ঢাকা ১২:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৪৮ বছরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:২১:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১০ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির: ইতিহাসের দীর্ঘ নদী কখনো সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না। তার বুকে থাকে ঘূর্ণি, ভাঙন, জোয়ার-ভাটা, কখনো অন্ধকার রাত, আবার কখনো নতুন ভোরের দীপ্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন বহু বাঁক পেরিয়ে আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু করেছিলেন, প্রায় পাঁচ দশক পর সেই বিএনপি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্বে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে; আর আগস্টে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এই বিশেষ দিনে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং বাংলাদেশের আপামর জনগণকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক আত্মপর্যালোচনা, আত্মশুদ্ধি, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ এবং মানুষের অধিকারকে আরও সুদৃঢ় করার নতুন অঙ্গীকারের দিন।

রমনার সেই বিকেল থেকে আজকের বাংলাদেশ : ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনার মাটিতে বিএনপির জন্ম নিছক একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক আত্মপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শন ও সংগঠনের উন্মেষ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, উৎপাদন, আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় ঐক্যের একটি রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়াস নেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি যুক্ত ছিল; পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক দর্শন দলটির দীর্ঘ পথচলার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। সরকারি বার্তা সংস্থা বিএসএসও বিএনপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ১৯ দফা কর্মসূচির সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের, রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতীয় স্বার্থ হবে রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান মানদণ্ড। সময়ের বিচারে সেই দর্শনের নানা দিক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জিয়া একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক : বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পর্যায় পর্যন্ত তাঁর জীবন যেন এক অস্থির সময়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকারগুলোর একটি ছিল বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের উদ্যোগ। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ও গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুমতের প্রত্যাবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল। বিএনপি সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বাহন হয়ে ওঠে। জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শনেও উৎপাদন, কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা ও বৈদেশিক সম্পর্কের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব ছিল।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আত্মপরিচয়ের এক ভিন্ন পাঠ :
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের প্রাণ। এই ধারণা বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তা, ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভাষা-সংস্কৃতি এবং জনগণের সম্মিলিত পরিচয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত। বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে জাতীয়তাবাদ কখনো শুধু পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।

আজকের বিশ্বে যখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং নিরাপত্তা-রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। বর্তমান সরকারও ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন নিয়েও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সহায়ক পরিবেশ’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

খালেদা জিয়া সংগ্রাম থেকে নেতৃত্বের শিখরে : জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপির সামনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অতিক্রম করে দলটিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেন বেগম খালেদা জিয়া। একজন গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার তাঁর যাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও বিরল এক অধ্যায়। এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে তাঁর আপসহীন ভূমিকা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে রাজনৈতিক অভিধা এনে দেয়। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্ব এবং পরবর্তী ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয় তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঐতিহাসিক মর্যাদা এনে দেয়। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেও তাঁর সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবেও দীর্ঘ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন।

গণতন্ত্রের জন্য রাজপথের দীর্ঘ ইতিহাস : বিএনপির ইতিহাস কেবল সরকার পরিচালনার ইতিহাস নয়; এটি বিরোধী রাজনীতিরও ইতিহাস। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার প্রশ্ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন—বিএনপি বারবার রাজপথে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে এ কথাও স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের কোনো বড় রাজনৈতিক দলই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। বিএনপিরও ভুল ছিল, সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি দল টিকে থাকা এবং বারবার পুনর্গঠিত হওয়া তার সাংগঠনিক সক্ষমতারও প্রমাণ।

ওয়ান-ইলেভেনের অন্ধকার ও পরীক্ষার সময় : ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বিএনপির ইতিহাসে এক গভীর সংকটের অধ্যায়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিধিনিষেধ, দল ভাঙার নানা উদ্যোগ এবং নেতাকর্মীদের ওপর চাপ সব মিলিয়ে বিএনপি তখন অস্তিত্বের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তার অভিঘাত দলটির ওপর দীর্ঘস্থায়ী হয়। তবু দলটি ভেঙে যায়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন—যা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন থেকে নেতৃত্বের কেন্দ্রে :
বিএনপির সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্ব একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলটির সাংগঠনিক কাঠামোকে সচল রাখার চেষ্টা করেন। ভার্চুয়াল সভা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। আজ সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথের এক নতুন পরিণতি দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘Bangladesh First’—রাষ্ট্র পরিচালনায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যয়।

