাবদিহিতার প্রশ্ন। বিচারহীনতা, দমননীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত—এসবের বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভ ছিল বহুকালের জমাট ক্ষত। এই ক্ষত যখন রাজপথে উন্মোচিত হলো, তখন দেখা গেল ন্যায়বিচার ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। আইন যদি দুর্বলের জন্য হয়, আর ক্ষমতাবানের জন্য আলাদা হয়, তবে সেখানে রাষ্ট্র নয়, কেবল আধিপত্য থাকে। জুলাই সেই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা : গণমাধ্যম রাষ্ট্রের দর্পণ এই প্রবাদটি জুলাইয়ে নতুন তাৎপর্য পায়। যখন বাস্তবতা রক্তাক্ত, তখন সত্য বলা আরও জরুরি হয়ে পড়ে। সাংবাদিক, ফটোজার্নালিস্ট, কলমযোদ্ধা—তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে মানুষের কষ্টকে, শহীদের মুখকে, রাষ্ট্রীয় নির্মমতাকে তুলে ধরেছেন। একটি জাতি তখনই সামনে এগোয়, যখন তার সত্যনিষ্ঠ দলিল রচিত হয়। জুলাইয়ের সংবাদ, ছবি, সাক্ষ্য, প্রতিবেদন—এসব ভবিষ্যৎ ইতিহাসের অপরিহার্য উপকরণ হয়ে থাকবে। কারণ সত্য যত দেরিতে হোক, একদিন তা ইতিহাসে স্থান পায়ই।

দীর্ঘ দুঃশাসনের পুঞ্জীভবন : কোনো গণবিস্ফোরণ হঠাৎ হয় না। জুলাই ছিল দীর্ঘ দিনের দুঃশাসন, অপমান, নিপীড়ন, ভোটাধিকার হরণ, দুর্নীতি, গুম, খুন আর মিথ্যার পুঞ্জীভূত ফল। মানুষ বছরের পর বছর দমে থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমছিল। জুলাই সেই জমে থাকা ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। রাষ্ট্র যখন মানুষের আস্থা হারায়, তখন একদিন জনতার আদালতেই তার বিচার হয়। ইতিহাসের এটাই নির্মম সত্য। স্বৈরাচার যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের সমষ্টিগত বিবেকের সামনে সে টিকে থাকতে পারে না। জুলাই সেই সত্যকে নতুন করে প্রমাণ করেছে।

বিএনপির সংগ্রামী ধারাবাহিকতা : জুলাইকে বুঝতে হলে তার পেছনের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইও বুঝতে হয়। বিএনপি ও এর নেতাকর্মীরা বহু বছর ধরে দমন, মামলা, নির্যাতন, গুম, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক অপপ্রচারের শিকার হয়েছে। তবু তারা রাজপথ ছেড়ে যায়নি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে, ভোটাধিকারের প্রশ্নে, মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে তারা অবিচল থেকেছে। এই ধারাবাহিক সংগ্রাম জুলাইয়ের জনবিস্ফোরণের সঙ্গে একত্র হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে। জনগণ যখন দেখে বিরোধী কণ্ঠগুলো নিঃশেষ হয়নি, তখন তাদের মনেও প্রতিরোধের আশার আলো জ্বলে। জুলাই ছিল সেই আশার পরিণতি।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক ছায়া : দূরপ্রবাসে থেকেও তারেক রহমানের বক্তব্য, মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা অনেকের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। তিনি বারবার গণতন্ত্র, অধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার ভাষা ছিল অনমনীয়, কিন্তু লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট—রাষ্ট্রকে জনমুখী করে তোলা। রাজনীতিতে নেতৃত্ব কেবল উপস্থিতি দিয়ে মাপা যায় না; কখনো কখনো তা দূরদর্শিতা, ধৈর্য, এবং সময়োপযোগী অবস্থানের মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান সেই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সাযুজ্য তৈরি করেছে। সেই কারণেই তিনি জুলাই-উত্তর রাজনৈতিক আলোচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চারিত হয়েছেন।

