ঢাকা ১২:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বেনাপোলে কসাই মিজান হত্যার ৬ মাস পেরোলেও খুলছে না রহস্যের জট, পরিবারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:২৪:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে

Oplus_131072

বেনাপোল (শার্শা) প্রতিনিধি: বেনাপোলে গরু ব্যবসায়ী ও কসাই মিজানুর রহমানকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যার ছয় মাস পার হলেও রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। ২৮ আগস্ট ২০২৫ গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নিহতের বাড়ির আসপাশে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী বাড়িটি ছিলো “নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টিত”। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘটনার রাতে বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি বাড়িতে প্রবেশের দৃশ্য ধরা পড়েনি। তবে রাত সাড়ে ৩টার দিকে চিৎকারের শব্দ রেকর্ড হয়েছে। এর আগে বা পরে কোনো অনুপ্রবেশের চিহ্ন মেলেনি—যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এত সুরক্ষিত বাড়িতে বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে না পারলে হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটলো—এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার আগে মিজানকে চেতনানাশক কিছু দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কারণ জবাইয়ের মতো নৃশংস ঘটনায়ও তার কোনো চিৎকার শোনা যায়নি।
নিহতের স্ত্রী ফিরোজা খাতুন জানান, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মিজান বাড়িতে ফিরে গেট ও ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুমাতে যান। পরে ভ্যানচালকের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে বাইরে গিয়ে দেখেন, ঘরের গেট থেকে তিন গজ দূরে স্বামী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন একজন ব্যক্তি ৮০ হাজার টাকা পাওনার দাবি নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন এবং মিজান শনিবার টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে ওই ব্যক্তির নাম, পরিচয় বা ঠিকানা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। এমনকি কার কাছে ঠিক কত টাকা পাওনা ছিল—সে বিষয়েও নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তার বক্তব্যের এই অসামঞ্জস্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আরও একটি বক্তব্য নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকরা মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করলে নিহতের স্ত্রী বলেন, “আমার যা যাওয়ার সে তো চলেই গেছে, আমি আর মামলা করে কি করব? আমি কারো নামে মামলা করতে চাই না।” স্বামীর নৃশংস হত্যার পরও মামলা না করার এমন মনোভাবকে অনেকেই অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, একজন নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণত বিচার দাবি ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়—সেখানে এ ধরনের বক্তব্য রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এদিকে, সিসিটিভির ভয়েস রেকর্ড নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ। ফুটেজে শোনা যায়, স্ত্রী জোরে কান্না শুরু করলেও মেয়ে ফাতেমার কণ্ঠ ছিল স্বাভাবিক। তিনি বাইরে এসে কেবল প্রশ্ন করেন, “কে মেরেছে?”এর পর মেয়ের আর কোন শব্দ শোনা যায়নি।  একইভাবে, রাত পৌনে ৩টার দিকে মায়ের উচ্চস্বরে কান্নার পরও ছেলে মুরসালিনের ঘুম না ভাঙা নিয়েও আলোচনা চলছে। জানা গেছে, সে রাত ১২টা পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইলে গেম খেলেছে। এ বিষয়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বন্ধুদের খোঁজ নিয়েছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার এসআই রাশেদ আলী বলেন, “মেডিকেল রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাচ্ছে না। রিপোর্ট হাতে পেলে তদন্তে অগ্রগতি হবে।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রতিটি দিক গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাড়ির ভেতরে অনুপ্রবেশের প্রমাণ না থাকা, চিৎকারের অনুপস্থিতি, পরিবারের সদস্যদের আচরণ, স্ত্রীর বক্তব্যে অসঙ্গতি এবং মামলা না করার ঘোষণা—সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি।
রহস্যে ঘেরা এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। মেডিকেল ও ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশের পরই হয়তো স্পষ্ট হবে-এই নৃশংস হত্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্য।
জনপ্রিয় সংবাদ

