ঢাকা ১২:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

রমজান ও নদীতে নিষেধাজ্ঞায় পরিবার নিয়ে হতাশ লক্ষ্মীপুরের জেলেরা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:৪৩:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার দেখা হয়েছে
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধিঃ ইলিশ রক্ষায় ১ লা মার্চ মধ্যরাত ১২টা থেকে (মার্চ-এপ্রিল) দুই মাস মেঘনা নদীতে ইলিশসহ সকল ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। নিষেধাজ্ঞার এ অবসর সময়ে নৌকা ও জাল মেরামতের কাজ সারছেন লক্ষ্মীপুরের জেলে সম্প্রদায়। তবে মেঘনার পাড়ের জেলেপল্লীগুলোতে এখন হাহাকার এবং কান্নার সুর। একদিকে  পবিত্র রমজান মাস, অন্যদিকে মাচ-এপ্রিল দুই মাস মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞা, মাঝনদীতে জাল ফেলে মাছ ধরার পথ একেবারেই বন্ধ। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় আয়ের একমাত্র উৎস্য হারিয়ে এবং ঋনের দেনায় জর্জরীত পরিবার নিয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার জেলে। তাছাড়া সরকারি খাদ্য সহায়তা (বিজিএফ) চালও অপর্যাপ্ত, বন্টনেও রয়েছে না পাওয়ার অভিযোগ। তবে মৎস্য বিভাগ জানালেন নিষেধাজ্ঞার সময় ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি এবারই প্রথম ভাসমান জেলেপল্লিগুলোতেও খাদ্য সহায়তার আশ^াস দিলেন সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী- ইলিশের বেড়ে ওঠা ও ঝাটকা ইলিশ রক্ষায় লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর আলেকজান্ডার এলাকা থেকে চাঁদপুরের ষাটনাল পর্যন্ত  ১০০ কিলামিটার মেঘনা নদী ইলিশের জন্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে সরকার। ঝাটকা ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও বেড়ে ওঠার জন্য ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেঘনা নদীত সব ধরনের মাছ ধরা, ইলিশ সংরক্ষণ, আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২৩ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশ- যা জাটকা নামে পরিচিত। সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা সফল করতে এরই মধ্যে জেলার সবকয়টি বরফ কলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও মাছঘাট সংলগ্ন বাজারে নৌকা ও ট্রলারের জ্বালানি তেলের দোকান বন্ধ রাখা এবং নদীরপাড় এলাকায় মাইকিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাত নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার এ সময় আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানা ও জাল জব্দসহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। মেঘনার তীরবর্তী কমলনগর, রামগতি উপজেলার কয়েকটি ঘাট ও সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট মাছঘাট ও জেলেপল্লী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলে নৌকা ঘাটে বেঁধে জাল শুকাচ্ছেন। অনেকে নৌকা ও জাল মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিষেধাজ্ঞার দু’একদিন আগেই নৌকা ডাঙ্গায় লঙ্গর করেছেন তারা। তবে কেউ কেউ বিকল্প কাজের সন্ধানে দিনমজুরি চেষ্টা করছেন।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞার এই সময়টা এমন এক মুহুর্তে এসেছে যখন মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংযমের মাস রমজান এবং খুশির উৎসব ঈদ। জেলেরা বলছেন, ঘরে চাল নেই, হাতে টাকা নেই- এমন অবস্থায় কীভাবে তারা রোজা রাখবেন এবং বাচ্চাদের নতুন জামা কিনে দেবেন, তা তাদের জানা নেই।
কমলনগর উপজেলার মতিরহাট মাছঘাট এলাকার আবদুর মজিদ ও সফিকসহ তিনজন জেলে  জানান,  সরকারের আইন আমরা মানি, কিন্তু নদীতে নামলেই নৌ-পুলিশ জালসহ টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। এরপর চালান দিয়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করিয়ে ছেড়ে  দেয়। রোজার দিন এখন চলতেই কষ্ট, তার উপর মাছ ধরা বন্ধ। এবারে ঈদুল ফিতর কিভাবে সন্তানদের নিয়ে করবো সেই চিন্তাই দিশেহারা। প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ ধরলেও সরকারি সহায়তা বিজিএফ কার্ডের ভাগিদার হতে পারেন নি তারা।