৩১ দফা থেকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ : তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি। বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণসহ বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার Vision 2030 এবং তারেক রহমানের ৩১ দফাকে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারের মূল দর্শন হিসেবে এসেছে ‘Bangladesh First’ এবং ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। এখানেই বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—দীর্ঘ আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করা।

২০২৬—বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে :
২০২৬ সাল বিএনপির ইতিহাসে এক অনন্য বাঁক। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন ও নির্বাচনী সংগ্রামের পর দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন; আগস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ২৫৫ ভোট পেয়ে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ওলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পর বিএনপি মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরণের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিএনপির নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায়েরও সূচনা।

ছয় মাসের সরকার প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে :
তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে Family Card, Farmer Card, খাল পুনঃখনন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকাভিত্তিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার নিজস্ব মূল্যায়নে এসব উদ্যোগকে জনমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছে। অবশ্য একটি সরকারের সাফল্য শুধু ঘোষণায় পরিমাপ করা যায় না; মানুষের জীবনযাত্রায় তার বাস্তব প্রতিফলনই শেষ বিচারের মানদণ্ড। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং প্রশাসনিক দক্ষতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণ এখন বাস্তব ফল দেখতে চাইবে। তাই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বেরও স্মারক।

ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক রাষ্ট্রের নতুন ভাবনা :

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে Family Card একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের প্রয়োজনীয় পণ্য সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে Farmer Card, Health Card এবং কর্মসংস্থানের নানা উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় এমন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও প্রয়োজন স্বচ্ছ ডেটাবেজ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাছাই, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং জবাবদিহি। কারণ জনকল্যাণের অর্থ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রকৃত উপকারভোগীর ঘরে পৌঁছায়।

সংস্কার বনাম স্থিতিশীলতা আগামীর বড় পরীক্ষা :
জুলাই জাতীয় সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতপার্থক্য রয়েছে। সংসদের বিশেষ কমিটি সংবিধানের সামগ্রিক পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং জুলাই সনদকে সংস্কার আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বিএনপি সংস্কারের প্রয়োজন অস্বীকার করছে না; বরং দলটির ৩১ দফায় বহু আগেই রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এমন দাবি দলের নেতৃত্বের। এখন ক্ষমতাসীন হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব হলো এমন সংস্কার বাস্তবায়ন করা, যা কেবল আজকের ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, আগামী দিনের বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত করবে। সত্যিকারের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই ক্ষমতা বদলাবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে।

আমার পরিবারেও বিএনপির ইতিহাসের স্পন্দন : বিএনপির এই ৪৮ বছরের ইতিহাস আমার কাছে শুধু বইয়ের পাতা, রাজনৈতিক বক্তৃতা কিংবা সংবাদপত্রের কলামে সীমাবদ্ধ নয়। এই ইতিহাসের সঙ্গে আমার পারিবারিক আবেগও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আমি নিজেও একটি বিএনপি পরিবারের সন্তান। আমার চাচা মরহুম কবির মুরাদ ছিলেন জিয়া পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, বিশ্বাস, নিষ্ঠা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিরও অংশ।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমার কাছে কোনো ক্ষমতার উত্তরাধিকার নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং প্রতিকূল সময়েও বিশ্বাসের জায়গায় অটল থাকার এক নৈতিক শিক্ষা। রাজনীতি যখন কেবল পদ-পদবি বা নির্বাচনী হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন এমন মানুষের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।

ইলিয়াস আলীর স্মৃতি ও লুনার সংগ্রাম : আমার ফুপি তাহসিনা রুশদীর লুনা বিএনপি নেতা ও গুমের শিকার বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী। তাঁর জীবনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক বেদনাময় অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। ২০১২ সালে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আজও তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের স্মৃতিতে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। আজ সেই তাহসিনা রুশদীর লুনা সিলেট-২ আসনের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর এই যাত্রা ব্যক্তিগত বেদনা পেরিয়ে রাজনৈতিক দায়িত্বে উত্তরণের এক অনন্য গল্প। একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন সংগ্রামী নারী এবং এখন একজন জনপ্রতিনিধি এই চারটি পরিচয়ের ভার তিনি একসঙ্গে বহন করছেন।

