কেউ মেশিনে আখ মাড়াইয়ে ব্যস্ত, কেউ রস নিয়ে ঢালছেন জ্বাল দেওয়ার পাত্রে। বরিশালের বাবুগঞ্জে রমজান মাস সামনে রেখে আখের গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আখচাষিরা। কয়েক যুগ ধরে উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামাঞ্চলের মানুষ গুড় তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বছরের শীতের মাস থেকে শুরু হয় আখের রস দিয়ে গুড় তৈরির কাজ। তৈরি গুড় বাজারে বিক্রি করে যা লাভ হয় তা দিয়ে সংসার চালান গ্রামের অধিকাংশ পরিবার।
জানা গেছে, প্রথমে আখ কাটার পর সেই পাতা ও আখের অংশটুকু নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে গৃহপালিত পশুর খাবার হিসেবে। এরপর রেখে দেওয়া আখ থেকে চাষিরা একটি মেশিনের মাধ্যমে রস বের করে। পাশাপাশি কয়েকটি বিশাল চুলা তার ওপর চাপানো হয়েছে বিশাল মাপের লোহার কড়াই। তাতেই আখের রস ঢেলে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। চুলার ওপর টগবগ করে ফুটছে আখের রস। রস লাল হয়ে এলে এক চুলা থেকে চলে যাচ্ছে আরেক চুলায়। সেই কড়াইয়ের দিকে সজাগ নজর চাষিদের। আখ মাড়াইয়ের পর অবশিষ্টাংশকেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে চাষিরা প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা রস জ্বাল দেন। পরে তা চুলা থেকে নামিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট রাখার পর শক্ত হয়। পুরোদমে জ্বাল এবং অনবরত বিশেষ প্রক্রিয়ায় নড়ার মধ্যমে এভাবেই তৈরি করা হয় আখের রস থেকে খাঁটি সুস্বাদু গুড়। দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন গরম গরম গুড় কিনতে। সুস্বাদু ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় বাবুগঞ্জের গুড় সবার প্রথম পছন্দর তালিকায়। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বাবুগঞ্জ উপজেলার এ বছর আখচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বেশি জমিতে আখ চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লাভবান হবেন আখ চাষিরা। সরেজমিন আজ মঙ্গলবার ঘুরে দেখা গেছে, আখচাষিরা একটি মেশিনের মাধ্যমে রস বের করছে। তাতেই আখের রস ঢেলে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। সেই কড়াইয়ের দিকে সজাগ নজর চাষিরা। পরে তা চুলা থেকে নামিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট রাখার পর শক্ত হয়। পরে চাষিদের হাতের সাহায্যে শক্ত গুড়গুলোকে একটি নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি করা হয় আখের রস থেকে সুস্বাদু গুড়।

আখ চাষীআজাহার শেখ বলেন, আমরা বিভিন্ন ফসল চাষ করি। কিন্তু আখের প্রতি মনটা খুব ভালো। আমি নিজে ৫০ বছর ধরে আখ চাষ করে গুড় তৈরি করে আসছি। তার আগে আমার বাপ দাদারা করছে। এই বছর ৩০ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করছি। আখ আর গুড় একসঙ্গে বিক্রি করলে লাভবান হচ্ছি। হানিফ মোল্লা বলেন, এখান থেকে প্রতিদিন ৯ পাক গুড় তৈরি করা হয়। এটি অনেক সুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে নিয়ে যায়। আমরা ২০০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি করি। আমাদের গুড়ের মধ্যে কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। আমরা অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনে গুড় বিক্রি করি।
আখচাষি মনির হাওলাদার বলেন, আমরা পাওয়ার টিলারের ইঞ্জিলের মাধ্যমে গুড় তৈরি করি। আলাদা কোনো শ্রমিক লাগে না, পরিবারের সব সদস্য মিলে আমরা কাজটা করি।
স্থানীয় আখচাষিরা বলেন, এখানকার গুড় নির্ভেজাল ও খাঁটি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চাষে খরচ কম ও তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর আখের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে কৃষি অফিসের আরো বেশি সহযোগিতা পেলে উপজেলায় আখ ও গুড়ের উৎপাদন বাড়বে। বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, বরিশাল জেলার মধ্যে বাবুগঞ্জ উপজেলায় আখ বেশি হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আখের চাষ হয়েছে। কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে চাষিদের সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অনেক জেলায় সরকারের চিনিকল আছে। এই অঞ্চলে কোনো চিনিকল তৈরি হয়নি। স্থানীয় চাষিদের চাহিদার উপর ভিত্তি করে সরকারের কাছে চিনিকল তৈরির প্রস্তাব করা হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















