ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

বুবি: একটি কবরের সামনে বাংলাদেশের বিবেক

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:০৩:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে

মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল: একটি রাষ্ট্রকে বিচার করার অনেক উপায় আছে। তার অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা মাথাপিছু আয় দিয়ে যেমন মূল্যায়ন করা যায়, তেমনি আরও একটি সূচক আছে- সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটির সঙ্গে কেমন আচরণ করে। কারণ সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড দাঁড়িয়ে থাকে সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষের জীবন ও মৃত্যুর পাশে।

জীবনের দীর্ঘ পঁচিশ বছর একটি রেলস্টেশন কে নিজের ঘরের মতো আগলে রেখেছিলেন বুবি। স্টেশনটি ছিল তাঁর কর্মস্থলই নয়, তাঁর আশ্রয়ও। হাজারো যাত্রী আসত, চলে যেত। কেউ তাঁর দিকে তাকাত না। কিন্তু প্রতিদিন ভোরে মানুষ যখন একটি পরিচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্ম পেত, তার পেছনে ছিল বুবির ঘাম, পরিশ্রম এবং নীরব দায়িত্ববোধ। অথচ সেই মানুষটির নিজের জীবনে ছিল না একটি নিরাপদ ঘর, ছিল না আপনজনের সান্নিধ্য, ছিল না সমাজের স্বীকৃতি। তাঁর পরিচয় ছিল কেবল একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবু তিনি বেঁচে ছিলেন। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত আশায় বাঁচে। হয়তো কোনোদিন পরিবারের কেউ ফিরে আসবে, হয়তো একদিন জীবনের মোড় ঘুরবে- এমন একটি ক্ষীণ আশাই মানুষকে টিকিয়ে রাখে।

জীবনের শেষ প্রান্তে সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। হয়তো বার্ধক্যের নিরাপত্তার জন্য, হয়তো অজানা একটি ছোট্ট স্বপ্ন পূরণের আশায়। কিন্তু সেই সামান্য সঞ্চয়ই হয়ে উঠল তাঁর মৃত্যুর কারণ। ছিনতাইকারীদের নির্মম আঘাতে নিভে গেল একটি নিরীহ প্রাণ।

এর চেয়েও হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ঘটল মৃত্যুর পরে। ময়নাতদন্ত শেষ। হাসপাতালের লোকজন অপেক্ষা করছে- হয়তো পরিবারের কেউ আসবে। কিন্তু কেউ এল না। শেষ বিদায়েও তিনি ছিলেন একা। একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? জীবদ্দশায় একা, মৃত্যুর পরও একা। কী ভয়ংকর এক নিঃসঙ্গতা! পৃথিবীতে এমন একজন মানুষও রইল না, যে বলবে, “ও আমাদের মানুষ, আমরা নিয়ে যাব।”

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই তাঁকে দাফন করল। কিন্তু জানাজায় কি মায়ের কান্না ছিল? ভাইয়ের কাঁধ ছিল? সন্তানের চোখের জল ছিল? নাকি ছিল শুধু কয়েকজন অপরিচিত মানুষের নীরব উপস্থিতি?

গ্রামের কবরস্থানে আমরা প্রায়ই দেখি, প্রিয়জনেরা কবরের পাশে একটি ফুল গাছ বা খেজুরের ডাল লাগিয়ে দেন। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; ভালোবাসার একটি চিহ্ন রেখে যাওয়ার জন্য। যাতে পরদিন, পর মাসে কিংবা পরের বছর এসে বলতে পারেন, “এখানেই তো আমার মানুষটি ঘুমিয়ে আছে।” বুবির কবরের পাশে সেই অপেক্ষা কি কেউ করবে? এই প্রশ্নটি শুধু একজন বুবির নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো প্রান্তিক মানুষের প্রশ্ন।

