ঢাকা ১১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, ১২০ ফুটের পানি এখন ৫৫০ ফুটে

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ১০:১৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে

নওগাঁ প্রতিনিধিঃ বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত নওগাঁয় ক্রমেই নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। দুই বছরের ব্যবধানে পানির স্তর নেমেছে প্রায় ১ দশমিক ৯৫ মিটার। একসময় ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া গেলেও এখন কোথাও কোথাও ৩৫০ থেকে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত বোরিং করতে হচ্ছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি কমছে সেচের আওতা। বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, কমছে লাভ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। দুই বছর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ০৪ মিটারে। অর্থাৎ এ সময়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ১ দশমিক ৯৫ মিটার নিচে নেমেছে।
নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার, পত্নীতলা ও মহাদেবপুর উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলে এ সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জনজীবনে। এসব এলাকা প্রাকৃতিকভাবে উষ্ণ ও খরাপ্রবণ হওয়ায় কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেশি। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ সুবিধাও কমে আসছে।
স্থানীয় কৃষক ও গভীর নলকূপের অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় একটি গভীর নলকূপ দিয়ে ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হতো। এখন অনেক এলাকায় একই নলকূপ দিয়ে ৯০ থেকে ১১০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে। ফলে বাড়ছে সেচের খরচ এবং কমছে কৃষকের লাভ।
নিয়ামতপুরের গভীর নলকূপের অপারেটর শাকিল আহম্মেদ বলেন, ‘দিন দিন গভীর নলকূপে পানি ওঠা কমে যাচ্ছে। দুই বছর আগেও যে পরিমাণ পানি পাওয়া যেত, এখন তার তুলনায় অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। অথচ পানি তুলতে খরচ বেড়েছে।’

পোরশা উপজেলার গভীর নলকূপের অপারেটর ও কৃষক মো. সাজ্জু বলেন, ‘পানি সংকটের কারণে এলাকায় এখন গম ও আমের আবাদ বেশি হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যেত। এখন ৩৫০ থেকে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত গভীর নলকূপের বোরিং করতে হচ্ছে। শুধু সেচ নয়, খাবার পানির সংকটও প্রকট হচ্ছে।’
পোরশার কৃষক রইচ উদ্দিন বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে টিউবওয়েল চেপেও অনেক সময় খাবার পানি পাওয়া যায় না। তখন পুকুর বা জলাশয় থেকে পানি এনে প্রয়োজন মেটাতে হয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন, নদী-নালা ও খাল-বিলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলাধারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসাধারণ সম্পাদক নাইস পারভীন বলেন, পানির সংকট উত্তরণে কৃষিকাজে পানির ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি নদী-নালা ও খাল-বিল খনন করে পানির প্রবাহ ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি খাতে প্রান্তিক পর্যায়ে আবাদসংক্রান্ত পরামর্শ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে অতীতে এলোমেলোভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর থেকে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ রাখা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় পুকুর ও জলাশয় খনন করে পানি ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, পানি ব্যবহারে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরোনো জলাশয় পুনঃখনন এবং সেচের পানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, কৃষি ও মানুষের জীবন—দুই ক্ষেত্রেই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির ভবিষ্যৎ। একদিকে যত গভীরে যাচ্ছে নলকূপ, অন্যদিকে ততই কমছে পানির প্রাপ্যতা।
তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর পাশাপাশি আমন ও বোরো মৌসুমে গম, আম ও সবজি চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আত্রাই, ছোট যমুনা ও পূর্ণভবা নদীর বর্ষার পানি ধরে রাখতে পারলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

মানসম্মত গবেষণা ও পুস্তক প্রণয়নে তিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, ১২০ ফুটের পানি এখন ৫৫০ ফুটে

প্রকাশিত : ১০:১৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নওগাঁ প্রতিনিধিঃ বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত নওগাঁয় ক্রমেই নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। দুই বছরের ব্যবধানে পানির স্তর নেমেছে প্রায় ১ দশমিক ৯৫ মিটার। একসময় ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া গেলেও এখন কোথাও কোথাও ৩৫০ থেকে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত বোরিং করতে হচ্ছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি কমছে সেচের আওতা। বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, কমছে লাভ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। দুই বছর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ০৪ মিটারে। অর্থাৎ এ সময়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ১ দশমিক ৯৫ মিটার নিচে নেমেছে।
নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার, পত্নীতলা ও মহাদেবপুর উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলে এ সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জনজীবনে। এসব এলাকা প্রাকৃতিকভাবে উষ্ণ ও খরাপ্রবণ হওয়ায় কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেশি। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ সুবিধাও কমে আসছে।
স্থানীয় কৃষক ও গভীর নলকূপের অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় একটি গভীর নলকূপ দিয়ে ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হতো। এখন অনেক এলাকায় একই নলকূপ দিয়ে ৯০ থেকে ১১০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে। ফলে বাড়ছে সেচের খরচ এবং কমছে কৃষকের লাভ।
নিয়ামতপুরের গভীর নলকূপের অপারেটর শাকিল আহম্মেদ বলেন, ‘দিন দিন গভীর নলকূপে পানি ওঠা কমে যাচ্ছে। দুই বছর আগেও যে পরিমাণ পানি পাওয়া যেত, এখন তার তুলনায় অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। অথচ পানি তুলতে খরচ বেড়েছে।’

পোরশা উপজেলার গভীর নলকূপের অপারেটর ও কৃষক মো. সাজ্জু বলেন, ‘পানি সংকটের কারণে এলাকায় এখন গম ও আমের আবাদ বেশি হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যেত। এখন ৩৫০ থেকে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত গভীর নলকূপের বোরিং করতে হচ্ছে। শুধু সেচ নয়, খাবার পানির সংকটও প্রকট হচ্ছে।’
পোরশার কৃষক রইচ উদ্দিন বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে টিউবওয়েল চেপেও অনেক সময় খাবার পানি পাওয়া যায় না। তখন পুকুর বা জলাশয় থেকে পানি এনে প্রয়োজন মেটাতে হয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন, নদী-নালা ও খাল-বিলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলাধারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসাধারণ সম্পাদক নাইস পারভীন বলেন, পানির সংকট উত্তরণে কৃষিকাজে পানির ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি নদী-নালা ও খাল-বিল খনন করে পানির প্রবাহ ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি খাতে প্রান্তিক পর্যায়ে আবাদসংক্রান্ত পরামর্শ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে অতীতে এলোমেলোভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর থেকে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ রাখা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় পুকুর ও জলাশয় খনন করে পানি ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, পানি ব্যবহারে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরোনো জলাশয় পুনঃখনন এবং সেচের পানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, কৃষি ও মানুষের জীবন—দুই ক্ষেত্রেই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির ভবিষ্যৎ। একদিকে যত গভীরে যাচ্ছে নলকূপ, অন্যদিকে ততই কমছে পানির প্রাপ্যতা।
তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর পাশাপাশি আমন ও বোরো মৌসুমে গম, আম ও সবজি চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আত্রাই, ছোট যমুনা ও পূর্ণভবা নদীর বর্ষার পানি ধরে রাখতে পারলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।