একই চিত্র রামগতি, সদর ও রায়পুর উপজেলার মাছঘাট এলাকায়। অধিকাংশ জেলেই এনজিও বা মহাজনের দাদনের কিস্তিতে জর্জরিত। আয় বন্ধ থাকায় কিস্তির চাপ কমছে না তাদের উপর।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলেদের জন্য সরকারিভাবে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু  তালিকার বাহিরে থাকা অনেক প্রকৃত জেলে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। আবার যে পরিমান চাল দেওয়া হয়, একটি বড় পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া ডাল, তেল বা লবনসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সওদা কেনার কোন নগদ অর্থ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
তাদের আরো অভিযোগ, ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে চাল প্রাপ্তিতে কার্ড প্রতি ২/৩ হাজার টাকা করে ঘুষ নেয়া হয়। ঘুষের টাকা দিতে না পারায় অনেক জেলে নিবন্ধন করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
লক্ষ্মীপুর সদরের চররমনী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীর হাট ভাসমান জেলেপল্লীর সর্দার সৌরভ হোসেন মাঝি বলেন, মজুচৌধুরীর ঘাটের দক্ষিণ পাশে মেঘনা নদীতে প্রায় ৩শতাধিক ভাসমান জেলে রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৯৩ জন জেলে ভিজিএফ সহায়তাার চাল পান। বাকী জেলেগুলোর নিবন্ধনের জন্য বিগত তিন বছর পূর্বে আমি নিজেই আবেদন করেও নিবন্ধন পায়নি। অথচ মৎস্য অফিসের দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে, ২-৩ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্য পেশার লোকজন দু’তিন মাসের মধ্যেই ভিজিএফ কার্ডের তালিকায় নাম চলে আসে। এতে প্রকৃত জেলেরা সারাজীবন বঞ্চিতই রয়ে যায়। কার কাছে বিচার দিবো- মৎস্য কর্মকর্তা বলেন আর প্রশাসন বলেন সবাই একই পথের পথিক বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি।
এদিকে মজুচৌধুর মাছঘাটের আড়ৎসার হুমায়ুন কবিরসহ পাশের বরফকল ব্যবসায়ী জানান, প্রতিবছরই ঝাটকা সংরক্ষণে নিষেজ্ঞার এ দুই মাস মৎস্য আড়ৎ ও বরফ কল বন্ধ রাখি। তবে সরকারি যে সহায়তা তা যদি সঠিক জেলেদের মাঝে বন্টন হয় তবে জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকবে, এতে জেলেদের লাভ। কিন্তু সহায়তা না পেলে পেটের তাগিদে আইন অমান্য করতে বাধ্য হয় জেলেরা। তখনি জেল-জরিমানার শিকার হয়ে সর্বসান্ত হয়।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলায় ৪৬ হাজার ৪৯ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৬০ জেলে পরিবারের জন্য ৪ হাজার ৬শ ৪৯ মেট্রিকটন চাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে।  এর মধ্যে সদরে উপজেলায় ৩ হাজার ৭৬০ জেলে পরিবারের জন্য ৬০১.৬০ টন, রামগতিতে ১৩ হাজার ৫শ জেলের জন্য ২ হাজার ১৬০ টন, কমলনগরে ৭ হাজার ৭শ জেলের জন্য ১ হাজার ২২ টন ও রায়পুর উপজেলায় ৪ হাজার ১শ জেলে পরিবারের জন্য ৬৫৪টন ভিজিএফ বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। ফেব্রুয়ারী থেকে চারমাস ৪০ কেজি হারে কার্ডধারী জেলে পরিবার সরকারি এ খাদ্য সহায়তা পাবে। ইতোমধ্যে কমলনগর উপজেলায় ১৩০টন চান বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে জেলার নিবন্ধিত ১৬ হাজার ৯শ ৮৯ জেলে ভিজিএফ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারী হিসাব এ জেলায় কর্মরত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, সারা বিশে^ এখানকার ইলিশসহ অন্যান্য মাছ সরবরাহ হয়। ধ্বংস হলে জাতি এ মাছ থেক বঞ্চিত হবে। আগামী দুইমাস এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে টাস্কফোর্স কমিটি গঠনসহ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও আনসার ও মৎস্যজীবী প্রতিনিধি সকলের সমন্বয়ে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে এর সুফল জেলেরাই ভোগ করবে।
তিনি আরো জানান, দুই মাস জেলেদের জন্য সরকারী ভাবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কমলনগর উপজেলাসহ ৪টি উপজেলায় ৪০ কেজি হারে বিজিএফ এ চাল বন্টন কার্যক্রম চলছে।  তবে ভাসমান জেলেপল্লির জেলেদের জন্য বিশেষ বরাদ্ধের আশ্বাস দেন এ মৎস্য কর্মকর্তা।
মেঘনার পাড়ের এই জেলেপাড়াগুলোতে এখন এক ধরণের নীরবতা। জেলেদের দাবী -শুধু চাল নয়, নিষেধাজ্ঞার  সময়ে তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক অনুদান এবং এনজিওর কিস্তি  স্থগিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এবারের রমজান ও ঈদ কেবল দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে উত্তরায় বিস্ফোরণে দগ্ধ ৭ জনকে নেওয়া হয়েছে