শহীদদের ঋণ : জুলাইয়ের প্রতিটি অর্জন এসেছে রক্তের বিনিময়ে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, এবং অসংখ্য অজানা শহীদ তাঁদের নাম ইতিহাসের অক্ষরে লেখা থাকবে। এই ঋণ শুধুমাত্র স্মৃতিচারণায় শোধ হয় না; শোধ হয় ন্যায়বিচার, সংস্কার, জবাবদিহিতা আর মানবিক রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে।
শহীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা মানে তাদের ত্যাগকে কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতিতে রূপান্তর করা। তাদের স্বপ্ন ছিল অন্যায়ের অবসান, বৈষম্যের বিলোপ, আর একটি মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নকে ধারণ করাই আমাদের দায়িত্ব।

নতুন বাংলাদেশের আহ্বান : জুলাই আমাদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তা বাস্তব রূপ পায়। মানুষ চায় ভোটাধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বাধীন গণমাধ্যম, নিরাপদ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, এবং ভয়ের ঊর্ধ্বে থাকা নাগরিক জীবন। নতুন বাংলাদেশ মানে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; নতুন বাংলাদেশ মানে রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিবর্তন। যেখানে কোনো নাগরিককে আর গুমের ভয় পেতে হবে না, যেখানে কথা বলার জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হবে না, যেখানে তরুণের স্বপ্ন রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখা হবে না। জুলাই সেই নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

পরিশেষে, আমি বিএনপির পরিবারের কন্যা হিসেবে জুলাইকে দেখি গভীর শ্রদ্ধা, অভিমান, গর্ব আর প্রত্যাশার মিশেলে। এই জুলাই আমাকে শিখিয়েছে, জনগণের শক্তি অবহেলার জিনিস নয়; মানুষের রক্ত বৃথা যায় না; আর ইতিহাস কখনো দমনকারীর হাতে বন্দি থাকে না। জুলাই আমার কাছে তাই শুধু একটি গণআন্দোলনের নাম নয়, এটি আমার অন্তরের জাগরণ, আমার রাজনৈতিক পরিচয়ের গভীর ব্যাখ্যা, এবং আমার ভবিষ্যৎ বিশ্বাসের শপথ। যে জাতি রক্ত দিয়ে ন্যায়ের দাবি তোলে, সে জাতিকে চিরকাল দমিয়ে রাখা যায় না। জুলাই সেই অমোঘ সত্যের নাম।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

৯ আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টির আভাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান : রক্তে লেখা জাগরণ, ইতিহাসের বাঁকবদলের অম্লান অধ্যায়

প্রকাশিত : ১১:৩৭:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মাস আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা জাতির হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। জুলাই তেমনই এক মাস। এটি আমাদের স্মৃতি, বেদনা, প্রতিরোধ আর পুনর্জাগরণের নাম। এই জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, যখন অন্যায় দীর্ঘ হয়, তখন মানুষের নীরবতা একদিন বজ্রধ্বনিতে রূপ নেয়। যখন বৈষম্য সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে ইতিহাসের অক্ষরখচিত কাগজ। জুলাই তাই কোনো নির্জীব তারিখের সমষ্টি নয়; এটি একটি অনুভব, একটি প্রত্যয়, একটি জাগ্রত চেতনা। এ মাস যেন জাতির বিবেককে প্রশ্ন করে—তুমি কি ন্যায়কে রক্ষা করেছ? তুমি কি মানুষের অধিকারকে সম্মান করেছ? তুমি কি তরুণের স্বপ্নকে মর্যাদা দিয়েছ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, বুক পেতে দিয়েছিল গুলির সামনে, আর ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লিখে দিয়েছিল রক্তমাখা বিজয়ের নতুন অধ্যায়।

আমার শিকড়, আমার অবস্থান : আমি বিএনপির পরিবারের কন্যা। এই পরিচয় আমার কাছে কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়; এটি এক ধরনের দায়, এক ধরনের নৈতিক স্মৃতি। যে পরিবার গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন লালন করে, সেই পরিবারের কন্যা হয়ে জুলাইকে আমি কেবল দর্শকের চোখে দেখি না। আমি দেখি হৃদয়ের গভীরতম কোণে, যেখানে ইতিহাস আর আবেগ একাকার হয়ে যায়। এই অবস্থান আমাকে শিখিয়েছে জনগণের কষ্টকে বুঝতে হয়, মানুষের কান্নাকে শুনতে হয়, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে হয়। আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা, মানুষের রক্তের ঋণ শোধ করা, মানুষের স্বপ্নকে মর্যাদা দেওয়া। সেই জায়গা থেকেই জুলাই আমার কাছে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক এবং নৈতিক—তিন স্তরেই অত্যন্ত গভীর এক অভিজ্ঞতা।

