ঢাকা ০৮:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

২৮ বছরের বন্দি জীবনের অবসান

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৬:৪৮:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার দেখা হয়েছে

জীবনের ২৮ বসন্ত কেটে গেছে কারাগারের চার দেওয়ালে। অবশেষে যখন মুক্তি মিললো তখন হারাতে বসেছেন দৃষ্টি শক্তি, স্মৃতিও ঠিকঠাকভাবে কাজ করছে না। কারাগারের লোহার দরজা পেরিয়ে বাইরে এলেন, ততদিনে চুল পেকে গেছে, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর।

রাহেলা বেগমের সাজার মেয়াদ শেষ হয় গত ১২ জানুয়ারি। মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আটকে ছিল মুক্তি। পরবর্তীতে কারা কতৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে সাড়ে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলে মুক্ত আকাশে ফেরেন তিনি।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বেগম (৬৫)। ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান তিনি। সেই থেকে শুরু হয় তার দীর্ঘ বন্দিজীবন। যখন তিনি জেলে প্রবেশ করেন, তখন বয়স ছিল মধ্য বয়সের কোঠায়, চুল ছিল কালো, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ভয়। সময়ের নির্মম ঘূর্ণিতে আজ তিনি একজন চুলে পাকা ধরা বৃদ্ধা, শরীর ভেঙে পড়েছে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল। এমনকি অনেক সময় নিজের প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন না। তবুও এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ের মাঝেও একটি স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন তিনি—একদিন মুক্ত আকাশে নিশ্বাস নেবেন।

কারাগারে কাটানো দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা বেগম। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, জেলখানায় যাওয়ার পর কাঁথা সেলাই করতাম। পুলিশ কাঁথা দিত, আমি সেলাই করতাম। কিন্তু দিন যত যেত, তত অস্থির লাগত। জেলখানার এক দিন আমার কাছে এক বছরের মতো মনে হতো। মনে হতো দম বের হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, জীবন, সংসার, কিছুই মিলাতে পারতাম না চার দেয়ালের ভেতর, খুব কাঁদতাম । আমার দিকে যেন সরকার একটু নজর দেয়। আর বেশি কিছু বলার শক্তি নাই।

রাহেলার বড় বোন সাহেলা বেগম বলেন, এই পৃথিবীতে রাহেলার আপন বলতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের বাবা-মা মারা গেছেন। তার স্বামী অন্যত্র সংসার গড়েছেন। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার বাড়িতেই ঠাঁই হয়েছে তার।

তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে পারত। সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমি অনুরোধ জানাই, মানবিক দৃষ্টিতে যেন তারা এগিয়ে আসেন।

নওগাঁর জেল সুপার রত্না রায় বলেন, রাহেলা বেগমের সশ্রম কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের ধার্য করা সাড়ে ৫ হাজার টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় তার মুক্তি আটকে ছিল। ওই টাকা পরিশোধ না করলে তাকে আরও দেড় বছরের মতো কারাগারে থাকতে হতো। কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় ওই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা চাই, জীবনের বাকি সময়টা তিনি যেন স্বাভাবিকভাবে কাটাতে পারেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

২৮ বছরের বন্দি জীবনের অবসান

প্রকাশিত : ০৬:৪৮:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

জীবনের ২৮ বসন্ত কেটে গেছে কারাগারের চার দেওয়ালে। অবশেষে যখন মুক্তি মিললো তখন হারাতে বসেছেন দৃষ্টি শক্তি, স্মৃতিও ঠিকঠাকভাবে কাজ করছে না। কারাগারের লোহার দরজা পেরিয়ে বাইরে এলেন, ততদিনে চুল পেকে গেছে, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর।

রাহেলা বেগমের সাজার মেয়াদ শেষ হয় গত ১২ জানুয়ারি। মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আটকে ছিল মুক্তি। পরবর্তীতে কারা কতৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে সাড়ে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলে মুক্ত আকাশে ফেরেন তিনি।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বেগম (৬৫)। ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান তিনি। সেই থেকে শুরু হয় তার দীর্ঘ বন্দিজীবন। যখন তিনি জেলে প্রবেশ করেন, তখন বয়স ছিল মধ্য বয়সের কোঠায়, চুল ছিল কালো, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চিত ভয়। সময়ের নির্মম ঘূর্ণিতে আজ তিনি একজন চুলে পাকা ধরা বৃদ্ধা, শরীর ভেঙে পড়েছে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল। এমনকি অনেক সময় নিজের প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন না। তবুও এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়ের মাঝেও একটি স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন তিনি—একদিন মুক্ত আকাশে নিশ্বাস নেবেন।

কারাগারে কাটানো দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা বেগম। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, জেলখানায় যাওয়ার পর কাঁথা সেলাই করতাম। পুলিশ কাঁথা দিত, আমি সেলাই করতাম। কিন্তু দিন যত যেত, তত অস্থির লাগত। জেলখানার এক দিন আমার কাছে এক বছরের মতো মনে হতো। মনে হতো দম বের হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, জীবন, সংসার, কিছুই মিলাতে পারতাম না চার দেয়ালের ভেতর, খুব কাঁদতাম । আমার দিকে যেন সরকার একটু নজর দেয়। আর বেশি কিছু বলার শক্তি নাই।

রাহেলার বড় বোন সাহেলা বেগম বলেন, এই পৃথিবীতে রাহেলার আপন বলতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের বাবা-মা মারা গেছেন। তার স্বামী অন্যত্র সংসার গড়েছেন। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার বাড়িতেই ঠাঁই হয়েছে তার।

তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে পারত। সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমি অনুরোধ জানাই, মানবিক দৃষ্টিতে যেন তারা এগিয়ে আসেন।

নওগাঁর জেল সুপার রত্না রায় বলেন, রাহেলা বেগমের সশ্রম কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের ধার্য করা সাড়ে ৫ হাজার টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় তার মুক্তি আটকে ছিল। ওই টাকা পরিশোধ না করলে তাকে আরও দেড় বছরের মতো কারাগারে থাকতে হতো। কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় ওই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা চাই, জীবনের বাকি সময়টা তিনি যেন স্বাভাবিকভাবে কাটাতে পারেন।