ব্যক্তিগত আবেগ যখন জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যায় :
আমার পরিবারের এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমাকে বিএনপিকে অন্য এক দৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছে। একটি দলের ইতিহাস তখন আর কেবল দলীয় কার্যালয়, মিছিল কিংবা নির্বাচনী প্রতীকের ইতিহাস থাকে না; তা হয়ে ওঠে অসংখ্য পরিবারের স্মৃতি, ত্যাগ, কান্না, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের সম্মিলিত ইতিহাস। কবির মুরাদের মতো প্রবীণ নেতাদের রাজনৈতিক নিষ্ঠা এবং ইলিয়াস আলীর পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা—এই দুই প্রান্তকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের রাজনীতির এক গভীর মানবিক চিত্র ফুটে ওঠে। রাজনীতির ইতিহাসে জয়-পরাজয়ের হিসাব থাকে, কিন্তু তার আড়ালে থাকে মানুষের জীবন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই আমার ব্যক্তিগত প্রার্থনা—রাজনীতি যেন প্রতিহিংসার নয়, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ভাষা হয়ে ওঠে।

বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি তৃণমূল : বিএনপির দীর্ঘস্থায়িত্বের অন্যতম কারণ তার তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন। গ্রাম থেকে শহর, ইউনিয়ন থেকে মহানগর—দলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সময় প্রতিকূলতার মধ্যে সংগঠন ধরে রেখেছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পেছনে এই তৃণমূলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের সামনে নতুন দায়িত্ব এসেছে। ক্ষমতার সঙ্গে দূরত্ব হারালে রাজনীতি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তাই বিএনপির প্রয়োজন ত্যাগী, সৎ, দক্ষ ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বকে সামনে আনা; দলীয় শৃঙ্খলা কঠোর করা; দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শূন্য-সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। কারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে যে সময় লাগে, তা হারাতে লাগে মাত্র একটি ভুল মুহূর্ত।

৪৮ থেকে ৫০ আগামীর দুই বছরের অঙ্গীকার : ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একটি মধ্যবর্তী ঐতিহাসিক মাইলফলক। সামনে ৫০ বছর পূর্তি। তাই এখন থেকেই দলটির সামনে একটি প্রশ্ন পঞ্চাশ বছরে বিএনপি নিজেকে কীভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে? তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশ আগের বাংলাদেশ নয়। তারা ডিজিটাল, বিশ্বমুখী, তথ্যসচেতন এবং একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রত্যাশী। তাদের কাছে শুধু অতীতের গৌরব যথেষ্ট নয়; তারা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চায়। ফলে জিয়ার ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার Vision 2030 এবং তারেক রহমানের ৩১ দফাকে সময়োপযোগী বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করাই হবে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক আত্মশুদ্ধির শপথ : ৪৮ বছরের গৌরব যেমন স্মরণ করতে হবে, তেমনি ভুল ও সীমাবদ্ধতার দিকেও তাকাতে হবে নির্মোহ চোখে। কারণ আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে না। বিএনপির সামনে আজ যে সুযোগ এসেছে, তা ঐতিহাসিক। একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা, অন্যদিকে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মতের প্রতি গণতান্ত্রিক সহনশীলতা। যে গণতন্ত্রের জন্য দলটি দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে, ক্ষমতায় থেকেও সেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই হবে তার শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।

