ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

‘হেপাটাইটিস’ বাধা বিদেশযাত্রায়, ভেঙে যাচ্ছে প্রবাসের স্বপ্ন

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত : ০২:১০:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

কর্মসংস্থানের আশায় প্রতি বছর সিলেট থেকে হাজারো মানুষ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ভিসা, চাকরির চুক্তি ও সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি বা সি ধরা পড়ায় শেষ মুহূর্তে থেমে যাচ্ছে অনেকের বিদেশযাত্রা। অধিকাংশই আগে জানতেন না, তাদের শরীরে নীরবে বাসা বেঁধেছে এই ভাইরাস। ফলে কেউ হারাচ্ছেন চাকরির সুযোগ, কেউ পিছিয়ে দিচ্ছেন বিদেশযাত্রা, আবার কেউ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আক্রান্তদের অধিকাংশই আগে জানতেন না যে তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। বিদেশগামী মেডিকেল পরীক্ষা, রক্তদান কিংবা অন্য কোনো রোগের চিকিৎসার সময় প্রথমবারের মতো তাদের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে। ফলে রোগটি নীরবে লিভারের ক্ষতি করতে থাকে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে একপর্যায়ে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো জটিল রোগে পরিণত হতে পারে।

মেডিকেল রিপোর্টেই থেমে যায় বিদেশযাত্রা

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) এই ছয়টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা জিসিসি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে সম্পন্ন করা হয়। ওই পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি বা সি শনাক্ত হলে অনেকের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা (ছদ্মনাম) ছালাম আহমদ কয়েক মাস আগে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। ভিসা, চাকরির চুক্তি ও অন্যান্য কাগজপত্র হাতে পেলেও মেডিকেল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি শনাক্ত হয়। এরপর তার বিদেশযাত্রা স্থগিত হয়ে যায়।

ছালাম বলেন, কখনও ভাবিনি আমার শরীরে এমন রোগ আছে। বিদেশে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর মেডিকেল রিপোর্টে বিষয়টি জানতে পারি। এখন চিকিৎসা নিচ্ছি, কিন্তু কবে যেতে পারব জানি না।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সিলেটের বালাগঞ্জের আরেক যুবক। কাতারে চাকরির সুযোগ পেলেও মেডিকেল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস ‘সি’ শনাক্ত হওয়ায় নতুন করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়েছে। এতে বিদেশযাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিদেশ যাওয়ার আগে জানেন না ঝুঁকি

বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিতে পাসপোর্ট, ভিসা, চাকরির চুক্তি ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অনেক কর্মী নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আগাম সচেতন থাকেন না। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ও সি সম্পর্কে ধারণার ঘাটতির কারণে অনেকেই জানেন না, শরীরে ভাইরাস থাকলেও দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, বিদেশগামী কর্মীদের শুধু নির্ধারিত মেডিকেলের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী আগেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং ও টিকাদানের আওতায় আনা গেলে রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়

হেপাটাইটিসের সার্বিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ এবং প্রতিরোধে সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস কোনো একক রোগ নয়, এটি বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসজনিত লিভারের প্রদাহের সমষ্টিগত নাম। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই প্রতিটির সংক্রমণের ধরন ও জটিলতা আলাদা। এর মধ্যে বি ও সি সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ। কারণ আক্রান্ত অনেকেই বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ ছাড়াই ভাইরাস বহন করেন। একপর্যায়ে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর কিংবা লিভার ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।

তিনি বলেন, হেপাটাইটিস ‘ই’ সাধারণত দূষিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ডা. মাহবুবুল আলম আরও বলেন, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার, জীবাণুমুক্ত ক্ষুর-ব্লেড ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ব্যবহার, নিরাপদ পানি এবং হেপাটাইটিসের টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় এনে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুগ্মসচিব পর্যায়ের ৩২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল সরকার

‘হেপাটাইটিস’ বাধা বিদেশযাত্রায়, ভেঙে যাচ্ছে প্রবাসের স্বপ্ন

প্রকাশিত : ০২:১০:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

কর্মসংস্থানের আশায় প্রতি বছর সিলেট থেকে হাজারো মানুষ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ভিসা, চাকরির চুক্তি ও সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি বা সি ধরা পড়ায় শেষ মুহূর্তে থেমে যাচ্ছে অনেকের বিদেশযাত্রা। অধিকাংশই আগে জানতেন না, তাদের শরীরে নীরবে বাসা বেঁধেছে এই ভাইরাস। ফলে কেউ হারাচ্ছেন চাকরির সুযোগ, কেউ পিছিয়ে দিচ্ছেন বিদেশযাত্রা, আবার কেউ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আক্রান্তদের অধিকাংশই আগে জানতেন না যে তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। বিদেশগামী মেডিকেল পরীক্ষা, রক্তদান কিংবা অন্য কোনো রোগের চিকিৎসার সময় প্রথমবারের মতো তাদের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে। ফলে রোগটি নীরবে লিভারের ক্ষতি করতে থাকে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে একপর্যায়ে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো জটিল রোগে পরিণত হতে পারে।

মেডিকেল রিপোর্টেই থেমে যায় বিদেশযাত্রা

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) এই ছয়টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা জিসিসি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে সম্পন্ন করা হয়। ওই পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি বা সি শনাক্ত হলে অনেকের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা (ছদ্মনাম) ছালাম আহমদ কয়েক মাস আগে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। ভিসা, চাকরির চুক্তি ও অন্যান্য কাগজপত্র হাতে পেলেও মেডিকেল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি শনাক্ত হয়। এরপর তার বিদেশযাত্রা স্থগিত হয়ে যায়।

ছালাম বলেন, কখনও ভাবিনি আমার শরীরে এমন রোগ আছে। বিদেশে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর মেডিকেল রিপোর্টে বিষয়টি জানতে পারি। এখন চিকিৎসা নিচ্ছি, কিন্তু কবে যেতে পারব জানি না।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সিলেটের বালাগঞ্জের আরেক যুবক। কাতারে চাকরির সুযোগ পেলেও মেডিকেল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস ‘সি’ শনাক্ত হওয়ায় নতুন করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়েছে। এতে বিদেশযাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিদেশ যাওয়ার আগে জানেন না ঝুঁকি

বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিতে পাসপোর্ট, ভিসা, চাকরির চুক্তি ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অনেক কর্মী নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আগাম সচেতন থাকেন না। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ও সি সম্পর্কে ধারণার ঘাটতির কারণে অনেকেই জানেন না, শরীরে ভাইরাস থাকলেও দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, বিদেশগামী কর্মীদের শুধু নির্ধারিত মেডিকেলের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী আগেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং ও টিকাদানের আওতায় আনা গেলে রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়

হেপাটাইটিসের সার্বিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ এবং প্রতিরোধে সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস কোনো একক রোগ নয়, এটি বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসজনিত লিভারের প্রদাহের সমষ্টিগত নাম। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই প্রতিটির সংক্রমণের ধরন ও জটিলতা আলাদা। এর মধ্যে বি ও সি সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ। কারণ আক্রান্ত অনেকেই বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ ছাড়াই ভাইরাস বহন করেন। একপর্যায়ে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর কিংবা লিভার ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।

তিনি বলেন, হেপাটাইটিস ‘ই’ সাধারণত দূষিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ডা. মাহবুবুল আলম আরও বলেন, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার, জীবাণুমুক্ত ক্ষুর-ব্লেড ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ব্যবহার, নিরাপদ পানি এবং হেপাটাইটিসের টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় এনে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।