পটুয়াখালী প্রতিনিধি: কুয়াকাটা সৈকতের বালুচর পেরিয়ে জোয়ারের পানিতে চোখ রাখলে কোথাও কোথাও ভেসে থাকতে দেখা যায় সবুজ-লালচে রঙের সামুদ্রিক শৈবাল। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের কাছে যা অনেকটা উপেক্ষিত, গবেষকদের চোখে সেটিই এখন হয়ে উঠছে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র।
পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা ও এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন এই সামুদ্রিক শৈবালকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হতে পারে খাদ্য, প্রসাধনীসহ নানা ধরনের মূল্য সংযোজিত পণ্য। পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলাতেও সামুদ্রিক শৈবালের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। এই সম্ভাবনা যাচাই করতে মৎস্য অধিদপ্তরের (DoF) তত্ত্বাবধানে Sustainable Coastal and Marine Fisheries Project-এর আওতায় এক বছর মেয়াদি একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. রাজিব সরকারের নেতৃত্বে এবং একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলমের সহ-নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষণার লক্ষ্য ছিল শুধু শৈবাল চাষের পদ্ধতি বের করা নয়। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাষের দক্ষতা বাড়ানো, উৎপাদিত শৈবালের পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ, শৈবাল থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে এর সম্ভাবনা মূল্যায়ন করাও ছিল গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কুয়াকাটায় বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন সামুদ্রিক শৈবালের উপস্থিতি অবশ্য নতুন কোনো তথ্য নয়।
২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) পটুয়াখালীর খেপুপাড়া নদী উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল কুয়াকাটা সৈকত ও আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে প্রচুর সামুদ্রিক শৈবালের সন্ধান পান।
কুয়াকাটা সৈকতের পাশাপাশি গঙ্গামতী খালের মোহনা, হাজিপুর ফেরিঘাট এলাকা, আন্ধারমানিক নদীর বালিয়াতলী ও চারিপাড়া এলাকায়ও এসব শৈবাল পাওয়া যায়।
তখন মোহাম্মদ আশরাফুল জানিয়েছিলেন, সৈকতসংলগ্ন জোয়ার-ভাটা এলাকায় পানির নিচে এসব শৈবাল জন্মায়। কুয়াকাটায় এ ধরনের শৈবাল পাওয়ার ঘটনা সে সময় প্রথমবারের মতো নথিবদ্ধ করা হয়েছিল। সংগৃহীত নমুনা গবেষণাগারে সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে এটিকে ‘হিপনিয়া’ (Hypnea) প্রজাতির শৈবাল বলে ধারণা করা হয়েছিল।
তিনি তখন আরও বলেছিলেন, সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। ফলে খাদ্য হিসেবে এর সম্ভাবনা রয়েছে এবং কিছু শৈবালজাত উপাদানের ঔষধি ও শিল্পগত ব্যবহারও রয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় কুয়াকাটা ও উপকূলীয় অঞ্চলে পাওয়া শৈবালকে শুধু প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ নয়, পরিকল্পিতভাবে চাষের আওতায় আনার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়েছে।
গবেষণার অংশ হিসেবে স্থানীয় উপকারভোগীদের দল গঠন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর শৈবাল চাষে রাফট ও লং-লাইন পদ্ধতি ব্যবহার করে চারা স্থাপন করা হয়।
গবেষণায় Ulva প্রজাতিকে সম্ভাবনাময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ প্রজাতি তুলনামূলক কম লবণাক্ততা ও ঘোলা পানিতেও বৃদ্ধি পেতে পারে। অনুকূল পরিবেশে মাসে দুইবার পর্যন্ত আহরণ করা সম্ভব হওয়ায় এটি উপকূলীয় মানুষের জন্য তুলনামূলক কম খরচে চাষযোগ্য একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হতে পারে।
গবেষক বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. রাজিব সরকার বলেন, পটুয়াখালী সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তাঁর ভাষায়, সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শৈবাল চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পুষ্টিগুণ বিবেচনায় বিকল্প খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির চেষ্টাও চলছে।
গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো—শৈবালকে শুধু কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে তা দিয়ে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির চেষ্টা।
গবেষণায় শৈবাল ব্যবহার করে নরি শিট, বিস্কুট, জেলি, চিপস, সসেজ, আইসক্রিম, জিলাপি, রসগোল্লা, সাবান, উপটান ও শৈবালভিত্তিক ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
এর মধ্যে নরি শিট তৈরির ক্ষেত্রে শৈবাল প্রথমে ধুয়ে ও ভিজিয়ে ব্লেন্ড করা হয়। এরপর ট্রেতে পাতলা স্তর তৈরি করে প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কয়েক ঘণ্টা শুকানো হয়। পরে হট-প্রেস মেশিনের সাহায্যে শিটটি সমতল ও সংযুক্ত করে প্রয়োজনীয় আকারে কাটা হয়।