পরিশেষে, ইতিহাস কখনো কখনো নীরবে কথা বলে আর আজকের এই দিনে, ১লা সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ, সেই ইতিহাসই যেন মুখর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলার কথা বলতে। ১৯৭৮ সালের রমনার সবুজ চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রাপথ কখনো মসৃণ ছিল না কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, রাজপথের রক্তাক্ত সংগ্রাম, নির্বাসনের নিঃসঙ্গতা আর হাজারো নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই এই দল আজ পরিণত হয়েছে বাংলার মাটির সবচেয়ে গভীর শিকড়বিশিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। শহীদ জিয়াউর রহমানের দূরদৃষ্টি, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামী চেতনা এই দুই মহান আদর্শের উত্তরাধিকার আজ বহন করে চলেছেন তাঁদেরই সুযোগ্য উত্তরসূরি দেশনায়ক তারেক রহমান। আজ সেই স্বপ্নেরই ধারাবাহিকতায় তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বিএনপি এগিয়ে চলেছে এক নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয়ে। এই যাত্রা কেবল ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর যাত্রা নয় এ যাত্রা হৃদয় জয়ের, আস্থা অর্জনের, আর ভাঙা স্বপ্নগুলো নতুন করে বুনে দেওয়ার। বাংলাদেশের আকাশে আজ যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছে, তার আলোয় আলোকিত হোক দেশের প্রতিটি প্রান্ত উত্তরের চা-বাগান থেকে দক্ষিণের উপকূল, পূর্বের পাহাড় থেকে পশ্চিমের সমতলভূমি পর্যন্ত। আগামী দিনগুলোতে বিএনপির প্রতিটি পদক্ষেপ যেন হয়ে ওঠে ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এক কল্যাণকামী যাত্রা যেখানে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের কাগজে বন্দি না থেকে প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের আলো হয়ে ধরা দেবে। কৃষকের মুখের নির্মল হাসি, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের অবারিত সুযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা, আর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এই হোক বিএনপির আগামীর অভিযাত্রার মূল সুর ও অন্তর্নিহিত দর্শন। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যেন হয়ে ওঠে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের এক অবিচল প্রহরী। রাষ্ট্র যেন কোনো দলের বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি না হয়ে ওঠে বরং হয়ে ওঠে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আশ্রয়স্থল। ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন আর অর্থনৈতিক মুক্তি এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ, যেখানে ভয় নয়, আশাই হবে মানুষের নিত্যসঙ্গী। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত এই পথ, ত্যাগী নেতাকর্মীদের অশ্রু ও ঘামে সিক্ত এই দীর্ঘ সংগ্রাম যেন কখনো বিফলে না যায় বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হয়ে উঠুক নতুন অঙ্গীকারের সূচনাবিন্দু, নতুন সংকল্পের উৎসমুখ। ৪৮ বছরের এই মহীরুহ যেন তার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত করে, শাখা-প্রশাখা আরও বিস্তৃত করে ছায়া দেয় গোটা বাংলাদেশকে যেখানে ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম নেয়, স্বপ্নবান তরুণ আশ্রয় খোঁজে, আর নিপীড়িত মানুষ খুঁজে পায় ন্যায়বিচারের ঠিকানা। আগামী পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস যেন লেখা হয় গৌরব আর অর্জনের কালিতে যেখানে বিএনপি শুধু অতীতের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের প্রধান কারিগর। জয় হোক গণতন্ত্রের। জয় হোক বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের। শুভ হোক, কল্যাণময় হোক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

একটি পরিবেশগত বিপর্যয়প্রবণ দেশ বাংলাদেশ, সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে

গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৪৮ বছরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি

প্রকাশিত : ০৮:২১:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির: ইতিহাসের দীর্ঘ নদী কখনো সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না। তার বুকে থাকে ঘূর্ণি, ভাঙন, জোয়ার-ভাটা, কখনো অন্ধকার রাত, আবার কখনো নতুন ভোরের দীপ্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন বহু বাঁক পেরিয়ে আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু করেছিলেন, প্রায় পাঁচ দশক পর সেই বিএনপি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্বে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে; আর আগস্টে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এই বিশেষ দিনে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং বাংলাদেশের আপামর জনগণকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক আত্মপর্যালোচনা, আত্মশুদ্ধি, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ এবং মানুষের অধিকারকে আরও সুদৃঢ় করার নতুন অঙ্গীকারের দিন।

রমনার সেই বিকেল থেকে আজকের বাংলাদেশ : ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনার মাটিতে বিএনপির জন্ম নিছক একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক আত্মপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শন ও সংগঠনের উন্মেষ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, উৎপাদন, আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় ঐক্যের একটি রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়াস নেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি যুক্ত ছিল; পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক দর্শন দলটির দীর্ঘ পথচলার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। সরকারি বার্তা সংস্থা বিএসএসও বিএনপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ১৯ দফা কর্মসূচির সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের, রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতীয় স্বার্থ হবে রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান মানদণ্ড। সময়ের বিচারে সেই দর্শনের নানা দিক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জিয়া একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক : বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পর্যায় পর্যন্ত তাঁর জীবন যেন এক অস্থির সময়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকারগুলোর একটি ছিল বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের উদ্যোগ। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ও গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুমতের প্রত্যাবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল। বিএনপি সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বাহন হয়ে ওঠে। জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শনেও উৎপাদন, কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা ও বৈদেশিক সম্পর্কের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব ছিল।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আত্মপরিচয়ের এক ভিন্ন পাঠ :
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের প্রাণ। এই ধারণা বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তা, ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভাষা-সংস্কৃতি এবং জনগণের সম্মিলিত পরিচয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত। বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে জাতীয়তাবাদ কখনো শুধু পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।