দুমকিতে বসন্তের শুরুতে শিমুল ফুলে রাঙ্গিয়ে তুলছে প্রকৃতি

বেনাপোলে কসাই মিজান হত্যার ৬ মাস পেরোলেও খুলছে না রহস্যের জট, পরিবারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত : ০৯:২৪:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বেনাপোল (শার্শা) প্রতিনিধি: বেনাপোলে গরু ব্যবসায়ী ও কসাই মিজানুর রহমানকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যার ছয় মাস পার হলেও রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। ২৮ আগস্ট ২০২৫ গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নিহতের বাড়ির আসপাশে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী বাড়িটি ছিলো “নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টিত”। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘটনার রাতে বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি বাড়িতে প্রবেশের দৃশ্য ধরা পড়েনি। তবে রাত সাড়ে ৩টার দিকে চিৎকারের শব্দ রেকর্ড হয়েছে। এর আগে বা পরে কোনো অনুপ্রবেশের চিহ্ন মেলেনি—যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এত সুরক্ষিত বাড়িতে বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে না পারলে হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটলো—এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার আগে মিজানকে চেতনানাশক কিছু দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কারণ জবাইয়ের মতো নৃশংস ঘটনায়ও তার কোনো চিৎকার শোনা যায়নি।
নিহতের স্ত্রী ফিরোজা খাতুন জানান, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মিজান বাড়িতে ফিরে গেট ও ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুমাতে যান। পরে ভ্যানচালকের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে বাইরে গিয়ে দেখেন, ঘরের গেট থেকে তিন গজ দূরে স্বামী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন একজন ব্যক্তি ৮০ হাজার টাকা পাওনার দাবি নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন এবং মিজান শনিবার টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে ওই ব্যক্তির নাম, পরিচয় বা ঠিকানা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। এমনকি কার কাছে ঠিক কত টাকা পাওনা ছিল—সে বিষয়েও নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তার বক্তব্যের এই অসামঞ্জস্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আরও একটি বক্তব্য নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকরা মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করলে নিহতের স্ত্রী বলেন, “আমার যা যাওয়ার সে তো চলেই গেছে, আমি আর মামলা করে কি করব? আমি কারো নামে মামলা করতে চাই না।” স্বামীর নৃশংস হত্যার পরও মামলা না করার এমন মনোভাবকে অনেকেই অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, একজন নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণত বিচার দাবি ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়—সেখানে এ ধরনের বক্তব্য রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এদিকে, সিসিটিভির ভয়েস রেকর্ড নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ। ফুটেজে শোনা যায়, স্ত্রী জোরে কান্না শুরু করলেও মেয়ে ফাতেমার কণ্ঠ ছিল স্বাভাবিক। তিনি বাইরে এসে কেবল প্রশ্ন করেন, “কে মেরেছে?”এর পর মেয়ের আর কোন শব্দ শোনা যায়নি।  একইভাবে, রাত পৌনে ৩টার দিকে মায়ের উচ্চস্বরে কান্নার পরও ছেলে মুরসালিনের ঘুম না ভাঙা নিয়েও আলোচনা চলছে। জানা গেছে, সে রাত ১২টা পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইলে গেম খেলেছে। এ বিষয়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বন্ধুদের খোঁজ নিয়েছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার এসআই রাশেদ আলী বলেন, “মেডিকেল রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাচ্ছে না। রিপোর্ট হাতে পেলে তদন্তে অগ্রগতি হবে।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রতিটি দিক গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাড়ির ভেতরে অনুপ্রবেশের প্রমাণ না থাকা, চিৎকারের অনুপস্থিতি, পরিবারের সদস্যদের আচরণ, স্ত্রীর বক্তব্যে অসঙ্গতি এবং মামলা না করার ঘোষণা—সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি।
রহস্যে ঘেরা এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। মেডিকেল ও ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশের পরই হয়তো স্পষ্ট হবে-এই নৃশংস হত্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্য।