ঢাকা ১১:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

যানজট নিরসন ও যাত্রীদের নিরাপত্তা: থেমে থাকা শহর, থমকে যাওয়া জীবন

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০৮:১২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

জুবাইয়া বিন্তে কবির : ঢাকা একসময় কেবল একটি শহর ছিল না—ঢাকা ছিল স্বপ্ন। যে স্বপ্নে জড়ো হতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষের আশা, পরিশ্রম আর ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। সেই ঢাকাই আজ যেন ক্লান্ত, অবসন্ন, শ্বাসরুদ্ধ। ঢাকার সড়কগুলো আর চলমান নয়, সেগুলো থেমে আছে। আর সেই থেমে থাকা সড়কের সঙ্গে থেমে যাচ্ছে মানুষের জীবন, সময় ও সম্ভাবনা। আমি এখন বরিশালে থাকি—একটি বিভাগীয় শহর, যেখানে এখনও সকালে রাস্তা পার হওয়া যায় আতঙ্ক ছাড়া, যেখানে যানজট মানে কয়েক মিনিটের বিলম্ব, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা নয়। কিন্তু ঢাকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কেটেছে শাহবাগ, টিএসসি, কলাভবন, নীলক্ষেত আর দোয়েল চত্বরের ভিড়ে। আজও আমার ছোট বোন, ননদসহ বহু আপনজন ঢাকায় থাকে। ফলে প্রয়োজনে, দায়িত্বে কিংবা আবেগের টানে আমাকে ঢাকায় যেতে হয়। আর প্রতিবার ঢাকায় গেলেই মনে হয়—এই শহর কি আর মানুষকে বাঁচতে দিচ্ছে?

যানজট: ঢাকার নতুন পরিচয় : ঢাকায় প্রবেশ করলেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো গতিহীনতা। গাড়ির সারি, ধোঁয়া, হর্নের বিকট শব্দ, ক্লান্ত মুখ, বিরক্ত চোখ। দশ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টা লেগে যায়। এই যানজট এখন আর ব্যতিক্রম নয়—এটাই নিয়ম। যানজট শুধু একটি যাতায়াত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তাজনিত সংকট। এই সংকট ধীরে ধীরে ঢাকাকে একটি অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর ও অকার্যকর নগরীতে পরিণত করছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক: নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার
যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। পায়ে চালানো রিকশার সঙ্গে ইঞ্জিন যুক্ত করে যে যানবাহন তৈরি হয়েছে, তা কোনো সুপরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থার অংশ নয়। এগুলোর চালকদের অধিকাংশের নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা। বাস, প্রাইভেট কারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব রিকশা সড়কের মাঝখানে দৌড়ায়। সামনে ও পাশে বাম্পার লাগিয়ে রিকশাকে বড় করা হয়, যা অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীতে প্রায় ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। সারাদেশে সংখ্যাটি প্রায় ৬০ লাখ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ডিজাইনের ই-রিকশা। পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব যানবাহন চলাচল করলে নগরজীবনের পরিণতি কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

যানজট ও অপরাধ: থেমে থাকা গাড়ি, উন্মুক্ত মানুষ
যানজট অপরাধের জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। গাড়ি থেমে আছে, মানুষ অসহায়—এই সুযোগেই সক্রিয় হয় ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি, সন্ত্রাসীরা। যানজটে আটকে থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছুরিকাঘাত, এমনকি গুলির ঘটনাও ঘটে। যানজট যেন অপরাধীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। ক্যামেরাহীন সড়ক, দুর্বল নজরদারি, আইন প্রয়োগের ঘাটতি—সব মিলিয়ে নগরবাসীর নিরাপত্তা দিন দিন ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে।

 

অর্থনীতিতে যানজটের ক্ষত : ঢাকার যানজট দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ আঘাত হানছে। প্রতিদিন রাজধানীতে প্রায় ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক হাজার হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতি সরাসরি জিডিপিতে প্রভাব ফেলছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ: নীরব ঘাতক যানজট : যানজট মানুষের শরীরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ফলে মানুষ শ্বাস নেয় বিষাক্ত বাতাস। কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, পার্টিকুলেট ম্যাটার ঢুকে পড়ে ফুসফুসে। বাড়ছে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকি। শব্দদূষণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। হর্নের শব্দে বাড়ছে মাথাব্যথা, অনিদ্রা, মানসিক অবসাদ। যানজট মানুষের মন-মেজাজকে বিষিয়ে তুলছে, যার প্রভাব পড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে।