আজকের বিশ্বে যখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং নিরাপত্তা-রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। বর্তমান সরকারও ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন নিয়েও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সহায়ক পরিবেশ’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

খালেদা জিয়া সংগ্রাম থেকে নেতৃত্বের শিখরে : জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপির সামনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অতিক্রম করে দলটিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেন বেগম খালেদা জিয়া। একজন গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার তাঁর যাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও বিরল এক অধ্যায়। এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে তাঁর আপসহীন ভূমিকা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে রাজনৈতিক অভিধা এনে দেয়। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্ব এবং পরবর্তী ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয় তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঐতিহাসিক মর্যাদা এনে দেয়। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেও তাঁর সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবেও দীর্ঘ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন।

গণতন্ত্রের জন্য রাজপথের দীর্ঘ ইতিহাস : বিএনপির ইতিহাস কেবল সরকার পরিচালনার ইতিহাস নয়; এটি বিরোধী রাজনীতিরও ইতিহাস। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার প্রশ্ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন—বিএনপি বারবার রাজপথে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে এ কথাও স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের কোনো বড় রাজনৈতিক দলই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। বিএনপিরও ভুল ছিল, সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি দল টিকে থাকা এবং বারবার পুনর্গঠিত হওয়া তার সাংগঠনিক সক্ষমতারও প্রমাণ।

ওয়ান-ইলেভেনের অন্ধকার ও পরীক্ষার সময় : ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বিএনপির ইতিহাসে এক গভীর সংকটের অধ্যায়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিধিনিষেধ, দল ভাঙার নানা উদ্যোগ এবং নেতাকর্মীদের ওপর চাপ সব মিলিয়ে বিএনপি তখন অস্তিত্বের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তার অভিঘাত দলটির ওপর দীর্ঘস্থায়ী হয়। তবু দলটি ভেঙে যায়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন—যা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন থেকে নেতৃত্বের কেন্দ্রে :
বিএনপির সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্ব একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলটির সাংগঠনিক কাঠামোকে সচল রাখার চেষ্টা করেন। ভার্চুয়াল সভা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। আজ সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথের এক নতুন পরিণতি দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘Bangladesh First’—রাষ্ট্র পরিচালনায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যয়।

৩১ দফা থেকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ : তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি। বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণসহ বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার Vision 2030 এবং তারেক রহমানের ৩১ দফাকে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারের মূল দর্শন হিসেবে এসেছে ‘Bangladesh First’ এবং ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। এখানেই বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—দীর্ঘ আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করা।

২০২৬—বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে :
২০২৬ সাল বিএনপির ইতিহাসে এক অনন্য বাঁক। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন ও নির্বাচনী সংগ্রামের পর দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন; আগস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ২৫৫ ভোট পেয়ে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ওলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পর বিএনপি মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরণের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিএনপির নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায়েরও সূচনা।

ছয় মাসের সরকার প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে :
তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে Family Card, Farmer Card, খাল পুনঃখনন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকাভিত্তিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার নিজস্ব মূল্যায়নে এসব উদ্যোগকে জনমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছে। অবশ্য একটি সরকারের সাফল্য শুধু ঘোষণায় পরিমাপ করা যায় না; মানুষের জীবনযাত্রায় তার বাস্তব প্রতিফলনই শেষ বিচারের মানদণ্ড। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং প্রশাসনিক দক্ষতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণ এখন বাস্তব ফল দেখতে চাইবে। তাই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বেরও স্মারক।

ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক রাষ্ট্রের নতুন ভাবনা :

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে Family Card একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের প্রয়োজনীয় পণ্য সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে Farmer Card, Health Card এবং কর্মসংস্থানের নানা উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় এমন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও প্রয়োজন স্বচ্ছ ডেটাবেজ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাছাই, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং জবাবদিহি। কারণ জনকল্যাণের অর্থ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রকৃত উপকারভোগীর ঘরে পৌঁছায়।

সংস্কার বনাম স্থিতিশীলতা আগামীর বড় পরীক্ষা :
জুলাই জাতীয় সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতপার্থক্য রয়েছে। সংসদের বিশেষ কমিটি সংবিধানের সামগ্রিক পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং জুলাই সনদকে সংস্কার আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বিএনপি সংস্কারের প্রয়োজন অস্বীকার করছে না; বরং দলটির ৩১ দফায় বহু আগেই রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এমন দাবি দলের নেতৃত্বের। এখন ক্ষমতাসীন হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব হলো এমন সংস্কার বাস্তবায়ন করা, যা কেবল আজকের ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, আগামী দিনের বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত করবে। সত্যিকারের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই ক্ষমতা বদলাবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে।