রমজান ও নদীতে নিষেধাজ্ঞায় পরিবার নিয়ে হতাশ লক্ষ্মীপুরের জেলেরা

প্রকাশিত : ১০:৪৩:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধিঃ ইলিশ রক্ষায় ১ লা মার্চ মধ্যরাত ১২টা থেকে (মার্চ-এপ্রিল) দুই মাস মেঘনা নদীতে ইলিশসহ সকল ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। নিষেধাজ্ঞার এ অবসর সময়ে নৌকা ও জাল মেরামতের কাজ সারছেন লক্ষ্মীপুরের জেলে সম্প্রদায়। তবে মেঘনার পাড়ের জেলেপল্লীগুলোতে এখন হাহাকার এবং কান্নার সুর। একদিকে  পবিত্র রমজান মাস, অন্যদিকে মাচ-এপ্রিল দুই মাস মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞা, মাঝনদীতে জাল ফেলে মাছ ধরার পথ একেবারেই বন্ধ। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় আয়ের একমাত্র উৎস্য হারিয়ে এবং ঋনের দেনায় জর্জরীত পরিবার নিয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার জেলে। তাছাড়া সরকারি খাদ্য সহায়তা (বিজিএফ) চালও অপর্যাপ্ত, বন্টনেও রয়েছে না পাওয়ার অভিযোগ। তবে মৎস্য বিভাগ জানালেন নিষেধাজ্ঞার সময় ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি এবারই প্রথম ভাসমান জেলেপল্লিগুলোতেও খাদ্য সহায়তার আশ^াস দিলেন সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী- ইলিশের বেড়ে ওঠা ও ঝাটকা ইলিশ রক্ষায় লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর আলেকজান্ডার এলাকা থেকে চাঁদপুরের ষাটনাল পর্যন্ত  ১০০ কিলামিটার মেঘনা নদী ইলিশের জন্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে সরকার। ঝাটকা ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও বেড়ে ওঠার জন্য ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেঘনা নদীত সব ধরনের মাছ ধরা, ইলিশ সংরক্ষণ, আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২৩ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশ- যা জাটকা নামে পরিচিত। সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা সফল করতে এরই মধ্যে জেলার সবকয়টি বরফ কলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও মাছঘাট সংলগ্ন বাজারে নৌকা ও ট্রলারের জ্বালানি তেলের দোকান বন্ধ রাখা এবং নদীরপাড় এলাকায় মাইকিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাত নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার এ সময় আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানা ও জাল জব্দসহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। মেঘনার তীরবর্তী কমলনগর, রামগতি উপজেলার কয়েকটি ঘাট ও সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট মাছঘাট ও জেলেপল্লী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলে নৌকা ঘাটে বেঁধে জাল শুকাচ্ছেন। অনেকে নৌকা ও জাল মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিষেধাজ্ঞার দু’একদিন আগেই নৌকা ডাঙ্গায় লঙ্গর করেছেন তারা। তবে কেউ কেউ বিকল্প কাজের সন্ধানে দিনমজুরি চেষ্টা করছেন।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞার এই সময়টা এমন এক মুহুর্তে এসেছে যখন মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংযমের মাস রমজান এবং খুশির উৎসব ঈদ। জেলেরা বলছেন, ঘরে চাল নেই, হাতে টাকা নেই- এমন অবস্থায় কীভাবে তারা রোজা রাখবেন এবং বাচ্চাদের নতুন জামা কিনে দেবেন, তা তাদের জানা নেই।
কমলনগর উপজেলার মতিরহাট মাছঘাট এলাকার আবদুর মজিদ ও সফিকসহ তিনজন জেলে  জানান,  সরকারের আইন আমরা মানি, কিন্তু নদীতে নামলেই নৌ-পুলিশ জালসহ টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। এরপর চালান দিয়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করিয়ে ছেড়ে  দেয়। রোজার দিন এখন চলতেই কষ্ট, তার উপর মাছ ধরা বন্ধ। এবারে ঈদুল ফিতর কিভাবে সন্তানদের নিয়ে করবো সেই চিন্তাই দিশেহারা। প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ ধরলেও সরকারি সহায়তা বিজিএফ কার্ডের ভাগিদার হতে পারেন নি তারা।