আমরা প্রায়ই বড় বড় ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কালো ছবি দিই, দীর্ঘ স্ট্যাটাস লিখি, ফুল দিই, স্মরণসভা করি। কিন্তু বুবির মতো হাজারো মানুষের মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় না। কারণ তারা বিখ্যাত নয়, ক্ষমতাবান নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। অথচ আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে সহজ করে তোলার পেছনে তাঁদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি সমাজ তখনই মানবিক হয়, যখন সে তার অদৃশ্য মানুষগুলোকেও দৃশ্যমান করে। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য “বুবি” আছেন—রেলস্টেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পথ ঝাড়ুদার, বর্জ্য সংগ্রহকারী, দিনমজুর, নিরাপত্তাকর্মী। তাঁরা আমাদের নাগরিক জীবনকে সচল রাখেন, কিন্তু তাঁদের অস্তিত্বকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক ধরে নিই। যতক্ষণ তাঁরা কাজ করেন, ততক্ষণ তাঁদের প্রয়োজন; কাজ শেষ হলে যেন তাঁদের আর কোনো মূল্য থাকে না।

বর্তমান সমাজে একজন মানুষের মৃত্যু যেন কেবল একটি সংবাদে সীমাবদ্ধ। কিছুদিন আলোচনা, তারপর নতুন ঘটনা এসে পুরোনো শোককে ঢেকে দেয়। যদি সত্যিই অপরাধীরা শাস্তি না পায়, তবে তা শুধু বুবির প্রতি অন্যায় নয়; তা পুরো সমাজের ন্যায়বিচারের প্রতি ব্যর্থতা।

বুবির ঘটনা আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য উন্মোচন করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—এই তিনটি নিরাপত্তা বলয় যখন একে একে ভেঙে পড়ে, তখন একজন মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে পারে, তাঁর জীবন তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। হয়তো কোনো অভিমান, কোনো ভুল বোঝাবুঝি কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। সেই ইতিহাস হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না। কিন্তু তাঁর শেষ যাত্রার নিঃসঙ্গতা আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়- যে সমাজে একজন মানুষের মরদেহ গ্রহণ করার জন্য কোনো স্বজন এগিয়ে আসে না, সেখানে সংকট শুধু একটি পরিবারের নয়; সংকট আমাদের সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের।

আমরা হয়তো বুবির কবরের অবস্থান একদিন ভুলে যাব। হয়তো সেখানে নতুন কবর হবে, নতুন মানুষ শুয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁর জীবন থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে তাঁর মৃত্যু অর্থহীন হবে না।

আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু আবেগ নয়, দায়িত্ববোধ। রাষ্ট্রের উচিত প্রান্তিক ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা আরও কার্যকর করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এমন হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। আর আমাদের প্রত্যেকের উচিত আশেপাশের মানুষগুলোর দিকে নতুন করে তাকানো- যাঁদের আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে কখনো দেখি না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

বুবির মৃত্যু আমাদের সামনে আরেকটি কঠিন সত্যকে তুলে ধরে- একাকীত্ব এক ধরনের সামাজিক দারিদ্র্য। অর্থের অভাবের চেয়েও ভয়ংকর হলো এমন একটি জীবন, যেখানে আপনার মৃত্যুর পর অপেক্ষা করার মতো একজন মানুষও থাকে না।

বুবি হয়তো আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের জীবন কখনোই তুচ্ছ নয়। সমাজের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে সাধারণ মানুষটির জীবনও সমান মূল্যবান। আমরা যদি সেই সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, যদি অন্তত আশপাশের নিঃসঙ্গ মানুষ গুলোর খোঁজ নিতে শিখি, তাহলে বুবির মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যাবে—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে একজন মানুষ জীবনের শেষ পর্যন্ত একা থেকে যায়, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো বুবির জানাজা আপনজনহীন হয় না? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।
মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল
সহকারী অ্যধাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম
বাংলাবাজার ফাতেমা খানম কলেজ, ভোলা।