কোটা সংস্কার থেকে গণজাগরণ : আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একটি আপাত প্রশাসনিক দাবিকে কেন্দ্র করে—কোটা সংস্কার। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি ছিল মেধার মর্যাদা, ন্যায়ের দাবি, আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রতিবাদ। তরুণেরা চেয়েছিল, যোগ্যতার মূল্য থাকুক, পরিশ্রমের সম্মান থাকুক, রাষ্ট্র যেন কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বন্দীশালা না হয়ে ওঠে। সেই দাবির মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি বড় প্রশ্ন—এই রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার? নাকি কিছু মানুষের? এ প্রশ্ন যখন রাজপথে উচ্চারিত হলো, তখন তা আর কেবল চাকরির প্রশ্ন রইল না; তা হয়ে উঠল নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন কোটার সীমানা ভেঙে সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিল। আর সেখানেই জন্ম নিল বৃহত্তর গণজাগরণ।

তরুণের চোখে ভবিষ্যৎ : বাংলাদেশের তরুণেরা বারবার প্রমাণ করেছে, তারা কেবল সময়ের ভোক্তা নয়, সময়ের নির্মাতা। জুলাইয়ের আন্দোলনে যেসব তরুণ রাজপথে নেমেছিল, তাদের চোখে ছিল এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন—যেখানে অসমতা থাকবে না, দমন থাকবে না, ভয় থাকবে না, থাকবে কেবল নাগরিক মর্যাদা আর মুক্ত কণ্ঠস্বর। তাদের কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের আগুন, কিন্তু হৃদয়ে ছিল নির্মল আশা। তারা জানত, পথ কঠিন; তবু তারা নেমেছিল, কারণ মৌনতা তখন আর বিকল্প ছিল না। তরুণদের সেই সাহস শুধু নিজেদের প্রজন্মের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্য এক জাগরণের বার্তা বহন করেছিল। এদেশের ইতিহাসে তরুণেরা সবসময়ই নতুন ভোরের বার্তাবাহক। জুলাই সেই সত্যকে আবারও প্রতিষ্ঠা করেছে।

আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া সাহস : আবু সাঈদ এই নামটি শুধু একজন শহীদের নাম নয়, এটি এক প্রতীক। বুক পেতে দেওয়া সেই তরুণের দৃশ্য আজও বাংলাদেশের বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনের ভাষাকে বদলে দিয়েছিল, হৃদয়ের গভীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এক তরুণ যখন নিরস্ত্র হয়ে রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে বুক মেলে দাঁড়ায়, তখন তা আর ব্যক্তিগত সাহস থাকে না; তা হয়ে ওঠে জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। আবু সাঈদের রক্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শোষণ কখনো চিরস্থায়ী হয় না। অন্যায় যতই বড় হোক, মানুষের ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা আরও বড়। সেই রক্তই আমাদের বলে—শহীদের জীবন ব্যর্থ যায় না, যদি তার নাম ধরে একটি জাতি জেগে ওঠে। জুলাইয়ের হৃদয়ে আবু সাঈদের নাম তাই অমলিন।

রাজপথে রক্ত, হৃদয়ে আগুন : প্রথমে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ, সংযত, দাবি-নির্ভর। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সংলাপের বদলে দমন বেছে নেয়, তখন আন্দোলনের চরিত্রও বদলে যায়। গুলি, লাঠি, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ভয়—এসবই জনতার হৃদয়ে জমে থাকা ক্ষোভকে আগুনে পরিণত করে। মানুষ বুঝে যায়, অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ালে আর কেউই নিরাপদ নয়। রাজপথ তখন কেবল চলাচলের স্থান ছিল না; সেটি ছিল রক্তের সাক্ষী, অশ্রুর সাক্ষী, সাহসের সাক্ষী। প্রতিটি ধাওয়া, প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি আহত মুখ যেন একেকটি করে ইতিহাসের বাক্য হয়ে উঠেছিল। মানুষ শিখেছিল—ভয়কে জয় করাই আসল বিজয়। আর সেই বিজয়ের বীজ জুলাইতেই বপন হয়েছিল।

সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ : জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল এর সর্বজনীনতা। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষক, শ্রমিক, অভিভাবক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখক, শিল্পী—সবাই এই আন্দোলনের অন্তর্গত হয়ে উঠেছিল। সমাজের নানা স্তরের মানুষ একই দাবিতে, একই প্রত্যয়ে, একই যন্ত্রণায় রাজপথে নেমে এসেছিল। এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, যখন রাষ্ট্র নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন জনগণ নিজেরাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের নৈতিক বিবেক। জুলাইয়ের রাজপথে সেই বিবেক একত্র হয়েছিল। এটিই ছিল আন্দোলনের শক্তি, সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য। এরকম সমষ্টিগত জাগরণ খুব কমই দেখা যায়। তাই জুলাই শুধু ছাত্র আন্দোলন নয়, এটি ছিল জাতীয় আত্মপ্রত্যয়ের এক মহোৎসব।

ডিজিটাল প্রজন্মের প্রতিরোধ : আজকের প্রজন্ম কেবল রাজপথে নয়, পর্দার ভেতরেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জুলাই আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছিল এক অনন্য প্রতিরোধ ক্ষেত্র। পোস্টার, স্লোগান, গ্রাফিতি, ভিডিও, বার্তা—সব মিলিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হয়েছিল। তরুণেরা দেখিয়েছিল, প্রযুক্তি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, তা প্রতিবাদেরও হাতিয়ার। অনলাইন ও অফলাইন যখন একাকার হয়ে যায়, তখন আন্দোলন আরও গভীর, আরও বিস্তৃত, আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। ডিজিটাল পোস্টারের ভাষা রাজপথের স্লোগানকে শক্তি দিয়েছে, আবার রাজপথের উত্তাপ অনলাইনকে প্রাণবন্ত করেছে। এই যুগলবন্দি জুলাইয়ের আন্দোলনকে সময়ের সীমা ছাড়িয়ে এক সাংস্কৃতিক চেতনায় রূপ দিয়েছে।

ভয়ভাঙার ইতিহাস : কোনো স্বৈরতন্ত্র কেবল অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না; তা টিকে থাকে মানুষের ভয়ের ওপর ভর করে। জুলাই সেই ভয়ভাঙার ইতিহাস। ইন্টারনেট বন্ধ, হাসপাতাল ঘিরে রাখা, আহতদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত করা, সংবাদমাধ্যমে চাপ, গুম, মামলা এসবের মধ্য দিয়েও মানুষ থামেনি। বরং প্রতিটি বাধা আন্দোলনকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে। ভয় যখন কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করতে চেয়েছিল, তখন মানুষ আরও জোরে স্লোগান দিয়েছে। নীরবতা যখন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন রাস্তায় জন্ম নিয়েছিল সমবেত উচ্চারণ। ভয়ভাঙা মানে কেবল সাহস পাওয়া নয়; ভয়ভাঙা মানে সত্যকে আর গোপন না রাখা। জুলাই আমাদের সেই সত্য উচ্চারণের সাহস দিয়েছে।

‘৩৬ জুলাই’ এর প্রতীকী বার্তা : ‘৩৬ জুলাই’ একটি প্রতীক। এটি সময়কে টেনে দীর্ঘ করার সাহিত্যিক কৌশল নয় শুধু; বরং এটি ছিল বিজয়ের প্রত্যাশাকে জীবন্ত রাখার এক মানসিক ঘোষণা। যখন আন্দোলনকারীরা দিন গুনছিল, তখন এই প্রতীক তাদের হতাশা ভেঙে নতুন শক্তি দিয়েছে। যেন সময়ও তাদের পক্ষে লড়ছে। প্রতীকী ভাষা আন্দোলনকে জনমানসে স্থায়ী করে তোলে। ‘৩৬ জুলাই’ তেমনই এক স্মারক যা বলে, মুক্তির পথে প্রতিটি দিনই সংগ্রামের দিন, প্রতিটি রাতই অপেক্ষার রাত, আর প্রতিটি ভোরই নতুন সম্ভাবনা। এই প্রতীক তরুণদের ভাষায় ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছে।