অব্যবস্থাপনা: সমস্যার মূল : ঢাকার যানজটের মূল কারণ অব্যবস্থাপনা। একই সড়কে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন গতির যানবাহন চলছে। লেন থাকলেও লেন মানার সংস্কৃতি নেই। লেন বিভাজনের স্পষ্ট চিহ্ন নেই। ট্রাফিক আইন প্রয়োগ দুর্বল। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ভয়াবহ হারে বেড়েছে। ঢাকায় চলাচলরত যানবাহনের প্রায় ৫০ শতাংশই ব্যক্তিগত, অথচ তারা বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। বিলাসিতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে গাড়ি।

সমাধানের পথ: কেবল পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন :
যানজট নিরসনে বহু পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এখন প্রয়োজন কঠোর সিদ্ধান্ত। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রিকশা ও সাইকেলের জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ করতে হবে। ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গণপরিবহনকে নিরাপদ, আধুনিক ও মানবিক করতে হবে। ঢাকামুখী জনস্রোত কমানোই স্থায়ী সমাধান। ঢাকার ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ মানুষ এখানে বাস করছে। এই চাপ কমাতে হলে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। বরিশালসহ সব শহরকে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

শেষ কথা: থামা নয়, এগোতে হবে : ঢাকা আমাদের সবার। এই শহরের প্রতি আমাদের দায় আছে। যানজট কোনো নিয়তি নয়—এটি আমাদের ব্যর্থতার ফল। চাইলে আমরা পারি। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাহসী সিদ্ধান্ত ও কঠোর বাস্তবায়ন। যানজট নিরসন মানে শুধু গাড়ি চালানো সহজ করা নয়—এটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করার প্রশ্ন। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আর অপেক্ষা করব, নাকি এখনই সিদ্ধান্ত নেব?

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজাপুরে মহিলা দলের উদ্যোগে বেগম জিয়ার স্মরণে দোয়া অনুষ্ঠিত

যানজট নিরসন ও যাত্রীদের নিরাপত্তা: থেমে থাকা শহর, থমকে যাওয়া জীবন

প্রকাশিত : ০৮:১২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

জুবাইয়া বিন্তে কবির : ঢাকা একসময় কেবল একটি শহর ছিল না—ঢাকা ছিল স্বপ্ন। যে স্বপ্নে জড়ো হতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষের আশা, পরিশ্রম আর ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। সেই ঢাকাই আজ যেন ক্লান্ত, অবসন্ন, শ্বাসরুদ্ধ। ঢাকার সড়কগুলো আর চলমান নয়, সেগুলো থেমে আছে। আর সেই থেমে থাকা সড়কের সঙ্গে থেমে যাচ্ছে মানুষের জীবন, সময় ও সম্ভাবনা। আমি এখন বরিশালে থাকি—একটি বিভাগীয় শহর, যেখানে এখনও সকালে রাস্তা পার হওয়া যায় আতঙ্ক ছাড়া, যেখানে যানজট মানে কয়েক মিনিটের বিলম্ব, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা নয়। কিন্তু ঢাকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কেটেছে শাহবাগ, টিএসসি, কলাভবন, নীলক্ষেত আর দোয়েল চত্বরের ভিড়ে। আজও আমার ছোট বোন, ননদসহ বহু আপনজন ঢাকায় থাকে। ফলে প্রয়োজনে, দায়িত্বে কিংবা আবেগের টানে আমাকে ঢাকায় যেতে হয়। আর প্রতিবার ঢাকায় গেলেই মনে হয়—এই শহর কি আর মানুষকে বাঁচতে দিচ্ছে?