শৈবাল দিয়ে আইসক্রিম তৈরির প্রোটোকলও তৈরি করা হয়েছে। এতে দুধ, চিনি ও শৈবাল গুঁড়া ব্যবহার করে বিভিন্ন মাত্রায় শৈবাল উপাদান যুক্ত করা হয়। এরপর পণ্যের স্বাদ, গন্ধ, গঠন ও ভোক্তা গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়।
তবে শৈবালকে খাদ্য হিসেবে বাজারজাত করার আগে এর নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষণায় শৈবালজাত পণ্যের সেন্সরি বা ভোক্তা গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা, পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা, লিপিড অক্সিডেশন এবং ভারী ধাতু বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুমকি লুথারান হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অফিসার ডা. মোনতারিয়া জান্নাত বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকতে পারে, যা মানবদেহের জন্য উপকারী। তবে খাদ্য হিসেবে গ্রহণের আগে সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুষ্টিবিষয়ক নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
অর্থাৎ, শৈবালকে ‘সুপারফুড’ হিসেবে প্রচারের আগে এর প্রজাতি, উৎপাদনস্থলের পানি, দূষণের মাত্রা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শৈবাল চাষের আরেকটি বড় সম্ভাবনা পরিবেশগত। ম্যাক্রোঅ্যালগি হলো বৃহৎ ও বহুকোষী সামুদ্রিক শৈবাল। উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থায় এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শৈবালে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান থাকতে পারে।
গবেষকদের মতে, সামুদ্রিক শৈবাল পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্রহণ করে এবং জলজ পরিবেশের কিছু প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। ফলে পরিকল্পিতভাবে শৈবাল চাষের মাধ্যমে কার্বন ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শৈবাল চাষ করলেই যে সরাসরি বিপুল পরিমাণ কার্বন স্থায়ীভাবে সমুদ্রের বাইরে আটকে যাবে—এমন সরল সমীকরণ নেই। কার্বন কতটা দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চিত হয়, তার একটি অংশ কোথায় যায় এবং চাষ ও আহরণের পুরো প্রক্রিয়ায় কতটা কার্বন নিঃসরণ হয়—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
গবেষণাটিতে তাই কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন বা কার্বন ধারণের সম্ভাবনা মূল্যায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় জেলায় মানুষের জীবিকা অনেকটাই মাছ ধরা, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রের পরিবর্তনশীল পরিবেশে এসব জীবিকা নানা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সেখানে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ তুলনামূলক ছোট পরিসরে শুরু করা গেলে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আশরাফুলও আগে বলেছিলেন, বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা অত্যন্ত উর্বর এবং এখানে জলজ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের বিপুল সম্পদ রয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই প্রযুক্তি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব।
তাঁর মতে, সামুদ্রিক শৈবাল সাধারণত শিলা, পাথর, প্রবাল, শামুক-ঝিনুকের খোসা, বাঁশ, রশি, গাছের শিকড় বা অন্য কোনো শক্ত বস্তুর ওপর জন্মাতে পারে। বিএফআরআই উদ্ভাবিত শৈবাল চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিতভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে একই সঙ্গে কয়েকটি সুফল পাওয়া সম্ভব—বিকল্প কর্মসংস্থান, স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধি, নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি, প্রসাধনী ও শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু চাষ করলেই হবে না। প্রয়োজন উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন, মানসম্মত চারা, চাষের উপযুক্ত এলাকা নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাজার তৈরি।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহান বলেন, সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামুদ্রিক শৈবালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি শৈবাল থেকে উৎপাদিত পণ্যের কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কুয়াকাটার সৈকতে যে শৈবাল একসময় জোয়ারের সঙ্গে ভেসে আসা কিংবা পানির নিচে জন্মানো একটি সাধারণ জলজ উদ্ভিদ হিসেবেই দেখা হতো, সেটিই এখন গবেষকদের কাছে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সম্পদ।
প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তব বাণিজ্যে রূপ নেয়। যদি বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিশ্চিত বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে কুয়াকাটার সৈকতে ছড়িয়ে থাকা এই সামুদ্রিক শৈবাল শুধু উপকূলের প্রকৃতির অংশ হয়ে থাকবে না—হতে পারে উপকূলীয় মানুষের নতুন জীবিকারও অংশ।

ডেস্ক রিপোর্ট 