আমার পরিবারেও বিএনপির ইতিহাসের স্পন্দন : বিএনপির এই ৪৮ বছরের ইতিহাস আমার কাছে শুধু বইয়ের পাতা, রাজনৈতিক বক্তৃতা কিংবা সংবাদপত্রের কলামে সীমাবদ্ধ নয়। এই ইতিহাসের সঙ্গে আমার পারিবারিক আবেগও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আমি নিজেও একটি বিএনপি পরিবারের সন্তান। আমার চাচা মরহুম কবির মুরাদ ছিলেন জিয়া পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, বিশ্বাস, নিষ্ঠা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিরও অংশ।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমার কাছে কোনো ক্ষমতার উত্তরাধিকার নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং প্রতিকূল সময়েও বিশ্বাসের জায়গায় অটল থাকার এক নৈতিক শিক্ষা। রাজনীতি যখন কেবল পদ-পদবি বা নির্বাচনী হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন এমন মানুষের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।

ইলিয়াস আলীর স্মৃতি ও লুনার সংগ্রাম : আমার ফুপি তাহসিনা রুশদীর লুনা বিএনপি নেতা ও গুমের শিকার বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী। তাঁর জীবনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক বেদনাময় অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। ২০১২ সালে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আজও তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের স্মৃতিতে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। আজ সেই তাহসিনা রুশদীর লুনা সিলেট-২ আসনের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর এই যাত্রা ব্যক্তিগত বেদনা পেরিয়ে রাজনৈতিক দায়িত্বে উত্তরণের এক অনন্য গল্প। একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন সংগ্রামী নারী এবং এখন একজন জনপ্রতিনিধি এই চারটি পরিচয়ের ভার তিনি একসঙ্গে বহন করছেন।

ব্যক্তিগত আবেগ যখন জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যায় :
আমার পরিবারের এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমাকে বিএনপিকে অন্য এক দৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছে। একটি দলের ইতিহাস তখন আর কেবল দলীয় কার্যালয়, মিছিল কিংবা নির্বাচনী প্রতীকের ইতিহাস থাকে না; তা হয়ে ওঠে অসংখ্য পরিবারের স্মৃতি, ত্যাগ, কান্না, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের সম্মিলিত ইতিহাস। কবির মুরাদের মতো প্রবীণ নেতাদের রাজনৈতিক নিষ্ঠা এবং ইলিয়াস আলীর পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা—এই দুই প্রান্তকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের রাজনীতির এক গভীর মানবিক চিত্র ফুটে ওঠে। রাজনীতির ইতিহাসে জয়-পরাজয়ের হিসাব থাকে, কিন্তু তার আড়ালে থাকে মানুষের জীবন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই আমার ব্যক্তিগত প্রার্থনা—রাজনীতি যেন প্রতিহিংসার নয়, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ভাষা হয়ে ওঠে।

বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি তৃণমূল : বিএনপির দীর্ঘস্থায়িত্বের অন্যতম কারণ তার তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন। গ্রাম থেকে শহর, ইউনিয়ন থেকে মহানগর—দলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সময় প্রতিকূলতার মধ্যে সংগঠন ধরে রেখেছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পেছনে এই তৃণমূলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের সামনে নতুন দায়িত্ব এসেছে। ক্ষমতার সঙ্গে দূরত্ব হারালে রাজনীতি মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তাই বিএনপির প্রয়োজন ত্যাগী, সৎ, দক্ষ ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বকে সামনে আনা; দলীয় শৃঙ্খলা কঠোর করা; দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শূন্য-সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। কারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে যে সময় লাগে, তা হারাতে লাগে মাত্র একটি ভুল মুহূর্ত।

৪৮ থেকে ৫০ আগামীর দুই বছরের অঙ্গীকার : ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একটি মধ্যবর্তী ঐতিহাসিক মাইলফলক। সামনে ৫০ বছর পূর্তি। তাই এখন থেকেই দলটির সামনে একটি প্রশ্ন পঞ্চাশ বছরে বিএনপি নিজেকে কীভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে? তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশ আগের বাংলাদেশ নয়। তারা ডিজিটাল, বিশ্বমুখী, তথ্যসচেতন এবং একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রত্যাশী। তাদের কাছে শুধু অতীতের গৌরব যথেষ্ট নয়; তারা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চায়। ফলে জিয়ার ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার Vision 2030 এবং তারেক রহমানের ৩১ দফাকে সময়োপযোগী বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করাই হবে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক আত্মশুদ্ধির শপথ : ৪৮ বছরের গৌরব যেমন স্মরণ করতে হবে, তেমনি ভুল ও সীমাবদ্ধতার দিকেও তাকাতে হবে নির্মোহ চোখে। কারণ আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে না। বিএনপির সামনে আজ যে সুযোগ এসেছে, তা ঐতিহাসিক। একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা, অন্যদিকে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মতের প্রতি গণতান্ত্রিক সহনশীলতা। যে গণতন্ত্রের জন্য দলটি দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে, ক্ষমতায় থেকেও সেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই হবে তার শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।

পরিশেষে, ইতিহাস কখনো কখনো নীরবে কথা বলে আর আজকের এই দিনে, ১লা সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ, সেই ইতিহাসই যেন মুখর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলার কথা বলতে। ১৯৭৮ সালের রমনার সবুজ চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রাপথ কখনো মসৃণ ছিল না কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, রাজপথের রক্তাক্ত সংগ্রাম, নির্বাসনের নিঃসঙ্গতা আর হাজারো নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই এই দল আজ পরিণত হয়েছে বাংলার মাটির সবচেয়ে গভীর শিকড়বিশিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। শহীদ জিয়াউর রহমানের দূরদৃষ্টি, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামী চেতনা এই দুই মহান আদর্শের উত্তরাধিকার আজ বহন করে চলেছেন তাঁদেরই সুযোগ্য উত্তরসূরি দেশনায়ক তারেক রহমান। আজ সেই স্বপ্নেরই ধারাবাহিকতায় তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বিএনপি এগিয়ে চলেছে এক নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয়ে। এই যাত্রা কেবল ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর যাত্রা নয় এ যাত্রা হৃদয় জয়ের, আস্থা অর্জনের, আর ভাঙা স্বপ্নগুলো নতুন করে বুনে দেওয়ার। বাংলাদেশের আকাশে আজ যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছে, তার আলোয় আলোকিত হোক দেশের প্রতিটি প্রান্ত উত্তরের চা-বাগান থেকে দক্ষিণের উপকূল, পূর্বের পাহাড় থেকে পশ্চিমের সমতলভূমি পর্যন্ত। আগামী দিনগুলোতে বিএনপির প্রতিটি পদক্ষেপ যেন হয়ে ওঠে ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এক কল্যাণকামী যাত্রা যেখানে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের কাগজে বন্দি না থেকে প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের আলো হয়ে ধরা দেবে। কৃষকের মুখের নির্মল হাসি, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের অবারিত সুযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা, আর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এই হোক বিএনপির আগামীর অভিযাত্রার মূল সুর ও অন্তর্নিহিত দর্শন। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যেন হয়ে ওঠে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের এক অবিচল প্রহরী। রাষ্ট্র যেন কোনো দলের বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি না হয়ে ওঠে বরং হয়ে ওঠে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আশ্রয়স্থল। ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন আর অর্থনৈতিক মুক্তি এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ, যেখানে ভয় নয়, আশাই হবে মানুষের নিত্যসঙ্গী। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত এই পথ, ত্যাগী নেতাকর্মীদের অশ্রু ও ঘামে সিক্ত এই দীর্ঘ সংগ্রাম যেন কখনো বিফলে না যায় বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হয়ে উঠুক নতুন অঙ্গীকারের সূচনাবিন্দু, নতুন সংকল্পের উৎসমুখ। ৪৮ বছরের এই মহীরুহ যেন তার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত করে, শাখা-প্রশাখা আরও বিস্তৃত করে ছায়া দেয় গোটা বাংলাদেশকে যেখানে ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম নেয়, স্বপ্নবান তরুণ আশ্রয় খোঁজে, আর নিপীড়িত মানুষ খুঁজে পায় ন্যায়বিচারের ঠিকানা। আগামী পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস যেন লেখা হয় গৌরব আর অর্জনের কালিতে যেখানে বিএনপি শুধু অতীতের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের প্রধান কারিগর। জয় হোক গণতন্ত্রের। জয় হোক বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের। শুভ হোক, কল্যাণময় হোক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট