পটুয়াখালী প্রতিনিধি: একসময় কুপির ক্ষীণ আলোয় বসে কাপড় সেলাই করতেন লাকী বেগম। হাতে ছিল স্বামীর কাছ থেকে শেখা সেলাইয়ের কাজ, পাশে ছোট্ট সন্তান আর সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির মানসিক নির্যাতনে বাবার বাড়িতে ফিরে এসে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন তিনি।
প্রথম মাসে আয় হয়েছিল মাত্র ৯০০ টাকা। সেই টাকায় ছেলের জন্য ঈদের পোশাক কিনে দেওয়ার আনন্দই তখন ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।
আজ সেই লাকী বেগম একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। তাঁর আমখোলা বাজারের টেইলারিং দোকানে কাজ করছেন দুজন কর্মচারী। দোকানে রয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকার মালামাল। গড়ে মাসে ৩০ হাজার টাকার কাপড় বিক্রি হয়। শুধু ব্যবসাই নয়, এখন অন্য নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণও দেন তিনি। ভবিষ্যতে নিজের একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন লাকী।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত আমখোলা গ্রামের মেয়ে লাকী বেগম। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০০৩ সালে একই গ্রামের দর্জি মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
২০০৮ সালে তাঁদের একমাত্র ছেলে সন্তানের জন্ম। সংসারের ব্যয় সামলাতে স্বামীর দর্জির দোকানে কাজ শেখা শুরু করেন লাকী। স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয়ে তখন কোনো রকমে সংসার চলছিল। কিন্তু পরের বছরই বদলে যায় সবকিছু।
২০০৯ সালে হঠাৎ মারা যান তাঁর স্বামী। একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে লাকীর সামনে নেমে আসে কঠিন সময়।
স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুর দর্জির দোকানটি নিজের দখলে নিয়ে নেন। শ্বশুরবাড়িতে মানসিক নির্যাতনের মুখে শেষ পর্যন্ত ছোট ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হন লাকী।
বাবার বাড়িতে ফিরে লাকীর পাশে দাঁড়ান তাঁর বাবা। মেয়েকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দেন তিনি। সেই মেশিন আর স্বামীর কাছ থেকে শেখা সেলাইয়ের কাজকে পুঁজি করে আবার শুরু হয় লাকীর পথচলা।
শুরুটা ছিল খুবই কঠিন। বিদ্যুৎ কিংবা সোলার সুবিধা না থাকায় অনেক সময় কুপির আলোয় বসে সেলাই করতে হয়েছে তাঁকে। দিনের পর দিন পরিশ্রম করেও আয় ছিল সামান্য।
প্রথম মাসে আয় হয় মাত্র ৯০০ টাকা। তবে সেই সামান্য আয়ও লাকীর কাছে ছিল বড় সাফল্য। সেই টাকা দিয়ে ছেলের জন্য ঈদের পোশাক কিনেছিলেন তিনি।
২০১৩ সালে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করান। সংসারে খাবারের সংকট থাকলেও ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। কখনো কখনো তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত। তবু ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে লড়াই চালিয়ে যান তিনি।
বাবার বাড়িতে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করে কিছু টাকা সঞ্চয় করেন লাকী। পরে অন্যের দোকানে কাজ করে আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর আমখোলা বাজারে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে নিজের টেইলারিং ব্যবসা শুরু করেন।
কিছুদিন পর তাঁর বাবা বাজারে একটি দোকান কিনে দিলে সেখানেই স্থায়ীভাবে ব্যবসা শুরু করেন লাকী।
২০১৮ সালে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ২৫ হাজার টাকা ঋণ নেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের অভাবে ব্যবসা আশানুরূপ এগোচ্ছিল না। এরপর আসে তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
২০১৯ সালে জরিপের মাধ্যমে লাকীর পরিবারকে অতিদরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি সদস্য হন প্রসপারিটি ভিলেজ কমিটির (পিভিসি)।
নিয়মিত পিভিসির সভায় অংশ নেওয়া এবং সঞ্চয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। পরে প্রকল্পের সহায়তায় সেলাই প্রশিক্ষণ নেন।
প্রশিক্ষণের পর নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করলেও আবারও বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুঁজির সংকট। দোকানে পর্যাপ্ত কাপড় তুলতে পারছিলেন না তিনি।
এ সময় কারিগরি দলের সদস্যরা তাঁর দোকান পরিদর্শন করেন। দোকানের অবস্থা বিবেচনা করে তাঁকে ২২ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি কোডেকের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা ঋণের ব্যবস্থা করা হয়।
এই অর্থ দিয়ে লাকী তিনটি সেলাই মেশিন—লক মেশিন, মোটর মেশিন ও প্লেন মেশিন—কেনেন। বাড়তে থাকে তাঁর ব্যবসার পরিধি।
সহায়তা পাওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যায় লাকীর ব্যবসার চিত্র। তাঁর দোকানে এখন নিয়মিত কাজ করেন দুজন কর্মচারী।
মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকার কাপড় বিক্রি করেন তিনি। দোকানে রয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকার মালামাল।
প্রকল্পের কর্মীদের নিয়মিত তদারকি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যবসার প্রচারের সুযোগ পাওয়ায় তাঁর আয় আরও বেড়েছে।
এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে নারী ক্যাটাগরিতে উপজেলা পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কার পান লাকী বেগম। তবে এখানেই থেমে থাকেননি তিনি।
নিজে দক্ষ হয়ে ওঠার পর এখন অন্য নারীদেরও দক্ষ করে তুলছেন। বর্তমানে পিপিইপিপি-ইইউ প্রকল্পের আওতায় সেলাই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
লাকী বেগম বলেন, “একসময় সংসারে তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন ছিল। এখন আমার ছেলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। তার পড়াশোনার খরচ চালাতে সমস্যা হচ্ছে না। আমরা এখন নিয়মিত তিন বেলা পুষ্টিকর খাবারও খেতে পারি।”
নিজের জীবনের পরিবর্তনের পেছনে বাবার সহযোগিতা, নিজের পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ এবং প্রকল্পের কারিগরি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সেবা গ্রহণ এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমেও তাঁর পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।
একসময় যে নারী কুপির আলোয় বসে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য কাপড় সেলাই করতেন, আজ তাঁর নিজের ব্যবসা আছে, কর্মচারী আছে, প্রশিক্ষক হিসেবে পরিচয় আছে। আছে সমাজে নিজের একটি অবস্থানও। তবে লাকীর স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়।
তিনি ভবিষ্যতে একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অনলাইনে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে তাঁর আয়ও বাড়ছে।
শূন্য থেকে শুরু করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই গল্প শুধু একজন নারীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার গল্প।
স্বামী হারানোর পর যে জীবনকে অন্ধকার মনে হয়েছিল, সেই জীবনেই আজ নিজের হাতে আলো জ্বালিয়েছেন লাকী বেগম। আর সেই আলোয় তিনি শুধু নিজের সন্তানকে নয়, আশপাশের অন্য নারীদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 























