জুবাইয়া বিন্তে কবির: একটি জাতির ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কেবল সময়ের প্রয়োজনে আবির্ভূত হন না—বরং সময়কেই নতুন সংজ্ঞা দেন। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ, সাহস ও প্রত্যয়ের প্রতীক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই একজন মানুষ—যাঁর নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং আত্মমর্যাদার সংগ্রাম এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে, এবং আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে, তিনি ছিলেন কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নন—তিনি ছিলেন শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার উদ্যোগে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে’—এই প্রশ্নে আয়োজিত শ্রোতা জরিপে শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯তম স্থানে অবস্থান করেন। সংখ্যার হিসাব দিয়ে ইতিহাসের উচ্চতা মাপা যায় না—এ কথা সত্য। তবু এই অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে তিনি কীভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। আজ, তাঁর জন্মবার্ষিকীতে, বিবিসি বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন সেই স্মৃতিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে—ইতিহাসের পাতায়, মানুষের অনুভূতিতে, এবং আমাদের পারিবারিক স্মৃতিচারণায়।
হঠাৎ আবির্ভাব, দৃঢ় নেতৃত্ব : ১৯৭১ সাল—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সেই সময়েই জাতীয় জীবনে হঠাৎ করেই আবির্ভাব ঘটে একজন সেনা কর্মকর্তার—মেজর জিয়াউর রহমান। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বর্বরতা, নিরস্ত্র মানুষের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, আর বাঙালির দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে তখন প্রয়োজন ছিল এক দৃঢ় কণ্ঠ, এক সাহসী নেতৃত্ব। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা তাঁর কণ্ঠ—“আমি মেজর জিয়া, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি”—সেই মুহূর্তে গোটা জাতির মনে জ্বেলে দিয়েছিল আগুন, জাগিয়ে তুলেছিল প্রতিরোধের সাহস। স্বাধীনতার ঘোষণাকে ঘিরে ইতিহাসে নানা আলোচনা ও দলিল রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা ও রাষ্ট্রীয় নথি বলছে, শহীদ জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে সেই ঘোষণা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল স্বাধীনতার বার্তা, দিয়েছিল সংগঠিত প্রতিরোধের দিকনির্দেশনা।

শৈশব থেকে সৈনিক জীবন : ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নিভৃত গ্রাম বাগবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। ডাকনাম ছিল ‘কমল’। তাঁর বাবা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ—সরকারি দফতরে কর্মরত। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বগুড়া ও কলকাতায়। ভারত বিভাগের পর বাবার কর্মস্থল করাচিতে বদলি হলে সেখানেই শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন হয় তাঁর। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে তিনি যোগ দেন সামরিক বাহিনীতে। একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন ছিল শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধে ভরপুর। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে তাঁর অসীম সাহসিকতা আজও সামরিক ইতিহাসে আলোচিত। কিন্তু সৈনিক জিয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক; দেশের সংকটে যিনি কখনো পেছনে দাঁড়াননি।
মুক্তিযুদ্ধ: অস্ত্র হাতে এক যোদ্ধা ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহঅধিনায়ক হিসেবে বদলি হওয়ার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁর সহকর্মী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের ভাষ্যে জানা যায়—নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের অনীহা, নতুন করে সেনা ও অস্ত্র পাঠানোর পরিকল্পনা—সবই তাঁকে বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়। ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকায় গণহত্যার সংবাদ পৌঁছানোর পর, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই চট্টগ্রামে বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। এরপর তিনি প্রথমে সেক্টর কমান্ডার, পরে জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধশেষে বিজয় অর্জনের পর তিনি আবার ফিরে যান সৈনিক জীবনে—ক্ষমতার মোহ নয়, দায়িত্ববোধই ছিল তাঁর চালিকাশক্তি।
রাষ্ট্রনায়কে উত্তরণ : স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর সংকটের সূচনা করে। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এরপর একের পর এক ঘটনা—ক্ষমতার পালাবদল, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা।
এই অস্থির সময়েই ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান সামনে আসেন জাতীয় নেতৃত্বে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ভাষায়—এই অভ্যুত্থান জিয়ার উদ্যোগে না হলেও, এর ফলশ্রুতিই তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দেয়। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায়, তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের প্রয়োজনীয় নেতা।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক দর্শন : জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান—বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসনব্যবস্থায় যখন বাক-ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত, সংবাদপত্রের কণ্ঠ রুদ্ধ—তখন তিনি রাজনীতির পরিসর উন্মুক্ত করেন। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বীকৃতি দেন, মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দল কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়—এটি হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের দর্শনের বাহক। আমার পরিবারের কাছে বিএনপি মানে কেবল রাজনীতি নয়—এটি একটি মূল্যবোধ, একটি বিশ্বাসের নাম, যার কেন্দ্রে ছিলেন শহীদ জিয়া।

অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও সার্ক : রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান বুঝেছিলেন—শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনই একটি দেশের প্রকৃত শক্তি। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন, স্বনির্ভরতার দর্শন—এসব তাঁর শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের মর্যাদা সুদৃঢ় করেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক গঠনের ধারণায় তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
ব্যক্তিত্ব ও মানবিকতা : শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন সহজ-সরল, বিনয়ী, অথচ অসম সাহসী। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ছিল না। একজন সৈনিকের শৃঙ্খলা আর একজন রাজনীতিকের দূরদর্শিতা—এই দুইয়ের বিরল সমন্বয় তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল। আমাদের পরিবারে তাঁর নাম উচ্চারণ মানেই ছিল সততা, নিষ্ঠা আর দেশপ্রেমের গল্প।
শাহাদাত: এক বেদনাবিধুর অধ্যায় : ১৯৮১ সালের ৩০ মে—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যুতে গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। শোকের সেই দিন আজও আমাদের পারিবারিক স্মৃতিতে গভীরভাবে আঁকা।
উত্তরাধিকার ও চলমান প্রভাব : জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তাঁর সহধর্মিণী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি টিকে থাকে, শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি। এটি প্রমাণ করে—শহীদ জিয়ার দর্শন, আদর্শ ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো জীবন্ত।
ব্যক্তিগত অনুভব : আমার এবং আমার পরিবারের কাছে শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন কেবল ইতিহাসের একজন চরিত্র নন। তিনি ছিলেন আমাদের বিশ্বাসের আশ্রয়, সংকটে সাহসের প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে—দেশপ্রেম মানে কেবল স্লোগান নয়; এটি দায়িত্ব, ত্যাগ ও সততার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।
পরিশেষে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইতিহাসের বিচারেই কেবল মহান নন—মানুষের হৃদয়ের বিচারেও তিনি শ্রেষ্ঠ। বিবিসি বাংলার জরিপে ১৯তম স্থান হয়তো একটি সংখ্যা, কিন্তু জাতির আত্মপরিচয়ে তাঁর অবস্থান অনেক উঁচুতে। স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযোদ্ধা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, রাষ্ট্রনায়ক—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই মহান মানুষটিকে—যাঁর জীবন ও ত্যাগ আমাদের জন্য চিরন্তন প্রেরণা হয়ে থাকবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















