পটুয়াখালী প্রতিনিধি: বঙ্গোপসাগরে একদিকে রূপান্তরিত আর্টিসানাল ট্রলিং বোটে অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে, অন্যদিকে দিনের পর দিন সাগরে থেকেও কাঙ্খিত মাছ পাচ্ছেন না সাধারণ ও প্রান্তিক জেলেরা। এতে অবৈধ ট্রলিং ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জেলেদের আশঙ্কা, শক্তিশালী ইঞ্জিন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশ ঘেঁষে সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল টেনে নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে ছোট মাছ, পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এভাবে মাছ আহরণ চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় এই উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র দুই দিনের মাছ শিকারে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ নিয়ে বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে আলিপুর মৎস্য বন্দরে আসে এফবি আব্দুল্লাহ নামের একটি ট্রলিং ট্রলার। পরে সিফাত ফিসে নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো প্রায় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
ট্রলারটির মাঝি বাদশা জানান, চার দিন আগে ১৮ জন জেলে নিয়ে তারা গভীর সমুদ্রে যান। দুই দিন মাছ ধরার পর মঙ্গলবার পায়রা বন্দরের শেষ বয়া সংলগ্ন এলাকায় জালে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। তবে ধরা পড়া ইলিশগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট ছিল বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় সাধারণ জেলেদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একটি ট্রলিং বোট যদি মাত্র দুই দিনে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ ধরতে পারে, তাহলে সাধারণ জেলেদের জালে মাছ নেই কেন?
কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী উপকূলের জেলেরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন সাগরে মাছ পাওয়া অনেক কমে গেছে। অনেক সময় জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচও তুলতে না পেরে লোকসান নিয়ে তীরে ফিরতে হয় তাদের।
জেলে হানিফ মাঝি বলেন, আগে অল্প সময় সাগরে গেলেই পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যেত। এখন দিনের পর দিন সমুদ্রে অবস্থান করেও কাঙ্খিত মাছ পাওয়া যায় না। তার অভিযোগ, অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো অগভীর সমুদ্র থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ তুলে নেওয়ায় সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
জেলেদের অভিযোগ, কিছু ট্রলিং বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল দিয়ে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হচ্ছে।
এ ধরনের জালে বড় মাছের পাশাপাশি ইলিশের পোনা, ছোট মাছ, ডিমওয়ালা মা মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীও আটকা পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্বিচারে ছোট মাছ আহরণ করা হলে ভবিষ্যতে সমুদ্রে মাছের মজুত আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জেলেরা।
জেলেরা জানান, চলতি মাসের শুরুতেও কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগরে একটি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের জালে একবারে ৪৬ মণ ইলিশ ধরা পড়েছিল। পরে সেই মাছ প্রায় ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
অল্প সময়ের ব্যবধানে একই উপকূলে ট্রলিং বোটে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ার ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠছে, সাগরে সত্যিই কি ইলিশের প্রাচুর্য ফিরেছে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী জালের মাধ্যমে মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে একসঙ্গে বিপুল মাছ তুলে নেওয়া হচ্ছে?
জেলেরা বলছেন, শুধু কত মণ মাছ ধরা পড়ছে, তা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে হবে না। কোন ধরনের নৌযানে, কী ধরনের জাল ব্যবহার করে, কোন এলাকায় এবং কী আকারের মাছ ধরা হচ্ছে, এসব বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ইলিশ বড় হওয়ার সুযোগ না দিয়ে আহরণ করা হলে ভবিষ্যতে প্রজননক্ষম ইলিশের সংখ্যা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা ও সামুদ্রিক প্রাণী ধরা পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, সামুদ্রিক মৎস্য আইনের তফসিল অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ জাল ব্যবহার করে ট্রলিংয়ের অভিযোগে বোট মালিকদের মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। এর আগে কয়েকটি বোট জব্দ করে মামলাও করা হয়েছে।
তবে জেলেদের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই পরিস্থিতির সমাধান হবে না। অবৈধ ট্রলিং বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সাগরের অগভীর এলাকায় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বঙ্গোপসাগরে ট্রলিংয়ের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো উপকূলের অগভীর এলাকায় এর বিস্তার।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৩০ মিটারের কম গভীরতার এলাকায় ট্রলিং নিষিদ্ধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে ট্রলার এমনকি কাঠের বোটও ট্রলিং পদ্ধতিতে মাছ ধরছে। অথচ অগভীর উপকূলীয় অঞ্চল অনেক সামুদ্রিক মাছের গুরুত্বপূর্ণ নার্সারি ও প্রজননক্ষেত্র। সেখানে তলদেশ ঘেঁষে জাল টানলে পোনা, ছোট মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর পাশাপাশি তলদেশের আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, আজ বেশি মাছ ধরতে গিয়ে যদি সাগরের মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জায়গা নষ্ট করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মৎস্য উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। এ জন্য কোন নৌযান কোথায় এবং কী ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরছে, তা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনা এবং ৩০ মিটারের কম গভীরতায় অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















