ঢাকা ১১:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

ফুটেছে বুনোফুল ‘ভাট’ মুগ্ধতায় পথচারীরা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৯:৫১:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: শীতের তীব্রতা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে মৌলভীবাজারের পথে-প্রান্তরে ফুটে উঠেছে চিরচেনা বুনোফুল ‘ভাট’। সড়কের ধারে, গ্রামীণ মেঠোপথের পাশে, নদী–খাল–দিঘির পাড়ে—যেদিকেই চোখ যায়, সাদা ও হালকা বেগুনি রঙের থোকা থোকা ভাটফুলে যেন সেজে উঠেছে প্রকৃতি।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কসহ জেলার নানা সড়ক ও গ্রামীণ পরিবেশে অনাদর-অবহেলায় বেড়ে ওঠা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ভাটফুল তার অপরূপ সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়েছে। সড়ক ও মেঠোপথের দুপাশে, নদী–খাল–দিঘি ও জলাশয়ের পাড়ে, গ্রামীণ পরিবেশের আনাচে-কানাচে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা ভাটফুলে চোখজুড়িয়ে যায় পথচারীদের।
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠা এ ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, মানুষের মনেও ছড়িয়ে দেয় প্রশান্তি। স্কুল–কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের হাতে হাতে দেখা যাচ্ছে ভাটফুল; ছোট ছোট শিশুরাও খেলছে দৃষ্টিনন্দন এ ফুল নিয়ে।
জানা গেছে, ভাট বা বনজুঁই একটি শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum viscosum এবং ইংরেজিতে এটি পরিচিত ‘Hill Glory Bower Flower’ নামে। সাদা রঙের মধ্যে হালকা বেগুনি আভাযুক্ত এ ফুল পাঁচটি পাপড়ি নিয়ে থোকায় থোকায় ফোটে। সাধারণত বসন্তের শুরুতেই এ ফুল ফোটা শুরু হয় এবং রাতের বেলায় এর সুগন্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশই এ উদ্ভিদের আদি নিবাস। অঞ্চলভেদে একে বনজুঁই, ঘেটু ফুল, ভাইটা ফুল বা ঘণ্টাকর্ণ নামেও ডাকা হয়, তবে ভাটফুল নামেই এর পরিচিতি সবচেয়ে বেশি।
ভাটফুল কেবল সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, ভাট গাছের পাতায় রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এতে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। পাতায় অ্যান্টি-ডায়াবেটিক উপাদান থাকায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও এটি উপকারী। পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদানের কারণে শ্বাসযন্ত্রের রোগ নিরাময়ে সহায়ক হিসেবে ভাট গাছের ব্যবহার রয়েছে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও হজমশক্তি উন্নত করতেও এর পাতা ব্যবহৃত হয়। আদিকাল থেকেই এর পাতা, বীজ, ফুল ও ফল নানা রোগে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লতিফা আক্তার মিতুল বলেন, “ভাটফুল ফুটলেই বোঝা যায় প্রকৃতিতে বসন্ত এসেছে। শীত শেষে ভাটফুল ফুটলে প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। কলেজে যাতায়াতের পথে এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করি। গ্রামীণ পরিবেশে ভাটফুল সত্যিই মনোমুগ্ধকর।”
কমলগঞ্জ উপজেলার ইউনানি চিকিৎসক ডা. রহিমা আক্তার ডলি বলেন, “ভাট একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় ঔষধি উদ্ভিদ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের নানা রোগে এটি ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফাল্গুন এলেই গাছে গাছে ভাটফুল ফুটে প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা যোগ করে।”
তিনি আরও বলেন, “দিন দিন গ্রামীণ প্রকৃতি থেকে ভাট গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভাটসহ বিলুপ্তপ্রায় ওষধি গাছ সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
কমলগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফারুক আহমদ বলেন, “যে কোনো ফুলই সৌন্দর্যের উৎস। বসন্তের শুরুতে ফোটা ভাটফুল গ্রামবাংলার চিরচেনা এক সৌন্দর্য। এ সময় ভাটফুল প্রকৃতিতে যেন রাজত্ব করছে। চারপাশের পরিবেশকে অলংকৃত করে তুলেছে এ ফুল।”
বসন্তের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা ভাটফুল তাই আজ শুধু প্রকৃতির অলংকার নয়, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও ঔষধি সম্পদের প্রতীক হিসেবেও নতুন করে দৃষ্টি কাড়ছে সকলের।
জনপ্রিয় সংবাদ

নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি আল মামুন সরকার বিভিন্ন কাজের প্রশংসায় ভাসছেন

ফুটেছে বুনোফুল ‘ভাট’ মুগ্ধতায় পথচারীরা

প্রকাশিত : ০৯:৫১:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: শীতের তীব্রতা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে মৌলভীবাজারের পথে-প্রান্তরে ফুটে উঠেছে চিরচেনা বুনোফুল ‘ভাট’। সড়কের ধারে, গ্রামীণ মেঠোপথের পাশে, নদী–খাল–দিঘির পাড়ে—যেদিকেই চোখ যায়, সাদা ও হালকা বেগুনি রঙের থোকা থোকা ভাটফুলে যেন সেজে উঠেছে প্রকৃতি।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কসহ জেলার নানা সড়ক ও গ্রামীণ পরিবেশে অনাদর-অবহেলায় বেড়ে ওঠা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ভাটফুল তার অপরূপ সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়েছে। সড়ক ও মেঠোপথের দুপাশে, নদী–খাল–দিঘি ও জলাশয়ের পাড়ে, গ্রামীণ পরিবেশের আনাচে-কানাচে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা ভাটফুলে চোখজুড়িয়ে যায় পথচারীদের।
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠা এ ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, মানুষের মনেও ছড়িয়ে দেয় প্রশান্তি। স্কুল–কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের হাতে হাতে দেখা যাচ্ছে ভাটফুল; ছোট ছোট শিশুরাও খেলছে দৃষ্টিনন্দন এ ফুল নিয়ে।
জানা গেছে, ভাট বা বনজুঁই একটি শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum viscosum এবং ইংরেজিতে এটি পরিচিত ‘Hill Glory Bower Flower’ নামে। সাদা রঙের মধ্যে হালকা বেগুনি আভাযুক্ত এ ফুল পাঁচটি পাপড়ি নিয়ে থোকায় থোকায় ফোটে। সাধারণত বসন্তের শুরুতেই এ ফুল ফোটা শুরু হয় এবং রাতের বেলায় এর সুগন্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশই এ উদ্ভিদের আদি নিবাস। অঞ্চলভেদে একে বনজুঁই, ঘেটু ফুল, ভাইটা ফুল বা ঘণ্টাকর্ণ নামেও ডাকা হয়, তবে ভাটফুল নামেই এর পরিচিতি সবচেয়ে বেশি।
ভাটফুল কেবল সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, ভাট গাছের পাতায় রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এতে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। পাতায় অ্যান্টি-ডায়াবেটিক উপাদান থাকায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও এটি উপকারী। পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদানের কারণে শ্বাসযন্ত্রের রোগ নিরাময়ে সহায়ক হিসেবে ভাট গাছের ব্যবহার রয়েছে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও হজমশক্তি উন্নত করতেও এর পাতা ব্যবহৃত হয়। আদিকাল থেকেই এর পাতা, বীজ, ফুল ও ফল নানা রোগে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লতিফা আক্তার মিতুল বলেন, “ভাটফুল ফুটলেই বোঝা যায় প্রকৃতিতে বসন্ত এসেছে। শীত শেষে ভাটফুল ফুটলে প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। কলেজে যাতায়াতের পথে এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করি। গ্রামীণ পরিবেশে ভাটফুল সত্যিই মনোমুগ্ধকর।”
কমলগঞ্জ উপজেলার ইউনানি চিকিৎসক ডা. রহিমা আক্তার ডলি বলেন, “ভাট একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় ঔষধি উদ্ভিদ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের নানা রোগে এটি ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফাল্গুন এলেই গাছে গাছে ভাটফুল ফুটে প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা যোগ করে।”
তিনি আরও বলেন, “দিন দিন গ্রামীণ প্রকৃতি থেকে ভাট গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভাটসহ বিলুপ্তপ্রায় ওষধি গাছ সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
কমলগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফারুক আহমদ বলেন, “যে কোনো ফুলই সৌন্দর্যের উৎস। বসন্তের শুরুতে ফোটা ভাটফুল গ্রামবাংলার চিরচেনা এক সৌন্দর্য। এ সময় ভাটফুল প্রকৃতিতে যেন রাজত্ব করছে। চারপাশের পরিবেশকে অলংকৃত করে তুলেছে এ ফুল।”
বসন্তের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা ভাটফুল তাই আজ শুধু প্রকৃতির অলংকার নয়, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও ঔষধি সম্পদের প্রতীক হিসেবেও নতুন করে দৃষ্টি কাড়ছে সকলের।