একই চিত্র রামগতি, সদর ও রায়পুর উপজেলার মাছঘাট এলাকায়। অধিকাংশ জেলেই এনজিও বা মহাজনের দাদনের কিস্তিতে জর্জরিত। আয় বন্ধ থাকায় কিস্তির চাপ কমছে না তাদের উপর।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলেদের জন্য সরকারিভাবে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু  তালিকার বাহিরে থাকা অনেক প্রকৃত জেলে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। আবার যে পরিমান চাল দেওয়া হয়, একটি বড় পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া ডাল, তেল বা লবনসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সওদা কেনার কোন নগদ অর্থ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
তাদের আরো অভিযোগ, ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে চাল প্রাপ্তিতে কার্ড প্রতি ২/৩ হাজার টাকা করে ঘুষ নেয়া হয়। ঘুষের টাকা দিতে না পারায় অনেক জেলে নিবন্ধন করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
লক্ষ্মীপুর সদরের চররমনী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীর হাট ভাসমান জেলেপল্লীর সর্দার সৌরভ হোসেন মাঝি বলেন, মজুচৌধুরীর ঘাটের দক্ষিণ পাশে মেঘনা নদীতে প্রায় ৩শতাধিক ভাসমান জেলে রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৯৩ জন জেলে ভিজিএফ সহায়তাার চাল পান। বাকী জেলেগুলোর নিবন্ধনের জন্য বিগত তিন বছর পূর্বে আমি নিজেই আবেদন করেও নিবন্ধন পায়নি। অথচ মৎস্য অফিসের দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে, ২-৩ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্য পেশার লোকজন দু’তিন মাসের মধ্যেই ভিজিএফ কার্ডের তালিকায় নাম চলে আসে। এতে প্রকৃত জেলেরা সারাজীবন বঞ্চিতই রয়ে যায়। কার কাছে বিচার দিবো- মৎস্য কর্মকর্তা বলেন আর প্রশাসন বলেন সবাই একই পথের পথিক বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি।
এদিকে মজুচৌধুর মাছঘাটের আড়ৎসার হুমায়ুন কবিরসহ পাশের বরফকল ব্যবসায়ী জানান, প্রতিবছরই ঝাটকা সংরক্ষণে নিষেজ্ঞার এ দুই মাস মৎস্য আড়ৎ ও বরফ কল বন্ধ রাখি। তবে সরকারি যে সহায়তা তা যদি সঠিক জেলেদের মাঝে বন্টন হয় তবে জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকবে, এতে জেলেদের লাভ। কিন্তু সহায়তা না পেলে পেটের তাগিদে আইন অমান্য করতে বাধ্য হয় জেলেরা। তখনি জেল-জরিমানার শিকার হয়ে সর্বসান্ত হয়।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলায় ৪৬ হাজার ৪৯ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৬০ জেলে পরিবারের জন্য ৪ হাজার ৬শ ৪৯ মেট্রিকটন চাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে।  এর মধ্যে সদরে উপজেলায় ৩ হাজার ৭৬০ জেলে পরিবারের জন্য ৬০১.৬০ টন, রামগতিতে ১৩ হাজার ৫শ জেলের জন্য ২ হাজার ১৬০ টন, কমলনগরে ৭ হাজার ৭শ জেলের জন্য ১ হাজার ২২ টন ও রায়পুর উপজেলায় ৪ হাজার ১শ জেলে পরিবারের জন্য ৬৫৪টন ভিজিএফ বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। ফেব্রুয়ারী থেকে চারমাস ৪০ কেজি হারে কার্ডধারী জেলে পরিবার সরকারি এ খাদ্য সহায়তা পাবে। ইতোমধ্যে কমলনগর উপজেলায় ১৩০টন চান বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে জেলার নিবন্ধিত ১৬ হাজার ৯শ ৮৯ জেলে ভিজিএফ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারী হিসাব এ জেলায় কর্মরত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, সারা বিশে^ এখানকার ইলিশসহ অন্যান্য মাছ সরবরাহ হয়। ধ্বংস হলে জাতি এ মাছ থেক বঞ্চিত হবে। আগামী দুইমাস এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে টাস্কফোর্স কমিটি গঠনসহ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও আনসার ও মৎস্যজীবী প্রতিনিধি সকলের সমন্বয়ে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে এর সুফল জেলেরাই ভোগ করবে।
তিনি আরো জানান, দুই মাস জেলেদের জন্য সরকারী ভাবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কমলনগর উপজেলাসহ ৪টি উপজেলায় ৪০ কেজি হারে বিজিএফ এ চাল বন্টন কার্যক্রম চলছে।  তবে ভাসমান জেলেপল্লির জেলেদের জন্য বিশেষ বরাদ্ধের আশ্বাস দেন এ মৎস্য কর্মকর্তা।
মেঘনার পাড়ের এই জেলেপাড়াগুলোতে এখন এক ধরণের নীরবতা। জেলেদের দাবী -শুধু চাল নয়, নিষেধাজ্ঞার  সময়ে তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক অনুদান এবং এনজিওর কিস্তি  স্থগিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এবারের রমজান ও ঈদ কেবল দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।