বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনা ঘিরে দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের পাশাপাশি এই ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির বড় শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী আমানত ভিত্তি এবং রিটেইল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের কৌশল এ আগ্রহের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে এসে করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ব্যবসাটি বিক্রির জন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগও হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি, মূল্যায়ন বা লেনদেনের সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংককেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। প্রকাশ্য প্রতিবেদনে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ও কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই) ঋণ পোর্টফোলিও ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির মোট আমানত ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল, যার প্রায় ২০ শতাংশ বা ৮ হাজার কোটি টাকা ছিল রিটেইল আমানত। সম্ভাব্য লেনদেনের আওতায় আমানত, ভোক্তা ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও অন্যান্য রিটেইল ব্যাংকিং সেবা থাকতে পারে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ও কার্ড ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পর সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যাংকটির আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের পাশাপাশি এ আলোচনায় পূবালী ব্যাংকের নামও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
কম খরচের আমানত, প্রিমিয়াম গ্রাহক ভিত্তি, ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্যালারি অ্যাকাউন্টের কারণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূবালী ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহী। ইতোমধ্যে তাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপনার অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। তাদের রিটেইল গ্রাহক ও সেবার ধরন আমাদের বর্তমান কৌশলের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তুলনামূলক কম খরচের আমানত এবং প্রিমিয়াম গ্রাহক ভিত্তির কারণে ব্যবসাটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই পোর্টফোলিওটি নিতে পারলে আমাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ার পাশাপাশি আর্থিক সূচকেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
পূবালী ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিটেইল ব্যাংকিং, কার্ড, ডিজিটাল ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্ট ও সেলফ-সার্ভিস ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে, রিটেইল ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণকে ব্যবসা বৃদ্ধির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অবকাঠামোর দিক থেকেও পূবালী ব্যাংকের বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বর্তমানে ১৮টি শাখা রয়েছে। বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের শাখা ৫০০টির বেশি এবং উপশাখা ২৮০টির বেশি। ব্যাংকটি সম্প্রতি এক হাজারতম এটিএম/সিআরএম চালু করেছে। ফলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল গ্রাহকদের বড় একটি অংশকে দেশজুড়ে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পূবালীর বিদ্যমান নেটওয়ার্ক কাজে লাগতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ১৮টি শাখার তথ্য ব্যাংকটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও দেওয়া আছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও পূবালী ব্যাংক সম্প্রসারণ করছে। ব্যাংকটির ‘পিআই’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ৫ লাখ ২৮ হাজারে পৌঁছায় এবং ওই বছরে প্ল্যাটফর্মটিতে ১ কোটি ৮৬ লাখের বেশি লেনদেন হয়েছে বলে ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে।
পূবালী ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাও বড় আকারের রিটেইল পোর্টফোলিও অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০২৫ সালের প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানত দাঁড়ায় ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) ছিল ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। বছরের শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ২০ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পূবালী ব্যাংক প্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা সমন্বিত মুনাফা করেছে।
বিশ্বজুড়ে কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সম্প্রতি অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে তাদের সার্বিক ব্যাংকিং গুটিয়ে নিয়েছে। এছাড়া শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া ও আইভরিকোস্টেও তারা কনজ্যুমার ব্যাংকিং বন্ধ বা বিক্রি করেছে। তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এই উদ্যোগ। একই ধরনের কৌশল নিয়ে এর আগে এইচএসবিসিও বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কমিয়ে করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
বাংলাদেশে রিটেইল ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে জানতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরীর কাছে জানতে চায়। লিখিত বক্তব্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানায়, রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা নিয়ে বাজারে প্রচলিত গুজব বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবে না।
ব্যাংকটি আরও জানায়, বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং এই মুহূর্তে ব্যাংকিং সেবা ও কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন নেই। বাংলাদেশে ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং দেশটির প্রতি ব্যাংকটির প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