যানজট: ঢাকার নতুন পরিচয় : ঢাকায় প্রবেশ করলেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো গতিহীনতা। গাড়ির সারি, ধোঁয়া, হর্নের বিকট শব্দ, ক্লান্ত মুখ, বিরক্ত চোখ। দশ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টা লেগে যায়। এই যানজট এখন আর ব্যতিক্রম নয়—এটাই নিয়ম। যানজট শুধু একটি যাতায়াত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তাজনিত সংকট। এই সংকট ধীরে ধীরে ঢাকাকে একটি অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর ও অকার্যকর নগরীতে পরিণত করছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক: নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার
যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। পায়ে চালানো রিকশার সঙ্গে ইঞ্জিন যুক্ত করে যে যানবাহন তৈরি হয়েছে, তা কোনো সুপরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থার অংশ নয়। এগুলোর চালকদের অধিকাংশের নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা। বাস, প্রাইভেট কারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব রিকশা সড়কের মাঝখানে দৌড়ায়। সামনে ও পাশে বাম্পার লাগিয়ে রিকশাকে বড় করা হয়, যা অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীতে প্রায় ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। সারাদেশে সংখ্যাটি প্রায় ৬০ লাখ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ডিজাইনের ই-রিকশা। পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব যানবাহন চলাচল করলে নগরজীবনের পরিণতি কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

যানজট ও অপরাধ: থেমে থাকা গাড়ি, উন্মুক্ত মানুষ
যানজট অপরাধের জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। গাড়ি থেমে আছে, মানুষ অসহায়—এই সুযোগেই সক্রিয় হয় ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি, সন্ত্রাসীরা। যানজটে আটকে থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছুরিকাঘাত, এমনকি গুলির ঘটনাও ঘটে। যানজট যেন অপরাধীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। ক্যামেরাহীন সড়ক, দুর্বল নজরদারি, আইন প্রয়োগের ঘাটতি—সব মিলিয়ে নগরবাসীর নিরাপত্তা দিন দিন ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে।

 

অর্থনীতিতে যানজটের ক্ষত : ঢাকার যানজট দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ আঘাত হানছে। প্রতিদিন রাজধানীতে প্রায় ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক হাজার হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতি সরাসরি জিডিপিতে প্রভাব ফেলছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ: নীরব ঘাতক যানজট : যানজট মানুষের শরীরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ফলে মানুষ শ্বাস নেয় বিষাক্ত বাতাস। কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, পার্টিকুলেট ম্যাটার ঢুকে পড়ে ফুসফুসে। বাড়ছে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকি। শব্দদূষণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। হর্নের শব্দে বাড়ছে মাথাব্যথা, অনিদ্রা, মানসিক অবসাদ। যানজট মানুষের মন-মেজাজকে বিষিয়ে তুলছে, যার প্রভাব পড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে।

অব্যবস্থাপনা: সমস্যার মূল : ঢাকার যানজটের মূল কারণ অব্যবস্থাপনা। একই সড়কে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন গতির যানবাহন চলছে। লেন থাকলেও লেন মানার সংস্কৃতি নেই। লেন বিভাজনের স্পষ্ট চিহ্ন নেই। ট্রাফিক আইন প্রয়োগ দুর্বল। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ভয়াবহ হারে বেড়েছে। ঢাকায় চলাচলরত যানবাহনের প্রায় ৫০ শতাংশই ব্যক্তিগত, অথচ তারা বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। বিলাসিতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে গাড়ি।

সমাধানের পথ: কেবল পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন :
যানজট নিরসনে বহু পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এখন প্রয়োজন কঠোর সিদ্ধান্ত। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রিকশা ও সাইকেলের জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ করতে হবে। ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গণপরিবহনকে নিরাপদ, আধুনিক ও মানবিক করতে হবে। ঢাকামুখী জনস্রোত কমানোই স্থায়ী সমাধান। ঢাকার ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ মানুষ এখানে বাস করছে। এই চাপ কমাতে হলে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। বরিশালসহ সব শহরকে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

শেষ কথা: থামা নয়, এগোতে হবে : ঢাকা আমাদের সবার। এই শহরের প্রতি আমাদের দায় আছে। যানজট কোনো নিয়তি নয়—এটি আমাদের ব্যর্থতার ফল। চাইলে আমরা পারি। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাহসী সিদ্ধান্ত ও কঠোর বাস্তবায়ন। যানজট নিরসন মানে শুধু গাড়ি চালানো সহজ করা নয়—এটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করার প্রশ্ন। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আর অপেক্ষা করব, নাকি এখনই সিদ্ধান্ত নেব?