জুবাইয়া বিন্তে কবির: বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যেখানে নার্সিং, মেডিকেল সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ।
তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম শুধু নতুন ভবনের উদ্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় আসলে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মার প্রতীক। এখানেই জন্ম নেয় নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি, নতুন দর্শন এবং নতুন নেতৃত্ব। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আরও বড় প্রশ্নটি সামনে আনতে হবে বাংলাদেশ কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে চায়, নাকি সত্যিকার অর্থেই বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চায়?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বিশ্বমানের অবস্থান কোথায়? গত তিন দশকে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো খুবই সীমিত। QS World University Rankings এবং Times Higher Education-এর মতো আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থাগুলোর সূচকে গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণার প্রভাব এবং উদ্ভাবনের সূচকে বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। এটি কোনো হতাশার গল্প নয়; বরং আত্মসমালোচনার একটি সুযোগ। কারণ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই বুঝেছে—একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা।
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে গড়ে ওঠে? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT), অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, স্ট্যানফোর্ড, ETH Zurich, National University of Singapore (NUS), KAIST কিংবা Tsinghua University এসব প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের শক্তি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে নয়; বরং গবেষণা, একাডেমিক স্বাধীনতা, বিশ্বমানের শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনের সংস্কৃতিতে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট অনেক দেশের সম্পূর্ণ শিক্ষা বাজেটের চেয়েও বড়। এমআইটি থেকে জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, যেগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে তুলনীয়। দক্ষিণ কোরিয়ার KAIST দেশটির প্রযুক্তিগত বিপ্লবের অন্যতম চালিকাশক্তি। সিঙ্গাপুরের NUS মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে এশিয়ার অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে।
ভবন নয়, গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ : বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য তার স্থাপত্যে নয়; তার গবেষণাগারের নীরবতায়, গ্রন্থাগারের আলোয় এবং গবেষকের চিন্তায়। UNESCO-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব দেশ গবেষণা ও উন্নয়ন (Research and Development) খাতে জাতীয় আয়ের বড় অংশ বিনিয়োগ করে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি গবেষণায় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করে। এর ফলেই তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জৈবপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং শিল্প উদ্ভাবনে বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশকেও যদি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হয়, তাহলে গবেষণাকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষকই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় : বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার ভবন নয়, তার শিক্ষক।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে শুধু ডিগ্রি নয়; গবেষণার মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, গবেষণা নেতৃত্ব, পেটেন্ট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও অসংখ্য মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করছেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার, গবেষণা-সহকারী, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা নীতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন শিক্ষক প্রশাসনিক জটিলতার চেয়ে গবেষণাগারে বেশি সময় ব্যয় করবেন, একজন গবেষক অনুদানের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না এবং একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সাহস অর্জন করবে।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি বিশ্ববিদ্যালয়: উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা : একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের শক্তি আর কেবল তার ভূখণ্ড, জনসংখ্যা কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানব পুঁজি। আর এই মানব পুঁজি তৈরির প্রধান কারখানা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয় না; বরং জাতীয় উদ্ভাবন ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। জার্মানির গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও ফ্রাউনহোফার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় দেশটির শিল্পোন্নয়নকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সিঙ্গাপুর স্বাধীনতার পর প্রাকৃতিক সম্পদের অভাবকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে শিক্ষা ও গবেষণাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আজ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS) এবং নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি (NTU) শুধু এশিয়ার নয়, বিশ্বেরও শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: উন্নয়নের সবচেয়ে লাভজনক পথ : বিশ্বের যেসব দেশ প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি, মহাকাশ গবেষণা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে তারা গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে বিপুল বিনিয়োগ করে। দক্ষিণ কোরিয়া বহু বছর ধরেই গবেষণা ও উন্নয়ন (Research and Development) খাতে জিডিপির চার শতাংশেরও বেশি ব্যয় করছে। ইসরায়েলও বিশ্বের সর্বোচ্চ গবেষণা বিনিয়োগকারী দেশগুলোর অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবছর হাজার হাজার গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করে, যেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন ওষুধ, নতুন প্রযুক্তি, নতুন শিল্প এবং নতুন কর্মসংস্থান। বাংলাদেশেও গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিল গঠন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। গবেষণাকে যদি ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে এর সুফল অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এবং প্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হবে।
ঝালকাঠিতে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি :
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে বগুড়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় জেলা ঝালকাঠিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা সময়ের দাবি। ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষিণাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান শিল্প, কৃষি, নৌপরিবহন, জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলীয় গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের বাস্তবতা বিবেচনায় এই অঞ্চলে একটি গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, জিনোমিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্লু ইকোনমি, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কৃষি, ফিনটেক, মেডিকেল টেকনোলজি, মেডিকেল সায়েন্স এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ ভবিষ্যতমুখী বিষয়সমূহ চালু করা হলে এটি শুধু দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে না; বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা যদি ঝালকাঠিতে এমন একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তবে তা আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিকাশ এবং স্মার্ট, জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের পথে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
মেধাপাচার রোধে প্রয়োজন সম্মানজনক গবেষণা পরিবেশ :বাংলাদেশের বহু মেধাবী শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানী আজ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁদের অনেকেই আন্তর্জাতিকভাবে অসামান্য সাফল্য অর্জন করছেন। এটি আমাদের মেধার সক্ষমতার প্রমাণ হলেও একই সঙ্গে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি নীরব সংকটও তুলে ধরে।
যখন একজন গবেষক পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল পান না, আধুনিক গবেষণাগারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, প্রশাসনিক জটিলতায় সময় নষ্ট করেন কিংবা গবেষণার যথাযথ মূল্যায়ন পান না, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিবেশ খুঁজবেন যেখানে তাঁর মেধার যথাযথ বিকাশ সম্ভব।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি, যেখানে মেধা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়, গবেষণা হবে সবচেয়ে বড় মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব ও দায়িত্ব নির্ধারিত হবে। তাহলেই দেশের মেধাবীরা দেশে থেকেই বিশ্বমানের গবেষণায় অবদান রাখতে আগ্রহী হবেন।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন দায়িত্ব :
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বায়োটেকনোলজি, সাইবার নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডেটা সায়েন্স এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা—এই বিষয়গুলো আগামী কয়েক দশকের বিশ্ব অর্থনীতিকে পরিচালিত করবে। সুতরাং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু নতুন বিভাগ চালু করা নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরি সৃষ্টিকারী, উদ্ভাবক এবং গবেষক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেই লক্ষ্যেই পাঠ্যক্রম, গবেষণা এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে হবে।
উচ্চশিক্ষা সংস্কারের নতুন রূপরেখা: এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্তের : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী জাতীয় কৌশল। সেই কৌশলের ভিত্তি হতে হবে গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিকীকরণ, সুশাসন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে জাতীয় প্রয়োজন, আঞ্চলিক সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের আলোকে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন জরুরি। একই সঙ্গে গবেষণা, শিক্ষার মান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্নাতকদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক অবদানের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বাধীন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সুস্থ প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতাই উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের সেতুবন্ধন: জ্ঞান থেকে অর্থনীতির পথে : বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি, জার্মানির গবেষণানির্ভর শিল্পব্যবস্থা কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল উদ্ভাবনের প্রাণকেন্দ্র। বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষাকে শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি স্থানান্তর কেন্দ্র, ইনোভেশন হাব, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে গবেষণাকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে কী প্রয়োজন?
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে উন্নতির জন্য কেবল অবকাঠামো নয়; প্রয়োজন উচ্চমানের গবেষণা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বৈশ্বিক গবেষণা সহযোগিতা এবং শক্তিশালী একাডেমিক সুনাম। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক গবেষণা কনসোর্টিয়াম, উন্নত গবেষণাগার, ডিজিটাল গ্রন্থাগার এবং ওপেন-অ্যাক্সেস গবেষণা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার অর্থ শুধু র্যাংকিংয়ে অগ্রসর হওয়া নয়; বরং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডারে বাংলাদেশের অর্থবহ অবদান নিশ্চিত করা।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি সময়োপযোগী আহ্বান : বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে গবেষণাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা, মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার, পোস্টডক্টরাল সুযোগ এবং একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষকসমাজ, গবেষক ও শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। কারণ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কখনো কেবল অবকাঠামো দিয়ে গড়ে ওঠে না; তা নির্মিত হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, সুশাসন, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশের ওপর।
পরিশেষে, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিধন্য বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আগামীতে দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি জেলায়ও যাতে একটি বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় সে বিষয়টিকেও জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়টি কতটি ভবন নির্মাণ করল তার ওপর নয়; বরং কতজন বিশ্বমানের শিক্ষক তৈরি করল, কতটি মৌলিক গবেষণা প্রকাশ করল, কতটি উদ্ভাবন সৃষ্টি করল এবং দেশের উন্নয়নে কতটা কার্যকর অবদান রাখতে পারল তার ওপর। ইতিহাস আমাদের একটি সুস্পষ্ট শিক্ষা দেয় হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এমআইটি কিংবা এনইউএস কোনোটি একদিনে বিশ্বসেরা হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণায় বিনিয়োগ, মেধার মর্যাদা, একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং উৎকর্ষের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারই তাদের আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথেই এগোতে পারে। প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নীতিগত স্থিতিশীলতা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদের প্রতি অটল আস্থা। কারণ যে জাতি তার বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করে, সে জাতিই ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। আর যে রাষ্ট্র তার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মুক্তচিন্তার আলো জ্বালাতে পারে, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রদীপও দীর্ঘস্থায়ীভাবে প্রজ্বলিত থাকে।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডেস্ক রিপোর্ট 






