জনপ্রিয় সংবাদ

বুবি: একটি কবরের সামনে বাংলাদেশের বিবেক

প্রকাশিত : ০৮:০৩:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল: একটি রাষ্ট্রকে বিচার করার অনেক উপায় আছে। তার অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা মাথাপিছু আয় দিয়ে যেমন মূল্যায়ন করা যায়, তেমনি আরও একটি সূচক আছে- সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটির সঙ্গে কেমন আচরণ করে। কারণ সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড দাঁড়িয়ে থাকে সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষের জীবন ও মৃত্যুর পাশে।

জীবনের দীর্ঘ পঁচিশ বছর একটি রেলস্টেশন কে নিজের ঘরের মতো আগলে রেখেছিলেন বুবি। স্টেশনটি ছিল তাঁর কর্মস্থলই নয়, তাঁর আশ্রয়ও। হাজারো যাত্রী আসত, চলে যেত। কেউ তাঁর দিকে তাকাত না। কিন্তু প্রতিদিন ভোরে মানুষ যখন একটি পরিচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্ম পেত, তার পেছনে ছিল বুবির ঘাম, পরিশ্রম এবং নীরব দায়িত্ববোধ। অথচ সেই মানুষটির নিজের জীবনে ছিল না একটি নিরাপদ ঘর, ছিল না আপনজনের সান্নিধ্য, ছিল না সমাজের স্বীকৃতি। তাঁর পরিচয় ছিল কেবল একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবু তিনি বেঁচে ছিলেন। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত আশায় বাঁচে। হয়তো কোনোদিন পরিবারের কেউ ফিরে আসবে, হয়তো একদিন জীবনের মোড় ঘুরবে- এমন একটি ক্ষীণ আশাই মানুষকে টিকিয়ে রাখে।

জীবনের শেষ প্রান্তে সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। হয়তো বার্ধক্যের নিরাপত্তার জন্য, হয়তো অজানা একটি ছোট্ট স্বপ্ন পূরণের আশায়। কিন্তু সেই সামান্য সঞ্চয়ই হয়ে উঠল তাঁর মৃত্যুর কারণ। ছিনতাইকারীদের নির্মম আঘাতে নিভে গেল একটি নিরীহ প্রাণ।

এর চেয়েও হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ঘটল মৃত্যুর পরে। ময়নাতদন্ত শেষ। হাসপাতালের লোকজন অপেক্ষা করছে- হয়তো পরিবারের কেউ আসবে। কিন্তু কেউ এল না। শেষ বিদায়েও তিনি ছিলেন একা। একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? জীবদ্দশায় একা, মৃত্যুর পরও একা। কী ভয়ংকর এক নিঃসঙ্গতা! পৃথিবীতে এমন একজন মানুষও রইল না, যে বলবে, “ও আমাদের মানুষ, আমরা নিয়ে যাব।”

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই তাঁকে দাফন করল। কিন্তু জানাজায় কি মায়ের কান্না ছিল? ভাইয়ের কাঁধ ছিল? সন্তানের চোখের জল ছিল? নাকি ছিল শুধু কয়েকজন অপরিচিত মানুষের নীরব উপস্থিতি?

গ্রামের কবরস্থানে আমরা প্রায়ই দেখি, প্রিয়জনেরা কবরের পাশে একটি ফুল গাছ বা খেজুরের ডাল লাগিয়ে দেন। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; ভালোবাসার একটি চিহ্ন রেখে যাওয়ার জন্য। যাতে পরদিন, পর মাসে কিংবা পরের বছর এসে বলতে পারেন, “এখানেই তো আমার মানুষটি ঘুমিয়ে আছে।” বুবির কবরের পাশে সেই অপেক্ষা কি কেউ করবে? এই প্রশ্নটি শুধু একজন বুবির নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো প্রান্তিক মানুষের প্রশ্ন।

আমরা প্রায়ই বড় বড় ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কালো ছবি দিই, দীর্ঘ স্ট্যাটাস লিখি, ফুল দিই, স্মরণসভা করি। কিন্তু বুবির মতো হাজারো মানুষের মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় না। কারণ তারা বিখ্যাত নয়, ক্ষমতাবান নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। অথচ আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে সহজ করে তোলার পেছনে তাঁদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি সমাজ তখনই মানবিক হয়, যখন সে তার অদৃশ্য মানুষগুলোকেও দৃশ্যমান করে। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য “বুবি” আছেন—রেলস্টেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পথ ঝাড়ুদার, বর্জ্য সংগ্রহকারী, দিনমজুর, নিরাপত্তাকর্মী। তাঁরা আমাদের নাগরিক জীবনকে সচল রাখেন, কিন্তু তাঁদের অস্তিত্বকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক ধরে নিই। যতক্ষণ তাঁরা কাজ করেন, ততক্ষণ তাঁদের প্রয়োজন; কাজ শেষ হলে যেন তাঁদের আর কোনো মূল্য থাকে না।

বর্তমান সমাজে একজন মানুষের মৃত্যু যেন কেবল একটি সংবাদে সীমাবদ্ধ। কিছুদিন আলোচনা, তারপর নতুন ঘটনা এসে পুরোনো শোককে ঢেকে দেয়। যদি সত্যিই অপরাধীরা শাস্তি না পায়, তবে তা শুধু বুবির প্রতি অন্যায় নয়; তা পুরো সমাজের ন্যায়বিচারের প্রতি ব্যর্থতা।

বুবির ঘটনা আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য উন্মোচন করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—এই তিনটি নিরাপত্তা বলয় যখন একে একে ভেঙে পড়ে, তখন একজন মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে পারে, তাঁর জীবন তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। হয়তো কোনো অভিমান, কোনো ভুল বোঝাবুঝি কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। সেই ইতিহাস হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না। কিন্তু তাঁর শেষ যাত্রার নিঃসঙ্গতা আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়- যে সমাজে একজন মানুষের মরদেহ গ্রহণ করার জন্য কোনো স্বজন এগিয়ে আসে না, সেখানে সংকট শুধু একটি পরিবারের নয়; সংকট আমাদের সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের।

আমরা হয়তো বুবির কবরের অবস্থান একদিন ভুলে যাব। হয়তো সেখানে নতুন কবর হবে, নতুন মানুষ শুয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁর জীবন থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে তাঁর মৃত্যু অর্থহীন হবে না।

আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু আবেগ নয়, দায়িত্ববোধ। রাষ্ট্রের উচিত প্রান্তিক ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা আরও কার্যকর করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এমন হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। আর আমাদের প্রত্যেকের উচিত আশেপাশের মানুষগুলোর দিকে নতুন করে তাকানো- যাঁদের আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে কখনো দেখি না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

বুবির মৃত্যু আমাদের সামনে আরেকটি কঠিন সত্যকে তুলে ধরে- একাকীত্ব এক ধরনের সামাজিক দারিদ্র্য। অর্থের অভাবের চেয়েও ভয়ংকর হলো এমন একটি জীবন, যেখানে আপনার মৃত্যুর পর অপেক্ষা করার মতো একজন মানুষও থাকে না।

বুবি হয়তো আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের জীবন কখনোই তুচ্ছ নয়। সমাজের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে সাধারণ মানুষটির জীবনও সমান মূল্যবান। আমরা যদি সেই সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, যদি অন্তত আশপাশের নিঃসঙ্গ মানুষ গুলোর খোঁজ নিতে শিখি, তাহলে বুবির মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যাবে—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে একজন মানুষ জীবনের শেষ পর্যন্ত একা থেকে যায়, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো বুবির জানাজা আপনজনহীন হয় না? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।
মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল
সহকারী অ্যধাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম
বাংলাবাজার ফাতেমা খানম কলেজ, ভোলা।