নারীর অভিজ্ঞতায় জুলাই : একজন নারী হিসেবে, একজন কন্যা হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে আমি জুলাইকে অন্য এক দৃষ্টিতে অনুভব করি। এই আন্দোলনে নারীরা শুধু সমর্থক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন অংশগ্রহণকারী, সংগঠক, প্রেরণাদাত্রী। রাজপথে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, পরিবারে, বিবেকের ভেতরে—নারীরা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের লড়াইয়ে নারী কখনো পেছনের সারির মানুষ নন। বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমতার প্রশ্নে নারীর কণ্ঠ আরও সংবেদনশীল, আরও অনুরণিত, আরও শক্তিশালী। জুলাইয়ের রক্তমাখা ইতিহাসে তাই নারীর অবদানও সমানভাবে স্মরণীয়।

শিক্ষাঙ্গনের বিবেক : বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন সবসময়ই রাজনৈতিক জাগরণের কেন্দ্র। জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন হয়ে উঠেছিল বিবেকের অস্থায়ী রাজধানী। ছাত্ররা সেখানে শুধু পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিল না; তারা রাষ্ট্র, সমাজ, অধিকার, ভবিষ্যৎ সবকিছু নতুনভাবে ভাবছিল।
শিক্ষাঙ্গনের সেই উত্তাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা নয়; শিক্ষা মানে প্রশ্ন করার ক্ষমতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, আর ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নৈতিক শক্তি। জুলাইয়ের আন্দোলনে শিক্ষাঙ্গন আবার প্রমাণ করেছে, তরুণ মননই জাতির আসল সম্পদ।

ন্যায়বিচারের তৃষ্ণা : জুলাইয়ের অন্তর্নিহিত আবেগ ছিল ন্যায়বিচারের তৃষ্ণা। মানুষ শুধু একটি নীতিগত দাবি তুলেনি; তারা তুলেছিল রাষ্ট্রের কাঠামোগত জবাবদিহিতার প্রশ্ন। বিচারহীনতা, দমননীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত—এসবের বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভ ছিল বহুকালের জমাট ক্ষত। এই ক্ষত যখন রাজপথে উন্মোচিত হলো, তখন দেখা গেল ন্যায়বিচার ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। আইন যদি দুর্বলের জন্য হয়, আর ক্ষমতাবানের জন্য আলাদা হয়, তবে সেখানে রাষ্ট্র নয়, কেবল আধিপত্য থাকে। জুলাই সেই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা : গণমাধ্যম রাষ্ট্রের দর্পণ এই প্রবাদটি জুলাইয়ে নতুন তাৎপর্য পায়। যখন বাস্তবতা রক্তাক্ত, তখন সত্য বলা আরও জরুরি হয়ে পড়ে। সাংবাদিক, ফটোজার্নালিস্ট, কলমযোদ্ধা—তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে মানুষের কষ্টকে, শহীদের মুখকে, রাষ্ট্রীয় নির্মমতাকে তুলে ধরেছেন। একটি জাতি তখনই সামনে এগোয়, যখন তার সত্যনিষ্ঠ দলিল রচিত হয়। জুলাইয়ের সংবাদ, ছবি, সাক্ষ্য, প্রতিবেদন—এসব ভবিষ্যৎ ইতিহাসের অপরিহার্য উপকরণ হয়ে থাকবে। কারণ সত্য যত দেরিতে হোক, একদিন তা ইতিহাসে স্থান পায়ই।

দীর্ঘ দুঃশাসনের পুঞ্জীভবন : কোনো গণবিস্ফোরণ হঠাৎ হয় না। জুলাই ছিল দীর্ঘ দিনের দুঃশাসন, অপমান, নিপীড়ন, ভোটাধিকার হরণ, দুর্নীতি, গুম, খুন আর মিথ্যার পুঞ্জীভূত ফল। মানুষ বছরের পর বছর দমে থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমছিল। জুলাই সেই জমে থাকা ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। রাষ্ট্র যখন মানুষের আস্থা হারায়, তখন একদিন জনতার আদালতেই তার বিচার হয়। ইতিহাসের এটাই নির্মম সত্য। স্বৈরাচার যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের সমষ্টিগত বিবেকের সামনে সে টিকে থাকতে পারে না। জুলাই সেই সত্যকে নতুন করে প্রমাণ করেছে।

বিএনপির সংগ্রামী ধারাবাহিকতা : জুলাইকে বুঝতে হলে তার পেছনের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইও বুঝতে হয়। বিএনপি ও এর নেতাকর্মীরা বহু বছর ধরে দমন, মামলা, নির্যাতন, গুম, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক অপপ্রচারের শিকার হয়েছে। তবু তারা রাজপথ ছেড়ে যায়নি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে, ভোটাধিকারের প্রশ্নে, মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে তারা অবিচল থেকেছে। এই ধারাবাহিক সংগ্রাম জুলাইয়ের জনবিস্ফোরণের সঙ্গে একত্র হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে। জনগণ যখন দেখে বিরোধী কণ্ঠগুলো নিঃশেষ হয়নি, তখন তাদের মনেও প্রতিরোধের আশার আলো জ্বলে। জুলাই ছিল সেই আশার পরিণতি।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক ছায়া : দূরপ্রবাসে থেকেও তারেক রহমানের বক্তব্য, মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা অনেকের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। তিনি বারবার গণতন্ত্র, অধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার ভাষা ছিল অনমনীয়, কিন্তু লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট—রাষ্ট্রকে জনমুখী করে তোলা। রাজনীতিতে নেতৃত্ব কেবল উপস্থিতি দিয়ে মাপা যায় না; কখনো কখনো তা দূরদর্শিতা, ধৈর্য, এবং সময়োপযোগী অবস্থানের মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান সেই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সাযুজ্য তৈরি করেছে। সেই কারণেই তিনি জুলাই-উত্তর রাজনৈতিক আলোচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চারিত হয়েছেন।

শহীদদের ঋণ : জুলাইয়ের প্রতিটি অর্জন এসেছে রক্তের বিনিময়ে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, এবং অসংখ্য অজানা শহীদ তাঁদের নাম ইতিহাসের অক্ষরে লেখা থাকবে। এই ঋণ শুধুমাত্র স্মৃতিচারণায় শোধ হয় না; শোধ হয় ন্যায়বিচার, সংস্কার, জবাবদিহিতা আর মানবিক রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে।
শহীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা মানে তাদের ত্যাগকে কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতিতে রূপান্তর করা। তাদের স্বপ্ন ছিল অন্যায়ের অবসান, বৈষম্যের বিলোপ, আর একটি মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নকে ধারণ করাই আমাদের দায়িত্ব।

নতুন বাংলাদেশের আহ্বান : জুলাই আমাদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তা বাস্তব রূপ পায়। মানুষ চায় ভোটাধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বাধীন গণমাধ্যম, নিরাপদ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, এবং ভয়ের ঊর্ধ্বে থাকা নাগরিক জীবন। নতুন বাংলাদেশ মানে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; নতুন বাংলাদেশ মানে রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিবর্তন। যেখানে কোনো নাগরিককে আর গুমের ভয় পেতে হবে না, যেখানে কথা বলার জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হবে না, যেখানে তরুণের স্বপ্ন রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখা হবে না। জুলাই সেই নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

পরিশেষে, আমি বিএনপির পরিবারের কন্যা হিসেবে জুলাইকে দেখি গভীর শ্রদ্ধা, অভিমান, গর্ব আর প্রত্যাশার মিশেলে। এই জুলাই আমাকে শিখিয়েছে, জনগণের শক্তি অবহেলার জিনিস নয়; মানুষের রক্ত বৃথা যায় না; আর ইতিহাস কখনো দমনকারীর হাতে বন্দি থাকে না। জুলাই আমার কাছে তাই শুধু একটি গণআন্দোলনের নাম নয়, এটি আমার অন্তরের জাগরণ, আমার রাজনৈতিক পরিচয়ের গভীর ব্যাখ্যা, এবং আমার ভবিষ্যৎ বিশ্বাসের শপথ। যে জাতি রক্ত দিয়ে ন্যায়ের দাবি তোলে, সে জাতিকে চিরকাল দমিয়ে রাখা যায় না। জুলাই সেই অমোঘ সত্যের নাম।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট